কবি ইদ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
রাত ৩টা
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১৫ নভেম্বর, ১৯৭০।

আমি হিসাব মেলাতে পারিনি
ডেবিট-ক্রেডিট হয়ে একাকার
বয়ে আনে ব্যর্থতার উপহার
বারংবার।
দেনা পাওনার হিসাব হয়ে মেশামেশি
যায় পিষি ভাগ্যকে আমার
প্রতিবার।

পঞ্চাঙ্কের পরীক্ষা নাটকে
আমি এক পরাস্ত নায়ক
পরীক্ষকের সুতীক্ষ্ণ শায়ক
বিধিয়াছে পঞ্জরে আমার।
রক্তে রক্তে তাই রিনি-ঝিনি এসেছে জোয়ার।
পঞ্চাঙ্কের প্রতি অঙ্কে
বর্ষব্যাপী হয় অভিনীত

প্রতি অঙ্কে অভিনয় করি
শেষ অঙ্কে হব উপনীত।
দুরন্ত পৌরুষে মোর করিয়া নির্ভর
ভাগ্যকে নেই নাই মানি, জানি
আমার যা কিছু প্রাপ্য শেষ দৃশ্যে নেব তাহা টানি।

এখন নিঃঝুম নিস্তব্ধ রাত
অতন্দ্র প্রহরী আমি বিনিদ্র ধরণী
হিসাবের খাতা হাতে –
হিসাব মেলাতে পারিনি।

ম্লান দীপ শিখা দেয়ালে দেয়ালে
আশা নিরাশার ছবি এঁকে যায়
প্রিয়ার মিনতি সম শয্যা টানে অঙ্গ মম
ক্লান্তি আসি দেহকে জড়ায়
শ্রান্ত দেহ ক্লান্ত মন
অবসণ্ণ চেতনার ধারা
তারি মাঝে জাগে স্মৃতি
কিছু অতীতের, কিছু ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভরা।
শূন্য দৃষ্টি মেলি দূর আকাশের পানে
চাই পড়িবারে কি আছে লেখা
.                   নিঃসীম নীল অনন্ত গগনে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নীড়
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১৬ অগাস্ট, ২০০১  

গাছটিকে ঘিরে ঘিরে
আকাশে বেড়ায় উড়ে
ছোট দুটি পাখী।

গাছের শুকনো শাখা, কিছু লতা পাতা
কিছু বা লোহার তার, কিছু খড়কুটা,
এখনো অনেক বাকি।
গাছের শুকনো ডাল, সবুজ পাতার ভীড়
বুকে জাগে আশা, এখানে বাঁধিবে বাসা
সুখের নীড়।

বসন্তের দিন শেষ, আসে বৈশাখী,
কুলায় কাঁপিছে পাখী।
বহিছে বাতাস প্রবল বেগে
ঘুম ভাঙা ঝড় উঠেছে জেগে।
ভয়ে বুক কাঁপে দুরু দুরু
প্রলয় নাচন হয়েছে কী শুরু ?

ভেঙে গেছে নীড়, লুটায় ধূলায় পড়ে।
পাখী দুটি তাই খোঁজে উড়ে উড়ে।

আনে শুকনো গাছের শাখা,
কিছু খড়কুটা, কিছু লতা-পাতা।
বারে বারে আসে ঝড়
বারে বারে ভাঙে ঘর।
জানে পাখী জানে
তবু হার নাহি মানে।
সুখে-দুখে হাসে-কাঁদে
তবু পাখী বারে বারে বাসা বাঁধে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গল্প
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১৭ অগাস্ট, ২০০১।

কিছু যা গল্প না, কিছু বা কল্পনা
মনের খাতায় নানা রঙে সিক্ত আমার রচনা।
স্মৃতির তুলিকা দিয়ে হৃদয়ের পটে
আমি এঁকে যাই আলপনা।

আমার ডালায় তুলেছি কত না ফুল,
কিছু সৌরভে ভরা, কিছু রূপেতে অতুল।
কিছু বা শিথিল শেফালি, বকুল,
বেলী, মল্লিকা, যূথিকা, পারুল,
তুলেছি অনেক ফুল।

আমি গাঁথি মালা, আমি রচি কথা,
কিছু বা চাঁপার হাসি, কিছু ঝরা বকুলের ব্যথা,
মুক্তা ছড়ানো হাসি আর রক্ত ঝড়ানো বেদনা।

নানা রঙে তারা করে ঝিলমিল,
কেহ হাসে, কেহ কাঁদে,
পেয়েছে কি খুঁজে তারা জীবনের মিল?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রতীক্ষায় আছি
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১৯ অগাস্ট, ২০০১।

প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিকূন্ড-বিচ্যূত উদ্বাস্তু ধরিত্রী অস্থির,
প্রদক্ষিণ করে চলেছে তার কেন্দ্রস্থল,
আজও পায়নি পুন
র্বাসন শান্তির প্রলয়ে।
অন্তর তলে তার প্রবাহিত সূর্যের উত্তাপ,
যে উত্তাপ মানুষের মনে প্রধূমিত করে অনেক আগ্নেয়গিরি।

শাসনের নামে নির্বিবাদ অনুষ্ঠিত শোষণ, লুণ্ঠন
দলিত শোষিত জনগণ-মন বেদনা জর্জ্জরিত
কিছু আর নাই হারাবার ভয়
তা’রা আজ হয়েছে নির্ভয়।
আহত ফণীর গোপন থলিতে জমা হয় সুতীব্র গরল,
ষ্ট্রটেজি রচনা করে কখন কিভাবে হানবে ছোবল।

নাটকটা ক্রমশঃ ঘনীভূত হয়।

লালাসিক্ত লোভের চিটচিটে কৃষ্ণজিহ্বা
ঈর্ষায় বীজ্যমান।
জ্বলছে লোভে আর হিংসার জতুগৃহ।
মহাকালের তৃতীয় নয়নে কালাগ্নি উর্দ্ধমুখী,
রক্ত ঢেলে দিয়েছে আকাশ সীমায়।

বুভুক্ষু শিশুর ক্রন্দন আর্ত্তের আর্ত্তনাদ
ধর্ষিতা ধরণীর হাহাকার
বৈকুণ্ঠের রূদ্ধ দ্বারে হানে করাঘাত।

কোথা কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কোথায়?
মঞ্চে জাগে প্রশ্নের জোয়ার।

কৃষ্ণ এখনো বীজাঙ্কুর, জনগণ-মনের গ্রীনরুমে,
প্রবেশের প্রকাশের এখনো হয়নি সময়।

উত্তর গো-গৃহ দৃশ্য শেষ, ভীষ্ম, দ্রোণ পরাজিত,
শক্তি আর ঐশ্বর্য্যের উদ্যত অহঙ্কার
আকাশ-চুম্বী সৌধ ধূলিতে লুণ্ঠিত।

সাজঘরে চলছে কুরুক্ষেত্রের প্রস্তুতি-পর্ব।
অসত্য অন্যায়ের চাই প্রতিকার।
দিকে দিকে উত্তাল কলরোল,
অস্ত্রের ঝনঝনা, গান্ডীব টঙ্কার।
ধর্ষিতা দ্রৌপদীর হাহাকার ব্যাপ্ত দিক দিগন্তরে,
সূর্য হয়ে জ্বলবে শত হোমের আগুন।
বেদনার কালীদহে জাত কৃষ্ণ জনগণ মনে
হোতা সে হোমের,
যে হোমে আহুতি হবে
অসত্য, অশিব আর সব অ-সুন্দরের।

কৃষ্ণের প্রতীক্ষা কর।
কৃষ্ণের কণ্ঠে নির্ঘোষিত হয়-
প্রতীক্ষা করো আমার প্রবেশের,
আমি বিশ্বরূপ পূঞ্জিভূত বিক্ষোভ বেদনা,
বঞ্চিতের হাহাকার আর আর্ত্তের প্রার্থনা।

কামনার বিষবাস্পে কোন কালানল
এখনো হয়নি সৃজন, এখনো আসেনি সময়।

পাঞ্চালীর বস্ত্রে এখনো দুঃশাসনের হাত,
পাঞ্চালী এখনো সচেষ্ট নিবারণে,
এখনো হয়নি শুদ্ধ পূর্ণ সমর্পণে উদ্বাহু।

নিশ্চেষ্ট, সমর্পণে দুই বাহু উর্দ্ধে উত্তোলিত,
যখনই খুঁজিবে আমায় অন্তর আকাশে
প্রার্থনায় সোচ্চারিত,
তখনি মিলিবে সঙ্কেত, বেজে উঠবে পাঞ্চজন্য,
তখনি ঘটবে আমার প্রবেশ।

আমিও প্রতীক্ষারত সময়ের॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অশনি সঙ্কেত
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ২০ অগাস্ট, ২০০১।

বিনিদ্র রজনী কেটে গেছে নক্ষত্রদের সাথে       
বালুকা বেলায়, যমুনার তটে।          
এখানেই ছিল আমাদের কুঁড়েগুলি,             
কাল সন্ধ্যায় সব দিয়েছে গুড়িয়ে।            
সব শেষ, অবশেষে শুধু ভগ্নস্তুপ            
ভাঙা হাড়িকুড়ি শুধু এধার ওধারে ছড়িয়ে।

ঐ তো ওখানে ছিল হাসিনার ঘর, শহীদার ঝুঁপড়ি,    
মন্ডলের ঘর আর শিবানীর বাড়ি,          
কিছু নাই আর;                           
জ্বালাধরা অনেক চোখ, বুক ভাঙা হাহাকার।          
                                                      
কিন্তু তারা তো করেছিল অঙ্গীকার
অণ্ণ, বস্ত্র আর আবাসের দেবে অধিকার।
তারা কি তা গেছে ভুলে, বা আমরাই করেছিনু ভুল,   
তাই কি আজ দিতে হবে ভুলের মাশুল?  
                                 
হয়েছি স্বাধীন, সে তো হ’ল বহুদিন  
কিন্তু কি তার ফসল? কী দিয়েছে?
বুভুক্ষা, নির্বাসন, লজ্জা, আশ্রয় আকাশের নীচে!        
ভিক্ষাপাত্র হাতে যবে গেছি দ্বারে
প্রবেশ হয়েছে নিষেধ
নিবেদন করেনি গ্রহণ, রক্ষীদল করেছে তাড়না
বিশ্বাস করেছি যবে, ভেবেছে নির্বোধ
শাসণ যবে নিয়েছিনু মেনে, করেছে শুধুই বঞ্চনা।
প্রতারণা, বঞ্চনা আর সহ্য নয়
সব গেছে, গেছে ভয়, আজ মোরা হয়েছি  নির্ভয়।

অনেক পিয়েছি গরল, নিরুদ্ধ চীৎকার নীল কণ্ঠে
জ্বালাধরা চোখ, অশনি চমকে সে চোখের মনিতে।
অবনত শির দেখে আমায় ভেবেছে ভীত
আজ মোর সমুণ্ণত শির কেন করে শিহরিত?

দিকে দিকে জাগে জাগ্রত জনতার কোলাহল,
বন্ধ্যা প্রতিশ্রুতি, প্রলাপ ভাষণে আর কি বা ফল?
আজ শোষকে শোষিতে দ্বৈরথ
সাগরে ডেকেছে বান, খুঁজে পেতে হবে পথ।
জনতা জাগ্রত আজ, রাখনি খবর
মরণ শিয়রে করি বৃথা খোঁজ আজ আঁধার বিবর।

রাজগৃহ ভেঙে গেছে ভীম গদাঘাতে,
ব্যাষ্টিলের দুর্ভেদ্য দুর্গ ভেসে গেছে জনতা-জোয়ারে
দ্বিখন্ডিত শোষকের নরমুন্ড
গিলোটিনের দুই পাশে রক্তের প্রবাহ।
পালাবার পথ নাই, রুদ্ধ সব দ্বার
চারিদিকে উচ্ছ্বসিত জনতা-জোয়ার।     

মৃত্তিকার স্পর্শ নিয়ে আজ সবার অঙ্গীকার।
এ মাটিতে ফিরে পেতে হবে পূর্ণ অধিকার।  
পঞ্জর অস্থিতে বজ্র গড়া হ’বে
হাহাকারের কর্মশালায় ভার্গবের শানিত কুঠার।
হে সারথি! চালাও রথ,
বাঁধার প্রাচীর ভেঙে খুঁজে নিতে হবে পথ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবন-বীণা
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ২৫ অগাস্ট, ২০০১।

ঝরে যদি যায় ফুল, রিক্ত হয় শাখা,
শ্রান্ত বলাকা যদি বন্ধ করে পাখা,
তবু জেনো সে-ই শেষ কথা নয়
বসন্ত ফিরিয়া আসে নিয়ে কিশলয়।

আকাশ যদি গো রয় মেঘে মেঘে ঢাকা,
পথরেখা যদি নাহি যায় দেখা,
কুটিরে প্রদীপ যদি গো নিভিয়া যায়,
তবু জেনো সে আঁধার শেষ কথা নয়।

মেঘের তরণী দূরে ভেসে যায়
কোন অজানার হাত ইশারায়,
আকাশ স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না ধারায়,
হাসে চাঁদ সেই নীলিমায়।

জীবন-তরী বেয়ে চলো
দুঃখ সুখের এই জোয়ারে,
ডুব দিয়ে আজ মুক্তো খোঁজো,
ভয়-ভাবনার কে ধার ধারে !

আলো-আঁধার কান্না হাসি,
নিত্য কালের এই তো কথা,
নুতন করে সাজাও জীবন
ভোল সব দুঃখ ব্যথা॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবন-দর্শন
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১ সেপ্তেম্বর, ২০০২।
বিপরীত মুখী ব্যাখ্যাতে লিও টলষ্টয়ের
“How much land does a man require” গল্পের  
কাব্যছন্দে ছায়ানুবাদ। মূল গল্পটিতে লোভ না করে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার প্রচ্ছণ্ণ ইঙ্গিত  
আছে। কিন্তু বিশ্বসৃষ্টির মূলে কাজ করছে ক্রমোণ্ণতি বা
Evolution Theory। অনু-পরমানুও
এক মহত্তর উণ্ণতির দিকে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে। শৈল শিখরে উপনীত বারিবিন্দুও  
সমুদ্রের আকর্ষণে নানারূপে সমুদ্রের প্রতি ধাবমান হয়। ভূমাতেই আনন্দ। চরম  
অবস্থাতেই পরম প্রাপ্তি। মধ্যপন্থা জীবনকে সার্থক করে না। উপনিষদ বলে – ‘ভূমৈব  
সুখম, নাস্ত্যল্পে সুখমস্তি’। ক্ষুদ্র সার্থকতা যেমন জীবনকে জয়ী করতে পারে না, তেমনি সব
ব্যর্থতাই শেষ কথা নয়। অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে জীবনযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করাতেই জীবনের
সার্থকতা।    

সূর্য তখন এসে দাঁড়িয়েছিল উদয় অচলে
সূর্যকে পিছে রেখে,
সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়েছিল সে
দৌড়েছিল সমুখ দিকে।
তার সাথে ধাবমান ছিল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা,
অদম্য উদ্যম তার চরণে দিয়েছিল চঞ্চলতা,
তার লক্ষ্য ছিল এক দীর্ঘ ব্যাসার্দ্ধ,
ব্যাসার্দ্ধ রচনা করে বৃত্তের পরিধি ;
তার আকাঙ্ক্ষা
এক বিস্তৃত জীবন-বৃত্তের পরিসীমা।

তার প্র
তিযোগিতা ছিল সূর্যের সাথে।
উদয়-অস্ত সময়ের দুই প্রান্ত সীমায়
অতিক্রান্ত পথরেখার ব্যাসার্দ্ধ
রচনা করবে যে জীবন-বৃত্তের পরিসীমা
সে হব তারই অধীশ্বর।
তার আশা ছিল বিরাট
বৃদ্ধ পঙ্গু স্থবির জীবন তার কাম্য ছিল না,
সে চেয়েছিল ভূমার আনন্দ,
মৃত্যুর গ
ণ্ডী অতিক্রম করে
এক পরিপূর্ণ জীবনের অধিকার,
সে দৌড়েছিল।
অগ্রে ধাবমান তার সুদীর্ঘ ছায়াটা
এক সময় পায়ের নীচে হারিয়ে গেল;
সে দেখেছিল,
মূহুর্তের জন্য সে তাকিয়েছিল উর্দ্ধাকাশে,
ভেবেছিল – এবার ফেরা যাক্
হোক না ব্যাসার্দ্ধ ক্ষুদ্র
যা পাওয়া যাবে, যদিও অল্প, কিন্তু নিশ্চিত।

কানে কানে আশা, কথা কয় যেন
এখনি ফিরবে কেন,
শুধুমাত্র পার হয়ে এসেছ পথের অর্দ্ধ,
এখনো ক্ষুদ্র তোমার ইপ্সিত ব্যাসার্দ্ধ,
বিরাটের অধিকার ছেড়ে
তুমি এখনি কি ফিরবে বিবরে?
সে ফিরলো না, সে দৌড়েছিল সমুখ পানে।
যাত্রা-বিন্দু দৃষ্টি সীমার অনেক দূরে,
অস্তাচলের সিঁড়ী বেয়ে
সূর্য নামছে দীগন্তে।
আর নয়, এবার সে দাঁড়ালো ফিরে।
চঞ্চল চরণে দ্রুততর গতি
সমস্ত উদ্যম পূঞ্জীভূত,
একত্রিত জীবনের সকল শক্তি,
জীবন-পণে তাকে জিততে হবে
জীবনের বাজি।
   
সূর্য তখন অস্তাচলের মধ্য সিঁড়ীতে
যাত্রা-বিন্দু ক্রমশঃ নিকটে এগিয়ে আসে।
উল্লসিত জয়ধ্বনি হতেছে ধ্বনিত,
‘আরও দ্রুত, আরও দ্রুত’
;
সূর্যের দক্ষিণ চরণ উত্তোলিত
মূহুর্তে স্থাপিত হবে শেষ ধাপে,
লোকটার কর স্পর্শ করল
সাফল্যের পদাঙ্গুলী,
লোকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল
জীবন-বৃত্তের সীমা স্পর্শ করে।
সে-ই অন্তিম নিঃশ্বাস।

জনতার একদল চিৎকার করে বলেছিল-
‘লোকটা জিতেছে, লোকটা পেরেছে’
তারা যা পারেনি;
তারা বলেছিল- লোকটা যোদ্ধা, লোকটা বীর,
জীবন-যুদ্ধে সে লড়েছিল অদম্য স্পর্ধায়
মরণ-পণ করে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষার ডানা মেলে,
ঈগলের স্পর্ধা নিয়ে
লোকটা সূর্যকে স্পর্শ করতে চেয়েছিল।
নিবীর্য্য স্থবির জীবন তার কাম্য ছিল না
তার মৃত্যুটা গণ্য নয়, কিন্তু জীবনটা ধন্য।

দুই হাঁটুর উপর চিবুক স্থাপিত করে
একদল বলেছিল- লোকটা ছিল হটকারী, লোভী,
কি কাজ ছিল এমন মৃত্যুতে?
হয়তো খুব অল্পই পেত,
কিন্তু জীবনটা বেঁচে যেত।
কেন বাপু আমরা কি বেঁচে নেই?
দুঃখ করি, কষ্ট পাই
ধুকপুক করেও বেঁচে থাকি, বেঁচে রই।
ওরে ভজা, হুকোটা এগিয়ে আন
উঃ বড় শীত পড়েছে আজ;
কল্কেতে আগুন দে,
ভালো করে তামাক সাজ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিকেলের রঙ
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ১৫ সেপ্তেম্বর, ২০০২।

প্রয়োজনী
তার সময়-সীমা অতিক্রান্ত  
ডিসকার্ডেড, ছাটাই হয়ে গেল।
ডিসপোসাল ভ্যানে স্নিফার কুকুরটি চলে যায়।
শেষবার সময়ের ঘ্রাণ নেয়।
প্রভুভক্ত বুঝেছে প্রভুর মন,
ছলছল চোখে ফিরে চায়, বিদায় জানায়।
অনেক পুরস্কার, অনেক পদক,
গ্যাস চেম্বারে সব শেষ,
কৃতঘ্নতার স্বাদে সিক্ত ভস্ম অবশেষ।

এখনো কিছু রঙ বাকী আছে,
এসো ছবি আঁকি বিকেল বেলার
হোক না মেঘলা আকাশ, দেখনি কি
মেঘের আড়ালে সূর্যাস্তের রঙ বাহার?

বাতায়নে বৃদ্ধটি কোন দিকে চেয়ে আছে?
বাতাসে উড়ে যায় ছেঁড়া টুকরো কাগজ
সেইদিকে কি দেখছে?
সে কি জীবনের কবিতায় মিল খুঁজছে,
ভেসে যাওয়া কাগজ টুকরোর।

বালুচরে মহিলাটি অনেকক্ষণ বসে আছে,
নদীর বুকে অনেক নৌকার যাতায়াত
মহিলাটি কি ভাবছে ? প্রথম দিনের ছবি?
এ নৌকায় সেদিন পতিগৃহে এসেছিল
পায়ে আলতা, হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর
না কি ভাবছে, এ যাত্রার কোথায় শেষ?
ফেলে দেওয়া রজনীগন্ধার মালা কোথায় যায়?

বৃদ্ধাশ্রমে বিকেল বেলার ধূসর আলো,
সবাই গল্প বলছে নিজের সোনালী অতীতের
বাতাসে গল্প ভাসে, শুনি আর ছবি আঁকি,
প্রৌঢ়ার প্লুরিসি, নিঃসঙ্গ জীবন, একাকী।
বৃদ্ধ এক ডাক্তার নিয়ে এল,
মেঘের আড়ালে সূর্যাস্তের সোনালী আলো।
কিছু শব্দ ভাসে বাতাসে,
নার্সিং হোম, স্যানাটোরিয়াম, উটিতে?
রঙের বাহার ফুটে ওঠে সাঁঝ গগনের ছবিতে
কিছুটা লাল রঙ ছলকে পড়ে
স্নিফার কুকুরটি আমাকে ভাবায়
বৃদ্ধ প্রৌঢ়াকে উটি নিয়ে গেছে
বিকেলের ধূসর রঙ রক্তিম হয়ে যায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুই পৃথিবী
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০২।

কার্গিল যুদ্ধের শহীদদের শবদেহ নিয়ে
বিমানগুলি নামছে বন্দরে।
শোক গাঁথা, ফুলের মালা,
গ্রহণ করছে তাঁদের সামরিক সন্মানে।

এক সরকারী কর্ম্মচারী
বমাল পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে
প্রতিরক্ষার গোপণ দলিল দিয়েছিল তুলে
বিদেশী শত্রুপক্ষের হাতে।

প্রবঞ্চিত, প্রতারিত জনগণ আন্দোলন করছে,
প্রতিবাদ জানাচ্ছে সরকারী অন্যায়ের।
‘রাস্তা রোকো’, ‘ট্রেন রোকো’
‘সরকার মুর্দাবাদ’, ‘সরকার হায় হায়’
ফিস প্লেট উধাও, ট্রেন লাইন চ্যূত
শতাধিক হত, অনেক আহত
নেতা হারায়েছে পরিবার পুত্র কন্যা সহ।
নেতা ভাবেন, তিনিই একদিন শিখিয়েছিলেন
ফিস প্লেট খোলার কৌশল
জনতা রয়ে গেছে যথাস্থানে
তারই ঘটেছে ভাগ্য বদল
আজ পেয়েছেন সাধনোচিত ফল।

অসহায় পুত্র, রোগ শয্যায় পিতা
হঠাৎ খুলে গেল পথ
রক্তের বিনিময়ে পাওয়া যায় টাকা
শরীরের অংশ বিক্রি হয় উচ্চমূল্যে
গোধূলিতে বাজতে পারে সানাই

ভীষণ অগ্নিকান্ডে বিপণ্ণা মাতা,
উদ্ধার করতে পুত্র আহত
আগ্নিদগ্ধ মাতা-পুত্র হাসপাতালে।

নিষিদ্ধ এলাকার আবর্জ্জনা থেকে উঠে আসে
এডিপাসরা অন্ধকার পথে
যে অন্ধকারে মা ও পুত্রী পরস্পর প্রতিযোগী
জীবনের প্রয়োজনে যুদ্ধমান।
মাতৃগর্ভে উজ্জীবিত সহোদর সহোদরা
আত্মজ আত্মজা
রমণী সীৎকার কাঁপে আত্মজের সঙ্গঁ-সুখে
এডিপাস চেয়ে দেখে নারী বিবসনা
ভাবে কেমন ছিল ‘আমার মা’।

কবর খুড়তে গিয়ে উঠে আসে একটা করোটি
কবর-খনক উল্টে পাল্টে দেখছে করোটি-টা
ভাবে - হয়তো একদিন ছিল এটা আমারই মাথা॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুর্যোগে
কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায়
রচনা ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০২।

কঠিন রৌদ্রে সব দাউ দাউ করে জ্বলছে,
পুড়ে গেছে ঘাস, ফুল আর যত মহুয়ার স্বপ্ন,
এখন নয়, এ বড় অসময়, কেউ যেন বলছে
দুরে উড়ে গেছে আজ প্রজাপতি রঙ আর লগ্ন।

জৈবিক নিয়মে খুঁজি হাতড়িয়ে চড়াই উৎরাই
অতলে তলিয়ে তবু পাই না সীমানা,
অধরা, আঁধারে যেন রয়ে যায় অজানাই
গলিঘুঁজি বৃথা খুঁজি মেলে না আলোর ঠিকানা।

বরষায় ভিজে যায় মনের ক্যানভাস,
সব রঙ ধুয়ে মুছে হয় একাকার
রামধনু, প্রজাপতি আজ আর পায় না প্রকাশ,
মন জুড়ে মেঘ ঝরে নিরাশা আঁধার।

তবু কিছু স্বপ্ন থাকে, কিছু জ্বালা লাগে ভালো
ছিঁড়ে ফেলে সব  ছবি জীবনের মশাল জ্বালাই,
সবুজ ধানের ক্ষেতে ঢালি দাবানল আলো,
রৌদ্রের ছবি আঁকি আর দামামা বাজাই।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর