পিছনের দশবছর কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
দুহাজার উনিশ যখন শেষ করতে চলেছি খেয়াল হল দুহাজার নয়এর ডায়েরি ফাঁকা রয়ে গেছে সে সময়ের কোনোকথাই লেখা হয়নি
আজ থেকে দশবছর আগে আমার পাকা চুলের সংখ্যা কত ছিল বছরে কতবার করে আঙুলে নখের কোনা পেকে ফুলে উঠতো কতটা জ্বরে কতমাত্রার প্যারাসিটামল কতবার খেয়েছি সেসব কিছুই লেখা নেই
দশবছর আগে লোহার অহংকারে টঙ্ টঙ্ আওয়াজ হত একথা নিশ্চিত বলা যায় কিন্তু ফেলে আসা দশটা শীতের আগে বসন্তরা কি এরকমই ভয় পেত রাস্তার শরীরে এত ক্লান্তির ছাপ দেখে দশবছর আগে পোশাক অগ্রাহ্য করে কতটা ভেতরে ঢুকে যেত শীত সেসব কিছুই লেখা নেই
দুহাজার উনিশ শেষ করে দুহাজার কুড়িতে যেতে হবে জানি যেতে হবে, যাবো , তার আগে দুহাজার নয়এর সেই ফাঁকা ডায়েরি ভরবো বলে সঙ্গে নিয়ে বিছানা পেতে আলো নিভিয়েছি
আজকের কথা কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
এখন যে কথাগুলো লিখবো সেগুলো আগের খাতায় লেখা যাবে না আগের জায়গা থেকে এখন একটু সরে দাঁড়াতে হবে আগের জায়গায় মাটি ছিল, জল ছিল গাছ ছিল, ছিল গাছেদের সালোকসংশ্লেষ আহ্লাদে জড়িয়ে ধরা লতা ছিল স্বপ্নের ভেতরে ছিল অনেক অনেক চিঠি
অবিরাম পতন দিয়ে তৈরি করা একটা অস্থিতির মধ্যে দাঁড়াতে হবে এখন সমুদ্রের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে যে ছেলেটা তার আকাশ-তৃষ্ণা নিয়ে আঁকা হবে একটা আবহ যার সঙ্গীতটা বাজতে থাকবে কান্নার মধ্যে স্নান করতে করতে
সেইসব শব্দগুলোই এখন কুড়িয়ে পাবো রাস্তায় যেগুলো লোকে ফেলে দিয়ে যায় কাজে লাগবে না বলে
এখন একটা নতুন বুকপকেট তৈরি করাতে হবে দর্জিকে দিয়ে তারজন্য বেশি মজুরি দেবো তাকে কোমরের ব্যথার ওষুধটুকুও যেন সে কিনতে পারে
গতি কমে আসছে কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
এতদিন আমার হাঁটার গতিটা একটু বেশিই ছিল পা যেখানে পড়তে চেয়েছে আমি পৌঁছে গেছি তার অনেক আগে কয়েক লক্ষ সিঁড়িকে আমি দেমাক দেখিয়েছি বারবার আমার পায়ের চাপে তারা কতটা ব্যথা পেয়েছে ভেবেও দেখিনি কত রাস্তা, কত ঘরবাড়ি, কত জড়িয়ে ধারাকে আমি গ্রাহ্যই করিনি এত দ্রুত হেঁটেছি যে হরস্কোপের সব ক্যালেন্ডারগুলো শেষ হয়ে গেল আগে আগে
এবার সেই হাঁটার গতিটা কমতে শুরু করেছে জোরে আর হাঁটতে পারিনা হাঁটুতে যন্ত্রণা হয় সেই যন্ত্রণা হাঁটুকে ছেড়ে পাঁচ ফুটের এই শরীরে একটা কুঠুরিতে গিয়ে জমা হয় টিসটিস করে ক্ষীরের মত রঙ নিয়ে পুঁজ তৈরি করে
ঘুরছে কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
পাখার সুইচ চালিয়েছি।পাখা ঘুরছে। আস্কারার মাত্রাও বাড়িয়েছি চরমে। সে এখন দুরন্ত। জল ছড়ালেও আগুন নিভছে না।সুইচ অফ করছি। নামিয়ে দিচ্ছি।বিদ্যুতের তার কেটে দিচ্ছি।পাখা কমছে না। থামছে না। ভীমরুলের মত সমস্ত ছাদ জুড়ে ঘুরছে। ছাদ ছেড়ে ঘরের দেওয়ালে । দেওয়াল থেকে মেঝেয় নেমেছে। ঘুরছে। অবিরাম। ভ্রুক্ষেপ করছে না কোনোদিকে।
জীবাণু ছড়িয়ে পড়ল চারধারে। সবার মধ্যে। বইয়ের তাক ঘুরছে।কাপবোর্ড শো-কেস ঘুরছে। চেয়ার ঘুরছে টেবিলের কোমরে। ক্যালেন্ডারগুলো উড়ছে সাল তারিখ সহ। দেওয়াল ঘড়ি তার ঘূর্ণমাণ কাঁটা ও সময় নিয়ে। মাথা ঝিমঝিম করছে আমার। আমিও কি ঘুরছি? আমাকে কেন্দ্র করেই বোধহয় ঘুরছে ইউরেনাস, নেপচুন, প্লুটো।
স্বপ্নের দুঃসাহস কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
ইটে পাথরে সিমেন্টে লোহায় ছিল দেওয়াল দুর্মূল্যের বাজারে আখ কিংবা খেজুরের রস যোগাড় করতেপারিনি সেই দেওয়াল থেকে জলের লাইন অবধি যেতে হলে রিক্সাভাড়া লাগে পঁচিশটাকা আমার লেংচে চলা পা দেখলে আরও দশটাকা বেশিও চায় কেউ কেউ এবং বেশিরভাগ দিনই লাইন থেকে জল পিছনের দিকে হাঁটতে থাকে কোনো একজন সৌভাগ্যবানের আকর্ষণে
ইটে পাথরে লোহায় সিমেন্টে গাঁথা আমার দেওয়াল আমি তার বাইরে বোরেয় চেক দেওয়া রাজার মত
স্বপ্নের দুঃসাহসের কথা কী বলব আপনাদের সে আমাকে সেই দেওয়ালের গায়ে ফুটন্ত শালুক দেখায় হামেশাই
কবিতার রাস্তা কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
যে রাস্তা ধরে কবিতারা যাওয়া আসা করে লাউ, পালং-এর মত লহ হে আমাকে লহ শিঙি, মাগুরের মত অর্জুন-শলাকা কেয়া, ছাতিমের মত নগ্ন তৈলচিত্র সে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো পথ আমি পাইনি
যেসব ঝামাইট আর পাথরের টুকরো আমি সংগ্রহে রেখেছি তারা আমাকে হোঁচট দেয় আঘাত দেয় ডুবে থাকার অক্সিজেনও দেয় হসপিটালের বেডের গায়ে জাগায় সবুজ শ্যাওলা
ঠিকানা পাইনি বলে এতকালের লেখা একটা চিঠিও ডাকে ফেলতে পারিনি এইভাবে না পারতে পারতে ক্রমে প্রাগৈতিহাসিক হয়ে গেল ডাকবাক্স
আজকাল তো আর কেউই বিশ্বাস করে না শুঁয়োপোকা থেকে জন্ম নিত পৃথিবীর সেরা কবিতারা
চোখের প্রতিশব্দ কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
কালও এইখানে গালে হাত রেখে বসেছিলাম পরশু, তরশু এইভাবে চল্লিশ বছর আগেও আমি পাথর-পুরুষ এরচেয়ে আর বেশি কী করতে পারে একটি ভাস্কর্য তা সে যত প্রখ্যাত আর ঐতিহাসিকই হোক না কেন
শুশুনিশাকের খসে যাওয়া একটি পাতার প্রেরণা আমার জন্য নষ্ট করতে না চেয়ে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া একটি দ-এর কোমর ধরে ঘষটাতে ঘষটাতে চলে গেছে
চল্লিশ বছর আগেও তোমার চোখের প্রতিশব্দ খুঁজেছি কালও খুঁজছিলাম এইভাবেই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুনীতি চট্টোরাজ কেউই পারেননি সন্ধান দিতে
গ্রানাইট-ভাস্কর্যের শরীর ও মন বড় নরম দুহাতে সাতটা সমুদ্র নিয়ে সে খেলতে পারে অবলীলায়, তবু অমন একজোড়া চোখের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার সাহস ও ক্ষমতা তার কোথায়
মানুষের সব সভ্যতাই পর্যায়ক্রমে ঘুমিয়ে পড়ে মাটির তলায়
বাহান্নপীঠ কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
সারাজীবনের কবিতার ভেতরেই ছড়িয়ে থাকে একজন কবির বাহান্নপীঠ কোথাও সে পাথর, কোথাও রক্তলসিকা কোথাও দাঁত, কোথাও চুম্বন মা এবং পুতনা
ইটের মত সাইজ করে পুড়ানো মৃত্যু সমগ্র জীবন ধরে তার সঞ্চয় সেইসব মৃত্যুর ভেতরে সমস্ত ফর্মুলায় জীবন বিহীন কোনো রসায়ন নেই পুরুষ মৌমাছি জানে তার মৃত্যু রমণেই রমণীর প্রেমে তবু তার দ্যুতি অনির্বাণ
হারিয়ে যাওয়া সমস্ত রাস্তার গা থেকে নতুন নতুন রাস্তার দৌড় শুরু হয় রাস্তা সংক্রান্ত যত তথ্য পৃথিবীতে লিপিবদ্ধ আছে তার চেয়ে হাজারগুণ কবির সাহস থেকে নিত্য জায়মান ফ্যাসিবাদ সেই ভয়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করে
কবিতা এক হজমি বিশেষ কবি দিশারী মুখোপাধ্যায় মিলনসাগরে প্রকাশ ১.৮.২০২২।
একজন ইতিহাসবিদের কথা আমি জানি যার অনুমোদন ব্যতীত এক পা আগে কিংবা পিছনে যাবার সাহস পেত না সময় তাকেও মাথার চুল পরিপাটি করার সময় কবিতাকে আয়নার মত ব্যবহার করতে দেখেছি
এরকম অনেককেই আমি জানি যারা লাঠি , ছাতা কিংবা টর্চ ছাড়াও চলাচল করতে পারে স্বচ্ছন্দে অথচ স্নানের সময় জলে অবগাহন করতে ভয় পায় দু'ছত্র কবিতা তখন যদি তাদের শোনানো যায় ল্যাজা, পাখনা, কানকো নিয়ে দিব্যি সড়গড়
একজন বিজ্ঞানভুকের কথাও আমি জানি যার অনুমোদন ব্যতীত গান্ধর্ব্য কিংবা বিয়ের সাহস দেখায় না যাবতীয় গবেষণা সকল তাকেও বুকের ব্যথা হজম করার সময় কবিতাকে হজমির মত অনুপান করতে দেখেছি
একজন কবির ঘুম কিংবা জেগে থাকা বিপন্ন প্রকৃতি আজও আগলে আগলে রাখে