যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে তার মুখে খবর পেলুম ; সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার জন্মমাত্র সুতীব্র চিত্কারে | খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলিত, উদ্ভাসিত কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায় | সে ভাষা বোঝেনা কেউ, কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার | আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা পেয়েছি নতন চিঠি আসন্ন যুগের----- পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে | এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান ; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ , মৃত আর ধ্বংসস্তুপ--পিঠে চলে যেতে হবে আমাদের | চলে যাব----তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি----- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার | অবশেষে সব কাজ সেরে, আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ,
চারাগাছ (ছাড়পত্র) কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার মাঘ ১৩৫৩ (জানুয়ারী ১৯৪৭) সংখ্যায়।
ভাঙা কুঁড়ে ঘরে থাকি : পাশে এক বিরাট প্রাসাদ প্রতিদিন চোখে পড়ে ; সে প্রাসাদ কী দুঃসহ স্পর্ধায় প্রত্যহ আকাশকে বন্ধুত্ব জানায় ; আমি তাই চেয়ে চেয়ে দেখি | চেয়ে চেয়ে দেখি আর মনে মনে ভাবি ----- এ অট্টালিকার প্রতি ইঁটের হৃদয়ে অন্ক কাহিনী আছে অত্যন্ত গোপনে, ঘামের, রক্তের আর চোখের জলের | তবু এই প্রাসাদকে প্রতিদিন হাজারে হাজারে সেলাম জানায় লোকে, চেয়ে থাকে বিমূঢ় বিস্ময়ে | আমি তাই এ প্রাসাদে এতকাল ঐশ্বর্য দেখেছি, দেখেছি উদ্ধত এক বনিয়াদী কীর্তির মহিমা |
হঠাৎ সেদিন চকিত বিস্ময়ে দেখি অত্যন্ত প্রাচীন সেই প্রাসাদের কার্নিশের ধারে অশ্বথ্ব গাছের চারা |
অমনি পৃথিবী আমার চোখের আর মনের পর্দায় আসন্ন দিনের ছবি মেলে দিল একটি পলকে |
ছোট ছোট চারাগাছ------ রসহীন খাদ্যহীন কার্নিশের ধারে বলিষ্ঠ শিশুর মতো বেড়ে ওঠে দুরন্ত উচ্ছাসে | হঠাৎ চকিতে, এ শিশুর মধ্যে আমি দেখি এক বৃদ্ধ মহীরুহ শিকড়ে শিকড়ে আনে অবাধ্য ফাটল উদ্ধত প্রাচীন সেই বনিয়াদী প্রাসাদের দেহে |
ছোট ছোট চারাগাছ----- নিঃশব্দে হাওয়ায় দোলে, কান পেতে শোনে : প্রত্যেক ইঁটের নীচে ঢাকা বহু গোপন কাহিনী রক্তের, ঘামনের আর চোখের জলের |
তাইতো অবাক আমি, দেখি যত অশ্বথ্বচারায় গোপনে বিদ্রোহ জমে, জমে দেহে শক্তির বারুদ ; প্রাসাদ-বিদীর্ণ-করা বন্যা আসে শিকড়ে শিকড়ে |
মনে হয়, এইসব অশ্বথ্ব-শিশুর রক্তের, ঘামের আর চোখের জলের ধারায় ধারায় জন্ম, ওরা তাই বিদ্রোহের দূত ||
খবর আসে ! দিগ্ দিগন্ত হতে বিদ্যুদবাহিনী খবর ; যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ , ঝড়------ -----এখানে সাংবাদিকতার নৈশ নৈঃশব্দ্য | রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝঙ্কৃত ছন্দে------প্রকাশের ব্যগ্রতায় ; তোমাদের জীবনে যখন নিদ্রাভিভূত মধ্যরাত্রি চোখে স্বপ্ন আর ঘরে অন্ধকার | অতল অদৃশ্য কথার সমুদ্র থেকে নিঃশ্ব্দ শব্দেরা উঠেআসে ; অভ্যস্ত হাতে খবর সাজাই ------ ভাষা থেকে ভাষান্তর করতে কখনো চমকে উঠি, দেখি যুগ থেকে যুগান্তর | কখনো হাত কেঁপে ওঠে খবর দিতে ; বাইশে শ্রাবণ, বাইশে জুনে | তোমাদের ঘুমের অন্ধকার পথ বেয়ে খবর--পরীরা এখানে আসেতোমাদের আগে, তাদের পেয়ে কখনো কন্ঠে নামে ব্যথা, কখনো বা আসে গান ; সকালে দিনের আলোয় যখন তোমাদের কাছে তারা পৌঁছোয় তখন আমাদের চোখে তাদের ডানা ঝরে গেছে | তোমরা খবর পাও, শুধু খবর রাখো না কারো বিনিদ্র চোখ আর উত্কর্ণ কানের | ঐ কম্পোজিটর কি কখনো চমকে ওঠে নিখুঁত যান্ত্রিকতার . কোনো ফাঁকে ? পুরনো ভাঙা চশমায় ঝাপসা মনে হয় পৃথিবী----- ৯ই আগষ্ট কি আসাম সীমান্ত আক্রমণে ? জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে, মহাত্মাজীর মুক্তিতে, প্যারিসের অভ্যুথ্বানে ? দুঃসংবাদকে মনে হয় না কি কালো অক্ষরের পরিচ্ছদে শোকযাত্রা ? যে খবর প্রাণের পক্ষপাতিত্বে অভিষিক্ত আত্মপ্রকাশ করে না কি বড় হরফের সম্মানে ? এ প্রশ্ন অব্যক্ত অনুচ্চারিত থাকে ভোরবেলাকার কাগজের পরিচ্ছন্ন ভাঁজে ভাঁজে |
শুধু আমরা দৈনন্দিন ইতিহাস লিখি ! তবু ইতিহাস মনে রাখবে না আমাদের----- কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা ধানের গুচ্ছকে ? কিন্তু মনে রেখো তোমাদের আগেই আমরা খবর পাই মধ্যরাত্রির অন্ধকারে তোমাদের তন্দ্রার অগোচরেও | তাই তোমাদের আগেই খবর-পরীরা এসেছে আমাদের চেতনার পথ বেয়ে আমার হৃদ্ যন্ত্রে ঘা লেগে বেজে উঠেছ কয়েকটি কথা----- পৃথিবী মুক্ত----জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী | তোমাদের ঘরে আজো অন্ধকার, চোখে স্বপ্ন | কিন্তু জানি একদিন সে সকাল আসবেই যেদিন এই খবর পাবে প্রত্যেকের চোখেমুখে সকালের আলোয়, ঘাসে ঘাসে পাতায় পাতায় |
একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল . বিরাট প্রসাদের ছোট্ট এক কোণে, . ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়---- . আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে |
আশ্রয় যদিও মিলল, . উপযুক্ত আহার মিলল না | সুতীক্ষ্ম চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে . গলা ফাটাল সেই মোরগ . ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত---- তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত |
তারপর শুরু হল তার আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা : . আশ্চর্য !সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার !
তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার---- . ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ ; . কাজেই দুর্বলতর মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে |
খাবার ! খাবার ! খানিকটা খাবার ! . অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে . বার বার চেষ্টা ক’রল প্রাসাদে ঢুকতে, . প্রত্যেকবারই তাড়া খেলো প্রচন্ড | ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে----- . ‘প্রাসাদের ভেতরে রাশি রাশি খাবার !’
তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল, . একেবারে সোজা চলে এল ধব্ ধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে ; . অবশ্য খাবার খেতে নয়------- . খাবার হিসেবে ||
কখনো হঠাৎ মনে হয় : আমি এক আগ্নেয় পাহাড় | শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা | এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে আমাকে তোমরা বিদ্রূপে বিদ্ধ করেছ বারংবার আমি পাথর : আমি তা সহ্য করেছি |
মুখে আমার মৃদু হাসি, বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা | সিংহের মতো আধ-বোজা চোখে আমি কেবলি দেখেছি : মিথ্যার ভিতে কল্পনার মশলায় গড়া তোমাদের শহর, আমাকে ঘিরে রচিত উৎসবের নির্বোধ অমরাবতী, বিদ্রূপের হাসি আর বিদ্বেষের আতস-বাজি---- তোমাদের নগরে মদমত্ত পূর্ণিমা |
দেখ, দেখ : ছায়াঘন, অরণ্য-নিবিড় আমাকে দেখ ; দেখ আমার নিরুদ্বিগ্ন বন্যতা তোমাদের শহর আমাকে বিদ্রূপ করুক, কুঠারে কুঠারে আমার ধৈর্যকে করুক আহত, কিছুতেই বিশ্বাস ক’রো না ---- আমি ভিসুভিয়াস-ফুজিয়ামার সহোদর | তোমাদের কাছে অজ্ঞাত থাক ভেতরে ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠা আমার অগ্ন্যুদ্ গার, অরণ্যে ঢাকা অন্তর্নিহিত উত্তাপের জ্বালা |
তোমরা আকাশে ফ্যাকাশে প্রেত আলো, বুনো পাহাড়ে মৃদু-ধোঁয়ার অবগুন্ঠন : ও কিছু নয়, হয়তো নতুন এক মেঘদূত | উত্সব কর, উত্সব কর----- ভুলে যাও পেছনে আছে এক আগ্নেয় পাহাড়, ভিসুভিয়স-ফুজিয়ামার জাগ্রত বংশধর | আর, আমার দিনপঞ্জিকায় আসন্ন হোক বিস্ফোরণের চরম, পবিত্র তিথি ||
ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু--- ঠিকানার সন্ধান, আজও পাও নি ? দুঃখ যে দিলে করব না অভিমান ? ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু, পথে পথে বাস করি কখনো গাছের তলাতে কখনো পর্ণকুটির গড়ি | আমি যাযাবর, কুড়াই পথের নুড়ি, হাজার জনতা যেখানে , সেখানে আমি প্রতিদিন ঘুরি | বন্ধু, ঘরের খুঁজে পাই নাকো পথ, তাইতো পথের নুড়িতে গড়ব মজবুত ইমারত |
. বন্ধু, আজকে আঘাত দিও না . তোমাদের দেওয়া ক্ষতে, . আমার ঠিকানা খোঁজ ক’রো শুধু . সূর্যোদয়ের পথে | . ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লোভিয়া, . রুশ ও চীনের কাছে, . আমার ঠিকানা বহুকাল ধ’রে . জেনো গচ্ছিত আছে | . আমাকে কি তুমি খুঁজেছ কখনো . সমস্ত দেশ জুড়ে ? . তবুও পাওনি ? তাহলে ফিরেছ . ভুল পথে ঘুরে ঘুরে | . আমার হদিশ জীবনের পথে . মন্বন্তর থেকে . ঘুরে গিয়েছে যে কিছু দূর গিয়ে . মুক্তির পথে বেঁকে | . বন্ধু, কুয়াশা, সাবধান এই . সূর্যোদয়ের ভোরে : . পথ হারিও না আলোর আশায় . তুমি একা ভূল ক’রে | . বন্ধু, আজকে জানি অস্থির . রক্ত, নদীর জল, . নীড়ে পাখি আর সমুদ্র চঞ্চল | . বন্ধু , সময় হয়েছে এখনো . ঠিকানা অবজ্ঞাত . বন্ধু, তোমার ভুল হয় কেন এত ? . আর কতদিন দু’চক্ষু কচ্ লাবে, . জালিয়ানওয়ালার যে পথের শুরু . সে পথে আমাকে পাবে, . জালালাবাদের পথ ধ’রে ভাই . ধর্মতলার পরে, . দেখবে ঠিকানা লেখা প্রত্যেক ঘরে . ক্ষুদ্ধ এদেশে রক্তের অক্ষরে | . বন্ধু , আজকে বিদায় ! . দেখেছ উঠল যে হাওয়া ঝোড়ো, . ঠিকানা রইল , . এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা ক’রো ||
অবাক পৃথিবী ! অবাক করলে তুমি জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশভূমি | অবাক পৃথিবী ! আমরা যে পরাধীন অবাক, কী দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন ; অবাক পৃথিবী অবাক যে করলে আরো---- দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো | অবাক পৃথিবী ! অবাক যে বারবার দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার | হিসেবের খাতা যখনি নিয়েছি হাতে দেখেছি লিখিত ----- ‘রক্ত খরচ’ তাতে ; এদেশে জন্মে পদাঘাতই শধু পেলাম, অবাক পৃথিবী ! সেলাম, তোমাকে সেলাম !
. || ১৯৪৬ ||
বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে, আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে, এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ, দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ ; স্বপ্ন-চূড়ার থেকে নেমে এসো সব------ শুনেছ ? শুনছ উদ্দাম কলরব ? নয়া ইতিহাস লিখছে ধর্মঘট, রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদ-পট | প্রত্যহযারা ঘৃণিত ও পদানত, দেখ আজ তারা সবেগে সমুদ্যত ; তাদেরই দলের পিছনে আমিও আছি, তাদেরই মধ্যে আমিও যে মরি-বাঁচি | তাইতো চলেছি দিন-পঞ্জিকা লিখে----- বিদ্রোহ আজ ! বিপ্লব চারিদিকে ||
আমরা সিগারেট | তোমরা আমাদের বাঁচতে দাও না কেন ? আমাদের কেন নিঃশেষ করো পুড়িয়ে ? কেন এত স্বল্প-স্থায়ী আমাদের আয়ু ? মানবতার কোন্ দোহাই তোমরা পাড়েবে ? আমাদের দাম বড় কম এই পৃথিবীতে তাইকি তোমরা আমাদের শোষণ করো ? বিলাসের সামগ্রী হিসাবে ফেলো পুড়িয়ে ? তোমাদের শোষণের টানে আমরা ছাই হই : তোমরা নিবিড় হও আমাদের উত্তাপে |
তোমাদের আরাম : আমাদের মৃত্যু | এমনি ক’রে চলবে আর কত কাল ? আর কতকাল আমরা এমন নিঃশব্দে ডাকব আয়ু-হরণকারী তিল তিল অপঘাতকে ?
দিন আর রাত্রি ------রাত্রি আর দিন : তোমরা আমাদের শোষণ করছ সর্বক্ষণ---- আমাদের বিশ্রাম নেই, মজুরি নেই------ নেই কোনো অল্প-মাত্রার ছুটি |
তাই, আর নয় ; আর আমরা বন্দী থাকব না কৌটোয় আর প্যাকেটে, আঙুলে আর পকেটে ; সোনা-বাঁধানো ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ | আমরা বেরিয়ে পড়ব, সবাই একজোটে, একত্রে----- তারপর তোমাদের অসতর্ক মুহূর্তে জ্বলন্ত আমরা ছিট্ কে পড়ব তোমাদের হাত থেকে বিছানায় অথবা কাপড়ে ; নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারব তোমাদের যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল ||
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না; তবু জেনো মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ--- বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস; আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল? ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন - আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়! কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে, কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্ আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের? মনে নেই? এই সেদিন- আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে; চমকে উঠেছিলে--আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি তা তো অনুভব করেছো বারংবার; তবু কেন বোঝো না, আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে, আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব শহরে, গঞ্জে, গ্রামে-- দিগন্ত থেকে দিগন্তে। আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়- তা তো তোমরা জানোই! কিন্তু তোমরা তো জানো না: কবে আমরা জ্বলে উঠব- সবাই-- শেষবারের মতো!
সেই বিশ্রী দম-আটকানো কুয়াশা আর নেই নেই সেই একটানা তুষার-বৃষ্টি, হঠাৎ জেগে উঠেছে---- সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠছে ভূস্বর্গ | দুহাতে তষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে, ডেকেছে রৌদ্রকে, ডেকেছে তুষার-উড়িয়ে-নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে, পৃথিবীর নন্দন-কানন কাশ্মীর |
কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হল প্রচন্ড সূর্যের উত্তাপে | গলে গলে পড়ছে বরফ---- ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দন : শ্যামল আর সমতল মাটির স্পর্শ লেগেছে ওর মুখে, দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছে ওর চুল : আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি | কাশ্মীর আজ আর জমাট-বাঁধা বরফ নয় : সূর্য-করোত্তোপে জাগা কঠোর গ্রীষ্মে হাজার হাজার চঞ্চল স্রোত |
তাই আজ কাল-বৈশাখীর পতাকা উড়ছে ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায় ; দুলে দুলে উঠছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত , নিস্তব্ধ বিরাট ব্যাপ্ত হিমালয়ের বুক ||
. || ২ ||
দম-আটকানো কুয়াশা তো আর নেই নেই আর সেই বিশ্রী তুষার-বৃষ্টি, সূর্য ছুঁয়েছে ‘ভূস্বর্গ চঞ্চল’ সহসা জেগেই চমকে উঠেছে দৃষ্টি |
কলম, তুমি কত না যুগ কত না কাল ধরে অক্ষরে অক্ষরে গিয়েছ শুধু ক্লান্তিহীন কাহিনী শুরু করে | কলম, তুমি কাহিনী লেখো, তোমার কাহিনী কি দুঃখে জ্বলে তলোয়ারের মতন ঝিকিমিকি ? কলম, তুমি শুধু বারংবার, আনত ক’রে ক্লান্ত ঘাড় গিয়েছ লিখে স্বপ্ন আর পুরনো কত কথা, সাহিত্যের দাসত্বের ক্ষুধিত বশ্যতা | ভগ্ন নিব, রুগ্ন দেহ, জলের মতো কালি, কলম, তুমি নিরপরাধ, তবুও গালাগালি খেয়েছ আর সয়েছ কত লেখকদের ঘৃণা, কলম, তুমি চেষ্টা কর, দাঁড়াতে পারো কি না |
. হে কলম ! তুমি কত ইতিহাস গিয়েছ লিখে . লিখে লিখে শুধু ছড়িয়ে দিয়েছ চতুর্দিকে | . তবু ইতিহাস মূল্য দেবে না, এতটুকু কোণ . দেবে না তোমায়, জেনো ইতিহাস বড়ই কৃপণ ; . কত লাঞ্ছনা , খাটুনি গিয়েছে লেখকের হাতে . ঘুমহীন চোখে অবিশ্রান্ত অজস্র রাতে | . তোমার গোপন অশ্রু তাইতো ফসল ফলায় . বহু সাহিত্য বহু কাব্যের বুকের তলায় | . তবু দেখ বোধ নেই লেখকের কৃতজ্ঞতা, . কেন চলবে এ প্রভুর খেয়ালে, লিখবে কথা ?
হে কলম ! হে লেখনী ! আর কত দিন ঘর্ষণে ঘর্ষণে হবে ক্ষীণ ? আর কত মৌন-মূক, শব্দহীন দ্বিধান্বিত বুকে কালির কলঙ্ক চিহ্ন রেখে দেবে মুখে ? আর কত আর কাটবে দুঃসহ দিন দুর্বার লজ্জার ? এ দাসত্ব ঘুচে যাক, এ কলঙ্ক মুছে যাক আজ, কাজ কর-----কাজ |
আমরা সিঁড়ি, তোমরা আমাদের মাড়িয়ে . প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও, তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে ; . তোমাদের পদধূলিধন্য আমাদের বুক পদাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় প্রতিদিন |
তোমরাও তা জানো তাই কার্পেটে মুড়ে রাখতে চাও আমাদের বুকের ক্ষত, ঢেকে রাখতে চাও তোমাদের অত্যাচারের চিহ্নকে আর চেপে রাখতে চাও পৃথিবীর কাছে . তোমাদের গর্বোদ্ধত, অত্যাচারী পদধ্বনি |
তবু আমরা জানি, . চিরকাল আর পৃথিবীর কাছে . চাপা থাকবে না আমাদের দেহে তোমাদের এই পদাঘাত | একদিন তোমাদেরও হতে পারে পদস্খলন ||
সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর---- . এক- টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী | ঘর ছেড়ে আমরা এদিক-এদিক যাই---- . এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায় |
. হে সূর্য ! তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে . উত্তাপ আর আলো দিও, . আর উত্তাপ দিও, রাস্তার ধারে ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে |
হে সূর্য ! তুমি আমাদের উত্তাপ দিও--- শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড, . তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ডে . পরিণত হব ! তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা, . তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো . রাস্তার ধারের ঐ ঊলঙ্গ ছেলেটাকে | আজ কিন্ত আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী ||
কালো মৃত্যুরা ডেকেছে আজকে স্বয়ম্বরায়, নানাদিকে নানা হাতছানি দেখি বিপুল ধরায় |] ভীত মন খোঁজে সহজ পন্থা, নিষ্ঠুর চোখ ; তাই বিষাক্ত আস্বাদময় এ মর্তলোক, কেবলি এখানে মনের দ্বন্দ্ব আগুন ছড়ায় |
অবশেষে ভুল ভেঙেছে, জোয়ার মনের কোণে, তীব্র ভ্রূকুটি হেনেছি কুটিল ফুলের বনে ; অভিশাপময় যে স আত্মা আজো অধীর, তাদের সকাশে রেখেছি প্রাণের দৃঢ় শিবির; নিজেকে মুক্ত করেছি আত্মসমর্পণে |
চাঁদের স্বপ্নে ধুয়ে গেছে মন যে-সব দিনে, তাদের আজকে শত্রু বলেই নিয়েছি চিনে, হীন স্পর্ধারা ধূর্তের মতো শক্তিশেলে----- ছিনিয়ে আমায় নিতে পারে আজো সুযোগ পেলে তাই সতর্ক হয়েছি মনকে রাখি নি ঋণে |
অসংখ্য দিন কেটেছে প্রাণের বৃথা রোদনে নরম সোফায় বিপ্লবী মন উদ্বোধনে ; আজকে কিন্তু জনতা-জোয়ারে দোলে প্লাবন, নিরন্ন মনে রক্তিম পথ অনধাবন, করছে পৃথিবী পূর্ব-পন্থা সংশোধনে | অস্ত্র ধরেছি এখন সমুখে শত্রু চাই, মহামারণের নিষ্ঠুর ব্রত নিয়েছি তাই ; পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ তাদের প্রাভাবে রাখি নি মনেতে কোনো আসন, ভুল হবে জানি তাদের আজকে মনে করাই ||
ইউরোপের উদ্দেশে ( ছাড়পত্র ) কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার আষাঢ় ১৩৫৩ (জুন ১৯৪৬) সংখ্যায়।
ওখানে এখন মে-মাস তুষার-গলানো দিন, এখানে অগ্নি-ঝরা বৈশাখ নিদ্রাহীন ; হয়তো ওখানে শুরু মন্থর দক্ষিণ হাওয়া ; এখানে সেখানে ফুল ফোটে আজ তোমাদের দেশে কত রঙ, কত বিচিত্র নিশি দেখা দেয় এসে | ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়েছে কত ছেলেমেয়ে এই বসন্তে কত উত্সব কত গান গেয়ে | এখানে তো ফুল শুকনো, ধূসর রঙের ধুলোয় খাঁ-খাঁ করে সারা দেশটা, শান্তি গিয়েছে চুলোয় কঠিন রোদের ভয়ে ছেলেমেয়ে বন্ধ ঘরে, সব চুপচাপ : জাগবে হয়তো বোশখী ঝড়ে | অনেক খাটুনি, অনেক লড়াই করার শেষে চারিদিকে ক্রমে ফুলের বাগান তোমাদের দেশে ; এদেশে যুদ্ধ, মহামারী, ভুখা জ্বলে হাড়ে হাড়ে ----- অগ্নিবর্ষী গ্রীষ্মের মাঠে তাই ঘুম কাড়ে বেপরোয়া প্রাণ ; জমে দিকে দিকে আজ লাখে লাখ----- তোমাদের দেশে মে-মাস ; এখানে ঝোড়ো বৈশাখ ||