অব্যক্ত প্রেম কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ৮ নভেম্বর, ২০০৪।
ভাষাহীন তোমার চোখের দৃষ্টিতে কিছু কথা যেন লুকানো ছিল অবগুণ্ঠিত ভীরু প্রেম, পার নাই ভাষা দিতে।
কিছু কথা আমারও বলার ছিল কাছে গিয়ে বারে বারে এসেছি ফিরে, সহজ কথাটি সহজে বলা হয়নি সহজ দুলেছি সংশয়ের দোলে অব্যক্ত প্রেম অন্তরে গুমরি মরে।
হয়তো সে কথাটি বলতে চেয়েছো সে আমারই কথা মনে মনে জানি তুমিও শুনেছো আমার সে ভাষাহীন বাণী, তবু গোপনে শতবার উচ্চারিত কথাগুলি রয়ে গেল মনে মনে তুমিও বলতে পারনি, আমিও।
কিছুই বলা হ’ল না অশ্রুত সে কথাটি আমরা যা শুনতে চেয়েছিলাম, শোনা হ’ল না ফুল তো ফুটেছিল, তোলা হ’ল না।
সকালের ফুল ঝরে গেল সাঁঝে মালা গাঁথা হ’ল না। শূন্য ডোর নিয়ে হাতে তুমি ভেসে গেলে জোয়ারের স্রোতে আমি দাঁড়িয়ে ভাঁটাতে নোনা অশ্রু মিশে যায় নদীজলে॥
অপরাজিত কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ২৩ ডিসেম্বর, ২০০৪।
মৃত্তিকার বুকে করি না কবর সন্ধান রেন-ট্রি–র শীর্ষ শাখে বিজয় দুন্দুভি মৃত্তিকা-আশ্রয় উর্দ্ধে তুলেছে শির উদ্ধত। আন্দোলিত শির প্রতিবাদ জানায় না, না ঝড় ঝঞ্ঝা হোক না যতই প্রবল আমি ভয় করবো না’ না, না।
জীবনের বাজি ধরা বুকে উষ্ণ নিঃশ্বাস স্নায়ুতন্ত্রী নয়তো শিথিল, নির্জীব ভুজঙ্গ নতজানু চাহি না প্রবলের প্রসাদ কনিকা। বিদ্যুত-গতি চঞ্চলকুরঙ্গ, ধাবমান চীতা স্ফীত বক্ষ দৃপ্ত পদক্ষেপ, আমাকে উদ্দীপ্ত করে। যদিও কভু ব্যর্থকাম তবু বীর্য্যবান গর্বিত হৃদয় আমার জানায় সহানুভূতি।
জীবনের যত মান-পত্রগুলি পড়ে আছে মূল্যহীন জঞ্জালের মতো দিন-রাতের রিক্সা চলে ভাগ্যদেবতা প্যাডেল পদতলে, পদাঘাত করি আর শীর্ষ শাখাটি দেখি, আন্দোলিত শির করে না, না আমি মাথা নত করবো না না, না॥
জৈবিক কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ১০ এপ্রিল, ২০০৫।
নিস্তব্ধ আঁধারের গোলাপী চিন্তাগুলি সূর্যালোকে পায় না খুঁজে কোন মিল, সমস্ত দিনের পুঞ্জীকৃত উঞ্ছবৃত্তি খট্টাশের অট্টহাসি হয়ে বিদ্রুপ করে মধ্যরাতে। আমি এক রণক্লান্ত সৈনিক যে ভালোবাসে, যে যুদ্ধ করে আমিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী অহোরাত্রি লিপ্ত দ্বৈরথে।
আমি নিজেই নিজের কাছে দ্বিখন্ডিত যে আমি আমার নিজের এবং নিজের নয় সত্ত্বহীন পথিলব্ধ যেমন কিছুটা অথবা ইতিহাস-হীন কোন কবন্ধ ভাস্কর্য, কোথাও নাই কোন সত্য পরিচয়। একদিন মানে ছিল, একদিন জীবনের অর্থ ছিল, আজ ঐতিহ্য এক বিস্মৃত স্মৃতি বিগত শতাব্দীর প্রথম দিনের স্বপ্ন আজ আর মনে পড়ে না।
জীবনেরে খুঁজি নিরন্তর আপোষের পথে শৃগাল আর পেঁচকের সাথে আমিও নিয়েছি আশ্রয় তমিস্র বিবরে, আলো হ’তে বহুদূরে। বিবর্ণ সময় রূপরস-হারা, ক্লান্তি জড়ানো সঙ্গীতের সুরে স্বপ্নে চেয়েছি যা’রে বারে বারে সে দ্বারে এসে গেছে ফিরে অনাদরে।
শুধু এক ছায়ামূর্ত্তি জেগে থাকে ‘অস্তি’ আর ‘প্রাপ্তি’র জগতে যমুনার আর পারে। ‘রাধা নামে সাধা বাঁশী’বাজে বৃন্দাবনে, পশে না শ্রবণে। অন্ধকার অন্তস্তলে জাগে এক অর্থহীন বোধ শুধু বেঁচে থাকা আর রিরংসা লালসা। চৈতন্যের দ্বার রোধ করে, অচেতন দেহের গভীরে ডুবুরি মন খোঁজে আলোর ঠিকানা॥
গ্রাম এনেছি সঙ্গে করে কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ২১ এপ্রিল, ২০০৫।
এসেছি দেশ ছেড়ে, আছি অনেক দূরে দেশ কি কেউ ছাড়তে পারে? দেশ এনেছি সঙ্গেঁ করে, মনে দেশ কি কভু যায় ছাড়া, চলে এলে দূরে? মনের মাঝে স্মৃতি হয়ে, থাকে যে দেশ হৃদয় জুড়ে, দেশের মাটি, দেশের ভাষা, রক্তে আছে মিশে।
স্বপ্নমাখা সে দেশ আমার স্মৃতি দিয়ে ঘেরা, তারে যায় না কভু ভোলা দেশের আকাশ, দেশের বাতাস আজও মনে দেয় যে দোলা সে দেশ স্বপ্নে আজো হাতছানি দেয়, যায় না তারে ভোলা ।
আমার নাই তো বাঁধা, নাই তো মানা, নিত্যচলে যাওয়া-আসা, মনে মনে, এসেছি দেশ ছেড়ে, দেশ এনেছি সঙ্গেঁ করে, মনে।
আজ চাঁদ জ্যোৎস্না ঢালে মনের আকাশে, ভাসলো আমার মনের ডিঙা স্মৃতির জোয়ারে। যাবে যদি এসো আমার নায়ে, আমি চলছি ভেসে গাঁয়ে, স্মৃতির সাগরে।
ঐ যে দূরে যায় দেখা, আমার গাঁয়ের পথের রেখা। থোকায় থোকায় দুলছে হিজল ফুল, যেন ঝুমকো কানের দুল। এসেছি আজ অনেক দিনের পর, ঝুমকো থেকে ঝরছে বৃষ্টি জল যেন কাণ্ণা-ভেজা আমার চোখের জল।
হিজল-ছায়ে বাঁধছে বাসা ডাহুক-ডাহুকী, গোধূলিতে ঘরমুখী ঐ গ্রামের পশুপাখী। সন্ধ্যাবেলায় ফিরছে কূলায়, আকাশের ঐ বকের পাতি। ওরা সবাই চেনে আমায় আমি ওদের চিনি।
পলাশ শিমুল ভরে গেছে ফুলে, হেলেঞ্চা আর মালঞ্চ ছেয়ে আছে কূলে, ভরা পুকুর কলমীদলে, হাঁসগুলি কাটছে সাঁতার জলে।
কিষান বঁধূ, বাজায় শাঁখ, আকাশে টিপ সন্ধ্যা তারার, দিনের শেষে ফিরল ঘরে কিষাণ তাঁর। আমার গ্রাম নয়তো দূরে আর।
সেদিনের গন্ধ আসে মাটিতে, সেদিনের ছন্দ বাজে বাতাসে, ঐ তো বোসের বাড়ি, বাদামতলা, জোড়া পুকুর শাপলা ভরা।
বনের ছায়ায় মায়ের ছোঁয়া, মাটিতে মা’র আঁচল পাতা, এই গাঁয়েতে ছিল আমার মা, আজরাতে এই ঘাটেতে বাঁধব আমার না’।
এই তো আমার গাঁ, হেথায় আমার নিত্য আসা যাওয়া। আমি রয়েছি আজ দূরে, গ্রাম এনেছি সঙ্গেঁ করে, মনে।
দেশ কি শুধু মাটিতে গড়া, ঘর বাড়ি আর মানুষ ভরা? দেশ গড়েছে আমার ব্যাকুল মন, আমার দু-নয়ন।
আমার দেশ আমার গ্রাম, আমার মনের কল্পনা। ফলে ফুলে সাজাই তারে, আঁকি কত আল্পনা।
গ্রামখানি রচেছে মোর মন, আমার ভালোবাসা, আমার দু-নয়ন। রয়েছে গ্রাম স্মৃতি জুড়ে গ্রাম এনেছি সঙ্গে করে, মনে॥
স্বপ্ন-জীবন কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ২৮ মে, ২০০৫।
স্বপ্নের ভিতরে আর এক স্বপ্ন, শূন্য আয়তন, তবু পার হয়ে যায় সুদীর্ঘ শতাব্দী সব ঋতু নিয়ে, স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাওয়া, ভেসে যাওয়া দৃশ্য ও দৃশ্যান্তর, শুধু যবনিকা ওঠা-নামা।
চারপাশে কামনার রক্তরাগ রঞ্জিত পুষ্পিত কানন, শ্রেণীবদ্ধ জীবনের বর্ণালী সুষমা, বিকীর্ণ রামধনু কুহক-মায়া ; তৃষাদগ্ধ, বেদনাদ্র বিষনীল, পাপিয়া কূজন আর মিথুন-বিলাপ ; স্রোতে ভাসমান জীবনের জলছবি।
এই তো সেদিন এলাম, মনে হয় হ’ল বহুকাল, পুরাতন রঙ্গমঞ্চে, আমি এক আগন্তুক নট, মনে হয় সবই পরিচিত, সবই চিনি, জানি অস্পষ্ট চেতনায় কুয়াশার অন্তরাল, এই সূর্যালোক, নদীজল-কলতান, সবুজ বনানী কতবার হয়েছে পরিচয়, শুনেছি মর্ম্মরধ্বনি, কতবার দিন অবসানে শেষের খেয়াতে ফিরে গেছি ঘরে
এমনি আর একটি অপরাহ্ণ বেলা পশ্চিম দিগন্তে জ্বলে দিনান্তের চিতা কূলায় ফেরা পাখীরা, পাখায় সন্ধ্যা ঘনায় ক্লান্ত কাকের সাথে অন্ধকার নামে ধরণীতে দিনের কর্ম্ম-কোলাহল স্তব্ধীভূত উষ্ণ ভালোবাসার স্পর্শমাখা দৃশ্যগুলি দাঁড়িয়ে থাকে। এ হৃদয় স্পর্শ করে এই ম্লান গোধূলি সন্ধ্যা, রাত্রির গভীর নিস্তন্ধ অন্ধকার।
আর এক নাটকের প্রস্তুতি-পর্ব এখন সামান্য বিরতি। বিরতির অবসরে – আর এক স্বপ্নরাজ্যের ঊষালগ্নে চক্রব্যূহে প্রবেশের পূর্বক্ষণে আমি খুঁজে নেই আর এক ভ্রূণের সুষুপ্তি আশ্রয়॥
অর্ঘ্য কবি ইন্দ্রজিৎ মুখোপাধ্যায় রচনা ৯ জুন, ২০০৪।
(১) যদি দারুন ঝড়ে আঁধার ঘরে নিভে যায় মোর ঘরের বাতি, যদি পথের পরে একলা ফেলে চলে যায় সব খেলার সাথি . কে রহে তখন মুছাতে নয়ন . দীননাথ, দয়াল তুমি ভিণ্ণ? সংসার যবে করে শুধু বঞ্চনা, আশ্রয় যদি কোথা নাহি মেলে বুক ভরে যদি জাগে হাহাকার, . ভেসে যাই যদি আঁখি জলে, . সে অশ্রুধারায় ওগো দয়াময়, . রাখিয়ো তোমার চরণ চিহ্ন॥