কবি অদিতি চক্রবর্তীর কবিতা
*
আমার স্বদেশ
কবি অদিতি চক্রবর্তী

ওই যে দেখছো খালি পায়ে উস্কো খুস্কো চুল
মাথায় তেল পড়েনি, চিরুনি তো বলাই বাহুল্য
ওর ধূলো লাগা পায়ের ফাটা গোড়ালি দিয়ে
চুঁয়ে পড়ছে রক্ত, তবু ছুটে চলেছে সাড়ে পাঁচটার
লোকাল ট্রেনটার দিকে! ওটাই ওর লক্ষ্য!
ওর মাথায় বোঝাই করা কচুর শাকের আঁটি
একহাত মাথার উপরে , আরেক হাতে
কোঁচড়ে ধরা কিছু শাপলার ডাল!
ওই আমার ভারত বর্ষ!

ওই যে দেখছো বটতলায় বসে অশিতিপর বৃদ্ধ
চেয়ে আছে অনিমেষে সামনে দিগন্ত বিস্তৃত
কালো সর্পিল পিচের হাইওয়ের দিকে,
পরনে উলিকটের রঙচটা ফিকে হয়ে আসা ফুলস্লিভ গেঞ্জি,
মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ, হাতে চাঁদ সওদাগরের মত
হেতালের লাঠি নিয়ে, বিদেশে চাকুরিরত
ছেলের খ্রীষ্টমাসের ছুটিতে বাসায় ফেরার প্রতীক্ষায়
ওই আমার ভারত বর্ষ!

ওই যে দেখছো বিলাসবহুল অট্টালিকা সমান স্কুল বাড়িটা !
ধোপদুরস্ত আধুনিক পোশাক সজ্জিত অভিভাবক অভিভাবিকার দুরন্ত গোলাপী স্বপ্নের
বাক্যালাপ, তার উঁচু পাঁচিলের ধার ঘেঁষে ই প্লাস্টিকের সংসার, ঠিকানা বিহীন,
কিছু অযাচিত সন্তানের জনক জননী!
ফুটপাতে ই যার ইহজনম পরজনম, ওই আমার ভারত বর্ষ!

ওই যে দেখছো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান নিয়ে ভরা সংসার, গাড়ি, বাড়ি, পানীয়ের বিপুল সম্ভার
প্রেম পরকীয়া, বিলাসবহুল আবাসন,
ডিস্কো, পাব, বার, রেষ্টুরেন্ট, পার্কে উপচে পড়া যৌবন!
মিথ্যা স্তব, স্তুতির, সফেন বুঁদ বুঁদ
ও ভারতবর্ষের বাইরের চিত্র। ও এক খণ্ড চিত্র!
ওর বাইরে পড়ে আছে আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপী এক হত দারিদ্র্য, অন্ধকারে নিমজ্জিত, পরমুখাপেক্ষী
হাত পেতে নিতে অভ্যস্ত এক অসহায় জাতি
ওই আমার ভারত বর্ষ! কেননা শুধু মাটি দিয়ে দেশ গড়ে ওঠে না!
মানুষ দিয়ে গড়ে ওঠে দেশ!
মানুষ, মানুষের জন্য ই দেশ, রাষ্ট্র, সীমারেখা
মানুষের জন্যই ভালবাসা, ঘৃণা হাহাকার
তবু এ দেশ আমার গর্ব, এদেশ আমার স্বপ্ন!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল স্বর্গ আমার
কবি অদিতি চক্রবর্তী
কবিকণ্ঠে কবিতাটির ভিডিওর ইউটিউবে লিংক...
https://youtu.be/kLmdmVS_mPQ       

বার বার ভুল করি, ভুলের পাহাড় গড়ি
সেই পাহাড়ে রয়েছে এক স্বর্গ
আমি সেই স্বর্গে চড়ি
একা একাই-
মাথার ভেতর একটা সবুজ সংকেত জেগে ওঠে
তবু, ভুল করি
ভুলের পাহাড় গড়ি।
তুমি বলবে এ আমার স্বেচ্ছাচারিতা
আমি হাসবো
কিছু বলবো না!
মুহুর্তরা এসে ধরা দেবে আমার কাছে-
আমি খুব আদর করে ওদের নাম দেব একেকটা

বারবার ভুল করি
ভুলের পাহাড় গড়ি
স্তব্ধতা ভেঙে তীক্ষ্ণ চিৎকার
মস্তিস্কের কোষে কোষে পাঠিয়ে দি
এক অবিভাজ্য অনুরণন!
মুহুর্তরা এসে ধরা দেবে
আমার কাছে!
আমি খুব আদর করে ওদের নাম দেব একেকটা!
ঘটনারা হিংসেয় জ্বলে পুড়ে যাবে।
আমার কাছে ওরা তুচ্ছ!
কবে কোথায় কি ঘটেছিল?
আমি কেয়ার করিনা মোটৈও!
কেই বা হিসেব রাখে তার!
সেই বেকার লোকটিকে মনে পড়ে?
যার কোনো কাজ ছিল না শখ ছিল না না রকমের?
ছোট ছোট কাঠের চৌকোয় মাটি ঢেলে তার ওপর
ছোট ঝিনুক সাজাতো! বাড়ির লোকের কাছে তার
লাঞ্ছনার সীমা ছিলনা!
রবিঠাকুরের লিপিকায় রয়েছে এক ভুল স্বর্গ।
বারবার ভুল করি
ভুলের পাহাড় গড়ি
তীব্র আশ্লেষে জড়িয়ে ধরি
আঁকড়ে ধরি প্রানপণে
তুমি বলবে, এ আমার কামনা
আমি হাসবো, কিছু বলবো না!
শুধু থেকে যাবে মুহুর্ত রা
আমি খুব যত্নে আদরে ভরিয়ে তুলবো,
আমার ওমে, স্বেদ, রক্ত, শ্রমে
নিয়ে যাব ওদের আমার সব থেকে প্রিয় ভুল স্বর্গে॥

.              ****************                          
.                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সময় সায়রে
কবি অদিতি চক্রবর্তী

এই তো এগিয়ে চলেছে সময়
সিন্ধু,গাঙ্গেয়,তটভূমি ছুঁয়ে, ছুঁয়ে-
শ্রাবস্তি ঘুরে পাঞ্চাল হয়ে
বিতস্তার জলরাশি ঠেলে
উজানের টানে ।
আমি ফিরে দেখি ভাঁটার টানে ম্লান
হয়ে আসা শীর্ণ জলের ধারা
আলোয় আলোয়
সাদায় কালোয়
এক জীবণের মানে!

পলকে পলকে ঝলকে ওঠে
কিশোর বেলার মন!
বুড়ি ছোঁওয়া সেই শৈশব ছবি
ঝাপসা কাচের কোণ....
এগিয়ে চলেছে সময় -চাকা
ফ্রক ছেড়ে বেনারসি
তারপর কত নক্সায় আঁকা ..
পথ শেষে বালুচরি........

নক্সি কাঁথায় বোনা হয় -
কতজীবনের জলছবি
চুপিচুপি এসে বলে যায় কথা
ফেলে আসা সুখ-স্মৃতি!
জানলার কাছে এসে ভোর
কখন যে দেয় উঁকি
মুছে দিয়ে গত রাতের স্বপ্ন
আগামী কে ভেবে সুখী॥

সুখের সায়রে ভেসে থাকে
কত, না জানি স্মৃতির ছবি
সেই গান গায় মিলে সুখ সারি
ভেসে যাওয়া তরণী তে
সেই সুখ ছবি মনে মনে নিয়ে
নদী বয়ে যায় খাতে!
দুখের সাগরে ওই খাতে ব‌ওয়া
সুখ এসে শুধু মেশে !

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাবার কথা ছিল বুঝি!......
কবি অদিতি চক্রবর্তী
'ঘুংঘুর' পত্রিকা ২০২০ বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত।    

ভোরের শুকতারা, হঠাৎ নেমে আসে
আমার শৌখিন ড্র‌য়িঙে
তার হাতে দি এক পেয়ালা দার্জিলিং টি
তারপর, তার পর, কী তাড়নায় ! উঠে পড়ি
হেলানো সোফা ছেড়ে!
সন্দিগ্ধ তারার চোখে প্রশ্ন,
"কোথা ও যাবার কথা ছিল বুঝি?"
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি!
তারপর বেঁধে নিই আমার ভাবনা গুলো কে,
সাজানো গোছানো পরিপাটি বাক্সে!
চেতনা, মনখারাপ, বিবেকগুলোকে,
ফেলে রাখি পুরোনো তোরঙ্গে,
সুখটা কে গুছিয়ে নিই আইভরি বাক্সে!
প্যাকিং শেষে ফিরি তড়িঘড়ি
কোথায় শুকতারা পড়ে আছে ফাঁকা পেয়ালা।
দীর্ঘ দুপুর নেমে আসে কার্নিশে কার্নিশে,
নিস্তব্ধতাকে দিয়ে আসি চিলেকোঠার সামনে
ভিড় করে আসা পায়রাগুলো কে,
সে প্রশ্ন করে "কোথাও যাবার কথা ছিল বুঝি?"
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি!
গুছিয়ে তুলে রাখি সারি সারি
কৈশোর থেকে যৌবনের স্মৃতি পর পর_
তারপর তুলে নিই সাথে কিছু গান
শুধু ওইটুকুই
গোছাতে গোছাতে শেষ হয় বেলা-
শুকতারা ফিরে আসে সন্ধ্যা তারা হয়ে,
চৌমাথায় চায়ের দোকানে ওঠা ধোঁয়া
অঘ্রাণের নরম কুয়াশা মেশা
কানে কানে বলে এসে
"কোথাও যাবার কথা ছিল বুঝি?"
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি।
কিছুতেই পাইনা ভেবে কোথায় যাবার ছিল কথা
শুধু মাথার ভিতরে ঘুরপাক করে,
সত্যিই ছিল বটে কথা
"হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনো খানে"

.              ****************                          
.                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেম যখন নিষিদ্ধ
কবি অদিতি চক্রবর্তী

সেদিন ছেলেটি দোষ করেছিল ভারী দোষ
জানো কি দোষ করেছিল? ভরা রেলস্টেশনে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে গাঢ় চুম্বনে মুছে দিয়েছিল ওর প্রেমিকার
লিপস্টিক বিলকুল!
মধ্যবিত্ত প্রেমিকা তার, লজ্জায় অপমানে মেয়েটির, চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো পা দুটো সৃতির
হাত দুটো অসাড়, শুনতে পাচ্ছে নিজের পালস বিট ধুকপুক ধুকপুক!
প্রচন্ড হুইসেল দিয়ে ওর বাড়ি যাওয়ার ট্রেন স্টেশন ছাড়লো।
ইচ্ছে হলো তাই তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম,
"ইচ্ছে হলো? ইচ্ছে হলে?" বলে ছুটে এল একদল উন্মত্ত যুবক ! তারপর তারপর..
ওর কপালে জুটল কিল চড়, লাথি
মেয়েটি দেখছে, দেখছে ওরা কী প্রচন্ড হিংস্র হতেপারে !
সত্যিই তো শুধু চুমুই খেয়েছে!
হিংস্র বন্য জন্তুর মত ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটিকে উচিত শিক্ষা দিতে, পুলিশ, উকিল, জাঁদরেল মাস্টার সবাই
করছে ছি! ছিঃ!
তবুও ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে
ওর ভালোবাসার দিকে!!
কি করেছি? হত্যা করিনি! ধর্ষণ করিনি! আমি শুধু ভালোবেসেছি ! ভালোবেসে চুম্বন করেছি
এদেশে কী ভালোবাসা পাপ!  হিংসাই পূণ্য!
হিংসাই শ্রেষ্ঠ! মেয়েটি তখন থেকেই কেঁদেই যাচ্ছে হাত জোড় করে বলছে, "আমার ভালোবাসাকে এবার
রেহাই দিন"
কিন্তু কে কার কথা শোনে এ পোড়া দেশে যখন প্রতারণা হয় জনতা জাগে না
যখন নেতারা ভুরিভুরি মিথ্যা স্তুতি দেয় জনতা জাগে না !
যখন ধর্ষিতা সাহায্য চায় ভ্রু বেঁকানো কুমন্তব্য পায় ! জনতা জাগে না
অথচ যখন ভালোবাসা মাথাচাড়া দেয়
তখন জনতা জেগে ওঠে গর্জে ওঠে নপুংসক আস্ফালনে!
প্রেম হয়ে যায় নিষিদ্ধ আর হিংস্রতা পায় আভিজাত্য
ছেলেটি বলে ওঠে "আমরা ভালোবেসে আকাশ হয়েছি
মিশে গেছি নীল নিঃসীমে,
ভালোবেসে পদাতিক হয়েছি, হেঁটে গেছি একদা অন্ধকারে,
ভালোবেসে জ্বলন্ত কাঠ হয়েছি পুড়িয়ে দিয়েছি আবর্জনা ও হোমানলে,
ভালোবেসে নরম নদী হয়েছি প্লাবনের বাঁধ দিয়েছি দুই পারে,
ভালোবেসে আবির হয়েছি ঝরেছি তোমার কেশে, বেশে,
ভালোবেসে অতীত হয়েছি হেঁটেছি লোডশেডিংয়ের জোনাক জ্বলা রাতে,
ভালোবেসে বর্ষার কদম হয়েছি নেচেছি রাইকিশোরীর সাথে
ভালোবেসে সুচেতনা হয়েছি দূর থেকে দূরে নির্বাসিত কোন দ্বীপে,
ভালোবেসে কখনো সুনীলের নীরা হয়েছি হঠাৎ করে কারো অভিসার ক্যানভাসে
শুধুমাত্র ভালবেসে বার বার ফিরে এসেছি শত প্রত্যাখ্যান জয় করে!"

.              ****************                          
.                                                                                       
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাগিচা জীবন
কবি অদিতি চক্রবর্তী
কবির চা বাগান নিয়ে লেখা কবিতা।

দূরে নীল পাহাড় সেজে আছে সবুজ মেখলায়
পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে নেমে গেছে
ঘাম ঝরানো শ্রমের ইতিহাস,
হাওয়ায় ঢেউ ওঠে সবুজ মেখলায়,
আর অগ্নি সরিয়ে বেরিয়ে আসে সেই কৃষ্ণকায় মেয়ের গল্প গাথা
যদিও চোখের সামনে ভেসে থাকে
এক মুগ্ধতার ছবি
আর তার আড়ালে থেকে যায়
রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে টিলায় টিলায়
পাতা তুলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া
নারী চা শ্রমিকের বারোমাস্যা।
"দুঃখ করো অবধান, দুঃখ করো অবধান"
বলে কাঁদলেও
ফুল্লরার বারোমাস্যার মত, কাজল কালো ঐ মেয়ের বারোমাস্যা নিয়ে গড়ে ওঠে না কোন কাব্য মহল।
দিন আনা, দিন খাওয়া, তাদের জীবনে
এক কাপ চায়ের মদিরতা নেই
নেই এক কাপ চায়ের সেই প্রেম,
দুটি পাতা একটি কুঁড়ি সযত্নে তুলে চলেছে সে তার পিঠের টুকরিতে,
সাত ফুট বাই চোদ্ফুদট ঘরে পুরো পরিবার
এর মধ্যেই তার সংসার,
আর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে সন্তান !
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একনিষ্ঠ ভাবে
কাটিয়ে দেয় এই বাগিচায়
দুটি পাতা একটি কুঁড়ির খোঁজ করতে করতে, কেটে যায় কত শৈশব, মায়ের সাথে চলে আসে, বাগানে,
প্রজাপতি, পাখি, ফুল তাদের ডাকে না, শুধু পাখির চোখের মত দুটি পাতা একটি কুঁড়ি।  
যুগের পর যুগ ধরে বাঁধা পড়ে জীবন
সবুজ চা বাগিচায়
ওদের নিরলস প্রচেষ্টায় দূর হয় শহুরে ক্লান্তি, আলস্য চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে।
'একদিন ঠিক বদলাবে জীবন' এই আশায় বুক বাঁধে বাগিচার কৃষ্ণকলি মন
হয়তো বদলাবে একদিন তাদের বাগিচা জীবন॥

.              ****************                          
.                                                                                       
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফিরে পাওয়া ডাইরি
কবি অদিতি চক্রবর্তী
কবিকণ্ঠে কবিতাটির ভিডিওর ইউটিউবে লিংক...
https://youtu.be/gEau8aOMJxo       

ঠিক বাইশটা বছর, বাইশটা বছর পেরিয়ে আজ যখন এক
অতিমারির গ্রাসে সারা পৃথিবী! ঘরবন্দী আমি হঠাৎ খুঁজে পাই
আমার পুরোনো ডায়েরি!
শেষ কবে লিখেছিলাম?
এইতো হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায়
বিবর্ণ কালিতে লেখা শেষ দিনলিপি
আমার গায়ে হলুদের দিনে,
আজ এতদিন পর আবার লিখছি
তোমার কথা খুব মনে পড়ছে মা ভিডিও কলিংয়ে তোমায়
দেখি তোমার গান শুনি
তবু তোমাকেই লিখছি আজ,
মা কেমন আছো,
ভুলো ,তুমি বাবা তোমরা সবাই,
ভালো নিশ্চয়ই আমিও বেশ আছি,
মা ,তোমার মনে পড়ে ছেলেবেলায় বলতে মেয়েদের অমন
ছটফট করতে নেই ভাই এর আগে পাত পেড়ে বসে খেতে নেই
সারাদিন ধেই ধেই করে
নাচের অনুশীলন করতে নেই,
ছেলে বন্ধু বাড়াতে নেই
হাটুর উপরে জামা নৈব নৈব চ।
এমন আরও কত নেই আর নেই
সেই নিষেধের বেড়া টপকানোর
সাধ্যও আমার নেই !
কোন দিন ছিল না তুমি তা জানো !
তবু ভয় সারাদিন একটা ভয়
তোমাকে কুরে কুরে খেত
কিসের ভয় পেতে মা
তোমার মেয়ের ভাল পাত্র জুটবে না এই তো? কিন্তু কি অদ্ভুত
দেখো সেই মেয়েরই
যখন এক সুপাত্র জুটে গেল মোটা টাকার মাইনের চাকরি ,
সুদর্শন,
স্বল্পভাষী, সবথেকে বড় কথা এনআরআই
এক বৈঠকে পাত্র সৃতির হয়ে গেল
কোথায় গেল? আমার সেই মধ্যবিত্ত মা!
যে মেয়েকে চোখের বাইরে যেতে দিত না তাকে দেশের বাইরে
পাঠাতে তার বুক কেঁপে উঠল না! আত্মীয়স্বজনের কাছে
তোমার মাথা উঁচু তে অনেক উঁচুতে উঠে আকাশ ছুঁলো আর
আমি? তোমার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে নতুন শহর
নতুন মানুষ চিনতে চিনতে
পড়লাম গিয়ে আরেক গণ্ডিতে !
আমি ভালো আছি মা!
এখানে কেউ কারোর কাছে বাঁধা নয়-
এখানে যত খুশি নাচের অনুশীলন করো
কেউ বাধা দেয় না ,যত খুশি বন্ধু বানাও
কেউ বাধা দেবে না ওড়ো যতখুশি ওড়ো
কেউ বাধা দেবে না উড়তে উড়তে তোমার ডানা দুটো ক্লান্ত
হয়ে যাবে তবু কেউ নেই তোমায় আটকাবার, মা আজ আমি
একা!
আমার মধ্যবিত্ত মানসিকতার সাথে
আমার উচ্চবিত্ত জীবনসঙ্গীর মতের অমিল
তাই আজ আমি স্বাধীন আরো স্বাধীন আমার সংকীর্ণ
ভালোবাসার কোন জায়গা নেই
ওই মানুষটার জীবনে
পেশাই তার নেশা পেশার জন্যই করতে হয় অনেক অনেক
কিছু নাইট ক্লাব
নিত্যনতুন উর্বশী রম্ভা এদের সাহচর্য!
তাকে আরো ও আরো উপরে উঠতে হবে
সেসব কথা শুনে তোমার কাজ নেই
আর হ্যাঁ জানো আমি এখনো মা হতে পারিনি
না এখানে কেউ আমাকে তা নিয়ে কোন কথা শোনায় না, কার
দোষ বিচার করে না,
এখানে কারো হাতে এত সময় কই !
আজ কেন যেন সেই ক্যাবলা ছেলেটাকে
বড় মনে পড়ছে ,সামনের বাড়ির বারান্দায়-
যে ছেলেটা সদ্য কৈশোর পেরোনো,
নানা অজুহাতে বারান্দায় এসে দাঁড়াতে
আর ছোকরা ছেলেরা "মেরে সামনে বালি খিরকি মে "বলে গান
গাইত!
আমার উপেক্ষা ওকে কতটা কষ্ট দিত
ঘুনাক্ষরেও তাই জানতে চাইনি
আজ বড় জানতে ইচ্ছে করছে,
থাক, সেসব কথা শুনে তোমার কাজ নেই
আমি একটা ছোট্ট কাজ করি এখানে ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের
দেখাশোনার কাজ ওদের মধ্যে খুঁজে পাই আমার শৈশব,
তোমার নিষেধ, তোমার বারণ, তোমার ভালবাসার উষ্ণ স্পর্শ।
তাই আর ফিরতে চাই না শিকড়ের টানে এই বেশ ভালো আছি
তোমরাও ভালো থেকো॥

.              ****************                          
.                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মহানগর
কবি অদিতি চক্রবর্তী

আজ আমি নতজানু হয়ে বসেছি
তোমার সামনে হে মহানগর
মহেঞ্জোদারোর মৃতের স্তূপ সরিয়ে,  
বিস্তৃত চারণভূমি হয়ে
সিন্ধু গঙ্গা বিধৌত জলধারা বয়ে
তাজমহলের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু ছুঁয়ে
ফিরে এসেছি আমি
এসেছি তোমার সম্মুখে,
দুর্গম পথে কতবার আছাড় খেয়ে পড়েছি,
যতবার পড়েছি ততবার তোমার আদুরে মুখের,
ঈষৎ হাসির রেখা টেনে এনেছে আমাকে
আমার মধ্যে থেকে, ফিরে এসেছি
এক অমোঘ টানে তোমার কাছে
তোমার কবোষ্ণ বক্ষের ওমে আর আদুরে ঠোঁটে,
একটা আকাশ উঁকি মেরেছে ,
আমার দেহ মনের দিগন্ত রেখায়,
মহানগর একটাই আকাশে
তার দিকচক্রবালে জেগে রয়েছে
অস্তায়মান সূর্যের রক্তিম আভা!
সন্ধ্যার আগে যেমন বাসায় ফিরে আসে
কালো বকের দল তেমনি ফিরে আসি
আমি সচেতন অথচ বিহ্বল!
পরিযায়ী মন খুলে বের করি স্মৃতিমেদুর চিত্রপট !
তারপর সোজা হেঁটে যাই কংক্রিটের কালো পথ!

.              ****************                          
.                                                                                       
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সোনাঝুরি
কবি অদিতি চক্রবর্তী
কবিকণ্ঠে কবিতাটির ভিডিওর ইউটিউবে লিংক...
https://youtu.be/gN_BYhRIWgM     

সারি সারি শালপিয়ালের বন পেরিয়ে যাবে নাকি আমার সাথে,
রবি ঠাকুরের স্বপ্নের সাথে !
বিশ্ব যেখানে, একতারে বাঁধা, এক সুরে গান গায়, আউল-বাউল
সাথে নিয়ে চলে পলাশের রং, মহুয়ার নেশায়, দূরে সরে যায়,
শহুরে ক্লান্তি আর হতাশা
যাবে নাকি আমার সাথে?
মন চায় ওই চিমনির কালো ধোঁয়া
যানজট ছাড়িয়ে রাক্ষুসী কংক্রিটের বহুতলের
বেড়া ডিঙিয়ে, টাইট জিন্স আর, লিনেন টপের মোহ কাটিয়ে,
দেয়া নেয়ার সম্পর্কের বিষময় ফল এড়িয়ে  সত্যি চলে যাই
খোয়াইয়ের পথে। কিন্তু বড় ভয়  আজ মনে বাসা বাঁধে
কেননা, আমি চিনি আমাদেরকে ঐ মেঠো পথে পলাশের রং
মেখে উজ্জ্বল হাসি ঠোঁটে, গায়ে-গতরে খেটে ওরা যে স্বর্গ রচনা
করেছে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে সেই স্বর্গে পড়েছে আমাদের পা,
ওই লাল মাটির দেশে, লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া,
উইকেন্ডের আমোদের আভাস,
শহর যেখানে কোমর দোলাবে ওদের সাথে জুড়ে বাউল এর
সাথে মিলিয়ে দেবে ফিউশনের‌ই সুরে
শহরের নীল ঢেলে দেবে ওই পলাশের‌ই  লালে
বিষিয়ে উঠবে হয়তো সে দেশ মেকী ভব্যতার টানে!

.              ****************                          
.                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হঠাৎ দেখার মত
কবি অদিতি চক্রবর্তী

সেদিন তোমায় দেখলাম জানো অনেকদিন পর রবি ঠাকুরের হঠাৎ দেখার মত!
না রেলগাড়ির কামরায় না !
দেখলাম জেট ব্ল্যাক স্করপিও থেকে নামছো, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা,
মাথারচুলে পাক ধরেছে,আর মুখেঅদ্ভুত প্রত্যয়! কিন্তু মুখের সেই এক প্রত্যয় আমাকে চিনিয়ে দিল তোমায়,
কলেজ স্ট্রিটের পোস্ট অফিসের পাশের বাড়িতে থাকা সেই প্রত্যয়, রসায়নের ছাত্র অদ্ভুত আস্থা বেঁচে
থাকার সংগ্রামে, বলতাম পড়লে না কেন? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিয়ে? মেসবাড়ির নোনাধরা স্নানঘরে একফালি
আয়নায় তোমার পা মাথা থেকে প্রতিফলিত হতো যে সমান্তরাল আলোকরশ্মি সৃষ্টি করত, প্রতিবিম্ব
সেই প্রতিবিম্বেও ফুটে উঠত সেই এক প্রত্যয়! পায়ে হেঁটে পার হয়েছে কত ট্রাম লাইন আর স্বপ্নে হেঁটেছে   
সাথে মাইল মাইল!
তারপর থেমে গেছে পথ !
চোখে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন আর প্রত্যয়-
জিজ্ঞাসা করেছিলাম প্রত্যয় দিয়ে কি হয় বলেছিলে "জীবনে বস্তু কিছু তো নয়! ক্ষুদ্র চাওয়ার জন্য আদর্শকে
কোনমতেই ছাড়া কি যায়" কি অসম্ভব বাগ্মিতা !
বেশ বেশ ফেলে এলাম প্রত্যয়,
তোমার বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়ে শুনতো সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পা রাখা সাধারণ মেয়ে টা
প্রখর যুবনেতা যার কাছে তুচ্ছ ছিল
দৈনন্দিন জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ
মানুষের চিন্তা মানুষের ভাবনাই শুধু ধ্যান জ্ঞান, তার কাছে অবোধ প্রেমের প্রত্যাশা বেমানান!
ভালো লাগলো দেখে সমাজতন্ত্রী ভাবনার ঘটেছে বদল ! অনেকটা পথ পেরিয়ে
আজ হঠাৎ যখন দেখা তোমায় আমায়
অনেক ফারাক অনেক খানি আড়াল
স্মৃতিতে ভেসে ওঠে রবি ঠাকুরের দুটো লাইন "আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে কিছুই কি নেই
বাকি?"

.              ****************                          
.                                                                                       
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর