সভ্যতার কোয়ারেন্টাইন কবি আবু ওবায়দা টিপু মিলনসাগরে প্রকাশ মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৬.২০২২।
অবরুদ্ধ এখন পৃথিবী। বিশ্বজুড়ে ফ্লাইট বন্ধ ------------অর্ধেকের বেশি । কোয়ারেন্টিনে বন্দি মানুষ ; ভালোবাসায় অবরুদ্ধ যেমন ------------তুমি আর আমি। শূণ্য কাবাঘর ; ভেনিসের সেন্ট মার্কোস ; জাপানের কিওটো, সিঙ্গাপুরের ম্যারিনা বে স্যান্ডস, ব্যাংককের গ্রান্ড প্যালেসও! আহ্ মানুষ! অথচ বেফাঁস উড়ছে পাখিরা। ফুল ঝড়ে সজনে ডালে ------------উঁকি দিয়েছে ডাটা। জিজং এর পোশাকে নতুন ধরন এখন যে মেয়েটির রুপ ছিলো . তার প্রিয়তমের মনের মতন, তাই এখন আবৃত বিশেষ পোশাকে! তুমি আর আমিও কি তবে চলেছি, নব্য কোনো সংস্কৃতিতে? (ধর) রাস্তায় ভিক্ষুক নেই, ছিনতাইকারিও না! (ধর) জ্যাম নেই রাজপথে কোনো! (ধর) মন্ত্রী আমলার ভ্রমণ ভাউচার ফাইল -----------------------হয়েছে শূণ্য! (ধর) কেউ আর বেরুচ্ছে না বাড়ি থেকে! লেনদেন বন্ধ টাকার, -----চিরতরে! (ধর) বেড়ে উঠা শিশুরা কেবল পড়ছে ঘরে, পরিবারে ; ঘরের ছাদ ফুঁড়ে যে পরিবার ছিলো, অভিজাত রেস্তোরা বা ক্লাবে। ফিরেছে তাই ফের পরিবারে! ফিরেছে তাই ফের পরিবারে! ফিরেছে তাই ফের পরিবারে॥ রাজনীতি ফাজনীতি বলে নেই কোনো খেলা! ধর্ষণের বিরুদ্ধে আর কোনো আন্দোলন নেই বকুলের ; আবৃত্তি চর্চা ছাড়া। নতুন পৃথিবী এক। নতুন লেনদেন ধরণ নতুন বন্ধন এখন ; নতুন বন্ধন! আকাশ সীমা নেই কোনো! নেই নিস্তব্ধতাও! পাখিতে পাখিতে হুড়োহুড়ি নীলাকাশে ; মেঘে মেঘে পাল্লা শুধু নির্নিমেশে! সীমান্তে পাহাড়া নেই! নেই গরুচোর! নেই চোরাকারবারী! -------নেই আহাজরি! সীমান্তে আর মরছে না মানুষ! মারণাস্ত্রের গবেষণা ছেড়ে নিউক্লিয়ার কারখানাগুলো বানাচ্ছে ফানুস! প্রকৃতির কাছে হেরেই জিতেছে মানুষ॥
মা কবি আবু ওবায়দা টিপু রচনা ০১.০৪.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৬.২০২২।
যেদিন প্রথম জানলাম, বিশ্বাসের আগল ভেঙ্গে, তুমি নতুন এক বিশ্বাসের ঠিকানা পেয়েছো সেদিন কোন কষ্ট পাই নি আমি। কেবল আরো বেশি করে মুঠোয় ধরেছি আমার একমাত্র সন্তানের হাত। সেও মেয়ে কিনা! মুখ লুকিয়েছি চাকরীর আঁড়ালে। প্রশান্তি খুঁজেছি উপার্জিত টাকায় একমাত্র সন্তানের প্রয়োজন আর আবদার মিটিয়ে! সংসারের এ কাজে ও কাজে, একটা জেলখানায়, যখন আমার কেটেছে সকাল দুপুর;তুমি তখন--! অথচ আমার দম আটকানো জীবনে কোনোদিন তুমি বা তোমরা কি বিছিয়েছিলে মখমল? মানুষতো একটি বেড়ালকেও আদর করে! গাছের শুকনো গোঁডায় করুণা করেও পানি ঢালে! মানুষের কত কি চোখে পড়ে! অথচ সংসারের মানুষের চোখে পড়ে না, হাল ধরা পরের ঘরের মেয়েকে! যেদিন প্রথম জানলাম; বিশ্বাসের আগল ভেঙ্গে, তুমি... তারপর একে একে কতো দুর্বিপাক! তুমি কিন্তু খুঁজে পাওনি বিশ্বাসের ঠিকানা । শুধু চরকির মতো দিগবিদিক ছুটে চলা তোমার এখন। কত বার তোমাকে মুক্তি দিয়েছি। আমার ছোট্র তরীর হাতে নিজেকে সঁপে আমি কিন্তু বেশ আছি। তাকে সরিয়ে নিইনি তোমার বুক থেকে। বাবার আবহ যে সে মিস করে খুব। আমি কি তা হতে দিতে পারি বলো? এক আধুনিকা নারী; যিনি ঘটিয়ে দিতে চান সমাজের আমূল পরিবর্তন, আমি তার মতো কিছুই পারিনি করতে। কেবল সবকিছু দিয়ে সন্তানের প্রয়োজন আর আবদার মেটানো ছাড়া। যোগ্যতার কি কোন কমতি ছিলো আমার ? এসএসসি বলো আর এইচএসসি, সবটাতেই তোমার চে বেশ ভালো করেছি আমি। তারপর কত পড়াশুনা ? কত কত সার্টিফিকেট ? ওসব চুলোয় গেছে বলবে কেউ কেউ; আমি বলবো আমি জ্বালিয়েছি সবটাই; কেবল আমার মেয়ের জন্যে। একটা সময় চলে গেল চাকরিটাও। নদীর মতো জীবনে এক একটা হঠাৎ ভাঙ্গন। নদী ভাঙ্গলে কতজন দাঁড়ায় এসে ! ভাঙ্গন ঠেকাতেও হাত লাগায় মানুষ। অথচ চাকরি হারা মধ্য বয়সী এক মা, একাই দাঁড়িয়ে থাকলাম বিরানে। বাজার বেড়েছে এখন। বেড়েছে খরচও। আমি দাঁড়িয়ে আছি তেমনই ? সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে চাই আমি--- চাই আবদার মেটাতে--- কেবল সবকিছু দিয়ে সন্তানের প্রয়োজন আর আবদার মেটানো ছাড়া, আর কিছুই করতে চাই না আমি। . **************** . সূচীতে . . .
নিউক্লিয়ার গবেষক কবি আবু ওবায়দা টিপু রচনা ১২ মার্চ ২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৬.২০২২।
ওর হাতের ছুড়িটা কেঁড়ে নাও, গলা উঁচিয়ে মাকে বলল বাবা। শাসালো খানিকটা, . তোমরা আসলে যা-তা। মায়েদের জন্যই মানুষ হয় না ছেলেরা। মা বকুনি খেয়ে থতমত। আমরা হাত থেকে ধারালো ছুঁড়িটা সেদিন কেঁড়ে নেয়া হয়েছিলো যদিও। বিষয়টা যথাযথ। ছুরিতো ঢ়েড়, একটা ছড়িও হাতে ওঠেনি আর কোনদিন। বইয়ের পোকা আমি পড়াশুনা করেছি রাত দিন দিন গেছে। গেছে রাত। বাবা নেই। নেই বেঁচে আজ। যখন ছিলেন বেঁচে আমি তখন বিদেশে, স্কলারশিপ পেয়ে সুইজারল্যান্ডে। গবেষণা করছি, --------মলিকুলার সায়েন্স। ব্যস্ত পাঠে। আর বাবা ; বিছানায় শুয়ে। আসা হয়নি তখন দেশে আর, রাখা হয় নি বাবার মাথায় হাত। লক্ষ্য একটাই : হব বিজ্ঞানী, হবে নাম, যশ খ্যাতি! বাবার চলে যাওয়ার খবর সামলে সিঁড়িভাঙা পরীক্ষাটাই ----------------নিয়েছি আমলে। পার করেছি সব এখন আমি কেউকাটা , নিউক্লিয়ার গবেষক।
জন্মদিনের গল্প কবি আবু ওবায়দা টিপু নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রী সীমা বানু সিমি ২০০১ সালের ২৩ ডিসেম্বর আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিরকুটের সূত্র ধরে খিলগাঁও এলাকার দোয়েল, খলিল, মোফাজ্জল, রিপন, খিলগাঁও থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক বাশার ও তাদের সহযোগী এনায়েত চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ ও সিমির বাবা আলী এমদাদ আলাদা দুটি মামলা করেন। সে ঘটনায় পাঁচজনকে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত এবং খালাস পান একজন। এই রায়ের বিরুদ্ধে সিমির বাবা দায়রা আদালতে আপিল করেছিলেন। যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো ঝুলছে সেই মামলা, বিচারের বাণীও কাঁদছে নিভৃতে। রচনা ৭.১২.১৭। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৬.২০২২।
রেলবস্তির আধো গলিতে আমার জন্ম মা’ কে (?) বলতে পারবো না আমি। কখনো কখনো মনে হয় ‘ওই বস্তিটা’ ওটাই আমার মা। যেমন তোমরা দেশকে মা বলো। দিনটা কবে ? জানবো কি করে ? কতো; কতোদিন আমি ন্যাংটো ছিলাম, খিস্তি করেছি রেলের পাটাতনে বসে চলে যাওয়া ট্রেন দেখেছি সমান্তরাল লাইনে নুড়ি দিয়ে চৌকো সাজিয়েছি ঝিক ঝিক ট্রেন সব চৌকো ভেঙ্গে চলে গেছে দিগি¦দিক। এই আমি কি করেইবা জানবো দিনটা কবে? তবে একদিন দিদিমনি আসে বিনিকাটা চুলে, লালটিপ, লিপিস্টক রাঙ্গা ঠোঁট; ‘কি নাম তোমার’ বলে আমাকে। সেদিনই প্রথম তুই তোকারি থেকে তুমিতে উঠলো কেউ। সেটাই ছিল আমার জন্মদিন। ন্যাংটো আমি, কিছু বুঝে উঠার আগেই শিস দিলাম। ওটাইতো দেখি প্রতিদিন। টিপ পড়ে,লিপিস্টিক দিয়ে সাঁঝ বেলায় এ আঁধো গলিতেইতো ................প্রতিদিন দাঁড়ায় কমলা বিন্তি-নার্গিস আর চামেলি দি কতজন শীস দেয়, খিস্তি করে। দিদিমনিরা ভেংচি দেয়, কিন্তু আমার শিসে নতুন দিদিমনি ভেংচি দিল না। ইশারাও না। শুধু বললে, ‘ নেবে’? নেবোই না বা কেন ? ওই, ওটাতেইতো আমার লোভ। স্টেশনের প্লাটফর্মে রহমানকা’র দোকান। আঙ্গুর-বেদানা-কমলা থরে থরে সাজানো। ট্রেন আসার আগে পিলপিল করে মানুষ। ভীড় বাড়ে, মাথায় মাথায় ঠক্কর খায়, তখন। কাকার বিক্রি বাড়ে আরো। ওঠে চরমে । ওই ভীড়েই প্রতিদিন হাত সাফাই করি। একটা কমলা ক’টা আঙ্গুর কখনো সখনো বেদানা। তখনো পকেট কাটিনি কারো। এদিকে ওদিকে বাবুদের ছেলেমেয়েদের আধ খাওয়া চকোলেট খাই কুড়িয়ে। আর ন্যাংটো হয়ে ঘুরি দিনমান। মাঝ রাত অব্দি। তারপর খেয়ে না খেয়ে ঘুমাই প্লাটফর্র্মে। ট্রেন আসে। ট্রেন যায়। রাত গড়িয়ে তখন ভোর। সেই আমাকেই দিদিমনি সেদিন কমলা বাড়িয়ে বলে, ‘নেবে’, শুধু কমলা নয়, একটা বইও। সেই আমার জন্মদিন। ওই কমলাতেইতো লোভ আমার। তারপর প্রত্যেক বিকেল : দিদিমনি আসে, কলা-বিস্কুট দেয় আর পড়ায় ‘অ’-‘আ’; সেই অ টাই, আমার মা। ওকে কমলার চেয়ে মিষ্টি আর গোলগাল মনে হয় আমার। অলকাদি আমার মা। আমি পড়ি, অ তে অলকা .........অলকা আমার মা। বর্ণমালা শিখে গেছি তখন শীতে গরম কাপড় আনে দিদিরা। খাবার আনে ঈদে; পূজোতেও। মার সন্তান ‘এই আমি’অনেকটাই বড় এখন ; কাজ করি রহমতকা’র দোকানেও, মাল সাজাই। পেপার পেপার পেপার বলে গলা ফাঁটিয়ে ফেরি করি পত্রিকাও। আবার, মুট বই ; বাক্স-পেটারা তুলে দেই ট্রেনে। দেখি-পিলপিল মাথায় ঠক্কর খায় মানুষ। বিক্রি বাড়ে রহমতকা’র। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়, তারপর-সুনসান। আমি আর ন্যাংটো থাকি না..। অ তে অলকা, অলকা আমার মা মা-এর স্কুল আমিই চালাই এখন। দিনক্ষণ মনে থাকে স্পষ্ট ; ক্লাসের পর ক্লাস টপকে আমি মাধ্যমিক দেব সেবার। দিদি চারুকলার ছাত্রী। ভোরের ট্রেনটা চলে গেছে তখন। যাত্রীদের হাতে পৌঁছে দিয়েছি কাগজ বেয়াড়া কাকগুলোও কাক ডাকা ভোরে ডেকে ডেকে একসার। সে নিঃসঙ্গ আঁধারে মানুষের ভীড়ে এসে দাঁড়ায়, এক দল সাংবাদিক। খোঁজে আমাকেই। জানতে চায় দিদির খবর। ‘অ’ তে অলকা ; অলকা আমার মা। কি হয়েছে অলকার! কি হয়েছে মার ! কি হয়েছে দিদির! ‘অ’ তে অলকা ; অলকা আমার মা। দিদি আত্মহত্যা করেছে। মা আত্মহত্যা করেছে। ওটাই আমার জন্মদিন। ওরা আমার, মায়ের খবর জানতে চায়। দিদির খবর জানতে চায়। জন্মদিনের খবর জানতে চায়। দিদি চারুকলায় পড়তো রাতভর আল্পনায় দিদি সাজাতো বাসর। ভোর রাতে ফিরতো ঘরে। এ নিয়েই উৎপাত বখাটেদের। আল্পনা রাঙ্গানো টাকায় দিদির ঘর চলতো, স্বপ্ন আর স্কুলও। রোজকার ভোরের ট্রেনটা তখন প্লাটফর্মে ঢুকছে। চলন্ত ট্রেনের হুইসেল আর প্লাটফর্ম কাঁপানো ঝিকঝিক ছাপিয়ে আমার আর্তনাদ মিশছে ষ্টেশনের দেয়ালে দেয়ালে। আর, ওদের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে পড়ছিলাম, মুহুর্তে-মুহুর্তে। এ দিনটাই আমার জন্মদিন -----------নতুন শপথ মুহুর্ত। দিদি, তোমার লাল টিপে আমি সূর্যোদয় দেখি জীবনের তোমার তেজদীপ্ত চোখে আাঁকি আগামীর প্রতিশ্রুতি। তোমার আঁকা আলপনাগুলো বিবর্ণ হয়ে যেতেই পারে কিন্তু তোমার জীবন তুলিতে বিকশিত আমরা বিবর্ণ হইনি। আমাদের রেখে গেছ তুমি, যেমন রেখেছিলে সুইসাইড নোট। দোয়েল, খলিল, মোফাজ্জল রিপন, এসআই বাশার আর সহযোগী এনায়েত চৌধুরীর নাম। দু’হাজার একের ২৩ ডিসেম্বর মামলা হল ; পুলিশের একটি আর অন্যটি তোমার বাবার। নামে মাত্র বিচার হল, আপিল হলো আজো আদালতে ঝুলেই চললো মামলাটা। যেমন ট্রেনে বাদুর ঝোলা ঝোলে মানুষগুলো। বছর ষোল হলো তোমার মৃত্যুর আমার জন্মের পঁচিশ। তোমার সান্নিধ্যে আমি জন্মেছি শিক্ষায়, মনুষ্যত্ব বাঁচাবো বলেই। তোমার চলে যাওয়া অর্থবহ করতেই দিদি, আমি আছি বেঁচে ; বেঁচে আছি, আত্মহত্যায় ঠেলে দেওয়া সমাজ পাল্টাবো বলে। প্ররোচনায় দায়ী সমাজকে দাঁড়াতেই হবে কাঠগড়ায়। আর, আমি সেদিন জন্মাবো নতুন করে। সেটাই হবে জন্মদিন আমার। . **************** . সূচীতে . . .