কবি পিন্টু পোহান-এর কবিতা
*
স্বপ্ন
কবি পিন্টু পোহান

কার্ল মার্কসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল
উনি বললেন, আমি ও আমার বন্ধু এঙ্গেলস
যা বলেছি, যা লিখেছি সব-ই ভুলে যান!
আপনি আপনার এল সি এসের
নির্দেশ পালন করুন!
–এল সি এস, মানে আমাদের...
কিন্তু স‍্যার, রঙ মেখে যদি নাচতেই হবে
রাজার প্রাসাদে কেন নয়?

কার্ল মার্কস বুঝলেন না কিছুই
বললেন, মানে?
ঠিক তখনই সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেবতা নির্মাণ
কবি পিন্টু পোহান

অনেক দিন দেওয়ালে কোনও যুদ্ধ ছিল না
গ্রামের মেয়েরা খড়ি দিয়ে লিখে আসছিল 'প্রেম'
যুবকেরা ভাবছিল, চাকরিটা পেয়ে গেলেই এবার...
মা ভাবছিলেন, এই বৈশাখে
টালিগুলো বদলে নেবেন তারপর...

ভক্তরা খুব মুষড়ে পড়েছিলেন
বহুদিন হয়ে গেল দেওয়ালে কোনও যুদ্ধ নেই
যুদ্ধ না থাকলে তাঁর মাহাত্ম্য বোঝে না
এমন বেকুব জনগণ!
কত দিন আর ইতিহাস খুঁটে খুঁটে
কীট-পতঙ্গ এনে দেওয়া যায়!

ভক্তরা মুষড়ে পড়েছিলেন !

তারপর প্রতিটা গল্পে যেমন হয়...
গল্পের দাবি কিংবা লেখকের মুন্সীয়ানা!

ঈগলের মতো এসে আতঙ্ক রেখে যায় যাত্রী বিমান
আতঙ্ক ছুঁয়ে নেয় আমাদের ঘরগেরস্থালি
ভক্তরা খড় দিয়ে দেবতা বানান
যুদ্ধের দেবতা ফের জনতার পূজা পান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দলিল - ১
কবি পিন্টু পোহান

আত্মহত্যার মিছিলের একটা
দলিল আছে আমার কাছে
আপনাদের লাগলে বলবেন!

গর্ভঘাতকের কিছু হত্যার
ছবি আছে আমার কাছে
আপনাদের লাগলে বলবেন!

অরণ্য থেকে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীদের
কিছু হাড় আছে আমার কাছে
আপনাদের লাগলে বলবেন!

লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর হারানোর
কিছু গল্প আছে আমার কাছে
আপনাদের লাগলে বলবেন!

এত ভার আমি আর বইতে পারছি না!

আপনাদের প্রতিটা লড়াইয়ের পাশে
মানুষ কেমন দল বেঁধে আসে
শ'য়ে...শ'য়ে...হাজারে...হাজারে...
লক্ষ্মণরেখার নিরাপত্তায় আপনারা
ডিম ফুটিয়ে কী সুন্দর বিপ্লবী তুলে নেন!

যে কবি নাভি ছেড়ে উঠতে পারেনি দেখি সেও
নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে শান্তির ঘরে ছুড়ে দেয় ছাই!
গদ্য-পদ‍্য জুড়ে শুধু চিৎকার ওঠে, লড়াই! লড়াই!
লাইকের বন‍্যা বয়ে যায় ফেসবুকে!

আর আমি
গর্ভঘাতী দাঙ্গার
আত্মঘাতী কৃষকের
অরণ্য থেকে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীর
দলিল দস্তাবেজ-ছবি-হাড়গোড় নিয়ে
হেঁটেই চলেছি....
যুগ থেকে যুগান্তরে...

আপনাদের লাগলে বলবেন!

আপনাদের লাগলে বলবেন
এত ভার আমি আর বইতে পারছি না!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গুণী
কবি পিন্টু পোহান

এ এক আশ্চর্য বাড়ি সন্ধ্যায় জাগে
আলো জ্বলে, ছায়া সরে
সিঁড়িতে পায়ের শব্দ ওঠে!
বাবা-মা অথর্ব
ছেলে বিদেশে সেটল্
ছেলের বন্ধু এসে আলো জ্বেলে যায়।

আলো জ্বেলে যাওয়া কাজ হদ্দ বেকার

ও তেমন গুণী ছেলে নয়!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বহিরাগত
কবি পিন্টু পোহান

"বহিরাগত" কাকে বলে আমরা ঠিক জানতাম না
আমরা কেউ লাঠির ওপর টুপি টাঙিয়ে
তাকেই মেনেছি মান‍্যবর
তার কথাই মেনেছি অক্ষরে অক্ষরে
বলেছি, বিদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে ...
অথচ পাশের মানুষটাকেই দেখছিলাম
সন্দেহের চোখে!
দেশ-দেশান্তরে আমরা খবর পাঠাচ্ছিলাম
আমরা ডিটেনশন ক‍্যাম্প তৈরি করছিলাম
খরচ করছিলাম হাজার হাজার আর
উল্লাস করছিলাম এই বলে,
দেশ থেকে এবার বিদেশি তাড়ানো হবে।
বলছিলাম জোর গলায়,
সি এ এ অর্থাৎ ক‍্যা একটি মহান আইন
যার মাধ্যমে বিদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা নাগরিকত্ব পাবেন!
তখন কি আমরা জানতাম
এই আইনের সুযোগ নিয়ে বিদেশ থেকে যিনি প্রথমেই আসবেন, তিনিই "করোনা!"
আন্তর্জাতিক বিমান থেকে নেমেই
বলবেন, সুপ্রভাত ভারতবর্ষ!
আর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে
আমাদেরকে স্বীকার করে নিতে হবে
ভারতের মাটিতে যে যেখানে আছে তারা সবাই ভারতবাসী!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সেই বিড়ালের গল্প
কবি পিন্টু পোহান

আমি কি লকডাউন ঘোষণা করেছিলাম?
আমি কি লকডাউন তুলেছি?
আমিই কি বন কেটে করেছিলাম মরুভূমি?
আপনারা সবই জানেন!

অথচ সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে
আমার বুকেই
নীতিকথা ধর্মগ্রন্থ উপদেশাবলী
একে একে চাপিয়ে যাচ্ছেন!

দুবেলা ঠিকমতো যার ভাত-ই জোটে না
লোভ সংবরণ করতে বলছেন তাকে!
দুমুঠো ভাতের অন্বেষণে মানবেতর হয়ে ওঠে
যে সব জীবন
তাদের বলছেন, ধৈর্য্য ধরো! ধৈর্য্য ধরো!

এ বলছে, ন‍্যায়ের পথে চলো!
ও বলছে, সত‍্যের পথে!
'সত্য' আর 'ন‍্যায়ে'র মাথা আপনারাই তো
চিবিয়ে খেয়েছেন!

ঘন্টাটা রাজার গলায় বাঁধার কথা ছিল,
অসহায়-নিরুপায় আমাদের গলায় নয়!

আপনারা কি জানেন না, সত‍্য আর ন‍্যায়ের পথে চলা কাদের প্রয়োজন?
যে চাষ করে, না কি চাষির ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে

কারখানায় যে কল চালায়, না কি শ্রমিকের
ভাগ্য নিয়ে যারা...?

আপনারা কি জানেন না–
আমাদের ছেলে ও মেয়েরা যখন
পাতার পর পাতা ভরিয়ে চলে
'একটি গাছ, একটি প্রাণ' লিখে লিখে
ঠিক তখনই কারা কারা এবং কীভাবে
বনজ সম্পদ ঘরে নিয়ে যাবে বলে
দলিল-দস্তাবেজ তৈরি করে নেয়?

নীরবে উচ্ছেদ হল দশ লক্ষ বনবাসী
মজুতদারকে দেওয়া হল সবুজ সঙ্কেত
অর্থনীতি চাঙ্গার দাওয়াই বলে
খোলা বাজারে তোলা হল  পাতালগুলোকে!
আপনারা চুপ করে রইলেন।
কাদের জন্য?

যারা যারা নিজেকে বাঁচাতে বিদ্বেষের
বীজ বুনে যায়
মানুষখেকোদের জন্য তৈরি করে যুগে যুগে
নতুন মুখোশ?

এই যে আপনারা কথায় কথায় অহিংসার মন্ত্র
পড়ান
কেন? বলি কীসের জন্য?
আমি কি অস্ত্র তৈরি করি, না কি অস্ত্রের কারবারি?
পুলিশ-মিলিটারি কিংবা প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট কি আমার হাতে?
আমি কি বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিচ্ছি পরমাণু বোমা বানাতে?
ঘন্টাটা রাজার গলায় বাঁধার কথা ছিল,
অসহায়-নিরুপায় আমাদের গলায় নয়!

অথচ সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে
আমার বুকেই
নীতিকথা ধর্মগ্রন্থ উপদেশাবলী
একে একে চাপিয়ে যাচ্ছেন!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যে লোকটা    
কবি পিন্টু পোহান

যে লোকটা ভূতের গল্প লেখে
যে লোকটা রূপকথার গল্প বলে
যে লোকটার একটা-দুটো কবিতাও ছাপা হয়
সেই লোকটাই আমি...
যে লোকটা চিৎকার করে
যে লোকটা স্লোগান তোলে
যে লোকটা শাসকের চোখে চোখ রাখে
সেই লোকটাই আমি...
আমার ভালোবাসার পাসওয়ার্ড-
9874763819...
আমার ভালোবাসার বারান্দা-
331/এ, বীরেন রায় রোড (পূর্ব)
কলকাতা--
700008
যদি কখনও কোনও লেখায় লেখকের নামের
জায়গায় 'পিন্টু পোহান' লেখা থাকে
চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবেন
আমিই  সে...
এখনও এই বাংলায়
'পিন্টু পোহান' এক এবং অদ্বিতীয়!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোর অপছন্দ হয়ে
কবি পিন্টু পোহান

তোর অপছন্দ হয়ে তোকে বলব, তোকে ভালোবাসি।
তোকে বলব, আমাকে ভালোবাসো।

আমার প্রার্থনা আমায়
বারবার দাঁড় করাবে রাস্তায়।
অপেক্ষায় থাকতে বলবে।

তুই বলবি, কী চাও এখনও?
আমি বলব, ভালোবাসা চাই।
তুই বলবি, কবিতা দেখাও।
আমি বলব, ভালোবাসা চাই।
তুই বলবি, বাড়িঘর কি আছে?
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
তুই বলবি, কী চাকরি কর?
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
তুই বলবি, ব‍্যবসা কর নাকি?
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
তুই বলবি, সাহস তো কম নয়!
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
তুই বলবি, বয়স কত হল?
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
তুই বলবি, উত্তর দেবে না?
আমি বলব, আমাকে ভালোবাসো।
শুধু আমাকে ভালোবাসো।
শুধু আমাকেই ভালোবাসো।

তোর অপছন্দ হয়ে আমি
তোকে বলব, আমাকে ভালোবাসো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সহজ গল্প
কবি পিন্টু পোহান

"জীবনের সহজ গল্প ছেড়ে আপনি কেন পালিয়ে এলেন?"
–তাহলে শুনুন কারা কারা ছিলেন সে ভোজসভায়!
আশি বছরের এক বৃদ্ধ ছিলেন
যিনি বলতেন, গরিব মানুষকে লাই দিলে মাথায় চড়ে বসে।
সত্তর বছরের এক বৃদ্ধা ছিলেন
যিনি বলতেন, নিয়ম করে ছোট জাতদের  মন্দিরে ঢোকা নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।
ষাট বছরের এক ধার্মিক ছিলেন
যিনি বলতেন, বিধর্মীদের রক্তে হাত রাঙানো বড় পূণ‍্যের কাজ।
ছাপ্পান্ন বছরের এক যুবক ছিলেন
যিনি দিনকে রাত বললেও আমাদের তালি
দিতে হত।

–"এত তুচ্ছ-তুচ্ছ কারণে!
তালপাতার ঘর ছেড়ে এগোতে এগোতে       আপনি যখন মাঝপথে...
ততক্ষণে আমাদের কপি লেখা শেষ।
সুন্দর একটা শিরোনামও দেওয়া হয়েছিল,
আর পাঁচ জনের মতো অবশেষে তিনিও পুরস্কার ছিনিয়ে নিলেন!"

–জানি! কিন্তু সে ভোজসভায় মানুষ পোড়ার গন্ধ ভেসে আসছিল!
আমার কেমন যেন সন্দেহ হল
আমি চুপিচুপি রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম
কোথাও শ্রমিক, কোথাও কৃষক, কোথাও দলিত
কোথাও ব্রাহ্মণ, কোথাও অব্রাহ্মণ  আবার কোথাও  ...
মানুষ... শুধু মানুষ পুড়ছে!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গল্প
কবি পিন্টু পোহান

সাদা রুমালে রক্তের দাগ মুছে
তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান
দেখে নেন সাংবাদিকদের
কর্মরত পুলিশকর্মীদের
এক পলকে দর্শকদেরও!

মুহূর্তে তিনি বুঝে নেন বিরোধীদের
মুহূর্তে তিনি বুঝে নেন গণমাধ্যমকে
মুহূর্তে তিনি বুঝে নেন অন্ধবিশ্বাসীদেরও।
তারপর শাসকের সেই চিরাচরিত ভঙ্গিমায়
তিনি বলে ওঠেন, বিরোধীরা চক্রান্ত করে...

আলোকবৃত্তের অনেক দূরে দাঁড়িয়ে
আমি তখন
এক এক করে কুড়িয়ে নিই
একটি গণহত্যা
একটি দ্বিচারিতা
একটি অন্ধত্ব
আর
অনেকগুলো বিশ্বাসঘাতকতার গল্প!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর