শশধরেরে নূতন দাঁত কবি জগদীশ গুপ্ত কবিতাটি ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩৫২ (অক্টোবর ১৯৪৫) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
সুশীল সেন : “ঐ যে মেয়েটি গেল হাসিতে হাসিতে সঙ্গিনীর পানে চেয়ে---লোহিতে ও পীতে একখানি অফুরন্ত গীতিকাব্যসম--- লাবণ্যে অপরিমেয়, বর্ণে নিরুপম ! দেখিলে তাহারে? তন্বী হেসেছিল বেশ--- কুসুমিত করে গেছে একটি নিমেষ ! দেখেছি ত' কত হাসি কতশত মুখে, বিকচ প্রফুল্ল হাসি সুখে ও কৌতুকে-... এ-হাসি তেমন নয়, নহে সাধারণ, সকল হাসিতে নাই অমৃতক্ষরণ, এ-হাসি হাসির যেন পরম প্রকাশ, পরম রসের রূপ! জন্মিল উল্লাস। এখনি দেখা সে-হাসি অদৃশ্য এখন--- শূর্য্যাস্তের পর রক্ত-দীপ্তির মতন ফুল্ল প্রতিচ্ছায়া তার অজস্র অক্ষয় লেগে' আছে প্রাণে। কেন এমনটি হয় ! কোথায় ফুটিল হাসি! সমগ্র আননে--- নয়নযুগলে, কিম্বা গণ্ডে কি দশনে !”
সুবোধ রায় : “দেখেছি সে হাসি ; হাসি অতীব মধুর উজ্জ্বল মানসরাগ ফুটেছে প্রচুর ; কিন্তু যদি প্রশ্ন করো, ফুটেছে কোথায়? সরল উত্তর তবে দে’য়া হবে দায় ; আমি মনে করি, হাসি তুলেছে উচ্ছ্বসি' সমগ্র যৌবন তার---রূপসী ষোড়শী। হেসেছে বয়স তার, হেসেছে তনুটি, দাঁত নয়, ওষ্ঠ নয়, নহে চক্ষু দু'টি। অদ্যাপি অনবগত কবি বৈজ্ঞানিক : কি কারণে কোন্ স্থান হাসে সমধিক ! শিশুর উলঙ্গ মূর্ত্তি না হেসেও হাসে--- সর্ব্ব অঙ্গ ব্যেপে তার হাসিটি বিকাশে।
তবে এ স্বীকার করি, দাঁত নাই যার তার হাসি স্বাদহীন ; দৈর্ঘ্য ও বিস্তার পাবে তা'তে ; কিন্তু নাই গভীরতা, আলো ; নাই তার আবেদন ; মোটেই জোরালো নহে তা' ; সে রপহীন নিকৃষ্ট ব্যাপার--- সোহাগটা ফোটে খালি বৃদ্ধ ঠাকুরদার। অন্ধের হাসিও দেখো, অসম্পূর্ণ হাসি--- বিকিরিত দীপ্তি চোখে ওঠে না বিকাশি'। সে যা' হোক, দাঁত আর ঠাকুর্দ্দার নামে মনে প'লো ঘটনা যা’ ঘটেছিল গ্রামে। শোনো যদি বলি তবে অপূর্ব্ব আখ্যান : দাঁত কেন মানুষের রহিল পরাণ” ।
থামিল সুবোধ রায়, ছাড়িল নিঃশ্বাস--- কহিল “মানুষ মাত্র নিয়তির দাস ; অহরহ দৃষ্টান্তের পেতেছি সাক্ষাৎ : আজিকার বনস্পতি কাল ধুলিসাৎ। সে কি তার শক্তি, তার, সে কি কলেবর--- তখনো, যখন তার বয়স সত্তর। নাম ছিল শশধর, শশধর ঘোষ, ছ'ফুট দু'ইঞ্চি দেহ, নির্ব্ব্যাধি নির্দোষ ; অতিশয় মিষ্টভাষী, প্রফুল্ল সর্ব্বদা... আমাদের সকলের “শশ ঠাকুরদা”। বার্দ্ধক্যেও দেখে তার শক্তি অসম্ভব দুষ্টজনে নাম দিল “দ্বিতীয় পাণ্ডব” ; উপরটা যত বড়ো তেমনি ভিতর--- অনুপাতে ততখানি গভীর গহ্বর, তিনটি লোকের খাদ্য খাইতে সক্ষম, হজমশক্তিতে নহে কারো চোয়ে কম ; দু'সের মাংসের সঙ্গে মাছ দুধ ভাত সাপটি' নিঃশেষ করে না থামিয়ে হাত ; চিবিয়ে পাঁঠার হাড় করে গুঁড়ো গুঁড়ো... লোকে বলে : “শশধর হ'ল নাকো বুড়ো”।
কিন্তু কথা টিকিল না ; ক্রমে গেল দাঁত ; চর্ব্বণে ঘটিল বিঘ্ন, অস্বস্তি নেহাত্। বার্দ্ধক্যের সে ক্ষতিটা করিতে পুরণ নিতে হ'ল বৈজ্ঞানিক মিথ্যার শরণ ; দু’পাটি সুন্দর দাঁত, ধবল মসৃণ, মুখে নিয়ে শশধর এল একদিন ; বাষট্টি টাকার দাঁত হাসে ঝিক্ মিক্--- কিন্তু মূল কাজটাই হ'ল নাকো ঠিক্। মাড়ি ত' নকল নয়! রক্ত মাংস তার নকল দাঁতেরে নিতে করি' অস্বীকার বাধাইল ল্যাঠা ; মাড়ি কোমল জিনিস--- সেখানে জনমে দ্রুত যন্ত্রণার বিষ ; রাখা যায় একটানা আধ ঘণ্টা জোর, তা'পর অসহ্য হয় যন্ত্রণা প্রখর।--- খুলে রেখে' দাঁত করে আহার্য্য ভক্ষণ... অভ্যাস ক্রমশঃ হ'বে যন্ত্রণাদমন--- আশা করে' থাকে ; কিন্তু, দিন যায়--- টাকার সে-দাঁত তার হ'ল না সহায় ; যন্ত্রণা চলিল বেড়ে'। কিছুদিন পর ‘কাইম্যাক্স’ দিল দেখা অতি ভয়ঙ্কর : একদিন দন্তস্পর্শ সহিল না মাড়ি এক মুহূর্ত্তও ; দাঁত খুলে’ তাড়াতাড়ি আর্ত্তনাদে তোলপাড় করিয়া সংসার শশধর প্রকাশিল যন্ত্রণা তাহার... অতিকায় লোকটার কাতর চীৎকার শুনা'লো ভীষণ, যেন সীমা নাই তার... ছুটিয়া আসিল লোক ; কহিল সকলে : “বিষাক্ত এ দাঁত শীঘ্র ফেলে দাও জলে ; বিষাক্ত পদার্থ দিয়া নির্ম্মিত এ-দাঁত দিয়েছে তোমারে, ইহা কহিনু নির্ঘাত্ ; হাজার হাজার লোক লাগাইয়া দাঁত হাসিতেছে দিব্য---নাই কোনোই উৎপাত ! উল্টো কাণ্ড কেন হবে তোমার বেলায়, দুনিয়া আঁধার দেখা দাঁতের জ্বালায় ! যাও তুমি কলিকাতা ; দন্তচিকিৎসকে--- ধাপ্পাবাজ সেই চোরে, ধূর্ত প্রবঞ্চকে, শিক্ষা দিয়ে এস’। উহা শুনি শশধর উপরন্তু অর্থশোকে বকিল বিস্তর... ব্যাগে নিয়ে দাঁত. আর দুধ খেয়ে খালি, ক্ষুধার উত্তাপে স্ত্রীকে দিয়ে গালাগালি গেল চলে'। . . .সেখানে সে পাবে কি না ত্রাণ করিল দেশের লেক বহু অনুমান।
কি কহিল চিকিংসকে, কি পেলে উত্তর, জানি না বিশেষ ; তবে এসে শশধর যা’ কহিল তাহা শুনি’ শত্রুমিত্রগণ, নর আর নারী হ'ল বিস্ময়ে মগন। হাসি' হাসি' শশধর কহিল খবর : “আমার অদৃষ্ট দেখি তেজালো জবর ! যা’ কখনো শুনি নাই করিনি কল্পনা ডাক্তারের মুখে সদ্য তা ই গেল শোনা ! আমার নকল দাঁত বিষাক্ত ত'নয়। ডাক্তার কহিল দেখে, "শুনুন্, ম'শয়, বাঁচিনা অজ্ঞের এই ঘৃণ্য অবিচারে--- বেচিনা বিষাক্ত দাঁত, তুলে' দি' তাহারে। বেদে' কি সাপুড়ে' নই, জানিনে ম্যাজিক্, দাঁতের ব্যাপার মহা কাণ্ড বৈজ্ঞানিক--- চালাকি কি ফাঁকি নাই, পড়ে’ শুনে’ শেখা ; দেহের রহস্য আজো বিস্তর অদেখা মানুষের ; আপনার আরও অজানা--- ক্রোধ প্রকাশিতে আমি করিতেছি মানা।
দাতের কসুর নাই। অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিতেছে ধীরে ধীরে হোথা আপনার ; হেন অসাধরণত্ব দেখা গেছে কম--- হইতেছে আপনার নবদস্তোদ্গম'... ডাক্তারের কথাগুলি কহি' শশধর উদগম-আনন্দভরে হাসিল বিস্তর। শুনি' কথা শশব্যস্তে লাফাইয়া উঠি’ 'দেখি' 'দেখি' রব তুলি' এল লোক ছুটি'... উংৎসুকে নিরস্ত করি' বৃদ্ধ শশধর সুখভরে পুনরায় হাসিল বিস্তর--- কহিল : ‘দেয়নি’ দেখা, আসেনি' বাহিরে, আসিছে দাঁতের সারি অতি ধীরে ধীরে ; সময়ে দেখিতে পা'বে, দেখাইব ডেকে'--- দিবস গণিতে থাকো সবে আজ থেকে।
হাসিল সে বটে ; কিন্তু দুই চার দিন না যেতেই হ'ল তার হাসাও কঠিন। শৈশবে যখন ওঠে দুধের সে দাঁত শিশুরা অসুস্থ হয়, কাঁদে দিনরাত। বিধাতার নিয়মটি বুঝি নাকো মোটে--- দাঁত কেন অনিবার্য্য ব্যথা দিয়ে ওঠে! মা ষষ্ঠীর শিশু পায় অল্পেই রেহাই ; কিন্তু যদি বুড়োকালে দাঁত ওঠে, ভাই, সে কি কাণ্ড ঘটে ! তার পোক্ত ঝুনো মাড়ি ক্রমাগত ঠেলে’, সেই দুর্ভেদ্যে বিদারি', পর পর এলে দাঁত কি কঠিন হয় সে যন্ত্রণা ! পরিমাণ বলিবার নয়। অন্তর্হিত হ'ল তার উদগম উল্লাস--- দৌড়াইল শশধর গলে নিতে ফাঁস ; চীৎকারে দাপটে যেন ক্রুদ্ধ ব্যোমকেশ, নিকটে ঘেঁষে না কেহ---করে’ দেবে শেষ ! যে কথা সে জানে বলে' কেহ জনিত না সেই কথা তার মুখে গেল বহু শোনা--- সে কথা আসিলে কানে খাডা হয় চুল ; ভগবানে করিল সে সবংশে নির্ম্মূল গা'ল দিয়া দিয়া। . . . তার পত্নী পতিব্রতা কাঁদিয়া আকুল হ'ল শুনি' বিশ্রী কথা।
সে যা’ হোক্, বহু কষ্ট দিয়া ক্রমে ক্রমে দাঁত ওঠা শেষ হ'ল তিন চার দমে--- উঠে' এল সব ক'টি পাঁচ ছয় মাসে... দেখা’য়ে দু'পাটি দাঁত শশপর হাসে ; সুদৃশ্য সুদৃঢ় দাঁত পূর্ণ আয়তন--- আসল জিনিস, ঠিক্ আগের মতন ; প্রকৃতির এ খেয়াল হ'ল জানাজানি--- লোকে তা' দেখিতে এল ; অনেক বাখানি’ কাগজে বেরলো বার্তা ; ছবি হ'ল ছাপা ; গৌরবে উদ্গম-স্মৃতি পড়ে' গেল চাপা।
যদি করি প্রকৃতির উদ্দেশ্য নির্ণয় দেখা যাবে, দাঁত যায় হিতার্থে নিশ্চয় ; ষে শিশু মায়ের বুকে করে স্তন্যপান--- দেন্ নাই দাঁত কিন্তু তারে ভগবান্, কারণ, দাঁতের তার নাহি প্রয়োজন--- সে শুধু চুষিয়া খায়, করে না চর্বণ। ঘুরিছে নিয়মচক্র অব্যর্থ গতিতে--- ব্যতিক্রম ঘটে যদি হবে দণ্ড নিতে। দুধ ছেড়ে’ যা’ খায় তা’ ক্ষুদ্র দাঁতে চলে... কঠিন কঠিন বস্তু পিষিয়া সবলে থেতে হ’বে বলে’ ওঠে আরো শক্ত দাঁত...
তারপর বৃদ্ধকালে ঘটে দন্তপাত--- আর তা’ ওঠে না ; তার উদ্দেশ্য ইহাই : চব্ব্য ছেড়ে’ লেহ্য পেয় খেয়ে থাকো, ভাই ; সহজে হজম হবে, সুস্থ রবে দেহ--- নিয়ম লঙ্ঘন কভু করো যদি কেহ শাস্তি পাবে হাতে হাতে। কিন্তু শশধর ভুলে’ গেল, পায়নি’ সে নূতন উদর ; দাঁতই নূতন ; কিন্তু অতি পুরাতন যন্ত্রপাতি, যারা করে শরীরে পোষণ ; ভুলে’ গেল, এ কালে যা’ না-থাকা নিয়ম--- পেয়ে তাহা বিধির সে মহা ব্যতিক্রম... লেগে গেল দাঁতের সে শক্তি পরীক্ষায়--- নির্বিচারে শক্ত, বস্তু বেছে' বেছে' খায় চিবায়ে পাঁঠার হাড় গুঁড়ো করি' গেলে ; বলে, “খেতে পারি আমি হাতী মোষ পেলে” মানে না নিষেধ কারো---নিষেধ করিলে চটে গিয়ে যা’ তা’ বলে ঢোক গিলে’ গিলে’
কিন্তু যেথা ঘুরিতেছে নিয়মের চাকা সেখানে চলে না কভু জিদ্ ধরে’ থাকা তাহার বিরুদ্ধে ; কিন্তু হুঁশ তার কম--- ফুরাইল একদিন উত্তেজনা, দম্ ; উদরে হ'ল না সহ্য, হ'ল আমাশয় ; তিনদিনে শশ যেন সে-মানুষ নয়--- এমনি চেহারা হ'ল ; সে-দেহ বিরাট নিল শয্যা ; শুকাইয়া হয়ে গেল কাঠ... তারপর একদিন যবনিকাপাত--- কহিল সকলে : “শশ নিয়ে গেল দাঁত ; দাঁত তারে নিয়ে গেল। হিত ও অহিত কিসে বটে, সে-বিচার করাই বিহিত।” . **************** . সূচীতে . . .
বিষাক্ত বন্দর কবি জগদীশ গুপ্ত কবিতাটি বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৯৫৪ সালের “শারদীয়া যুগান্তর” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
রূপসী কন্যার পিতা মাধব বিশ্বাস ফেলিতেছে ক্ষণে ক্ষণে গভীর নিঃশ্বাস ; সর্বান্তঃকরণ তার ভাবনাকাতর...... কি করি কোথায় যাই কোথা বাঁধি ঘর আবার নূতন করি ঘুরে' ঘুরে’ ঘুরে’ বন্ধন বেষ্টন হতে দূরে, বহু দুরে ; আপন ইচ্ছায় ধরা ছুঁড়ে দেছে তারে--- আবার সে দিতে চায় ঠেলে অন্ধকারে--- একবার হোয়েছিল মনে ঠিক তার...... অচ্ছেদ্য বন্ধন মাঝে প্রতিষ্ঠা আবার লভেছে সে, কিন্তু তাহা সত্য নহে নহে--- মৃত্তিকায় বসে নাই, পড়িয়াছে দহে। তুলনা আপনি এল ; মনে হোলো তার কর্মে মর্মে এক বস্তু এপার ওপার ; কোথাও পার্থক্য নাই ---কোনো ভেদ নাই, কেবল এ দেয় বলি, ও করে জবাই। একদিন ছিল বাস পদ্মার ওপার--- ছিল শান্তি স্বচ্ছলতা সজীবতা তার, অতর্কিতে রক্তচক্ষু অনেক মানুষ করে দিল দিশেহারা আতঙ্কে বেহুঁশ--- করিল না হত্যা তবে যত অপমান করিল তা দুর্বিষহ মৃত্যুর সমান--- দলবদ্ধ হয়ে এল ঘরে গেল ঢুকে--- লুণ্ঠন করিল বস্তু তাল ঠুকে ঠুকে ; কহিল ভুলিয়া যাও, হিন্দুর সন্তান, হিন্দু তুমি --- আজ হতে অ-মুসলমান..... বলিতে বলিতে এক নবীন যুবক কবিল সুন্দরী স্ত্রীর স্বামী ও সেবক হই আমি ভারি ইচ্ছা। বলে মেয়েটার হাত ধরে টেনে নিল খুব কাছে তার... নুরুন্নেছা বিবি নাম, ভারি মিষ্ট নাম--- আমি ভালবেসে সেই নাম রাখিলাম ; যাবে না আমার ঘরে? রাখিব আদরে--- ভাল সজ্জা, ভাল খাদ্য পাবে মোর ঘরে... বলিয়া যুবক তার কাঁধে রাখি হাত হাসিতে লাগিল খুব ঘাড় করি কাত।
আতঙ্ক পাণ্ডুর মুখে কাঁপি থর থর লটায়ে পড়িল কন্যা মাটির উপর... যেড়শী রূপসী কন্যা মৃতের মতন রহিল অসাড় হয়ে। হাসি বিলক্ষণ কহিল দ্বিতীয় ব্যক্তি... সবুর সবুর--- যাচিয়া আসিবে কাছে নহে বহুদূর সেইদিন। উপোষের তৃতীয় দিবসে আসিবে ভাতের লাগি আমাদেরি বশে। বলে তারা চলে গেল পরম উল্লাসে করিয়া আনন্দধ্বনি কৃত সর্বনাশে মাধব পাললো রাত্রে লয়ে পরিবার মাটির নীচেয় বিত্ত যাহা ছিল তার, আঁধার জঙ্গল কাঁটা পার হ'য়ে হ’য়ে আকণ্ঠ শুকায়ে ধরা পড়িবার ভয়ে আসিল আশ্রয়ে, এক অ-মুসলমান হলেন একটা দিন তাহাদের স্থান। তারপর আসিল সে মনুষ্য সমাজে--- মহানগরীর পথে প্রজারণ্য মাঝে। বহুকষ্টে পেয়ে গেল কারিয়া সন্ধান উদ্বাস্তু পল্লীতে পেল চারকাঠা স্থান--- কুটীর নির্মাণ করি বসিল মাধব--- খরচ কুলাতে গেল সোনা প্রায় সব ; স্থানটা লাগিল ভাল-অজস্র কুটীরে বৃহৎ পল্লীটা গড়ি উঠিতেছে ধীরে...... নিশ্চিন্ত হইল মন---গঠিত আশ্রয় যত ক্ষুদ্র হোক তাহা ভাঙ্গিবার নয়---
চিরদিন থাকা যাবে নিশ্চিন্ত নির্ভয়ে--- পলি চাপা পল দুঃখ যত দঃখদয়ে--- ছাড়িয়া এসেছে দেশ, অপমান তার আর না জাগাবে প্রাণে ত্রাস হাহাকার। আর কেহ বলিবে না, ওহে তুমি ওঠো--- তল্পি ঘাড়ে লয়ে পথে পগব্রজে ছোট। মুক্ত বায়ু, মুক্ত আলো করিয়া সেবন প্রাণশক্তি বেড়ে যাবে পাব সঞ্জীবন ; প্রতিবেশী সহ রাখি অটুট সদ্ভাব চলিতে হইবে নিত্য ; মনুষ্য স্বভাব বিচিত্র নিশ্চয় ; হবে_সবাই দরদী সহিষ্ণু শুভানুধ্যায়ী, সদা নিরবধি আশা তা যায়না করা ; তবু ভালবেসে টানিতেই হবে কাছে ভদ্রভাবে হেসে। ছাগল খাইযে গাছ, গরুর উৎপাত সহিয়া যাইতে হবে মা তুলিয়া হাত... ছয়মাস পরে এল দোলের উৎসব, চঞ্চল হইল পল্লী---মহা কলরব--- হুলিয়া হইল শুরু খেলা ছোটদের--- রং নিয়ে পথে ঘরে ছড়াছড়ি ঢের ; বড়রা আবীর নিয়ে আসিল বাহিরে--- গাহিল কৃষ্ণের গান গলা চিরে চিরে ; সেবিল পুরুষোত্তমে ওই পদ্ধতিতে বর বার সাধ যেন চাহে না মিটিতে। কুকাজ নহে তো এটা---দুরন্ত আকারে শাশ্বত সুখের ব্যপ্তি আঁধারে আঁধারে। উৎসব জমিল ভারি মোটের উপর।--- আনন্দ ইয়ত্তাহীন রসালো জবর, মনে মনে যোগদান করিল মাধব--- নীরবে করিল দোল দেবতার স্তব... হে কৃষ্ণ করুণাময়, পায়ে রেখো দাসে--- দিন যেন যায় প্রভু আরামে বিশ্বাসে ; যেন কেউ আসে নাকো দিতে দাগা ব্যথা, ভুলে যেন যেতে পারি অতীতের কথা ; হলেও নগণ্য আর অ-মুসলমান থাকে যেন আপনার স্ত্রী কন্যার মান। জগৎ রক্ষক তুমি, আমার জগং দেয় যেন মোরে সুষ্ঠু বাঁচিবার পথ--- বজায় থাকিতে চাই, রাখ হে বজায়--- বুকে কর অবস্থান---প্রণাম তোমায়। পরম পুরুষে করি এইরূপ স্তব থলে নিয়ে চলে গেল বাজারে মাধব। হৃষ্টচিত্তে তুষ্ট করি বালকে যুবকে নানাবিধ রঙ লয়ে আপাদ মস্তকে, ভিজায়ে কাপড় জামা সর্ব অবয়ব ফিরিল বাজার লয়ে প্রসন্ন মাধব। চারিদিকে দোললীলা অপূর্ব রঙিন--- আজ কি আনন্দ, আজ ভারি শুভদিন! চারিদিকে কি আনন্দ কত না উৎসাহ, কারো মনে নাই যেন কাতরতা দাহ ! এমনি কোমল আর সুখী স্নিগ্ধ মনে প্রবেশি কুটীরে তার পড়িল নয়নে শোকেরি মূর্তিটা যেন দেখিল মাধব, দেখিল করিল সারা প্রাণে অনুভব... স্ত্রী কন্যা শোকাভিভূতা, সজল নয়ন--- রয়েছে বাসিয়া যেন নাহিকো চেতন--- সারা অঙ্গে রঙ ঢালা পত্নী কমলার--- জলো রঙে ভিজে গেছে সম্মুখটা তার। কন্যাটির মুখখানা রঞ্জিত আবীরে--- ভেসে গেছে গণ্ডযুগ নয়নের নীরে। মাধব অধাক হোলো---মনে হোলো তার... এই কাণ্ড করে গেছে মেয়েরা পাড়ার--- পাড়ার আমোদপ্রিয় কন্যা ও বধুরা ঢেলে দিয়ে গেছে রং জলীয় গুঁড়া--- দুখের কি আছে তা’তে! দোলের এদিন রং না থাকিলে দেহ দেখায় শ্রীহীন ; কাপড় হয়েছে মাটী---ক্ষতি সেটা নয় এমন কিছু যে চক্ষু হবে জলময়। কহিল... বলতো এই কান্না এল কিসে--- নির্জীব নিস্তেজ যেন জর্জরিত বিষে। এসেছিল বুঝি ঢের প্রতিবেশী মেয়ে, রং ঢেলে কাপড়ের মাথা দেছে খেয়ে... মুছিয়া চোখের জল কহিল কমলা... না, তা' নয়, সব কথা যাবে নাকো বলা--- তুমিতো ছিলে না ঘরে দেখনি ব্যাপার শুনে তুমি বুঝিবে না একাংশও তার ; এখানে ছিলাম বসে, ঈশানী উঠনে অদূরে দাঁড়ায়ে ছিল আপনার মনে--- সহসা ছুটিয়া এল জন দশ বার পাড়ার যুবক---হাতে পিচকারী কারো, কারো হাতে থলে ভরা আবীর প্রচুর--- টলিতেছে সারা দেহ ঢঙে ভরপুর ; বহালো আমার গায়ে রঙের প্লাবন বালতি উপুড় করি ষণ্ডা তিনজন ছুটে গেল সঙ্গে সঙ্গে ঈশানীর পানে--- ঈশানী দাঁড়িয়ে ছিল কাছেই উঠানে আতঙ্কে পাণ্ডুর হয়ে, হয়ে জড়সড় তিনজন মিলে তারে শাস্তি দিল বড়। বুঝাতে পারব নাকো, বুঝিবেও কম, সেই ক্ষিপ্ত পৈশাচিক প্রচণ্ড উদ্যম গাত্র স্পর্শ করিবার---তাদের একটি বাঁ হাতে বেড়িয়া ধরি ঈশানীর কটি কাছে টেনে নিল তারে---মাংসাশী কুকুর যেমন লোলুপ হয়ে ক্ষুধা করে দূর ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খেয়ে তেমনি করিয়া আবীর মাখালো তারে---কপাল ভরিয়া দিল, দিল দুই গালে, চিবুকে ও কানে--- দুহাতে বুলায়ে দিল আরও নানা স্থানে, সারাটি মাথায় পিঠে। তারপর তারা চলে গেল, রহিলাম হয়ে বাক্যহারা--- ঘটনা ঘটিয়া গেল একটি নিমেষে--- শ্যেন বেগে চলে গেল, শ্যেন বেগে এসে।
এর আগে এসেছিল চিঠি একখানি : “বড় ভালবাস তোরে সুন্দরী ঈশানী,” লেখাপড়া শিখি নাই ভবঘুরে আমি, তথাপি হইতে চাই তোর প্রিয় স্বামী ; জাতিতে নিকৃষ্ট মত লাঙল বাহক, তবুও রমণী রত্ন পেতে ভারি শখ, মা বলে ; সরে যা, সর ; মর জোড়া ঢেঁকী বাবা বলে, দাঁড়াও তো জুতো মেরে দেখি আক্কেল গজায় কিনা, পায় কিনা থই কুঁড়োমির, বজ্জাতির ওষুধ জুতোই। তবু আছি আরামেতে রাখিব আরামে, সোনাটা লক্ষ্মীটী আয়, বসে পড় বামে। আশা করি গুপ্তভাবে দেখা তোর পাব--- নাম নাই লেখা আছে শুধু একটা---“ব”॥ . **************** . সূচীতে . . .