কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডলের কবিতা
*
গভীর জীবন থেকে নিজেকে
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

সোনার চাঁদ আমি ধরতে পারিনি
গভীর জীবন থেকে নিজেকে দেখিনি
বিশ্বাস করেনি আমার অন্তরের অবতরণ,
যে কোনো দিন কোনো গাছে সবুজ ফুল ফোটেনি
সে জীবন রেখে কি হবে ;সে ত কাঁদতে জানে না
অন্তরের ভালোবাসা পাহাড় ডিঙিয়ে আসে
সে শরীর ভোগের পাণ্ডুলিপি লিখে রেখে যায়।

আষাঢ়ে বৃষ্টির মত মানুষ গুলো মাঠে দেহ মন রচনা করে
জানি না তাতে আমার বোকা কবির কবিতা হয় কি না
আমার আকাশের প্রেম ধরে খায়
আমি অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে শুধু দেখি
বিদায়ের বেলায় দিগন্তে ঘোষণা করে, একা একা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজ মাতৃভাষা দিবস
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

জীবনের কাছে আমি জ্যোৎস্না হতে চেয়ে ছিলাম
ধূলির পারিজাত ভেঙে ক্রান্তির রাতে তোমাকে ভালো বাসলাম
ভুলে থাকার কিছুই নেই যন্ত্রণার সান্তনা নেই
যে ফুল শহীদের মিনারে সাজানো হলো অসহায় জীবনের রক্তে ভেজা
যত মা ভাই বোন পিতার দৃঢ় বক্ষ ভয়ের কম্পনে কাঁদে সারাজীবন
কিছুই পেলো না ; আজও হাওয়ায় ক্রন্দনের ধ্বনি ভাসে
নিশিতের গভীর রাতে কারা যেন হেঁটে যায় পায়ের শব্দ কানে বাজে
দেশের মাটি কাঁপে।

আজ মাতৃভাষা দিবস।

চারিদিকে সাজো সাজো রব
আলোর জলসাঘরে নাচের ঘুমুরের শব্দ আর মাইকে মাইকে ভাষণের ঔদ্ধত্য।
সেই জীবন বলিদানের নিস্তব্ধতা অন্ধকার ঘরে, ঘরের মানুষ গুলো গালে হাত দিয়ে ভাবে
নিথর ভাবনায়
নিরবে কেঁদে কেঁদে দিনরাত কেটে যায় কালের নিয়মে সময় যে চলে যায়
অজানার ভাবনায় ভাবায় গভীর কষ্টে দিন কাটে অভাব আর নিরুত্তর একত্ব
পাথর হয়ে বুকের উপর চেপে বসে থাকে।তবু্ও চারিদিকে  কবিতা আর নাচ গানে
ভরপুর আলোর ঝলকানিতে নিভে যায় নিরুত্তরের জীবনের সাজ বাতি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ এক অন্য মানুষ মানবতা জানে না
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

এ এক অন্য মানুষ মানবতা জানে না
মরুভূমির মরুদ্দান রোদ্দুরে চিকচিক বালি রাশি,
প্রেমের ঘোমটা উড়িয়ে দিয়ে কোথায় হারিয়ে যে যায়
কেউ জানে না। বনলতার পায়ের ঘুমুরে বিয়ের আলিঙ্গন দোলে
ভালবাসা নেই তাতে, দূরের আকাশে চিল উড়ে যায়
গেরস্থালির দুপুরে খোলা চিঠি শরৎ রচনাবলী বুকের উপরে
একা একত্ব বোধ কাটে না ;
জীবনের উপমা তৃষ্ণার রাত্রি অবুঝ লজ্জা ছুঁয়ে যায়
নিরুত্তর ভালোবাসা দেখিনি যারে কাছে সে চিরসঙ্গী হয়ে
খোলা উঠোনে তিমির রাত্রি পারিজাত এই বাসরঘর।
আজ বড় মনে পড়ে, প্রেম  এতটা গভীর আগে কোনো দিন বুঝতে পারেনি
বৃদ্ধ এই শরীর বৃদ্ধ এই দেখার মত চোখ দুটো অবগাহন করি
সক্রোধে রোগ গ্রন্থ যন্ত্রণায় জীবন টানে, তখন বুঝলাম
বেলা শেষের দিনে ভালোবাসার এত টান
এ কি মায়া ; কি অপরূপ সৌন্দর্য্যের কাতর মায়া।
বর্ষাতি পড়ে আমি একা একা হেঁটে চলেছি বৃষ্টি পড়ছে ঝর্ণার মত করে
একা ত যেতে হয় গোরস্থানে শয্যা পাতা
পিছনে আর ফিরবো না, ফেরা যায় না;তবুও কে যেন
শূন্য ছোট্ট ছোট্ট হাত অবুঝের মত টানে
আমার ত যেতেই হবে বেলা শেষের গান বাতাসে বাজে ;
এ এক অন্য মানুষ মানবতা জানে না।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যতটা গভীর ততটা জীবন নয়
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

কত জীবনের জীবন্ত বোধ ভেঙে যায় অজানা চেতনায়
মুক্তি চেয়েছি যতটা গভীর ততটা জীবন নয়
হেরে চলমান জীবন,বসন্ত ভাঙা বসন্ত মনের গভীরে আশা জাগায়
যতকিছু নিরুত্তরে নিয়েছি, যে প্রেম হারিয়ে যাওয়ার কথা
সে যে খোলা সমুদ্র সৈকতে ছোটো ছোটো ঢেউয়ের অপেক্ষা করে।

সারারাত মেঘ আসেনি খোলা আকাশে মোমবাতি জ্বেলে
অনন্তকালের জন্মদিন পালন করে। সে বুঝি গোরস্থানে কবর খোঁড়ে রেখেছে
অজানার এ দেহ কখন দিন শেষ হয় কেউ জানে না
অনন্তের স্মৃতি লিখে যাই সৃষ্টির সবুজ কুচি পাতায়
বোকা হয়ে আশার বীণা বাজায়, অচেনার সাথে ঘর
সংসার ভাঙাগড়ার খেলা সময় বড় কম, আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে করে
হাত অতদূর যায় না ; পাহাড় পর্বত বরফে ঢাকা মেরুদেশ
সাহারার মরুভূমি সমতল পার করে মালভূমি পার হয়ে
ভেসে যাওয়া নদী অথৈ সমুদ্র তারি মাঝে এ জীবন খনে কের কালে
বেঁচে থাকে ফুল ফল জল বাতাস আর মাটি হয়ে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমি ক্লান্তির চেয়ে বড় কিছু
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

এ ভাবে চলতে চলতে আমি ক্লান্তির চেয়ে বড় কিছু
ওই সেই ফিলে আসা সুন্দরবনের নদীর বাঁধের ধারে
নোনা ধুলোয় ভরা উঠান আর খসে পড়া মাটির ঘরখানি
মাকড়শার জালে ভরা ঝুল তার মাঝে ছেঁড়া চ্যাটাই পাতা
বসে আছে বৃদ্ধা আমার মা চোখে ভালো দেখতে পায় না
চোখের ছানি পড়েছে জল পড়ে চোখ ব্যাথা করে।

দিগন্তের বেলা শেষে যখন একথালা ভাত আর শুকন শাক ভাজা
দিয়ে খেয়ে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়লাম
একঘুমে কখন যে রাত শেষ হয়ে যেত বুঝতেই পারতাম না;
শান্তির ঘুম আজ আর নেই, আজ যে সারারাত চোখে ঘুম আসে না
ঘুমের ওষুধ খেয়ে ও ঘুম আসে না।

আজ সেই ধুলো ভরা উঠোন নেই আমি এখন শহরে থাকি
আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা কাজের মেয়ে আসে রান্না করে
আর ঝাঁ-চকচকে  ঝলমল করে ঘর পরিস্কার করে দিয়ে যায়
ব্যাস্ত এ শহর কেউ কারো সাথে কথা বলে না।
আমার একমাত্র ছেলে বৌমা নাতি পাশের অট্টালিকায় থাকে,
ওরা খুব ব্যাস্ত মানুষ  কথা বলাবার আর একটু ভাল কি মন্দ
খোঁজ নেওয়ার সময় থাকে না।
আমার ছেলে সন্তুর কত মাস মুখ দেখিনি কথা হয়নি মনে নেই।

আজ আমার সেই ধুলো ঘর আর বৃদ্ধা মায়ের কথা বড় মনে পড়ে
শান্তির বাতাস জালনা দিয়ে আসা যাওয়া করে,
এখানে বাতাসেই নেই আলো নেই
কৃত্রিম আলো বিজলী বাতি জ্বলে
ফ্যান আর এসি চালিয়ে বাতাস তৈরি করতে হয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার ভাষার জন্যে
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

আমি আমার মাতৃভাষার জন্যে মিছিলের আগে আগে হেঁটে যাব
দিগন্তের অন্তিম বেলা শেষ করে অনন্তের গভীরে মিলনের মেলা রব
মেঘ ভাঙা পথে তোমার সাথে দেখা হবে
চিনতে যদি না পারো কার্তিক মাসের সদ্য সকালের সোনালী টুপিয়ে পড়া ধানের ভেজা
শিশির দেখো
সেই খানে বসেবসে জললিপি লিখে যাই অনন্তের সাধনায়
আমি করি সাধনা ধুলো ভরা সেই মাটির কুঠির খানি দক্ষিণের জালনা খোলা
এলোমেলো বাতাস শিশুর মনে গেয়ে উঠে আনন্দের গান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আলোছায়া
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

জীবনের কাছে একটা মানুষ কেমন করে প্রাণ চায়
দেখলাম নিজের করে, এই রোগ যন্ত্রণা কুরে কুরে খায়
যখন চলে যাওয়ার সময় হয় মন বলে আর কিছু দিন থেকে যেতে চায়
সময় থাকে না আর জ্যোৎস্না নির্ভয়ে কাঁদে আলো নদীর নোনা জলে
এলোমেলো ঝিলিমিলি করে
আপন ঘরে সাজানো ফুল বুঝি আর পুজোর অর্ঘ্য হবে না।

ভুল সব চেনা চেতনা গভীর রাতের ক্লান্তির অবকাশ স্বপ্ন
তবুও দিয়ে গেলে ভালো হয় মন বলে ভুলের মাসল
আনন্দ বোধ করে খেলা সৃষ্টির সবুজ নতুন আলো
আর নয় চোখ করে ছলছল, ঘুম চিরদিনের ঘুম আসে আলোছায়া।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেম সব অতীত স্মৃতি বেনোজল
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

এমন করে আকাশ ভেঙে পড়ে মাথার উপর
সে নিজেই জানে না, শৈশব চলে যাওয়া অতীত
মন গভীর অচৈতন্য চেতনা, স্কুলের পড়া আর ভালো লাগে না
কলেজ পালানো প্রেম সব অতীত স্মৃতি বেনোজল।

রোগযন্ত্রণা হাসপাতালের বিছানায় অসহ্য যন্ত্রণা
যা ভুলিবার নয় তা ভুলে যাই, এই বৃদ্ধ কালে বোঝা হয়ে যাই
সকলের কাছে শাদা কুয়াশার ভরা চোখে শুধু চেয়ে থাকি
এ শুকনো ফুল ভালো হয় ঝরে গেলে কপালে যা আছে,
এও বুঝি নতুনের জায়গা দিতে হবে ছেড়ে
চলে যেতে ইচ্ছে করে চলমান জীবন যদি ছেড়ে না যায় দেহ
কি করবো তবে, দিনের অপেক্ষা ছাড়া আর কি করার আছে!
পশ্চিম দিগন্তের বেলা অপেক্ষা করে পূর্বের আকাশে আলোর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এত বৃষ্টি নবজাতকের মৃত্যুর গভীরে
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

তুমি বোঝ কি না,নাকি
বোঝতে চাও না, বুঝি না
চাষ করার কথা ছিল জমি
ভেসে যাওয়ার গভীরে
জানি না তুমি কি চাষ করেছ মনে
ভেসে যাওয়া মেঘেদের দলে
বৃষ্টি আছে।

এত বৃষ্টি নবজাতকের মৃত্যুর গভীরে
বাঘের হিংস্র থাবা
হিংস্র নখড়  রক্তপিপাসু দাঁতে;
কিভাবে আকাশের কাছে
হাত পেতে জীবন ভিক্ষা করে,
আমার কান্না পায়,কেঁদে কি হবে
সবুজ বনে আগুন লেগেছে
মাছের নোনা নদীতে বৃষ যেন
মৃত্যু খেলা করে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জীবনের জীবন্ত মানুষের রহস্য
কবি নিত্য রঞ্জন মণ্ডল

প্রেমের কৌশল আমি জানি না
ছায়ার মত আর কত জীবনের জীবন্ত মানুষের রহস্য
যতবার চেয়েছে জীবনের ভিক্ষা-- গভীর প্রাণের কাছে
এক দিগন্তের বাতাবরণ  ভেঙে আসা মানুষ গুলো
এমন করে বড় হয়ে যায়, যা জন্মের কাছে পরাজয় হয়।

কি আছে এই ভাবে এই ছোট্ট জীবনের কাছে
যতবার চেয়েছি প্রাণের ভিক্ষা, যতবার
হৃদয়ের কাছে পেতে চেয়েছি ততো বার জীবন ক্ষমা করেনি;
বাতাসের কাছে আমি যেন অজানার ঘুম
কেমন করে একটা আকাশ অন্য এক মানুষের সব কিছু
শরীর হতে পারে না, নোনা নদীর পাড়ে
এই সুন্দরবনের ভাঙা নদীর বাঁধের উপর ত্রিপল টানিয়ে
এক যুগের মরণের অপরাহ্ণে এখনও সংসার করে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর