কবি জগদীশ গুপ্তর কবিতা
*
রূপান্তরিতা
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত “শনিবারের চিঠি” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩৪৮ (অক্টোবর
১৯৪১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এ-বাড়ির বউ তুমি, ও-বাড়ির মেয়ে---
আমারি সুমুখ দিয়া কর যাঁতায়াত ;
মাঝখানে ব'সে আমি দেখি চেয়ে চেয়ে,
তোমার এ দুটি রূপে কতটা তফাৎ।
এ-বাড়িতে, আছ ব'লে পাই নাকো টের,
সরমে ওঠে না মুখ, মুখে নাহি রা ;
বুঝে চল, চপলতা অপরাধ ঢের ;
শাশুড়ীর চোখে তুমি “লক্ষ্মী” “হীরা”।
ও-বাড়িতে গেলে দেখি বেঁধেছে বিপ্লব---
কোমরে আঁচল বেঁধে উঠে গেছ গাছে ;---
ধর্‌ ধর্‌ মার্‌ মার্‌ খাব খাব রব ;
শশব্যস্ত ভাই বোন ছোটে আগে পাছে।
এখনি ছলনা তুমি এতখানি পার!---
বয়স তো সবেমাত্র এগারো কি বারো!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তীর্থে এস, এস তীর্থে
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩৪৮
(অক্টোবর ১৯৪১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

॥ গান॥

তীর্থে এস, এস তীর্থে---
.        চিরদিনের স্রোতের তীরে,
ভাসাও তোমার দিঠির কুসুম
.        আমার দু'টি আঁখির নীরে।
স্বর্ণবরণ স্বপ্ন-আলোক---
আমার মনের সেই ধ্রুবলোক
অস্তাচলের কালো ছায়ায়
.        মিলায় মিশায় ধীরে ধীরে।---

তোমার স্মৃতির দীপান্বিতায়,
.        আমার আঁধার হ’বে উজল,
তোমার হাসি, সেই হাসিটি
.        কুসুমিত রাখবে ভূতল ;
সেই তীর্থে আসবে মরণ---
.        চিরশরণ দুঃখহরণ,
পাব তোমায় নীরবতায়---
.        সেই মরণে, সেই গভীরে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সহজ পথে
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার মাঘ ১৩৫২ (জানুয়ারি
১৯৪৬) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এই দেশেতে মরি যেন, ইহা বলাই বৃথা,
অন্য দেশে মরতে হবে, অনর্থক এ-ভয় ;
এই দেশেতেই হরিনাম, এই দেশেতেই গীতা ;
দেশান্তরে গিয়ে মরার খরচ অতিশয়।
এই দেশেতেই মরা সহজ রোগে অনাহারে---
আঁৎকে’ উঠে’ অবাক্‌ হবে এমন ত’ কেউ নাই ;
বিপর্যস্ত হ'তে হ'তে অভাবে ও ধারে
মরেই আমরা অব্যাহতি ভূমানন্দ চাই।
এই দেশেতেই মরি যেন, অকারণেই বলা---
বাপ, পিতাম' রেখে’ গেছেন বেঁচে থাকার কাল ;
শৈশব থেকে সয়ে আসছে মরার পথে চলা---
বাছাবাছির ধার ধারি না অকাল কি কাল !
এই দেশেতে একদা যে জন্ম নিলাম আমি---
সুখ সেটা নয় ; সুখের বলে' মরণটাই দামী।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভয়
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩৫৫
(অক্টোবর ১৯৪৮) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

কিশলয় কহে ডাকি’ স্নিগ্ধ মৃদু সুরে
ভূপতিত ধূলিম্লান জীর্ণ পত্রটিরে :
“জননীর কোল ছাড়ি' গেছ বহু দূরে---
অগ্রজ আমার তুমি ; কৌমুদী শিশিরে
অরুণ আলোকস্নানে পবন হিল্লোলে
নাহি তব প্রয়োজন। নবমঞ্জরীরে
বিকাশের অবকাশ দিয়া কুতূহলে
মিশিছ মৃত্তিকাসনে অতি ধীরে ধীরে...
আমার সেবার রত সন্তানবৎসলা
জননী প্রকৃতি ; আমি অতি পুলকিত ;
তবু কোথা' হ'তে আসি' গভীর উতলা
একটি নিঃশ্বাস মোরে করে চমকিত !---
তোমরা যেতেছ আর গিয়েছ যেখানে
আমি ফি চলেছি সেথা প্রবাহের টানে !

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গুরু-প্রণাম
কবি জগদীশচন্দ্র গুপ্ত
কবিতাটি উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত “বিচিত্রা” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৩৮ (ফেব্রিয়ারি
১৯৩২) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

॥ রবীন্দ্র-জয়ন্তী উপলক্ষে রচিত॥

অনন্ত অতিথি আসে
.        তব রস-সাগরের তীরে---
আকণ্ঠ করিয়া পান,
.        অবগাহি’ তটহীন নীরে---
মনোপাত্রে ভরি’ লয় সেই তীর্থবারি
.        লক্ষ নরনারী।
ফিরে ফিরে আসে তারা---
.        যাতায়াত চলে অনিবার---
আকুল অমৃত-তৃষ্ণা
.        অবিলম্বে নহে মিটিবার---
আপনি ভুঞ্জিয়া ডাকে প্রতিবেশীগণে,
.        “ভুঞ্জ জনে জনে।”
তোমার ঝঙ্কৃত তন্ত্রী
.        অন্তরের দেবতারে ঘিরে
বাজিতেছে সুরে সুরে
.        মানবের হৃদয়-মন্দিরে
নিরলস স্তবগানে হয়েছে মুখর
.        পুজার আসর।
হেরি আপনার মাঝে
.        তোমার সে চারু-বিরচন
আপনার মননের
.        চিন্ময়ের তব রূপায়ন
বিগলিত হৃদয়ের ধারা অবিরল
.        করে ছল্‌ ছল্‌।
সবাক্‌ বৈকুণ্ঠ রচি',
.        পদ্মালয়ে জাগা’য় প্রভাত---
মূকেরে উত্তরি’ ল’য়ে
.        করাইলে বাণীর সাক্ষাৎ---
দেখাইলে সসাগরা মূর্ত্তিখানি তার
.        রূপে চমৎকার !
সে শুধু রূপসী নহে,
.        কেবল সে নহে সালঙ্কারা---
দিকে দিকে উল্লাসিনী,
.        নাহি তার ছটার কিনারা---
সে বাণীরে নতিচ্ছলে আমি করিলাম
.        গুরুরে প্রণাম।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সর্ব্বজ্ঞ
কবি জগদীশচন্দ্র গুপ্ত
কবিতাটি জীতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বীরভূমি” পত্রিকার পৌষ ১৩১৮ (ডিসেম্বর
১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

সারারাত ঘুরি’ ফিরি’ চুরি করি’ চোর
ঘরে এসে শুয়ে' প’লো না হইতে ভোর।
কহে চোর---সাধু বলে' চালা’ব নিজেকে
যতদিন ধরা না---হঠৎ চেয়ে দেখে
কাহার পলকহীন তীব্র আঁখি দু’টি
চেয়ে আছে, তিরস্কার বাহিরায় ফুটি'।
সভয়ে মুদিল চোর নিদ্রারুণ আঁখি,
দেখিল জানিতে তার কিছু নাই বাকি।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অর্থের দহন
কবি জগদীশচন্দ্র গুপ্ত
কবিতাটি জীতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বীরভূমি” পত্রিকার মাঘ ১৩১৮ (জানুয়ারি
১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

পথ বহি যায় দীন গুণ্ গুণ্ গেয়ে,
রাজা দেখিলেন তারে কক্ষ হ’তে চেয়ে।
কহিলেন নিদারুণ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি---
মিথ্যা এই ধনরত্ন বৃথা জমিদারী।
আমিও হ’তাম সুখী ওর মত হ’লে,
পেয়েছে সন্তোষ দীন ধনের বদলে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৈপরীত্য
কবি জগদীশচন্দ্র গুপ্ত
কবিতাটি জীতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বীরভূমি” পত্রিকার মাঘ ১৩১৮ (জানুয়ারি
১৯১১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

জন্মান্ধ লভিয়া দৃষ্টি বলে---কি বাহার!
কি সুখে(ই) বঞ্চিত ছিল নয়ন আমার!
চক্ষুষ্মান্‌ চক্ষু মুদে' বলে, চমৎকার!
কি অগাধ শান্তি এই আঁধার মাঝার!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
করলাম পকেটে
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৯৫৪ সালের “শারদীয়া যুগান্তর” পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়।

সয়ে সয়ে দাদার একদিন জন্মে গেল কোপ
লক্ষ্য করে আমায় হঠাৎ দেগে দিলেন তোপ ;
“ভাগ পাবিনে আর তার যা' আনি রোজ খেটে”--
"দূর হয়ে যা" কথাগুলো করলাম পকেটে।

আদেশ মতো পাকা রাস্তায় বেরিয়ে এলাম সোজা
মুখে উত্তম অহং ভাব, বিড়ি কানে গোঁডা . . .
হেঁটে হেঁটে ক্লান্তি এল, জ্বালা ধরসো পেটে
ক্লান্তি এবং জ্বালাটাও করলাম পকেটে।

আসছে দুপুর---কিছু মাত্র নাহি হোয়ে ভীত---
জয়রামপুর ইস্টিশানে হ’লাম উপনীত---
টিকিট নাই তাই গলাধাক্কা খেতে হল গেটে---
গলাধাক্কা অনায়াসে করলাম পকেটে।

এল গাড়ী---উঠতে গেলাম চক্ষে নিয়ে ধূলো
উঠছিল সে মাথায় নিয়ে গাঁটরি কতগুলো---
মারল ঠ্যালা ছিটকে প’লাম কপাল গেল কেটে---
যন্ত্রণা ও রক্তধারা করলাম পকেটে---।

মাটি ছেড়ে ঐ গাড়ীতেই উঠে পড়লাম ত্বরা...
পৌঁছে গেলাম : গেটে বললে, “ওরে বেটা চোর”---
“টিকিট” বলেই মারল চাঁটি ঘন্টায় শ রেটে---
শব্দ এবং আঘাতগুলো করলাম পকেটে।

জ্ঞাতির বাড়ী এলাম, তাঁরা খুড়োমশা’র ছেলে,---
দেখে আমায় বললেন তাঁর চক্ষুদুটি মেলে---
শুনতে পাই তুই বেড়াস নাকি পরের চরণ চেটে
কথাগুলো পূর্ববৎ করলাম পকেটে।

তাহার পরে বললেন, “এটা ভদ্রলোকের বাড়ী---”
রান্না হয় রোজই কিন্তু খুব ছোট্ট হাঁড়ি
বেশী চালে ফাটবে হাঁড়ি কারণ হাঁড়ি মোটে---
ভঙ্গী ভাষা হাসির ছটা করলাম পকেটে।
অতি উচ্চ শিরে
বেরিয়ে গেলাম ধীরে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কখন
কবি জগদীশ গুপ্ত
কবিতাটি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার পৌষ ১৩১৭ (ডিসেম্বর ১৯১০) সংখ্যায়
প্রকাশিত হয়। লাইট বিরচিত “এ্যানি”র অনুকরণে।

দেখেছি তাহারে                 ছোট বালিকাটি
শৈশবক্রীড়া-রত,
স্নিগ্ধ যেমন                      ঊষার আলোক,
ফুল্ল ফুলেরি মত।

প্রজাপতি তার                 খেলিবার সাথী---
ছুটাছুটি তারি সনে,
ফুলটি তাহার                   দেখার জিনিষ---
চেয়ে থাকে আনমনে।

দেখেছি তাহারে                     ষোড়শ বর্ষে
যুবতী লাবণ্য ভরা.
রূপরাশি যেন                       চাঁদের কিরণ
জগৎ-প্লাবিত-করা।

লজ্জা-আনত                     আঁখি দুটি সদা,
নম্র মন্দ গতি,
বচনে তাহার                           হর্ষগীতির
ব’য়ে যেত সুধানদী।

তার পরে তারে                  দেখিয়াছি পুনঃ
স্নেহ-বিগলিত মাতা---
করুণা বিভল,                        স্নেহ ছলছল
অনিমেষ আঁখিপাতা।

স্তনন্ধয় শিশু                        আশ্রিত বুকে
করিতেছে সুধা পান,
মুদে’ আসে আঁখি                 শুনি মার মুখে
ঘুম পাড়ানিয়া গান।

দেখিলাম তারে                    অস্তিম-কালে---
সুখাশ্রু বহিছে ধারে,
বিদায় মাগিছে                  স্বামী পুত্র কাছে---
পার হ’য়ে যাবে পারে।

করুণ দৃশ্য---                        ত্যাজিল পরাণ
স্বামীর চরণে নমি’ ,
মাধুরী কখন                        বাড়িল অধিক
বুঝিতে নারিনু আমি।

.              ****************              
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর