কবি ডঃ কৌশিক ঘোষের কবিতা
*
একটা কবিতা লেখ
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “পায়রা কবি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

আমাকে কেউ একটা কবিতা লিখতে
বললেই আমি একটা ম্যাচিস
চেয়ে বসি। কারণ আমার ডানহাতটা
সোজা আমার পাঞ্জাবির ডানপকেটে
সুশীল বিড়ির তাড়ায় গিয়ে ঠেকে।

কেউ আমার কাছে একটু
আগুন চাইলেই আমি আগে অ্যাসট্রেটা
এগিয়ে দিই।
.        কখনওসখনও
অলৌকিকতা আমাকে ঘুম থেকে তোলে,
মশারি থেকে ঠেলে বের করে ---
ফিউজকাটা বাল্বটা জ্বালবার ব্যর্থ চেষ্টা
করার পর কামরূপ এক্সপ্রেস নবদ্বীপ
ঢোকার শব্দ শুনতে শুনতে ডাক্তারি
চেম্বারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কবিতার
আলোটা জ্বেলে লিখতে
বসি বা বসতে বাধ্য হই ---
.                আমার শোবার ঘরে
কবিতার প্রবেশ নিষেধ।
আমার বসবার ঘরে পঞ্চাশটা চ্যানেল
হটলাইন ওয়েবসাইট খোলা ---
আমার চেম্বারে সকাল থেকে সন্ধে ---
সরকারি ও বেসরকারি কারণে আইনত
বা বেআইনি অনেক লোকের আনাগোনা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পায়রা কবি
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “পায়রা কবি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

কবিতা পায়রা হয়ে বসেছে মাথায়।
প্রান্তিকের পালিত কেশে নিঝুম দুপুর।
এখন কি আমি ছাতিমতলায়
গণ্ডুষে পান করব মহুয়ার রস।

লক্ষণ গন্ডী কেটে শ্যাম চলে গেছে ---
মানুষ তো চলে যায়ই দাগ কেটে যায়
দাগের ভেতরে কেউ বসে বসে আঁকে
বুড়ো বট, ভিজে মেয়ে, পুকুরের হাঁস
মেয়েরা ঢেউও হয় ইচ্ছে হলেই।
কোনো মেয়ে হাঁস হয়ে জলে দেয় ডুব।
গন্ডী পেরিয়ে কেউ রাবণের রথে
স্বেচ্ছায় চড়ে বসে ভায়াগ্রাকে ছেড়ে

কবিতা পায়রা হয়ে বসেছে মাথায়
শব্দেরা শতাব্দীর ছন্দ খুঁজে মরে
দুলে দুলে পড়ে সাঁঝে সহজপাঠ
সহজপাঠের ভিতর কেবল চ্যানেল
রিমোট স্পর্শ করে কালো ইতিহাস।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হিংস্র উষ্ণতা
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “পায়রা কবি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

কখনো কখনো বস্তুর তাপমাত্রা বাড়ে।
ক্রমে আন্তঃআণবিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।
তখন অজগাঁয়ের হালকা সবুজ মেঠো
হাওয়ায় ভেসে আসে কলকারখানার
লালিত্য কাঠিন্যে পরিণত হয়।
.                        ক্রমবর্ধমান
উত্তাপেই কোনো কোনো চিতাবাঘ চিড়িয়াখানায়
বন্দি হয়। আর চিড়িয়াখানা বন্দি হয়
টিকিট কাউন্টারের মতো শিশুকারাগারে।
.        উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রাণীদের গোপন
অঙ্গও শৈথিল্য হারায়। হায়নার মতো
গ্রীষ্মে হাপায় --- ঝরে পড়ে কুকুরের
লালার মতন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আর্সেনিক প্রকল্প
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “আর্সেনিক প্রকল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

মাননীয় স্বাস্থমন্ত্রী মহোদয়,
আর্সেনিক প্রকল্প চালু করতে
কোটি কোটি টাকা অর্থব্যয়
করার কোনো প্রয়োজন নেই।
চোখেরজলব্যাঙ্ক করুন ---
চোখের জলে দুঃখ থাকে, অভিনয় ছলনা
থাকে --- আনন্দ উচ্ছ্বাস থাকে
.        ঊর্ধ্বপাতন প্রক্রিয়ায় ওদেরকে
পৃথক করা যদি যায় তাহলে ভালো
নইলে আপনি দুঃখসৃষ্টির পরিকল্পনা
নিন --- দুঃখ --- হ্যাঁ তারজন্য আসবে
আপনার কিছু পোষা গুণ্ডা।
তারা? অজস্র খুন, ধর্ষণ বা
রাহাজানি করবে --- মাসিক
মাসোহারাও থাকবে বরাদ্দ তাদের জন্য
সর্বহারাদের দল তখন ঝরঝর
করে কাঁদবে। সেই অশ্রু
একফোঁটা একফোঁটা করে জমবে
.        এর বোতলে বোতলে।
চোখের জলে আর্সেনিক নেই ---
এই তথ্য পেশ করলাম ---
বিশেষ সংবাদদাতা আরো জানাচ্ছে
আর্সেনিকের ছোবল খাওয়া
মানুষের অশ্রবিন্দুগুলো আরো
আর্সেনিকমুক্ত --- যন্ত্রণায় মৃত্যুর
দিন গোনে এরা --- এদের
কান্না রাজনীতি নয়
.        অভিমানও নয়
বিষাক্ত ক্ষতের যন্ত্রণায় ওরা জল
ফেলে যায় টপটপ করে
.        মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আসুন বেরিয়ে পড়ি --- সাগ্রহ
অভিমানে --- তারপরে অ্যাকোয়াগার্ডে
পুরে সেই জল পান করে আমরা
বলব আর্সেনিক --- সাবধান
.        এবার বিজয়পতাকা ওড়াব
.                        আমরাই
সামনেই বিধানসভায় নির্বাচন
আমাদের সংগ্রাম মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিরুদ্ধে
ধর্ষণকারী যুগ যুগ জিও
খুনি তোমায় লালসেলাম ---
আকাশে মেঘ করেছে ---
.        বাতাসে জীবাণুযুদ্ধ চলছে ---
.        মাটিতে আমরা পদাতিক বাহিনী
.        হাতে হাজার হাজার
.        বোতল নিয়ে সংগ্রহ করেছি শুধু
.        নেত্রবারি --- আর্সেনিকমুক্ত পানীয়
.        আবার আসব ফিরে আর্সেনিক মুক্ত
.        জল খাইয়ে --- বিধানসভায়
.        যেমন এসেছি আগে বারবার ---

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একক দশক শতক
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “আর্সেনিক প্রকল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

আমি এককের ঘরে বসলাম।
দশকের ঘরে বসল একটা পাখি।
পাখিটার ঠোঁটে পারলৌকিক যাজ্ঞিক ক্রিয়ার বটের গুটি।
শতকের ঘরে একজন প্রাজ্ঞ পুরোহিত। কয়েকটি বৈদিকমন্ত্রের আলপনা
আর অপরিণত কিশোর কবির বাতুলতা মাখানো রুটি।
এই মুহূর্তে পাখিটা মধ্যযুগীয় ছেঁড়া পর্দা ঝোলানো
একটা জানালায় --- একটা কিশোরীর মুখ দেখতে পেল
পাখিটা বটের গুটি ফেলে ওই পর্দার দিকে এগিয়ে গেল।
দশকের ঘরে শূন্যতাসূচক ঘণ্টাটি শতকের পুরোহিতই বাজাল।
অমনি চতুষ্পাঠীর একদল উচ্ছৃঙ্খল ছেলে যারা গুরুমশাইয়ের
বেতের সামনে দুলে দুলে এতক্ষণ ভাগবত নামতা পড়ছিল--- তারা
ভোঁকাট্টা ঘুড়ির মতো গোঁত্তা মেরে এসে পড়ল দশকের ঘরে।
দশকের শূন্যটা বেলুনের মতো ফটাস করে ফেটে গেল।
এইবার শতকের বুকের ছবিতে ধরা পড়ল যক্ষারোগের
মানচিত্র। শতক সরকারি টিবি ওষুধের অনিয়মিত
সরবরাহ এবং হাসপাতালের কম্পাউন্ডারের ইথামবিউটল
বা রিফামপিসিন অর্ধেক দামে বিক্রি করার শিকার
হল। কম্পাউন্ডারের ছোটো মেয়েটির পঞ্চাশ টাকা দিয়ে
হ্যান্ডিক্যাপ কোটায় --- প্রাইমারি শিক্ষকের সঙ্গে এক লক্ষ
টাকা দিয়ে বিয়ে হল। শতকের মৃত্যু হল। কিন্তু সে
কাশতে কাশতে ছড়িয়ে দিল যক্ষার জীবাণু বাতাসে।
দশকের ছাত্ররা আক্রান্ত হল। আক্রান্ত হলাম এককের
ফুসফুস নিয়ে আমিও।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্পর্শক
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “আর্সেনিক প্রকল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

স্পর্শকাতরতাহীন স্পর্শক
আমাকে একটা নিখুঁত নিপাট জীবনালেখ্য শুনিয়েছিল।
বৃত্তের পরিধির একটিমাত্র বিন্দুকে স্পর্শ করার অধিকার
নিয়ে সে
.        তির ছুঁড়ে দিয়েছিল অভিমন্যুর মতো
.        কিন্তু পারেনি
কেন্দ্রকে ব্যারিকেড করে রেখেছিল
.        একটা চক্রব্যূহ।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও কেন্দ্রকে মনে হয়েছিল
.        দুর্ভেদ্য নয়।
স্পর্শকের শাণিত তির বুকে বিঁধতে পারে অনায়াসেই।
আর তাহলেই স্পর্শক হয়ে পড়বে কামাতুর ---
একাধিক ধর্মের মধ্যে “অস্পৃশ্যতা” শব্দটি
শূন্য রানে প্যাভেলিয়ানে ফেরা --- হাঁসটির মতো
প্যাঁক প্যাঁক করে উঠবে।
.                বৃত্তের এ পাশের পরিধিটা
গান্ডীব রামধনুর মতো করবে প্রিজমের বিচ্ছুরণ
আর স্পর্শক আদালতের বিনা এফিডেবিটেই
নাম বদলে ফেলবে।
.                “জ্যা”-এর এ-পাশটায় তখন
সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মি ---
.                শূন্যে ভাসমান অজস্র জলকণার উপর ---

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
টেলিফোন
কবি ডঃ কৌশিক ঘোষ
কবির “আর্সেনিক প্রকল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

প্রত্যেকের জীবনে হৃৎপিণ্ডে একটা
টেলিফোন আছে। প্রত্যেকের Lock No.ও
একান্ত গোপন। দূর থেকে ডায়াল
করলে সেই হৃদয়টাই শুধু শুনতে
পায়, সে যার হৃৎযন্ত্র। এই
“দূরভাষ” যন্ত্রটিকে 'হৃদভাষ' আখ্যাও
দেওয়া যায়। কোনো
ডাইরেকটরিও নেই। মানুষ মানেই কবি নয়।
স্বপ্ন মানেই কবিতা নয়। তবু প্রত্যেকের
কিছু কিছু নম্বর থাকে মনে।
যেগুলো দিয়ে রিচ হয়
আরেকজনের হৎযন্ত্রে --- সেও কেঁপে ওঠে।
পরিচিত কণ্ঠস্বরে। গভীর রাত্রিতে
বা হতাশায় --- অন্ধকার গুহায়
প্রবেশ করতে করতে কানের
পাশে ঠেকানো সন্ত্রাসবাদীর
রিভলভারের শব্দে হৃদভাষের ডিজিটগুলো
কাজ করে --- কথা হয় ---
অনেক কথা অনেক --- কেউ শুনতে পায় না
.                        একমাত্র সেই ---

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুই সূর্য
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

প্রাতে পূর্ব নভে রবি আঁকে প্রভা দীপ্ত ছবি
ধরণী আলোয় ভরে যায়,
অন্য ভাণু জ্ঞানাকাশে বিশ্বকবি রূপে হাসে
কাব্য গীতি নাট্যে শোভা পায়।

চিত্রাঙ্গদা গীতাঞ্জলি চিত্রা মানসী চৈতালী
গল্পগুচ্ছ সঞ্চয়িতা লেখে,
অন্য ভাণু নীলাম্বরে আলো ঝলমল করে
এই ধরা হাসে জ্যোতি মেখে।

পঁচিশে বৈশাখ আসে শুভ জন্ম লগ্নে হাসে
প্রাণের ঠাকুর বিশ্বকবি,
সারদা সুন্দরী কোলে সৃজনী প্রতিভা দোলে
কাব্য নাট্য গল্প গানে রবি।

কবি পত্নী মৃণালিনী দেহ ত্যজি যান তিনি
পুত্র কন্যা মহালোকে যায়,
বিষাদ নীরব মনে ব্যথা বুকে কাব্য রণে
রবীন্দ্র প্রতিভা তরী বায়।

বাইশে শ্রাবণ সাঁঝে মহাপ্রয়াণের মাঝে
কাব্য ভাণু অস্তমিত হয়,
নোবেল বিজয়ী কবি গানে কাব্যে পুণ্য ছবি
নভে রবি গাহে তাঁর জয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বপ্নের শাপলা
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

লাল সাদা সব শাপলা ফুলে
খোকার স্বপ্ন আঁকা,
ভর্তি বিলে দেখেই খোকার
যায় কি ঘরে থাকা।

ভাসায় ভেলা সাধ হয় মেলা
রঙিন শাপলা তুলে,
খোকার খুশির হৃদয় আজকে
দোলে শাপলা ফুলে।

বন্ধু সাথে ভাসছে বিলে
লগি হাতে নিয়ে,
শাপলা তুলে ভেলায় ভরে
খুশি ভরা হিয়ে।

গান গেয়ে যায় শরৎ হাওয়ায়
স্বপ্ন জাগে ফুলে,
শাপলা ভরা নাও ভেসে যায়
কল্প বিলে দুলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শুনুন না!
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

শুনছেন??
ঘন্টা পড়ে গেছে ঠিকই
খাতাটা কেড়ে নেবেন না প্লীজ
একটু সময় দিলে খুব কী ক্ষতি হবে
একটা স্ট্যাঞ্জা বাকি।
মেয়েটির বাবার যে অনেক দেনা বাকি।
চাকরি পেতেও তো পারে।
টাকা নেই, মামা দাদা বা সংরক্ষণ নেই
রাজনীতি ও করতে পারে না।
পরীক্ষা তো ওর কাছে অগ্নিপরীক্ষার মতই...
এর পরে ইন্টারভিউয়ে না হয় কোন ছুতায় বাদ দেবেন!
তবু সামান্য সময় দিলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে?
লিখুক না মন ভরে।
একটুখানি আশায় বাঁচুক কিছু দিন...
আপনিও তো একজন মেয়ের বাবা...
ভাবুন তো এই দুর্ভাগা বেকারের দেশে এই মেয়েটির বাবা
টোটো চালিয়ে ক' টাকা পায়?
আপনার ছোট্ট মেয়েটি যদি একটা পুতুল চাই?
দেবেন না?
কেড়ে নেবেন ওর সব স্বপ্ন?
একটু সময় পুতুল আশার মুখের হাসি?
খাতাটা কেড়ে নেবেন না..

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর