December 8, 2019 ·
‘দূরে গেলে যেন ভুলে যেও না,
গানে গানে জেনো কাছে রব...’
শ্রদ্ধায়, স্মরণে কিংবদন্তী কবি ও গীতিকার শ্যামল গুপ্ত
***************************************
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও কবি শ্যামল গুপ্তের ৯৭তম জন্মদিন ছিল গত ৩
ডিসেম্বর। অজস্র কালজয়ী গানের রচয়িতা তিনি। বিশ শতকের পাঁচের দশক থেকে সত্তর দশক অবধি
বাংলা গানের জনপ্রিয় গীতিকার হিসেবে যাঁরা খ্যাতির মধ্যগগনে ছিলেন তাঁদের মধ্যে শ্যামল গুপ্ত (জন্ম: ৩
ডিসেম্বর, ১৯২২ – মৃত্যু: ২৮ জুলাই, ২০১০) ছিলেন অন্যতম। বেসিক আধুনিক গান থেকে আকাশবাণীর
রম্যগীতি, রাগাশ্রয়ী গান থেকে লঘুসংগীত এবং বাংলা ছায়াছবির অসংখ্য কালজয়ী গান রচনায় তিনি
তাঁর উজ্জ্বল প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর লেখা গান গেয়েছেন সেকালের খ্যাতনামা শিল্পীরা। জগন্ময়
মিত্র, যূথিকা রায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সুপ্রীতি ঘোষ,
রমা দেবী, ইলা বসু, গায়ত্রী বসু, বাণী ঘোষাল, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্পনা মুখোপাধ্যায়, আরতি
মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, উৎপলা সেন, ললিতা ধরচৌধুরী, লক্ষ্মী শংকর, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী
সেনগুপ্ত, কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, তালাত মাহমুদ,
শৈলেন মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মান্না দে,
পিন্টু ভট্টাচার্য, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শচীন গুপ্ত, সমর গুপ্ত, অরুণ দত্ত, সুদাম বন্দ্যোপাধ্যায়, আব্দুল জব্বর,
অনুপ ঘোষাল প্রমুখ স্বনামধন্য শিল্পীদের কণ্ঠে চল্লিশের শেষের দিক থেকে সত্তর দশক অবধি শ্যামল
মিত্রের রচিত অসামান্য সব গান বাঙালি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। বাংলা ছায়াছবির গানেও ছিল তাঁর
স্বমহিমায় উপস্থিতি। তিনি শুধু গীতিকার ও কবি ছিলেন না, গল্প ও চিত্রনাট্যও লিখতেন। ‘বধূবরণ’ ও
‘পুতুলঘর’ ছবির কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন। কবিতা লিখেছেন ‘অরণি’, ‘অভ্যুদয়’, ‘একক’ ইত্যাদি
সাহিত্য পত্রিকায়। ছোটোগল্প লিখেছেন ‘বসুমতী’ ও ‘সাহিত্যযুগ’ পত্রিকায়।
১৯২২ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় শ্যামল গুপ্তের জন্ম। তাঁদের পৈতৃক বাসস্থান বিহারের জামালপুরে।
তাঁর বাবা ও ঠাকুরদা দু’জনেই মুঙ্গের হাইকোর্টের আইনজীবী ছিলেন। তাঁদের আদিবাড়ি অবশ্য ছিল উত্তর
চব্বিশ পরগনার হালিশহরে। তিনি স্কটিশ চার্চ স্কুল ও কলেজের ছাত্র ছিলেন। পরে বিজ্ঞান শাখার মেধাবী
বিদ্যার্থী শ্যামল গুপ্ত উচ্চশিক্ষা লাভ করেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৪৫ সালে সেখান
থেকেই রসায়নে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর মহারাষ্ট্রের পুনেতে ভারত সরকারের
মিলিটারি বিভাগের বিস্ফোটক কারখানার গবেষণাগারে রসায়নবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁর মন
পড়েছিল কাব্যসাহিত্য ও সংগীতের জগতে। ১৯৪৭ সালে চাকরিতে ইস্তফা দেন। চলে আসেন কলকাতায়।
বিস্ফোটক বানাতে নয়, তিনি যে বাংলা গানের দুনিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাই কলকাতায়
ফিরেই কিছুকাল বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সংগীতে মনপ্রাণ নিবেদন করেন।
প্রথম আত্মপ্রকাশ গায়ক হিসেবে। শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রবাদপুরুষ তারাপদ চক্রবর্তীর সুযোগ্য শিষ্য মণি
ঘোষের কাছে মার্গ সংগীতের প্রাথমিক তালিম নেন। ‘এইচএমভি’ গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর কণ্ঠে
তিনটি গান প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রামোফোন কোম্পানির সূত্রে আলাপ-পরিচয় হয় প্রবাদপ্রতিম শিল্পী
সুরসাগর জগন্ময় মিত্রের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালেই তাঁর রচিত জীবনের প্রথম দু’খানি গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন
জগন্ময়। গান দু’টি ছিল ‘প্রণাম তোমায় হে নির্ভয়’ এবং ‘অন্তবিহীন নয় তো অন্ধকার’। জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে
তাঁর রচিত ‘কতদিন পরে এলে’ গানটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এই গানের সুরকারও শিল্পী স্বয়ং।
শ্যামল গুপ্ত রচিত ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’, ‘বিজুরী চমকে এলো ঝড়’, ‘ঘুমালো রাতের চাঁদ’,
‘যদি তুমি না এ গান কোনোদিন শোনো’, ‘কথা দাও ভুলবে না গো’, ‘পাষাণের বুকে লিখো নাম’, ‘পুজোর ছুটি’
(গতবারের শরৎকালে), ‘আমি নিরালায় বসে’, ‘ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে’, ‘সোনা রোদের গান’,
‘জানি পৃথিবী আমায় যাবে ভুলে’, ‘বনের বসন্ত এলো’, ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কী হবে’, ‘ঝরা পাতা
ঝড়কে ডাকে’, ‘এই ভালো আছি বেশ একলা’, ‘বাঁধো ঝুলনা’, ‘আরো একটুখানি কাছে থাকো না’, ‘তুমি সুন্দর
নাহি যদি হও’, ‘এই পারে বাংলা ওই পারে বাংলা’, ‘আমি সাপের বিষে জ্বলছি না হায় হায়’, ‘মন বলছে
আজ সন্ধ্যায় কিছু বলতে তুমি আসবে কি’, ‘দূরে দূরে থেকো না’, ‘না যেও না গো চলে যেও না’, ‘বনের
পাখি গায় বোলো না বোলো না’, ‘পাখি আজ কোন সুরে গায়’, ‘ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে’, ‘গুন গুন
ভ্রমরা গুঞ্জরি’, ‘এই ফুলের দেশে কোন্ ভ্রমর এসে’, ‘কৃষ্ণচূড়ার স্বপ্ন ঝরা’, ‘যে আঁখিতে এত হাসি লুকানো’, ‘এ
যেন সেই রাত হারিয়ে যাওয়া’, ‘পরেছি চাঁপা ডুরে শাড়ি’, ‘চাঁদ তুমি ঘুমাতে পারো’, ‘জলতরঙ্গ বাজে
আনমনা সাঁঝে’ ইত্যাদি কালোত্তীর্ণ গানগুলি আজো ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, উস্তাদ আলি
আকবর খাঁ, উস্তাদ মুনাব্বর আলি খাঁ, দক্ষিণামোহন ঠাকুর, চিন্ময় লাহিড়ী, কমল দাশগুপ্ত, নিখিল ঘোষ,
কানু ঘোষ, পি ভি কৃষ্ণমূর্তি, ভি বালসারা, রাজেন সরকার, নচিকেতা ঘোষ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, শচীন গুপ্ত,
সন্তোষ মুখোপাধ্যায়, দুর্গা সেন, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, অজয় দাস, অনুপম মুখোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়,
রতু মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, তপন সিংহ, যূথিকা রায়,
উৎপলা সেন, অসীমা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, প্রভাস দে, অনিল বাগচী, অনল চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকা,
অরুণ ভাদুড়ী, আনন্দ শংকর, বাপ্পী লাহিড়ী প্রমুখ স্বনামধন্য সুরকাররা তাঁর গানে সুর দিয়েছিলেন। তাঁর
কথায় সুর দিয়ে জীবনসাথী ও গানের সাথী গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও গেয়েছেন। ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা
একা কী হবে’, ‘ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে’ ইত্যাদি জনপ্রিয় গানের সুরকার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। একাত্তরে
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে শ্যামল গুপ্তের কথায় একটি ঐতিহাসিক গান সৃষ্টি হয়েছিল। ‘হাজার
বছর পরে আবার এসেছি ফিরে বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে’। গেয়েছিলেন দরদি কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার।
শ্যামল গুপ্তের কথায় ‘মন্দিরে নয় সেথায় যাবো প্রাণের কুসুম লয়ে’, ‘হারালো কোথায় আমার সে গান’,
‘অসময়ে নেমে বরষা দিয়েছে’, ‘সবার চেয়ে দামি জানি যা পেয়েছি আমি’, ‘আগামী দিনের সবুজ স্বপ্ন’,
আঁখিজলে হায়’, ‘গেঁথে আন রে মালা’, ‘আজ বলে যায় পৃথিবী’, ‘স্বপ্নভরা অন্ধকারে’, আজকে আমি
মরণলোকে’, ‘আঁখি জাগে শ্যামরূপরাগে’, ‘প্রেম যে কাঁদে রাধার’, ‘হয়তো আবার ফিরে আসবে’, ‘এমনি করে
আরো কদিন’, ‘এই রাতের শেষে’, ‘যেও না, না যেও না’, ‘নাচে নাচে বৃষ্টি নাচে’, ‘অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটছে’,
‘আমি তার ছলনাতে ভুলব না’, ‘জাগি নিশি একলা নিরালায়’, ‘জ্যোৎস্না হাসি আকাশে’, ‘আমায় তুমি যে
ভালোবেসেছ’, ‘আষাঢ় সন্ধ্যা ছায়া ফেলে মোর মনে’, ‘গানে মোর দখিন হাওয়া’, ‘যে পথে নিলে বিদায়’, ‘ও
দুটি কাজল কালো’, ‘এই ক্ষণটুকু কেন এত ভালো লাগে’, ‘এ যেন সেই রাত হারিয়ে যাওয়া’, ‘সেই ভালো এই
বসন্ত নয়’, ‘এ জীবনে আমি যারে চেয়েছি’, ‘সেই পথে যাই চলো না’, ‘দূরে ওই পিয়াল শাখায়’, ‘ময়ূরী নাচ’,
‘ও সোনা কন্যা’, ‘ও রাজকন্যে আমার জন্যে’, ‘এই ফুলের দেশে’, ‘ছেলেবেলায় আমায় যখন’, ‘একটি নতুন গান
শুনবে বলে’, ‘এই বসন্ত জানালে বিদায়’, ‘কার কণ্ঠে পরাবো আমার এ বরণমাল্য’, ‘বেলা হলে অবসান’,
‘তরীখানি ভেসে চলে’, ‘একটি ছোট্ট দ্বীপ সমুদ্রে ঘেরা চারিধার’, ‘আকাশ নদীর বুকে’ ‘আমার এ জীবনে তুমি
যে কে’, ‘কোনো দিন যদি তুমি দূরে চলে যাও’, ‘কাগজের ফুল বলে আজো’, ‘বনে বনে গাহে’, ‘শূন্য ঝুলনা
দোলে’, ‘চেয়ে চেয়ে দেখি ঝরা ফুলে ছেয়ে গেছে পথ’, ‘চলে গেলাম আমি’, ‘যেথায় গেলে হারায় সবাই’, ‘দূরে
গেলে যেন ভুলে যেও না’, ‘স্বপ্ন জাগে আজ সবারই নয়নে’, ‘কে ভুলালে বারে বারে’, ‘হয়তো আবার ফিরে
আসবে যখন’, ‘তুমি নেই শুধু এই আর কিছু নয়’, ‘কথা দাও বলো আমারে’, ‘স্বপ্ন দেখার যেন শেষ নেই’, ‘ও
পাখি রে উড়ে যা’, ‘পিয়া পরবাসে বড়ো একা লাগে’, ‘ও কালো হরিণ চোখে ভাবের লীলা’, ‘এই প্রেম যেন
তোমার’, ‘তুমি নাই আজ’, ‘এই আছে এই নেই’, ‘চামেলি তুই বল’, ‘যেদিন রবে না মোর আর কোনো গান’,
‘আমার ভস্ম ছড়িয়ে দিও না বিন্ধ্য-হিমাচলে’, ‘এ গানে আমার জীবনে গীতিকাব্য’, ‘মনে পড়ে যায় কত’,
‘তোমার দেওয়া এ বেদনা’, ‘আমি গানের মাঝেই বেঁচে থাকব’ ইত্যাদি আরো অসংখ্য গান হারানো দিনের
সংগীতপ্রেমী শ্রোতাদের অন্তরে অম্লান হয়ে রয়েছে।
সংখ্যার হিসেবে তাঁর রচিত বেসিক বাংলা আধুনিক গান ও রম্যগীতির তালিকাটি যতটা দীর্ঘ, ছায়াছবির
গান তার তুলনায় অনেকটাই কম। এর একটি কারণ তিনি খুব বাছবিচার করে ছবির গান লেখার প্রস্তাব
গ্রহণ করতেন। ছায়াছবির গানে প্রথম সুর দেন ‘অভিমান’ ছবিতে। সুরকার ছিলেন রামচন্দ্র পাল।
‘অভিমান’ ছবিতে গানের সূত্রেই শ্যামল গুপ্তের সঙ্গে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রথম আলাপ, পরে পরিণয়।
শ্যামল গুপ্তের চিত্রগীতির মধ্যে সুপারহিট ‘মায়ামৃগ’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘শেষ অঙ্ক’, ‘সাগিনা মাহাতো’,
‘হারমোনিয়াম’, ‘সুদূর নীহারিকা’, ‘পুতুল ঘর’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র ছাড়াও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি হল,
‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘আঁধারে আলো’, ‘বধূবরণ’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘রাত্রি শেষে’, ‘নিধিরাম সর্দার’, ‘গোধূলিবেলায়’,
‘মুখার্জী পরিবার’, ‘কানামাছি’, ‘কালস্রোত’, ‘কষ্টিপাথর’, ‘দেড়শো খোকার কাণ্ড’, ‘মহাতীর্থ দক্ষিণেশ্বর’,
‘বীরেশ্বর বিবেকানন্দ’, ‘দক্ষযজ্ঞ’, ‘ওগো শুনছো’ ইত্যাদি। চলচ্চিত্রে তাঁর রচিত গানের সংখ্যা
আনুমানিকভাবে দুশোর ঊর্ধ্বে। তাঁর লেখা মোট গানের সংখ্যা প্রায় দু’হাজার অনুমান করে গেলেও সঠিক
অঙ্কে বলা যায় না। কারণ আজও তাঁর রচিত গানগুলির সম্পূর্ণ ডিস্কোগ্রাফি হয়নি। ‘আধুনিক গান’
শিরোনামে একটি মাত্র নির্বাচিত গানের সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। তাঁর গানের কথার কোনও
পূর্ণাঙ্গ সংকলন আজো গ্রন্থিত নয়। আসলে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত – এই
পঞ্চকবির গানের যুগের পরের উত্তরসূরি অধিকাংশ গীতিকাররাই ‘কবি’ হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান ও
মর্যাদা পাননি। তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠের কবিতা ও গানের সমগ্র প্রকাশিত হয়নি। তাঁদের কেন শুধুই
‘লিরিসিস্ট’ বলা হবে, ‘কবি’ নন কেন? গীতিকারদের ‘কবি’ বলে স্বীকৃতি দিতে বাঙালিদের এত কুণ্ঠা কেন?
এই প্রশ্ন তোলাও আশু প্রয়োজন। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার গভীর অভিমানের সুরে বলেছিলেন, ‘আমি
কি কবি নই?’ এ আমাদের বঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার সীমাবদ্ধতা ও নিদারুণ দৈন্য। শ্যামল গুপ্তের প্রতি
অবহেলা তারই আরেক পীড়াদায়ক দৃষ্টান্ত।
✅ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েব-আর্কাইভ ‘মিলনসাগর’-এ কবি শ্যামল গুপ্তের রচিত নির্বাচিত
৪০টি জনপ্রিয় আধুনিক ও ছায়াছবির গানের কথার সংকলন পড়তে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন।
https://www.milansagar.com/…/shyamal_…/kobi-shyamalgupta.html
তপন সিংহ নির্দেশিত ‘হারমোনিয়াম’ ছবির গান লেখার স্বীকৃতি স্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে
বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। ২০১০ সালের ২৮ জুলাই শ্যামল গুপ্তের জীবনাবসান হয়। মৃত্যুকালে
তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
রচনা:~ রাজেশ দত্ত, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।
(তথ্যসূত্র: সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা গান’ (প্রকাশক: প্যাপিরাস, ১ বৈশাখ ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ)
এবং অন্যান্য ইন্টারনেট সূত্রে প্রাপ্ত তথাবলী।)
এই বরেণ্য গীতিকারের অমর স্মৃতির প্রতি অন্তরের বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই টুকরো স্মৃতিচারণায় তাঁর জনপ্রিয়
দুটি গানের জন্মবৃত্তান্তে। এই পোস্টের ছবিতে বাংলা গানের অনন্য দুই দম্পতি শ্যামল গুপ্ত
ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং বেলা মুখোপাধ্যায়ের সাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
✅ ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’ কথন
****************************
‘মায়ামৃগ’র গান বাঁধা হচ্ছে। গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। মানবেন্দ্রর বহুকালের বন্ধু। যখন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের
সঙ্গে শ্যামলের বিয়ে হয়নি, তখন থেকেই তাঁরা হরিহর আত্মা। এই বন্ধুতা শুধু দু’জনের নয়, সম্পর্ক ছিল
পরিবারে-পরিবারে। তা যে কতটা ঘন, বোঝাতে দুই বাড়ির একটা রীতির কথা বলা যেতে পারে। —
প্রত্যেক বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নর্থ রোডে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে যেতেন। এক
কুঁজো জল, এক থালা ফল আর মিষ্টি নিয়ে। এ প্রথা কবে শুরু হয়েছিল বলা মুশকিল, কিন্তু চলেছিল
মানবেন্দ্রর জীবনের একেবারে প্রান্তবেলা অবধি।
মায়ামৃগ-র সময় শ্যামল গুপ্তকে মানবেন্দ্র বললেন, ‘‘নায়ক বিশ্বজিৎ নায়িকা সন্ধ্যা রায়ের প্রেমে পড়েছে।
কিন্তু নায়কের সব কথাতেই ডাক্তারির প্রসঙ্গ এসে পড়ে। এমনকি প্রেম নিবেদনের সময়ও তাই। এটাকে
মাথায় রেখে একটা গান লেখ।’’
মানবেন্দ্র তখন ফার্ন রোডে ‘গীতবীথিকা’ নামে একটি স্কুলে গান শেখান। ক্লাসের পর সেখানে বন্ধু শ্যামলের
সঙ্গে গান-আড্ডাও হয়।
তেমনই এক রবিবারের বিকেলে শ্যামল গুপ্ত হাজির হলেন ফার্ন রোডে। সঙ্গে গান — ‘মেটেরিয়া মেডিকার
কাব্য’। দেখে বললেন, ‘‘ছ্যা, এ কী লিখেছিস! এ একেবারে চলবে না। গান লেখা টুকরো কাগজটা হাতে নিয়ে
মুচড়ে ছুড়ে ফেলে দিলেন জানলা দিয়ে। বন্ধু আর কী করেন! মুষড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়লেন।
ঘণ্টা দুই গড়াল। গানের ক্লাস শেষ। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে মানবেন্দ্র দেখলেন বন্ধু পাংশুমুখে বসে। বললেন,
‘‘নারে, গানটা তুই মন্দ লিখিসনি। দেখি এক বার!’’
এ বার রাগে-অভিমানে শ্যামল বললেন, ‘‘তুই তো ফেলে দিলি রাস্তায়। আমার কাছে কোনও কপিও নেই।
ট্রামে আসতে আসতে হাতে যা ছিল, তার ওপরে লিখেছিলাম…।’’
তা হলে?
তখন সন্ধে নেমে গেছে। রাস্তায় আলো প্রায় নেই। টর্চ হাতে তোলপাড় খোঁজ চলল তার মধ্যেই। শেষে দলা
পাকানো টুকরো কাগজটার খোঁজ মিলল নর্দমার পাশে। এর পর ‘মেটেরিয়া মেডিকার’ জনপ্রিয়তা তো
আকাশ ছুঁয়ে যায়। যেখানে অনুষ্ঠানে যেতেন, ‘মেটেরিয়া’ না শুনিয়ে রেহাই নেই। গানের লিপ দিতে মঞ্চে
ডাক পড়ত বিশ্বজিতের।
✅ আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি...
মানবেন্দ্রর কথায় “ভূতে পাওয়া গান!”
****************************
এই শ্যামল গুপ্তরই লেখা ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’। মানবেন্দ্র বলতেন, ‘‘ও আমার ভূতে
পাওয়া গান।’’
তখন রেডিয়োয় লাইভ ব্রডকাস্টের যুগ। ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেস থেকে ইডেনে আসেনি আকাশবাণী। এক
অনুষ্ঠান শেষে পরের অনুষ্ঠানের মাঝে অনেকটা ফাঁকা সময় থাকলে অফিসেই কাটিয়ে দিতেন অনেকেই।
তেমনই এক দিনে ছাদে পায়চারি করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। নিঝুম
সন্ধেবেলা। ঠিক নীচে কবরখানার দিকটা জমাট কালো। ও-বাড়ির সাহেব-ভূতের গল্প বহুশ্রুত। তাতে
ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাঁর।
হঠাৎ কেউ যেন ডেকে উঠল, ‘‘মানব, মানব।’’ চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখেন দুটো চোখ। জ্বলছে। — ‘‘কে?’’
‘‘আমি শ্যামল। একটা গান লিখে ফেলেছি। শুনবি?’’
একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘‘বল।’’
অন্ধকারে দাঁড়িয়েই শুনতে লাগলেন গানের কলি — ‘‘…তোমার কাজল চোখে যে গভীর ছায়া কেঁপে ওঠে
ওই/তোমার অধরে ওগো যে হাসির মধু মায়া ফোটে ওই/তারা এই অভিমান বোঝে না আমার…।’’
সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। শেষ হতেই এক হাতে বন্ধুকে পাকড়ে ধরে সোজা পাঁচ নম্বর স্টুডিয়ো।
ওখানে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো রাখা। সন্ধে পাঁচটার পর সে-ঘরের দরজা তালাবন্ধ থাকে। পিয়ানোর ডালায়
চাবি দেওয়া। কিন্তু সে দিন যে কী হল!
দরজার ‘ল্যাচ’ ঘোরাতেই খুলে গেল! ডালায় হাত দিয়ে ওঠাতে উঠে গেল! তাতে বসেই গানের মুখরাটা করে
ফেলেছিলেন মানবেন্দ্র।
পুরো ব্যাপারটা নিয়ে বিস্ময়ের ঘোর জীবনের শেষ দিন অবধি তাঁর কাটেনি। কেবলই বলতেন, ‘‘ও
আমার ভূতে পাওয়া গান।’’ (উল্লেখ্য: ১৯৫৭ সালের ৩০ জুলাই এক ঘণ্টারও কম সময়ে তৈরি হয়েছিল
অনবদ্য ওই গান। পরে গ্রামোফোন কোম্পানির ‘শারদ অর্ঘ্যে’ প্রকাশিত হয়েছিল - ‘আমি এত যে তোমায়
ভালোবেসেছি’ গানটি।) [‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশিত মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে নিবন্ধ “আমি
এত যে তোমায় ভালোবেসেছি…” থেকে উদ্ধৃত। লেখক: দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। প্রকাশকাল: ৮ অগাস্ট,
২০১৫।]
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও কবি শ্যামল গুপ্তের অমর স্মৃতির উদ্দেশে অন্তরের
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।
বাংলা গানের অনন্য দুই দম্পতি শ্যামল গুপ্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং বেলা মুখোপাধ্যায়ের সাথে হেমন্ত
মুখোপাধ্যায়।