কবি অশোককুমার মিশ্রর কবিতা
*
সম্পর্ক
কবি অশোককুমার মিশ্র

আগে ছিল বিনি সুতোর মালা
এখন চেয়ার চেয়ার সুতোয় গাঁথা
কখনও এ পাশে পড়ে টান চোখঢেকে কেঁদে ওঠে সে
কখনও ওপাশে ডুকরে কেঁদে ভাসায়
ফুলের বরাত নিয়ে সুতোয় সুতোয় হাসাহাসি
রেষারেষি বেশ ছিল ,বেশ ছিল---
হঠাৎ ফুল-সুতোর সম্পর্ক মাঝরাতে হাত ধুতে গেল
গঙ্গায় –পদ্মায়
এতো আলতা ঢাললো কে? নাকি অনুরাগ?
নাকি সিঁথির সিঁদুর?
পদ্মা আর গঙ্গা হাত ধরে লাফিয়ে বেড়ায় সমুদ্র তরঙ্গে
সমুদ্রের নীল ঢেউ এ হাঙর হয়ে যায় সুতো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষকে শিখতে হয়
কবি অশোককুমার মিশ্র

মানুষকে শিখতে হয়,থামতে হবে কোথায়
এক নদী জল পেলেই সে ফল ফলাতে
পারে না,শিখতে হয়
আমরা শিখছি এখন পাহাড়ে চড়া
সাঁৎরে পেরিয়ে যাওয়া নদী, সাগর,সময়
সাঁতরাচ্ছি,সাঁতরাচ্ছি
তারপর---
কোথায় সমুদ্রের শেষ জানতে হয়- নইলে শুধুই
বালি বালি বালি
পাহাড়ের শেষে গিয়ে থামতে হয় নইলে
খাদ খাদ খাদ
এখন এক পাহাড় থেকে আর একপাহাড়-
আমরা লাফাচ্ছি;
আমাদের ডানায় আণবিক বোমা,কোষাগার ইন্টারনেট
ভাবছি চকমক করছে   সোনা

এখন মানুষকে শিখতে হবে থামতে হবে, কোথায়----

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সত্যের তরবারি
কবি অশোককুমার মিশ্র

বাবা দিয়ে যান সত্যের দীর্ঘ তরবারি
শানানো সে তরবারি ঘরের দেওয়ালে আছে ঝুলে
বাইরে অজস্র কাঁটা-ঘরের ভেতরে ওম শান্তি ওম
মানুষ কাঁদছে বড়;উচ্চারণ শুনে আগে
দৃষ্টি যেত চলে
হৃদয়ের গরম ঘামসহানুভূতির টীকা পেলে
পৃথিবীটা দান করা যেত
এখন কথার রাজ্যে শুধু কথা
শল্কপত্র তুললেই পেঁয়াজের উগ্রগন্ধের মতো
বের হয়ে আসে বাস্তব।
খাদ্য বস্ত্র নিয়ে যারা ভাবে তারা বড় ক্ষীণ দুর্বল
অহরহ টানাটানি কুর্সি কিসসা
খাদ্যে তার টান কতটুকু?
যে আলোর নিচে থেকে আলোকিত আমি
কী কাজ সে আলোয় আনা তীক্ষ্ণ তরবারি
আলোকপ্রত্যাশী আমি স্বস্তি অন্ধকারে
অন্ধকার দেয়ালেই ঝুলে থাকে আঁধার বিনাশী
ঘর থেকে বের হই হাতে লাল গোলাপের দল।
ভয়ের জাঙাল ভেঙে মানুষ বেরোতে গিয়ে ভাবে
কার হাতে হাত!
বিশ্বাসে ঘর থেকে নেমে ঘর ছাড়া হতে
সাধ্য আছে কার!!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তুমি এবং কিছু দায়
কবি অশোককুমার মিশ্র

কিছু দায় থাকে সাগরের মতো লোনা
কিছু দায় থাকে শক্ত সুপুরী শক্ত
কিছু দায় থাকে জন্মলব্ধ দেনা
কিছু কিছু দায় আজীবন সংরক্ত।
বুকেতে যতই ডাক দিয়ে যাক টিয়া
কন্ঠে মৃত্যু ওষ্ঠে বিষাদ ওষ্ঠে
বিদ্যুৎ দায় তীব্র কশায় ছায়া—
ইতিহাস করি তোমাকেই অতি কষ্টে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমি কি তবে সক্রেতিস
কবি অশোককুমার মিশ্র

বিষের পাত্র মুঠোর মধ্যে আমি কি তবে সক্রেতিস?
বিষপাথরটা কোথায় রাখি –বিষে কিংবা প্রজন্মে
চেতনা আমার হেমলক ম্লান; সত্তা মলিন অহর্নিশ
বিশ্বাস তবে হারাতে কি হবে মানুষের পরে এ জন্মে?
জোনাকীর আলো চোখের তারায়;হৃদয়ে তবে কি পূর্ণিমা?
শ্রেণীময় উট এখানে দাঁড়ায় ;এটাই হবে বা মরুদ্যান!
কাঁটাগাছে মুখ ক্ষতবিক্ষত সেটাও তো তবু কষ্ট না
হাতে গর্জায় অস্ত্র যখন মানুষ যখন পশুও না!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পৃথিবীটা বদ্ধ মাতাল
কবি অশোককুমার মিশ্র

কোথাও যাবার তাড়া নেই,কাজ নেই অহোরাত্রি সুরার বৈঠক;
বাদাভর উদ্বেগ,সজনেখালির চরে সংশয়ী যন্ত্রণা কোরক—
জমিতে লাঙল ভেঙে পড়ে আছে, শস্যবীজে গাঢ় অন্ধকার
প্রশ্নের গর্ভ থেকে ভ্রূণ খুঁজে মেপে নেবে গভীরতা, কার?
গভীরতা তারল্যের ? শব্দব্রহ্ম ব্যর্থ হয় ,জড়তায় স্খলনে বিশাখা
সুরায় ভেসেছে গ্রাম,পাতার কুটির নড়বড়ে কাঠামোটা বাঁকা।
ক্ষুধার্ত শুষ্ক ঠোঁটে কার ঠোঁট উঁকি দেয়—মউলের মত্ত সুবাস
উঠোনে হলুদ বনে ফড়িং-এর শিহরণে আন্দোলিত মন্মথ-ঘাস
দেওয়ালে সশ্রদ্ধ ছাপ সরকারী নিষেধের পরিপুষ্ট কমনীয় চোখ
তার পাশে লাইসেন্স ,গড়ায় শিথিল দেহ,টালমাটাল সমগ্র দ্যুলোক।
এ জীবন গ্লাসভর একমুঠো ভাত চেয়ে শ্লথ ও ব্যথিত
স্মিত হেসে গাঢ় ছায়া বিস্তৃত লম্বমান ক্রম-ক্রমাগত
তারাদের ক্ষীণকন্ঠ,গ্রহবেগ উল্কায়,আলো অনু স্নিগ্ধ সকাল
প্রতিধ্বনি ফিরে যায় পদতলে নতভার ,পৃথিবীটা বদ্ধ মাতাল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দখল
কবি অশোককুমার মিশ্র

রাতভর প্রস্তুতি শঙ্খস্বরে জাগরণী ঘরে ঘরে প্রশ্রয়ী চোখ
পুলিশ বেষ্টনী ভেঙে সাবলীল ভঙ্গিমায় রোজ রোজ তারা পলাতক
তীক্ষ্ণস্বর বাদুড়ের সশব্দডানায় কাঁপে আঁধার-আঁচল
নিয়মিত সমাবেশ পৃথিবী রাহুগ্রস্ত নক্ষত্রে নক্ষত্রে যুদ্ধের আদল
কার থাবা খুঁজে ফেরে শিকারের অভীপ্সায় দিনান্তে বিফল বালক
শান্তির দূত হয়ে যে পায়রা উড়ে গেল-নর্দমায় তারই পালক
যুদ্ধ চাইনি বলে হাটে-মাঠে সাইরেণ ঘরে ঘরে যুদ্ধের ডাক
নিহতের তালিকায় সময় মানুষ-দেহ ,প্রজাপতি খুন করা সমর পোষাক
নিহত হাতের খুন মুহূর্তও নিহত স্নেহ দয়া মিয়ানো বারুদ
মৃত্যুকে মারবে বলে গোক্ষুরের ফণা দোলে ঘরে ঘরে যুদ্ধের দামামা প্রস্তুত।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষকে ভালোবাসো একদিন
কবি অশোককুমার মিশ্র

মানুষকে ভালোবাসো একদিন
বিশ্বাস করো একদিন
তারপর,বুঝে নিও ভালোবাসা বুঝে নিও বিশ্বাস কি!
তোমার রক্তে যদি জবাফুল ফুটে ওঠে
চোখেতে পদ্ম তবে ফুটবে না কেন?
মনে করো হিংসা দ্বেষ ঈর্ষা থাকে ভিন গাঁয়ে
এ গাঁয়ে শুধুই আলো- পারিজাত যেমন নন্দনে।।
সুখ পাওয়া ,সুখে থাকা, ব্যাকরণ মেনে চলা জীবনে শৃঙ্খল
তার চেয়ে একদিন
ভুঁইচাঁপা তুলে নিও
হেঁট হয়ে পথ থেকে তুলে নিও ঝরন্ত শিউলি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আগামীকে
কবি অশোককুমার মিশ্র

জ্ঞানের আলো জ্বালার জন্য কক্ষ চাই
সে কক্ষের মধ্যে সজাগ কানের সারি আর উৎসুক চোখ
তবেই না বিদ্যুতের তরঙ্গের ধুন পৌঁছবে তার মনে!
দীপশলাকা হাতে কক্ষে দাঁড়িয়ে কেউ হতাশ,
কেউ চোখ আর কান জাগিয়ে বসে আছে
না কোনো তরঙ্গের ধুন না বিদ্যুতের ঝলকানি!
এ সময়ের নিদান এটাই, হাজার আলোর ঝলকানিতে বিভ্রান্ত
একটু জাগ্রত হতে হবে অভিভাবকদের ,যাঁরা
স্কুলে পৌঁছে দিয়ে যান আগামীকে।
কেটে যাবে এই দোটানা
একদিন আলো জ্বলবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে-
সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় আনন্দে মাথা দোলাবে
মাঠভরা সবুজ ধান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাত পাতবো না কারো কাছে
কবি অশোককুমার মিশ্র

হাত পাতবো না কারো কাছে স্থির করে
আকাশকে খুলে দিয়েছি মুঠি থেকে
অঙ্গুলিতে ছুঁয়েছি পাহাড়
চোখের পাতার স্বপ্নকে দিয়েছি গহীন অরণ্য উপহার
মনের ব্যাকুলতাকে উদ্বেল সমুদ্র।
অথচ লগ্ন আসার শঙ্খধ্বনি মুখর মুহূর্তে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে
আমি আকাশের তলায় নতজানু
শ্বেতহংসকে করেছি মিনতি
হাঁটুমুড়ে শুয়ে আছি জীবনময় ঘাসে—
আমার অঞ্জলি ভরে গেল লবনাক্ত জলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর