কবি ডঃ কৌশিক ঘোষের কবিতা
*
ফটিকের ছুটি
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ
শান্তিনিকেতন, বোলপুর। কবির “পায়রা কবি” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

অমাবস্যার রাত্রি কে গ্রীষ্মের দাবদাহে দ্বিপ্রহর দিয়ে গুণ করলে যে গোধূলি লগ্ন পাওয়া
যেতে পারে তা অংকের গুরুমশাই তাকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না।
রবীন্দ্রনাথের ফটিক চরিত্রও তাই মায়ের কাছে যাবার সুযোগ পেলো না গ্রীষ্মের ছুটিতে।
কারণ মামার বাড়ির যাবতীয় কার্যকলাপ যেমন, হাটবাজার করা, রান্নার সময় মসলা
বাটা, মামাতো ভাই বোনদের ফাইফরমাইস খাটা, কখনো কাজের মেয়ে না এলে ঘর মোছা,
বাসন ধোয়া ইত্যাদি..... করার জন্য মামীর আদেশে বাড়ি যাবার ছুটি হলো না।
একথা মামার জানাই ছিল না।
একদিন রাতে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে বেরিয়ে পরলো হিউ এন সাং এর মত চীন থেকে
ভারতবর্ষে উদ্দেশ্যে....
মায়ের কাছে যাবার আশায়।
ফটিকের মৃত্যুটা আবার অমাবস্যার রাত হলো ওর মামিমা রুদ্র বৈশাখ হয়ে হলো ছুটির
গুণ্য। ফল বের করতে গিয়ে মাখন মানে ফটিকের ভাই ভাবল দাদার কথা, "মা আমার
ছুটি হয়েছে এবার আমি বাড়ি যাচ্ছি!”
একটু পরে তিনি সন্ধের আধো আঁধারে ওদের মায়ের চোখে চিকচিক করে উঠলো জল।
মিটমিটে তারার মত।
এছাড়া আকাশে কোন সংখ্যায় ছিল না। ছিল শুধু শূন্যতা আর ফটিকের চিরন্তন ছুটি....

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সময় এসেছে কবি
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

নিস্তব্ধ নির্বাক কবিতারা খাক স্লেট পেন্সিল খাতা
এখনো আসেনি অনুভূতি ঝড় প্রলয় নৃত্য করে
অনেক তো হলো নগরে ছুটছে রাজপথে অজগর
কঙ্কালসার পচা লাশ গুলো কখন উঠবে চিতায়।

ভাবনার আগুন জ্বলবে যেদিন সেদিন আঁধার রাতে
মাৎস্যনায়ের জিভের তলায় সায়ানাইডের স্তুপ
বলগা হরিণ শিকার করতে সাবধানে পা ফেলো
কে বলেছে ভাই ভঙ্গিল পর্বত বিরিয়ানি খায় নাকো?

লোপাট করেছে সকল প্রমাণ তেজস্ক্রিয় হিরোশিমা
আদালত গেলে শুধু দেখি ড্রোনেরাই জাজ বেশে
মিশরে সকল পিড়ামিড কবে ভাঙা হবে কে জানে?
তোমার আমার কালো সাহিত্য কাকের পালক পরে,

লুন্ঠিত হয় ময়ূর পেখম মিউজিয়ামের কাঁচে
সাঁঝ নেমে আসে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বুকে
অগণিত ওই অভুক্ত মিছিলে ডিনামাইডের ছবি
এখন কি তুমি লিখবে কবিতা সময় এসেছে কবি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ আর হলো না
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

এই শোনো.....
একদিন সবকিছু উজাড় করে দিতে হবে__
কোন নিভৃতে বাৎসল্য প্রগলভতা আমার তোমার
এই আরোহণ করা জীবন পাথুরে উঁচু পর্বতের চূড়ায় ওঠার আগেই বক বক করে........
ভেবে দেখো ভেতরের সব প্রেম লাভা স্মৃতির পিরামিড আকৃতির একটুও বিকার নেই...….
আজো এই লোল চর্ম জীর্ণ গালের ত্বকে প্রেমের সমান্তরাল চুম্বন বরাবর গোধূলি বেলার
আভা ছড়িয়ে পড়ে.......
তুমি আমি দুজনেই বার্ধক্যের চোরাবালি-মগ্ন স্বপ্নে দেখি জানি সেই জোনাকি আলো।
স্মৃতিমেদুর বালুকাবেলায় আলিঙ্গনে প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করে যাই... এখনও ফিরে
আসে কলেজ ক্যান্টিন বা দ্বারিকের মিষ্টান্ন ভান্ডারের সব রাবড়ির স্বাদ... তাজা রক্ত
গোলাপ
কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ দুই হৃদয়ে গরম কফির পেয়ালায় ওঠে ধোঁয়া...বই
মেলা ধুলো এলার্জি থাকলে ভালো হতো মনে হয় না তোমার?
বেলাশেষের বাগবাজার ঘাটে শেষ লঞ্চের সাইরেন শুনতে শুনতে বলে যাই---যেতে পারি
আবার আমাদের ছাতিম গাছের তলায় হাতে হাত রেখে অনেক না বলা কথা গুলো
বলতে, ক্ষুধা ভয় অন্ধকার তাড়িত ধূলিধূম্র দিশেহারা বধির আকাশ কি পেরেছে সেই
প্রেমসিন্ধুকের চাবি কেড়ে নিতে?
বার্ধ্যকের ভ্যালেন্টাইন ডে নেই.... শুনলে হাসি পায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত্যুহীন আকাঙ্খা
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

কোন একদিন
অতৃপ্ত হৃদয় ভরে যায় অজস্র না পাওয়ায়
ভালোবাসা স্বপ্ন শৈশবের সেই হারানো ঘুঘু পাখি উড়ে গেলেও
আসে তুফান
চাই চাই চাই রব শুনে পাষাণ হৃদয় হয় তোলপাড়
ধন বৈভব নয়
আকাঙ্খার অন্তরালে কেউ লিখে যায় কল্পলোকের গল্পকথা।
কবিতার রহস্যময় গভীর অনুভূতিতে থমকে আছে মেঘ...
ধবল বক কাব্যিক দাবী নিয়ে জীনের হাত ধরে আবৃত্তি করতে চায় অন্তর গুহায় প্রেমের
কবিতা
আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটে নৈতিকতার ভিত কে নড়িয়ে দিতে সভ্যতার অসভ্য অস্ত্র দিয়ে..
কখনো বা মেঘের ঘোমটা সরিয়ে বিধবা আলো জ্বলে ওঠে .. অশ্রুতে নেভে
আকাশ শঙ্খ বাজায় আকাঙ্খারা ঘুরে ঘুরে বুকে
মহাকাশ যান হতে গিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়
কোন একদিন
অতৃপ্ত আকাঙ্খার আত্মা টাইটানিক জাহাজ হারিয়ে যায়..
তবু আজও কোন আকাঙ্খার মৃত্যু হয় না...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার পূজো
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ
কবির করোনা কালে রচিত কবিতা।

তোমার পূজো প্যান্ডেল ঘুরে নতুন পোশাক পরে
আমার পূজো ইমারজেন্সি ডিউটি করা ঘরে।
আমার পূজো প্রবল জ্বরে কোভিড উনিশ সাথে
তোমার পূজো আলোয় ভরা জলসা করা রাতে।
আমার পূজো কতক্ষনে সুস্থ করতে পারি,
কেউ বা বাঁচে অক্সিজেনে কারোর কাছে হারি।
তোমাদেরই একজন কেউ এক্সিডেন্টে পড়ে,
এম্বুলেন্সে আসে হঠাৎ আমার পূজোর ঘরে।
গভীর রাতে সেলাই করি ফাটা মাথার ক্ষত
তোমরা তখন মনের সুখে ঠাকুর দেখো কত।
নার্স গ্রুপ ডি ও ডাক্তারের পূজোয় মজা বেশী
মধ্য রাতে মাতাল আসে দেখিয়ে যায় পেশী।
ডক্টরস রুমে রেস্ট নেবো কি স্ট্রোকের রোগী এলে
চিকিৎসাতে সাড়া দিলে পূজোর খুশি মেলে।
প্রসব ব্যথা নিয়ে যখন দুর্গা কেঁদে মরে
তখন ভাবি অসুর নিধন করবে কেমন করে?
গরল খেয়ে আমার কাছে নীলকন্ঠ এলে
হাঁফ ছাড়ি ভাই তবুও তো শিবের দেখা মেলে।
এমন করে রোগ সারিয়ে মোদের পূজো দেখা
হাসপাতালের ডাক্তারদের মন্দ ভাগ্য রেখা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রতিবাদী কবি
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

কবিতা আমার বুকে শব্দ ছন্দে ভরি
কবিতাতে পাই মুক্তি স্বপ্ন পূর্ণ করি।
কাগজ কলম মন কবিতাতে বাঁচে
কবিতা লিখেই মন সৃষ্টি সুখে নাচে।

ফুল ফুটে কবি মনে কাব্য বাগে কত
প্রতিবাদী কবি আমি লিখি অবিরত।
আগুন মশাল জ্বালি সত্যদ্রষ্টা কবি
দুর্নীতি দেখে বিদ্রোহী আঁকি সেই ছবি।

মানবতা হীন বুকে পাপে লিপ্ত যারা
শাণিত কবিতা পড়ে শঙ্কা পাবে তারা।
বিভেদ পাঁচিল সব কাব্যে চূর্ণ করি
নির্যাতিতার হৃদয়ে শান্তিই-প্রীতি ভরি।

অশান্ত অবনী মাঝে কাব্যে মুক্তি খুঁজি
অত্যাচারীর মুখোশশোশ খুলি আমি যুঝি।
কবিতা আমার মনে প্রিয়া রূপ ধরে
আমার কলমে প্রেম ঝর্ণা ধারা ঝরে।

সাম্য মৈত্রী বাণী আমি শুধু লিখে চলি
কবিতায় হয় লেখা দরিদ্রের বলি।
শাসন শোষণ যবে সীমা ছেড়ে চলে
কবিতা মশাল বহ্নি শিখা ওঠে জ্বলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ডিমসেদ্ধ
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

আমার যাবার আগে হাঁসের ডিমটা
চন্দন কাঠের চিতার আগুনে সেদ্ধ
করে দিও।  
তৃপ্তি ভরে খেয়ে আমি খুব খুশি হব
চিতার ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে
পাতিহাঁসের একটা ডিম সেদ্ধ করে
দিও.. আমি খাবো.. .. অন্তিম ইচ্ছা
সব কথা হয়ে গেছে হংসিনীর সাথে
বলেছে দিতে পারি কিন্তু কেন দেব?
মা হাঁস তা দিতে চায় মা হবে বলে
মমতা স্নেহের উষ্ণতায় ফুটে ছানা।
হলেই বা! কতশত গর্ভপাত অহরহ
ডিমের হলুদ কুসুম পূর্ণ মাতৃস্নেহ।
দেবদত্তের তীর বিদ্ধ হংসডিম্বেরও,
খোলায় লেখা মাতৃত্বের ইতিহাস!
বয়েল্ড আন্ডা বিক্রেতা নেমে গেছে
সব ডিম বিক্রি করে আগের স্টেশনে
সেদ্ধ ডিমের মধ্যে কী শুভ্র পবিত্রতা!
ফুল চাই নাকো। সেদ্ব ডিম খেতে চাই
চিতার আগুনেই তা সেদ্ধ করে দিও
মরার আগে হাঁসের সেদ্ধ ডিম খাবো
তারপরে চিতায় জ্বালিয়ে দেবে দেহ।
ডিমের খোলা চেল্লাবে তার ইতিহাস
পোড়ে না যেন। হাঁসের মাতৃত্ব লেখা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
লোকগীতি
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

আয়রে প্রিয়া ভাঙরে হিয়া তোকেই চায় এই মন
তোর বিহনে রই কেমনে কাটাই কেমন ক্ষণ
না বলে যে গেলি চলে
আসবি ফিরে তাও না বলে,
ভাসছি আমি নয়ন জলে
আমার প্রেমকে পায়ে দলে
মনের মাঝে উথাল পাথাল চলছে ব্যথার রণ
তোর মতো যে নেইকো আমার এত আপন জন।

তোর তরে যে ছেড়ে এলাম আমার আপন ঘর
আমার বুকের মধ্যে ওঠে ভালবাসার ঝড়
বাজাই আমি কানুন বাঁশি
প্রেম যমুনায় যাই যে ভাসি
জাগছে মনে স্মৃতির রাশি
আয় না কাছে মধুর হাসি।
অশ্রু আমার দুই নয়নে ঝরছে নিরন্তর
নিঠুর প্রিয়া এমন করে করিস না রে পর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রিক্সার কান্না
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

দুই হাত দুই পায়ে
চাকা ঘুরে যায়,
আঁকা বাঁকা উঁচু নীচু
পথে রোজ ধায়।

কেউ হাটে কেউ বাটে
হেলে দুলে চলে,
স্বল্প ব্যয় পায় তাই
ভাড়া কিছু হলে।

ঘরে বউ ছেলে মেয়ে
পথ পানে চেয়ে,
সাঁঝ বেলা আবু ফেরে
টাকা কিছু পেয়ে।

জলে ভিজে রোদে পুড়ে
রিক্সা সে টানে,
খুব জ্বরে যক্ষাতে
ওষুধ কে আনে?

ছোট চোখে দেখে লোকে
পশু মনে ভাবে,
তিন চাকা থামে নাকো
খেতে তবু পাবে।

মাঝে মাঝে অবসাদে
ঘুমে পড়ে ঢুলে,
উদরের খিদেটাকে
বেশ থাকে ভুলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কাব্য আমার
কবি ডাঃ কৌশিক ঘোষ

কাব্য আমার মনের ভিতর
উথাল পাথাল করে,
আমার সকল ভালোবাসা
লিখি কলম ধরে।

কাব্য আমার ভাবনাগুলো
প্রকাশ করে চলে,
অনুভূতির সকল কথা
কাব্য আমার বলে।

কাব্য আমার প্রিয়তমা
লাল গোলাপের শোভা
কাব্য আমার রাতের শশী
দিন আকাশে প্রভা।

কাব্য আমার সৃষ্টি সুখের
উল্লাসেতে হাসে,
নইকো কবি মনের ছবি
কাব্য জুড়ে ভাসে।

কাব্য আমার রুধির ধারা
শিরায় শিরায় বহে,
হইনি কবি তবু সবাই
কেন কবি কহে?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর