কবি অদিতি চক্রবর্তীর কবিতা
*
স্বপ্ন ফেরে
কবি অদিতি চক্রবর্তী

আমার স্বপ্নের কোনো রঙ নেই_
তবে ভেবোনা তা বিবর্ণ......
আমার স্বপ্ন .......
আমার স্বপ্ন? ধরে নাও জলের মতো...
তোমার মতো কারূকার্য, স্থাপত্য ভাস্কর্য্য
নেই অতো
উদাসী বিকেলে পাখির নীড়ে ফেরার মতো
বৈশাখে রিক্ত শালিকের বুকের মতো
.     চাপা আকাঙ্খা_
অথবা তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যথা
কোনোটাই ফুটে ওঠে না তাতে...
তবু যা ফিরে ফিরে আসে তা হ'ল
প্রাগৈতিহাসিক সাম্য,
ইউটোপীয়ান প্রেম
তাইতো আমার স্বপ্নে_
বারুদের গন্ধ নয়_
ভেসে আসে বনজ মধুর গন্ধ
চাক ভাঙা আনকো মধু.....
স্বপ্ন ফেরে বার বার
মানেনা জীবণের ব্যকরণ
মিশরীয় সুন্দরীর একচিলতে হাসি
বয়ে নিয়ে আসে আমার শরণ
স্বপ্ন ফেরে ব্যাবিলন হয়ে প্রাচীন গ্রীসে,
কলসিয়ামে বেধে যায় লড়াই
আমার আর আমার জলজ স্বপ্নের।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিভ্রান্ত ...
কবি অদিতি চক্রবর্তী

কারো মনে ভয়, কারো দ্বিধা, বা সংশয়
অতীতসাক্ষী, এমন কতো প্রতিবাদের অনাস্থায়
কত মিছিলে হেঁটেছে কত আরক্ত মুখ দৃঢ় চোয়াল!
শিক্ষা নিয়েছে কত তরতাজা সদ্য যৌবন,
তবু আশা হত হয়না পড়ন্ত রোদ্দুর মাখা আদুরে বিকেল,
হাঁটতে তো পারেঅনায়াসপায়ে পা মিলিয়ে পা,
তবু জাগে সংশয়, জন্ম নেয় দ্বন্দ্ব আর দ্বিধা
প্রতিবাদ মুখ ঢাকে কালো হতাশায়।
শুধু ইতিহাস রেখায় ছায়া ভাসা দুরন্ত পাতায়
ফুটে ওঠে একটাই ছবি অহংবোধে অন্ধ হয়ে
-মৃত্যু পাতা গ্যাসচেম্বারফাঁদে মেরেছ যে
হাজার হাজার না পসন্দ নিরপরাধ বিধর্মী,
সেই ফাঁদে একদিন পড়বেই তুমি,
এ ইস্তেহার বার বার ছড়িয়ে পড়বে,
কালের অমোঘ নিয়মে,
এ বিশ্বাসেই বুক বেঁধে চলেছি হাজার কতক আমি
বিভ্রান্তের সীমানায় দাঁড়িয়েছে তোমার আমার জমি॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এক নদীর কথা
কবি অদিতি চক্রবর্তী

একটা নদীর গল্প বলি
শোনো ;
নদী তার মেঘ রঙা ওড়নায়
নীল মেখলায়
অফুরান গতিতে বেড়িয়ে এসেছিল
দুধ সাদা হিমবাহ গলিয়ে......
তারপর একের পর এক খাদ সৃষ্টি করে
বানভাসি করে দুকূল প্লাবিয়ে
সে চলতে থাকে অন্যমনে
অকারণে ভাঙতে থাকে পাড়
নিজের মনে নিজের আনন্দে......
তারপর একদিন শান্ত হয় জল
স্তিমিত হয় ঢেউ
পাড়ভাঙা নদীর দিকে তাকায় না কেউ!!

এমনি করে এক পড়ন্ত বিকেলে
আগুন রাঙা লালচে আভায়
যখন নতুন করে চোখ মেলল সে,
পাড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছটা থেকে-
টুপ করে লাল কৃষ্ণচূড়া অস্তগামী-
সূর্যের লাল আভা মেখে
ঝড়ে পড়ল তার কোলে!
অতল জলে লাগল
বিষম ঢেউ
ইচ্ছে হল করতে শতেক ভুল!
এই তো তার,
বিকেলে ভোরের ফুল॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
“কেমন আছো মা”
কবি অদিতি চক্রবর্তী

সে একটা দিন ছিল বাবু,যখন
ফাঁকা ঘরে একলা থাকতে ভয় পেতিস
ছুট্টে এসে নক্সা পেড়ে আঁচলটা তে
অভিমানী মুখ লুকাতিস,
"তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে"
এক নিঃশ্বাসে বলে উঠতিস
'বীরপুরুষ 'বলেই গলা জড়িয়ে
অস্থির হয়ে উঠতিস,
কখন আমি বলে উঠবো
"এই তো আমার বীরপুরুষ"....

"জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার"
বাস_ভূমির সঙ্গে আছে সুগার,প্রেসার।
আজ গঙ্গাপাড়ের ফাঁকা বাড়িতে
পড়ন্ত রোদের ছায়া মাখানো ব্যালকনিতে,
নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছি সেই স্মৃতি -সাম্পানে!
শুধু একটা রিংটোনের অপেক্ষায়....
সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে
একটাই স্বর কখন বলে ওঠে
"কেমন আছো মা?"

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দারুণ দহন
কবি অদিতি চক্রবর্তী

সৃষ্টির অন্তরালে বয়ে চলে শোক-ফল্গুধারা,
চোরাবালিতে সাজানো সুখে বাঁধা ঘরখানা !
শব্দে শব্দে সেজে ওঠে ব্যথা!
প্রিয় যেন হয়ে ওঠে দেবতা,
ছন্দে তালে শুরু হয় সেই আরাধনা
প্রকৃতি পুরুষ বাজে সেই দ্যোতনা!

মহাকবি যখন বলে ওঠেন,
"মা নিষাদ প্রতিষ্ঠানং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।
য়াতক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম্ অবধীঃ কামমোহিতম্॥"
তির বিদ্ধকোঁচবকেরমৃত্যুতে তার সঙ্গিনীর আর্তরবে
ব্যথিত কবিহৃদয়ের শোকাগ্নি জন্ম দেয় মহকাব্যের,
কবিতার উৎস মুখ খুলে যায় নিষ্ঠুর নিয়তির অঙ্গুলি হেলনে
নিয়তির পরিহাসকে পাথেও করে আক্ষেপের বিলাপে
জন্ম নেয় ট্র্যাজিক কবির ছক ভাঙা ছন্দের আত্মবিলাপ,
মৃত্যু-সহযোদ্ধা করে তার অহংকারী অশ্বের লাগামটি ধরে
মৃত্যুঞ্জয়ী কবি হৃদয় ছুটে চলে বেদুইনের মতো বল্গাহীন
তবুওসবাই কি রবি ঠাকুর হতে পারে?
হে, ঈশ্বর শোক ঠিক কতো টা হলে তা সহনীয়,
কে বলে দিতে পারে!
লালনের মতো সবাই কি প্রশ্ন করতে পারে!
"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়"...
মোমের দহনের মতো জ্বলে ওঠে হৃদয়
জেগে ওঠে মৃত্যু নীলাভ ঈঙ্গিত
জন্মানোর দায় শোধ করে দিতে হবে পারি,
বুকের উপর বেঁচে থাকবে সসাগরা পৃথিবী
যত দুঃখ যত শোক জন্ম দেবে কবিতার,
দুঃখ যদি দিয়ে থাকো শক্তি দাও সহিবার,
শোক তাপ জড়া ব্যাধি, আনন্দ, দুঃখ পরিহাস !

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বসন্ত ফেরে
কবি অদিতি চক্রবর্তী

বসন্ত কি দোর দিয়েছে চিলেকোঠার ঘরে
পলাশ শিমুল ফাগের লাজে আপনি ঝড়ে পড়ে!

মন অশান্ত হা বসন্ত ডেকে ফেরে বারে বারে
চলে যায় আর দেখে পিছু পানে  কৃষ্ণচূরাটি তারে

কৃষ্ণচূড়া কৃষ্ণচূড়া তোমার কি পড়ে মনে
ফেলে আসা সেই আগুন ফাগুন পঁচিশ বছর আগে

জুবুথুবু শীত পাহাড়ায় ছিল সদর দরজাতে
টিমটিম সেই হ্যারিকেন শিখা ভুষোকালি কাচেতে!

ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে  কুহকিনী সেই চাঁদ
ভেসে যেত কত অবহেলে নিয়ে  যত অবসাদ

বনজোৎস্নায় স্নান  সেরে নিয়ে সেজে নিত যত গাছ
অস্থির হয়ে ডেকে আনত সেই অমোঘ সর্বনাশ!

ভোরের আলোয় টুটে গেছে মোহ কৃষ্ণচূড়ার আজ,
সবাই তো জানে বসন্ত মানে ফাগুন চৈত্র মাস!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গল্পের সাথে বাস
কবি অদিতি চক্রবর্তী

গল্পরা নিঃশব্দে এসে ভিড় করে চাতালে
দুপুর নিঃসঙ্গ হয় কার্নিসে কার্নিসে,
স্মৃতি-পথে হেঁটে চলে সেই বাসন ওয়ালা
খাঁ খাঁ দুপুরের রোদ চিড়ে
সেই সুর কানে এসে বাজে,
"কাঁসা পিতল... পিতল কাঁসা"
আর ঝাঁকায় বয়ে যায় আমার শৈশব!
যেমন মরুর তৃষ্ণার্ত উট
কাঁটাফল চিবিয়ে নোনা স্বাদে ভোলে
তেমনি ভুলি কাঙ্খিত স্মৃতি!
দীর্ঘতর ছায়া ছেড়ে যায় অবয়ব,
এঁকে দেয় সন্ধ্যার আলপনা
মসজিদের মিনারে এসে
জড়ো হয় গোলা পায়রার দল,
কখনো বা শিব মন্দিরের চূড়ায়
গির্জার ঘড়িটা ওঠে বেজে
নিশ্চিন্ত সন্ধ্যা আসে ঘনিয়ে,
প্রতিধ্বনিত হয় সন্ধ্যার প্রার্থনা...
মুর্হূতরা হয়ে ওঠে চঞ্চল
মুঠোর মধ্যে থাকতে চায়না যে
গল্পরা নিঃশব্দে এসে বসে
চাতাল থেকে তুলে আনি
সুসজ্জিত ড্রয়িংয়ের আভিজাত্যের কার্পেটে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মিলে যাবে একদিন
কবি অদিতি চক্রবর্তী

আগের মতন কোনো কিছুই নেই!
আগের মতো আর কোনো কিছুই নেই,
থাকেনা, কিছুই আগের মত আর, ঘন্টি বাজিয়ে হাওয়াই সনপাঁপড়ি নেই
নেই বিন্তি পিসি আর তার পেল্লায় আপট্রন সাদাকালো টিভির টান
হরেকরকমবা, রামায়ণ, জাঙ্গলবুক
দেখার অবাধ্য ইচ্ছা, শনিবারের বার-বেলা শোনার জন্য, অহেতুক আবদার, ভোর
হতে না হতেই গলা ছেড়ে রেওয়াজের তান নেই !
জন্মদিনে রঙিন কাগজ মোড়া
ছোটদের আরব্য রজনী
কিম্বা ফুলদার বিয়েতে পাওয়া
বেলা দের 'দেশ বিদেশের রান্না'।
ছিলনা তেমন কিছু শৌখিন  কায়দা
তবু, যতটুকু পেয়েছি খোসা থেকে আঁটি সবটুকু নিয়েছি কোনো কিছু বাদ না!

আজ দেখি চারিদিকে কত কত আয়োজন!
ছোট্ট ছোট্ট স্মৃতি উঁকি দেয় তারই ফাঁকে, প্রয়োজন কত টুকু বুঝি না একবারে!
এত! এত !এতকিছু হেলায় হারিয়ে ফেলি ,
উৎসবের রোশনাই, আর, জলসায় মেহফিলে,
বেশ আছে চারপাশ ঢুলু ঢুলু সব ভুলে!
কালের নজরে আছে হিসেবের খাতা খানি
যতই বেহিসেবে চলি মিলে যাবে তা জানি!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শোনরে বিভুঁই-মন
কবি অদিতি চক্রবর্তী

মন যদি সদা করে রাধে রাধে
রুক্মিণীর আর করার কী থাকে!

কানু বিনা বৃন্দাবন অন্ধকার লাগে
রুক্মিণীর প্রেম হয় মহৎ আত্মত্যাগে

রাধার প্রেমে কী তবে কেবলকামনা!
বৈষ্ণব কবি‌ দেন হরেক ব্যঞ্জনা,

মানবের প্রেম নয় শুনো ভক্ত জন,
হ্লাদিনী রূপ ও যে কৃষ্ণ-প্রাণা মন,

পরকীয়া স্থান পায় ভক্তের হৃদে
কত বড় বঞ্চনা ‌শুধু জানে রাধে!

সেই থেকে তিনলোকে প্রেম হল দূর
রুক্মিণী, রাধিকা দোঁহে গায় এক সুর।

প্রেম যদি নাই থাকে কেন বাজে বাঁশি
পরকীয়া, স্বকীয়ার তর্কে নাহি আসি

একা ছিলে একা আছো শুনো 'বরনারী'
ভুল প্রেমে হারিয়েছ তুমি অভিসারী!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পঁচিশে বৈশাখ
কবি অদিতি চক্রবর্তী

পঁচিশে বৈশাখ মানেই ইতি উতি
অনেক স্মৃতি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই পাড়ার মাঠে তক্তাপোষ
আর সতরঞ্চি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই বিকেল ঢাকা কালবৈশাখী
চোখে জল মুখে হাসি

পঁচিশেবৈশাখ মানেই সঞ্চয়িতা সংকলিতা গীতবিতান
আর গুরুদেবের ছবি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই জুঁই বেলি রজনী আর
লাল হলুদ শাড়ি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই সন্ধ্যা বেলা রির্হারসাল আর
রাত করে বাড়ি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই নতুন ভালো লাগা নতুন করে
আড়ি

পঁচিশে বৈশাখ মানেই ছোট্টো মনের ছোট্ট ছোঁওয়া
নেই কোনো বাড়াবাড়ি

.......কিন্তু এখন কোথাও তো নেই সেই দিনের
সেই আমি,

তাকিয়ে দেখি রবি পূজার আড়ম্বরের ঢক্কানিনাদ
হারিয়ে গেছো তুমি!

সন্ধ্যা নামে যখন গলির মোড়ে একলা আকাশ নামে ঘরের কোণে

তখন শুধু ভাবি মনে মনে এমন করে বলতে ক'জন পারে
"যদি প্রেম দিলে না প্রাণে "...….
আবার তিনি ই বলেন "ওরা চিরকাল টানে দাঁড়
ধরে থাকে হাল!"


.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর