মহানগরের অলিতে-গলিতে দৌড়ে বেড়ায় কালো, ছিপছিপে, গোলগাল গড়নের মেয়েটি। যখন সন্ধ্যাতারা মিটমিট করে ওঠে, অনেক অনেক দূর আলোকবর্ষ হতে ডাক আসে ! এবার বেরিয়ে পড়তে হবে তৈরী হয়ে নে, হাতে মালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে, ঝা চকচকে রাস্তার সিগন্যাল হাতছানি দেয়, "মালা নেবে, মালা..”
একা মেয়ে কত নজর ওর ওপর, কত দেখভালের মানুষ, সবাই ওর ভালো চায়- ফুলের মালা কিনতে আসে, কত সহজে ছুঁয়ে যায় শিথিল হাতদুটো _ দৃষ্টি দিয়ে লেহন করে সমস্ত শরীর _ হ্যাঁ নারীমাংস! যেমনই হোক! ছুঁয়ে দেখা দরকার। গুটিয়ে যায় ওর সমস্ত শরীর, তারপর আস্তে আস্তে একদিন _ ভেঙে যায় সব জড়তা, ভয়, কুণ্ঠা ,
দেহাকাশে জ্বলে ওঠে নতুন সূর্য পুড়িয়ে দেওয়া নিদাঘ! তারপর সোজা চলে আসে ওদের হাত ধরেই লাল আলোর অঞ্চলে। সহজে শিখে নেয় ঊর্বশী হওয়ার পাঠ! বেজে ওঠে গোধূলির আলিঙ্গনের রাগ , তারপর, শুধু অপেক্ষা, রাত আর রাত, ধ্রুবতারা কে সাক্ষী রেখে _ ফিরে আসে ভোরের শুকতারা, আর এই ভাবেই চলতে থাকে নগর কীর্তন॥
অন্দরমহলে ছিল তোমার রাজকীয় উপস্থিতি তোমার নিটোল দুই বাহু থাকতো বাজুবন্ধে বাঁধা, পিঠছাপানো চুলে, সুডোল নিতম্বে চলন, গজগামিনী তোমার রূপের স্তুতি করেছেন কত রাজা মহারাজা! পর্দার আড়ালে না জানি কত মোহ, কত হাতছানি, তোমাকে পেতে তাই দিল্লীশ্বর খিলজিও বিবশবেহুদা! এমনই রূপের ঈশ্বরী ছিলে তুমি রাজ্ঞী পদ্মিনী.. অসূর্যম্পশা, তোমার মাধুরী শিল্পীর তুলিতে আঁকা সে খোঁজ, দিয়েছিল কোনো এক হিরামন পাখি! সেই অরূপ রতন সুদূর সিংহল থেকে , খুঁজে নিয়ে আসে তাঁকে মরু দেশের যুবক প্রেমিক নীল সমুদ্র তটে থেকে একেবারে বালিয়ারির দেশে! তারপর লেখা হয় সেই অনাবিল প্রেমের উপাখ্যান, সতীত্ব বাঁচাতে নারীর আত্ম বিসর্জন!
সে আগুন নিয়ে আসে যুগান্তরের পথে হেঁটে যাওয়া নিজের চিতাভস্ম থেকে জন্ম নেওয়া মানবী একবিংশের! আজকের পদ্মিনীর চোখে ভাসে এক অন্য চিতোর! সে চিতোরের দুর্গে সকালে তার পা ধুয়ে দেয় ভোরের শিশির, বালসূর্যের আলোয় তার মসৃণ মুখমণ্ডল আরো চক চক করে ওঠে! না জওহর ব্রত নয় কোনো, ভয় নেই কোনো দিল্লীশ্বরে, আজকের পদ্মিনীর এক বুকআগুনে বাঁচে তার - জিগীষা॥ মনের গোপন কুঠুরি তে বেড়ে ওঠে প্রেম, যে প্রেম অসূর্যম্পশা!
তারা খসে যায় কবি অদিতি চক্রবর্তী শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
দূর আকাশে নীলাভ নরম বুক ছেড়ে হিমেল রাতে নীরবে খসে যায় তারা! তেমন করেই নক্ষত্রলোকে সৃষ্টি হয় শূণ্যতা! ভোরের শুকতারা ফিরে আসে সন্ধ্যা তারা হয়ে! সেদিন ও তো ব্যতিক্রম ছিলনা কোনো! আরো, কিছুক্ষন আরো না হয় রহিতে তুমি! না হয় ফিরে আসতে, সন্ধ্যা তারা, আরেকবার ভোরের শুকতারা হয়ে! সন্ধ্যার মেঘমালায়, তারা রিমঝিম আকাশে ধ্রুব তারা নিস্তব্ধ ছিল, কোনো এক আশঙ্কায়! একে একে খসে যাবে তারা ! গানের ইন্দ্রধনু-ছটা রয়ে যাবে বাঙালির মনের মণিকোঠায়, একটা নাম থেকে যাবে অমলিন গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।
১ আমিই সেই অগ্নিবাক্ আমিই সেই মানবী যার বোধ আর চেতনা তোমাদের_ করেছিল বিস্মিত! তাই আমার সহজাত অভিজ্ঞতালব্ধ বচন.... টলিয়ে দিয়েছিল পৌরুষের আস্ফালন! কিন্তু পন্ডিত প্রবর মিহির তুমি তো জানতে আমার হৃদয়ে ছিল এক অভিন্ন প্রেমের ফল্গু তোমার জন্য ছিলো এক দেহজ আগুন!! পাষণ্ডের আজ্ঞাবাহী জল্লাদ যখন এক কোপে...... অথচ দেখো. বাক্ রুদ্ধ হলাম আমি ঠিকই কিন্তু খনার জিভ ছড়িয়ে পড়ল !! সহস্র খনার ভ্রূণ নিষিক্ত হল বাংলামায়ের কোমল জরায়ুতে তোমার ই ঔরসে! জন্ম নিলাম কত বার সত্য বলতে! কিন্তু বার বার তোমরা দিলে শিষ্টতার পাঠ! আর মিহির তোমার সমাজ করল নগ্ন আমার হৃদয় .... রিক্ত শূণ্য মাঠ! তবু আগুন জ্বলবে মিহির পারো তো সামলাও খনার জিভের সাচ্ছা বাতে শুধরে যদি যাও!!!
২ আমিই সেই মানবী যে শুধু তোমাকে ভালোবেসে কৃষ্ণাদ্বাদশীর মরা চাঁদ কে সাক্ষী রেখে তোমার শব নিয়ে যাত্রা করলাম আমার পূর্ণ যৌবন কে উপেক্ষিত রেখে! আমার দেহের প্রতিটা খাঁজ দেখছিলো _ওরা যখন ,কেবল তোমার জন্য আমি হৃদয় বাজি রেখে লাস্যে আর বিভঙ্গে নেচেছিলাম ,আর আমার দেহ লতা ওদের আর্য আভিজাত্য দৃষ্টি বার বার ধর্ষিত করছিল আমাকে!! আজ ও কান পাতো গাঙুরের জলে শুনতে পাবে বেহুলার ভাসানের রক্ত ঝড়ানো আকুতি! সত্য বলার অপরাধে আজ ও ঘরে ঘরে খনাদের "জিভ টেনে ছিঁড়ে নেবো" শুনতে হয় জান্তব হুঙ্কার!
৩ আমিই সেই আমি ই সেই যে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে গিয়ে আগুনে হেঁটে গেছি অনায়াসে বিষণ্ণ প্রতিমা হয়ে পাতালে ডুকড়ে ডুকড়ে কেঁদে মরেছি,আর তোমরা গাল ভরা উপাধি দিয়েছ সতী! চিরকাল বলে এসেছ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তীর মত হও ভারতের নারী,, কিন্তু তাদের অন্তরের শোক ফল্গু ধারার গতিপথ কখনো জানতে চেয়েছ?কাব্যে,নাট্যে তাকে রূপসী করেছ, কুঁচ বরণ কণ্যার মেঘবরণ কেশ ,পান করেছ রস সুধা আপাদমস্তক! ভরা রাজসভায় স্থবির বিজ্ঞজনের সামনে নগ্ন করতে চেয়েছিল পাষণ্ড যাকে আমি সেই যাজ্ঞসেনী , যে শুধু জেনেছিলাম পঞ্চস্বামী নয় সত্য তখন একমাত্র কৃষ্ণ সুদর্শন আমিই তো সেই সতীদাহের চিতা থেকে পালিয়ে এসে ঘর বেঁধেছি কাফের মাঝির সাথে, আমিই তো সেই সাদা খড়ির আঁক কেটেছি প্রথম ব্ল্যাক বোর্ডে ! পড়তে পড়তে কখন যেন ধরতে শিখেছি সার সত্য এই নিজের অধিকার নিজেকেই ছিনিয়ে নিতে হয়।
এই তো আমার অনিবার্য পোতাশ্রয় আমার মায়ের ভাষা, আমার নিঃশ্বাসের ওঠা পড়া,আমার প্রথম হাঁটতে শেখা আমার নামতা পড়া ভোর!আমার একলা গানের তরী আমার প্রেম অ-প্রেমের কাহিনী আমার একটা আকাশআমার মেঘলা দিন , আমার সূর্যস্নাত ক্লান্ত দুপুর, বিনা আয়াশেই এই পোতাশ্রয়ে এসে ভেরে, আমি, স্নিগ্ধ মনোরম হ্রদে অবগাহন করি।
আমার কবোষ্ণ হৃদয়, আকাশে ছড়িয়ে দেওয়া অসহ্য সুন্দর নীল মেখে,বার বার ফিরে আসে আর নোঙড় করে তোমাতে॥ আমার অস্থিমজ্জায়আমার ধমনীতে বয়ে যায়_ যে, চেতনার ধারা, তা তোমাতেই এসে থামে একুশে ফেব্রুয়ারি! একুশের মিষ্টি সকালে তোমার_পদ্মার ঢেউ এসে ঠেকবে আমার গঙ্গার তটে রোজকার মতো। আমার শিমুল পলাশে লেগেছে যে রঙ সেই রঙেই তো রাঙা হয়ে উঠেছে তোমার হৃদয় কে বলে, তোমার আমার বসত আর এক নয়! কে বলে আমার আকাশ পানা হৃদে, তোমার টইটুম্বুর মেঘ আর ভেসে বেড়ায় না! সে তো এক ভুল স্বর্গে বাস করে॥ আমার পড়শির আজানের সুর, আমার, ভোরেরস্নিগ্ধ শিউলি শরৎ.. আমার পলাশ ফাগুণ.. সারি সারি তাল তমালের কোলে ..কালো দীঘল চোখের স্তব্ধতা, কি.. অনায়াসে ফিরে আসে মহুয়ায় আর মাদলে.. জারি গানের ছন্দ তাল এসে ঠেকে গম্ভীরা, টুসুতে! আর একুশ? সে তো...তোমার আমার ধমনি তে বয়ে আনে ধীরোদাত্ত অঙ্গীকারের এক অনির্বাপিত আগুন..
"তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব" সন্ত্রস্ত অন্নপায়ী বঙ্গবাসীর, সুখী গৃহকোণই যাদের দিনের শেষে গন্তব্য, ছাপোষা বাঙালির পরম প্রাপ্তি! পূর্বপুরুষের গর্বে গর্বিত হওয়া একমাত্র পাথেয় সেই বাঙালির রক্তে লাগলো দোলা ! আর এই দোলা যিনি দিলেন তিনি বাঙালির - হৃদয়ের নেতা ! নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস ! অহিংস অসহযোগিতায় তোমার বিশ্বাস ছিল না। তুমি চেয়েছিলে সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদ। এগারোবার তোমাকে কারারুদ্ধ করল শ্বেতাঙ্গ সরকার! তাও তোমাকে দমাতে পারেনি - কুচক্রী শাসক, উমেদার প্রবঞ্চক, তোমারি দেশের তোমারি সহযাত্রী রাজনৈতিক সুবিধাভোগী অর্থলোলুপ রাজনৈতিক নেতারা! তুমি বলেছিলে, "স্বাধীনতা কেউ দেয় না অর্জন করে নিতে হয়" রাশিয়া থেকে জার্মানি, জার্মানি থেকে জাপান, সেই ঋজু, সর্বশক্তিমান গতির প্রতিভু বল্গাহীন অশ্বের মতো তোমাকে দগ্ধ করলো সর্বগ্রাসী এক আগুন ! সব শেষ হয়ে গেল বাঙালির স্বপ্ন, আশা ,ভরসা সব অগ্নি দগ্ধ হলো তাইহুকু বিমানবন্দরে! চোখের জলে বিদায় নিলে তুমি রেখে গেলে এক অসহায় জাতিকে ! তার পরবর্তী বাঙালি শৈশব থেকে প্রৌঢ় ভোলেনি তোমাকে! ঋতুচক্রের নিয়মেই তেইশে জানুয়ারি আসে, তোমার শুভ্র মূর্তিতে মালা দেয় এত মালা দেয় যে তোমার দম বন্ধ হয়ে আসে ! মালা জমে জমে পাহাড় হয় তোমার পাথরের মূর্তিতে তে ওরা মালা দেয় ইংরেজদের ছেড়ে যাওয়া রাজ্যপাটে তোমার জায়গা হয়নি ! গোপনে রাতের অন্ধকারে টাকার বিনিময়ে স্বাধীনতা কিনেছে সেখানে তোমার কোন জায়গা নেই! স্বাধীন ভারতে আমরা পেয়েছি একদিকে নেতা, দলাদলি হিংসা পুঁজিপতি মাফিয়া, আর অপরদিকে অশিক্ষা, অপুষ্টি আর রুগ্ন ধূঁকতে থাকা শ্রমজীবী আর এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে আমার মত কিছু সর্বংসহা অদ্ভুত মধ্যবিত্ত জীব! শুধু অপেক্ষার প্রহর গোনা এই অজাগর ঘুম ভেঙে কবে আবার সুখী গৃহকোণ ছেড়ে এমন এক অজেয় পৌরুষ জলদ গম্ভীর কণ্ঠে আসবে সেই আহ্বান, সাতাত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও আজো বাঙালি কান পেতে আছে, শুনতে পায় তোমার সেই সর্বকাল জয়ী বক্তব্য ; ‘আমাদের দেশের সকলের সমস্যা হল দরিদ্রতা, রোগ, অশিক্ষা, যে দিন মানুষের সামাজিক চেতনা বোধ হবে সেই দিন এই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে।’
বাহ্ এই তো ফিরছি একটু একটু করে চেনা ছন্দে কুড়িয়ে নিতে চাইছি, পায়েসের হাঁড়িতে লেগে থাকা - লালচে বাদামি হয়ে আসা চেঁছে নেওয়া আনন্দটুকু! শীতের নতুন গুড়ের সন্দেশ, বড়দিনের কেক এই তো বেশ! মাঝে মাঝে অ্যাম্বুলেন্স, শববাহী গাড়ি, আত্মীয়, বন্ধুর প্রিয়জন বিয়োগ, মহামারী দিনে শোক এক পরিসংখ্যান!
মানুষ তার আনন্দ খুঁজে নেয় ঠিক আনন্দের মাঝে বিষণ্ণতা মুখ ঢাকে! সত্যি বলতে কি প্রত্যাশা ফুরিয়ে গেলে এক অনাবিল শান্তি পেয়ে বসে ! আকাঙ্খা তখন মুখ লুকায় কামনার সমুদ্রে! তুমি ভাবছো তোমার জন্য থমকে গেছে বুঝি পৃথিবীর সব চাওয়া পাওয়া ভাবছো তোমার চিন্তায় সত্যিই জেগে আছে সব ঝাউপাতারা! তোমার জন্য নিরন্তর অশ্রু নির্গত হয় বুঝি পাথর চিড়ে নেমে আসা পাহাড়িয়া ঝর্নার মত! কিম্বা হিমেল রাতে কচুপাতা থেকে টুপ করে খসে পড়া এক বুঁদ শিশির! হয়তো ভাবছো তোমার জন্য নিরন্তর শোক বয়ে চলেছে এই সংসার চরাচরে ফল্গুধারার মত! বেড়িয়ে এসো এই মোহ থেকে! দূরে গিয়ে দেখো কেউ নেই বসে, একা বাতায়ন পাশে! তোমাকে ছেড়েই কেমন এগিয়ে চলেছে সময়-স্রোতস্বিনী। যত দূরে যাই শুধু শুনি তার কলধ্বনি! পিছে পড়ে থাকে বিশ্ব চরাচর শীতের কুয়াশা মাখা নবান্নের দেশ॥
যখন সন্ধ্যা নামবে গলির মুখে তুই দাঁড়াবি স্বপ্ন মেখে মনটাতে চোখ সাজাবি মাসকারা আর লাইনারে নিয়ন আলোয় উড়বে যে তোর নীল লিনেন সন্ধ্যা তারায় বাজবে সাঁঝের রাগ রঞ্জনী।
তোর চোখে সেই রাগের আবেশ মসলিনে পেলব হবে রাতের আলোর রোশনাইয়ে! পাশেই থামা নতুন বরের ফুলসাজানো অল্টোতে স্বপ্ন পরীর হাত ধরে ওই প্রজাপতির পাখনাতে অলীক আশা কল্পকথার জাল ছড়াবে নন্দিণী!!
গলির মুখে একলা যখন, তুই যে বড় মন্দ রে তোর সাজানো স্বপ্ন টা যে সহস্র হয় আখ্যানে নটীর পুজা স্থান করে নেয়, কাব্যে গানে গল্পতে বাস্তবে তা অনাদরে স্থান করে নেয় মন্দতে দিনের আলোয় এড়িয়ে চলে রাত্তিরেতে সঙ্গিনী !!