এবার পুজোয় তার আস্ত একটা জামা প্রয়োজন বাবাকে সে বলেছিল বাবা তার বুঝেও বোঝেনি সারাদিন ঘাড় নিচু করে লিখেছে কবিতা লিখেছে ঝড়ের পূর্বাভাস লকডাউনের দিনলিপি...
মেয়েটা গাছতলায় এসে দাঁড়িয়েছে ওই যে আসছে ওরা ওরা তার আত্মীয় প্রতিবেশী ওরা সব পুজোর বাজার সেরে ফেরে...
বাবা তার বুঝেও বোঝে না সারাদিন ঘাড় নিচু করে লেখে রাজনীতি লেখে সমাজ লেখে অথচ বোঝে না মেয়ে তার চোখে-চোখে দুঃখ লিখে রাখে বাবা তার বুঝেও বোঝে না মেয়ে তার এখনও অসমাপ্ত কবিতা! . **************** . সূচীতে . . .
প্রতি রাতে এ ঘরের গোপন ফাটল জেগে ওঠে অজস্র বিষধর উঠে আসে ফাটলের মুখে নাড়ির মতন যোগ সেইসব ফাটলের পাতালের সাথে শীতঘুম থেকে জেগে বিষধর উঠে আসে পাতালের থেকে
আমার বিছানা জুড়ে ঘোরে-ফেরে ফণা তোলে খাদ্যের খোঁজে ভয়ে ভয়ে জড়োসড়ো চলে যেতে বলি যেই শান্ত গলায় আমার লুকানো জিভ সহসা বাইরে এসে ভাগ হয়ে যায় দুহাত গুটিয়ে রাখি পায়ে পা জড়িয়ে বাঁধি তবু বুক ঘষে ঘষে ঠিকই চলে যায় দরজার কাছে হাঁ-মুখে দরজা খুলে পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ জানাই ঘুমন্ত মুখে ছুঁড়ি আমার দেহস্থিত বিষ! . **************** . সূচীতে . . .
বাবা বলেছিল, ছেলেটা একটা কাওয়ার্ড উপহার দেওয়ার ক্ষমতা নেই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায় তাই... মা বলেছিল, অপেক্ষা করলে কি বয়স থেমে থাকে? দেখ হয়তো সটকে পড়েছে তাই... বন্ধুরা বলল, এনজয় গুরু বাঁদরটা রাবড়ি খেয়ে পাপড়ি মেলে ফুড়ুৎ ও আর কোনদিনও আসবে না।
আমিও ভাবলাম, এছাড়া কী হবে এতটা রক্তাক্ত করে সময়ের ক্ষত এঁকে এঁকে যে মানুষ সময়ে আসে না সে কি আর আসবে কোনদিন?
সহসা আবছা করে আমাদের ছায়ার শরীর দেখা দিল মানুষের দীর্ঘ এক ছায়া রক্ত ও ঘামের গন্ধ কেড়ে নিল আমাদের কৃত্রিম সুবাস তাকিয়ে দেখলাম― ছেঁড়াফাটা শার্ট খাচ্ছে গণধোলাইয়ের রক্ত তার হাতের মুঠোয় সূর্য নতুন কবিতা! . **************** . সূচীতে . . .
হলদেটে কয়েকটি খাতা ছিল আপনার দেরাজে বুকসেল্ফে অজস্র পত্র-পত্রিকা নতুন ফ্ল্যাটে এসে সব হারালেন
দক্ষিণের জানলা খুলে ছেলে বলল, দেখ বাবা! সুগন্ধি বাতাস... তারপর সুগন্ধি বাতাস হাসতে হাসতে বলে গেল, কবি ছাড়া দিব্যি চলে যায়!
কবি ছাড়া দিব্যি চলে যায়? আপনি আশ্চর্য হন তাকান অব্যক্ত সব কবিতার দিকে দেখেন অব্যক্ত সব কবিতার মুখে সেই চাপা হাসি যা আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, কবি ছাড়া দিব্যি চলে যায়। আপনি দক্ষিণের জানলায় দাঁড়ান চোখ রাখেন চলমান জনস্রোতে আপনি আপনার অতীতের দিকে তাকান আহত ক্ষত-বিক্ষত হন বারবার অথচ আপনাকে বারবার ফিরে আসতে হয় কবিতায়। . **************** . সূচীতে . . .
দু-কামরার একটা ঘর একফালি বারান্দা আর এক চিলতে উঠোন! এছাড়া সামান্য চাষের জমি একটা পুকুর একটা ডাঙ্গা! এখন অতিথি এলে খুশি হতে পারে বিদায় নেওয়ার আগে বললাম, প্রমাণ করে দিলে মইদুল পরিশ্রমের কোনও...
কথাটা হল, ইউনিভার্সিটির রিসার্চ-স্কলার আমার বন্ধু অ্যান্তোনিও এখন গান নিয়ে রিসার্চ করছে ! সেই অ্যান্তোনিও, যে আমার ভাঙা ঘরে আসত প্রতিদিন যে আমার সঙ্গে কারখানায় যেত করাতকলে আমার পাশে বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু একটা গান শোনাবে বলে!
দুপুরবেলা সস্তা মকাইয়ের ছাতু খেতাম আমরা বিকেলবেলা ঘুরতে যেতাম নদীর ধারে একটা গোটা পৃথিবী হাঁটত আমাদের সঙ্গে সে বলত, কথা দাও! কথা দাও! পথে নামবে তুমি! হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, শিখ নয়, বৌদ্ধ নয় খেটে খাওয়া নিপীড়িত মানুষের কথা বলবে তুমি! ভয়ে ভয়ে কেঁপে উঠতাম! মালিকের হাতে যার টিকি বাঁধা যাকে রোজ যেতে হয় বাবুর বাড়িতে গতর না চললে যার পেটও চলে না কীভাবে সে পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ জানাবে?
আমাদের বস্তিতে তখন চাঁদ উঠত গোল হয়ে গ্রাম থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষেরা শুনত আরতি মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে হংসরাজের সেই বিখ্যাত গান, শহরটার এ গোলকধাঁধায় আঁধার হল মন মন্দভালোর এই কী খেলা চলছে হেথা সর্বক্ষণ... কেউ বিনা দোষে চোর হয়ে যায় কেউ সাধু সেজে পরাণ বাঁচায় আবার গরিব বন্ধু রাখতে কথা পণ করে দেয় তার জীবন...
বিদায় নেওয়ার আগে সে বলত আবার, কথা দাও হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, শিখ নয়, বৌদ্ধ নয় খেটে খাওয়া নিপীড়িত মানুষের কথা বলবে তুমি! কথা দাও পথে নামবে তুমি!
অ্যান্তোনিও প্রিয় বন্ধু আমার জানি, তুমি খুবই ব্যস্ত এখন! দেশে-বিদেশে কত সেমিনারে যেতে হয় তোমাকে কত গান শুনতে হয়। অ্যান্তোনিও প্রিয় বন্ধু আমার তোমার কি আজও সেই গানটার কথা মনে পড়ে যার কোনও ছত্রে লেখা ছিল, গরিব বন্ধু রাখতে কথা...?
বিশটা বছর! বিশটা বছর অ্যান্তোনিও! আমি পথে দাঁড়িয়েই আছি! . **************** . সূচীতে . . .
--আপনি আবার ঘুমাতে চল্লেন? --আমি আপনার বাবুর বাঁধা গোলাম নাকি, জেগে থাকতে বললেই জেগে থাকতে হবে? --আপনি সমাজ সচেতন! --ছিলাম একসময়! যখন কৃষকরা আত্মহত্যা করছিল আর আপনারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন! যখন অসমে উনিশ লক্ষ মানুষের পায়ের নিচ থেকে দেশ সরে গেল। দিকে দিকে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হল। গৌরী লঙ্কেশকে খুন করা হল। --গৌরী লঙ্কেশ? --চেনেন না? কালবুর্গীর নাম শুনেছেন?বুঝেছি! বাবু না ডাকলে যার ঘুমই ভাঙে না... --না,না, আজ বাবু নয় পৃথিবীর এ মহাবিপদে... --একটি ভাইরাস যদি দেহে ঢুকে যায় সেই ভয়ে! তাহলে ঘরেই থাকুন। নইলে আমার মতো নিশ্চিন্তে ঘুমোন! --তা কি হয়? পৃথিবীর কঠিন অসুখ! আমাদেরও কর্তব্য থাকে কিছু! ---তাহলে আজই যা শখ-শৌখিনতা সব বর্জন করুন! যুদ্ধাস্ত্রগুলো দিন সাগরের জলে! --তা কি হয়? --বাবু বললেই হয়ে যাবে! কিন্তু বাবুরা বলবে না! হিসেব মশাই! আপনাদের জাগা আর জেগে ওঠাটাও হিসেব! হিসেব! --আপনি আবার ঘুমাতে চল্লেন? –হ্যাঁ, আমি ঘুমোতে চললাম। কারণ এখন পৃথিবীর গভীর অসুখ জেগে উঠছে চারিদিকে! . **************** . সূচীতে . . .