কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
অচেনা আলোয়
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

ধ্রুপদিয়ানায় বলা সেই পাখি আজ আবার অদ্ভুত কিসিমে শিস দিচ্ছে আজ
এই পাখিটাকে তো চিনিনা আমরা, কোথায় সে মার্গীয় সংগীত, ঝড়ের সাপাট?
মিড় হীন, তান হীন, গমক বিহীন ওই অননুশীলিতের কর্কশ চিৎকারে কই
অনুকোমল ঋষভের মৃদু কম্পন !অচেনা আমার, অচেনা ও শিস ’এর আওয়াজ !     
দূরে কোথায় বাজ পড়ল , মেঘ ডাকছে সকাল থেকেই ; সাম্মানিক ডিলিট কি পেয়েছিলেন
বিনয় বা প্রণবেন্দু, অনন্য রায়েরা? চিন্তা জাগে মনে , প্রশ্ন : কী করলে তবে? ...

পাখি বলল : ‘অবশেষে  রেগে একশা হ’লে ! হিংসার দুর্গন্ধে তো বাংলা ভ’রে যায়...’
শ্লোগানেতে শিস দেও হাওয়ার উজানে, নিন্দা কর ভারতের  পাকিস্তানে গিয়ে ,
চিনে গিয়ে ওবামার মুণ্ডু ভেজে খাও ।   

কবি বলল : ‘জম জম’, কবি গাইল লালনের গান
আজকে আকাশ ফের ঝলমলে হ’ল।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মন
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

CH2O তে রাখা মনটাকে তুলে নিয়ে ফের মেলে দিতে হল হাওয়াতে আবার
যা হওয়ার, তা হয়েছে। মরেছে জীবাণুগুলো। বিষিয়ে গিয়েছে তবু ধর্মে-রসায়নে   
মেছুনি মেয়েকে দেখে দ্বৈপায়ণ হ্রদে বসে কৃত্রিম কুয়াশা চাদরে কেন
কেন ঢেকে দিলে তার  দৃষ্টিগোচরতা? কেন বাবা দেখতে দিলে না সেই মোমের গলন?   
এ লজ্জার কী মানে হয়? এ কেমন জিতেন্দ্রিয়তা !কী  রকমের জিতবাসনা তোমার !  
নিজেকে প্রমাণ করো,বারংবার,প্রতিক্ষণ: ধৈর্য  কেন থাকেনা এখনো !

লোকাল ট্রেনের মধ্যে প্রসাধন কক্ষ নেই অথচ ভীষণ বেগ চাড়া দিচ্ছে বেশ
চাপার অসাধ্য সেই উষ্ণ স্রোতোধারাটিকে মুক্ত ক’রে দিতে গিয়ে অঘটন হ’ল  
খুলে ফেলা চাপা প্যান্ট যথাস্থানে ঠিকঠাক ফিরিয়ে নেওয়ার আগে  ট্রেন ছেড়ে দিল  
লজ্জা ফেলে সে দৌড়চ্ছে চলন্ত ট্রেনের সাথে, গন্তব্যে যাওয়ার আকুলতা
ছিন্ন হ’ল ধড়-মুণ্ডু, হাওয়া এসে বিলি কাটছে যৌন-কেশদামে, মন ফের ডোবা ফরমালিনে !

দুই স্তবকের মধ্যে কোনও মিল, যুক্তি নেই, অর্থহীন মন তাই বিষিয়ে দিয়েছে কবিতাকে !

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খুন
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

হাতটা বাড়ানো ছিল সমুদ্রের দিকে। হাওয়া তাকে নিয়ে গেল চারণভূমির
অবশিষ্ট কৌতুহলে, যে গুলো সাজানো ছিল  
.               পাইন-বার্চের দেহে  
.                                জমানো  রক্তের দাগে মাটি ও ঘাসের     
লুকোচুরি ছিঁড়ে ফেলে কিছুটাক উঁচু থাকা বিক্ষত শিশুর মুখ
.                               কাল যাকে আমোদিত দেখা গেছে সারা দিন   

ওই ঘন ঢল নামা তিরতির ঝরনায়
.                উইলো গাছের গায়  
.                                থমকানো শাদা মেঘ  
.                                                         তার পাশাপাশি  

মনভালোকরা এক সুরেলা বাঁশির মোহ রেখেছিল তর্জমায় যে সব দেশের লোক,   
তারা ও অবাক হয়ে গিয়েছিল এই ভাবে প্রিয়তম সৌন্দর্যের খুন হওয়া দেখে   
শুধু সে হাতটা আর সঙ্কেত করেনি কোনও সমুদ্রের দিকে...

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধোঁয়া
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

স্বপ্নপুর থেকে অলীকপুরে ঘর বসিয়েছেন কোন কবি?  
জানি না, কিন্তু নিশ্চিত যে, চিঠি পৌঁছতে ৪ দিন  
সেই ৪ দিন ওই মাঠের সঙ্গে, গাছের সঙ্গে, মেঘের সঙ্গে সারাদিন...  
বাকল ছাড়াতে ছাড়াতে শাঁস পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে হিজবিজ  
চিঠি পৌঁছল কি? উত্তরবিহীন এক কালো বর্ষা মেঘ কখন  
আসবে এখানে? ঘুলঘলির ফাঁক দিয়ে আলোর সুতোটি  
.                                 নরম আঙুল হয়ে নেমে আসবে কি?
ভাবতে ভাবতে ঘুমে দেখি : ওই তো তিনি বসে আছেন অভিনন্দনপুরে
দেখেও দেখলেন না যেন, ঝলসে ওঠা বাঁকা চোখের আলো জ্বেলে মিলিয়ে গেলেন
অশান্ত কলোনি থেকে ধোঁয়া বলল : ‘বোকার হদ্দ, তারকারা তো এমনি হয়...’

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্ধক
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

একটা কান্না এসে অক্ষরের ছদ্মবেশে বসেছে পাতায়
তাকে কেউ ছবি ভেবে নিলামে ওঠাতে গিয়ে ভাবে জনতার
রোষ যদি এসে পড়ে, যদি কেউ প্রশ্ন তোলে দখিনা হাওয়ায়
যে গ্রামটি পেল দেহ তাদের মেয়ের সাথে সেই যন্ত্রণার
আর্তি গুলো কম্পমান কোমল স্বরের মধ্যে অনাহত নাদে
কে তুমি হে মহা শিল্পী যন্ত্রণার অক্ষরকে ছুঁড়ে দিয়ে পাঁকে
এঁকেছ যে অক্ষরেখা হাসি হাসি মুখ দিয়ে মহা আহ্লাদে
সেখানেই শুয়ে আছে আমার মায়ের কান্না,দেখেছ কি তাঁকে?

যাঁদের রোদন নিয়ে তোমার বৈভব আজ সে অক্ষর আজ
বন্দী হয়ে আছে সব কাচের ঘরের মধ্যে এবং চেয়ার
আভূমি প্রণত হয়ে পাদুকার জন্ম দেয় কোন মহারাজ
বিবেক বন্ধক রেখে নিজত্বক মেলে দেয় আজ যে সমাজ
ঘৃণার অক্ষর নামে বাংলার গাছ মাটি ঘাসের উপর
তুমি কি দেখতে পাও মহা শিল্পী যেখানে এ তোমার বাসর

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অর্থহীন কবিতাত্রয়ী
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

১.
থাকে যে সমুদ্র তীরে তবু কেন সে ও তাকে নিবিড় দেখেনি
মৃদু সে পলাশ বন নিজে রাঙা তবু তার রক্তাভা অরুচি
আঁচড়ে দেয় চুল সব কান্না ভেজা মাথা থেকে চেনা অভিরুচি   
ভাবনা পথিক এসে গালে টোকা দেয় পাশে নীলিমা চিরুনি
অরুন্তুদ শব্দ-বান ইজেলে আকার নিয়ে অব্যক্ত যে ধ্বনি
ছবির আকার নিয়ে কবিতার গাল ঘেষে বলে :পাশে আছি
পাশে আছি সে মেয়ের যাকে আমি বহুবার ধর্ষণ করেছি
আমি সে সমুদ্রহাওয়া ঘুরে যাই বারংবার তবু তো চেননি !
################
চেননি যে সে কারণে নুনের কৃষ্টালপ্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে
চোখের কোণায় লেগে তারল্যহীনতায় এই বেঁচে যাওয়া
মধু ও মাধ্বীর কোলে শ্যামতরুবেদীমূলে নিজেকে বাড়িয়ে
কান্নাদের অভিশপ্ত স্বর  রচনার কাল  দেখে বুঝে নেওয়া
আমি বুঝি নীলাচলে নীলশূন্য বোধিপ্রাপ্ত নির্গুণ আশ্রয়ে
পাওয়া সে সমুদ্রদষ্ট অর্থহীন কবিতার বুকে মেলে দেওয়া !  

২.
এমন যে অপভাষা  তাও কি ধর্ষণের  ব্যথার সমতুল     ও চিৎকার          
যাকে আজ ঘরে এনে  রেখেছি আলনায় বহতা বাতাসের   সবুজ প্রাণ
শ্যামতরুবেদীমূল   নীলের সমাহার     নূপুর নিক্কনের      আজব জ্ঞান
নিয়ে আজ কবিতার  হাজির পদমূলে     রোদন মানুষের     চলা প্রচার
ভেসে থাকা ঘর-দোর   পাহাড়,সমতল    আনন্দ ঝরনার  ওঠা বাহার

সব মিছে,মিছে দেখ  মিথ্যার আয়নায়  জমানো সে আঁধারে  নিজের ধ্যান
ভেসে ওঠা সে আকার  ভয়ের জানালায়   চুপ সে কথাহীন  মুঠোয় জান
শুধু আজ কোনো মতে  অপমান জর্জর  কুঁকড়ে শুয়ে থাকা  পেটে প্রহার
################
নীলের আভাষ টুকু     শুধু সে ইশারায়    আলোর ঝলকানি   শিখছে চোখ
কালের ওপার থেকে    যে রেশ অক্ষরের   চেনেনা তাকে কেউ  চিনুক লোক
এখন মদির রেশ      ছায়াতে মিলনের  আকুল অধীরতা        বাড়া সে শোক
কাটিয়ে বাতাসে আজ  মাধুরী আকাশের  মাধুরী অক্ষরের      লেখানো হোক
আমার বুকের থেকে    বুকেতে তোমাদের  মৃত যে অক্ষরের    প্রভাতালোক
ছড়িয়ে পড়ুক আজ   জলেতে শিশিরের নদীর দু’ধারের     কাব্য -অশোক


ছন্দের উঠোন থেকে তুলে এনে আকাশের যোনিতে বসানো
এবং সে বৃষ্টিধর মাথার উপরে এই যে ধারা বর্ষালো  
তা সব অতীতঘেষা, মাহিষ্মতীপুরালোককাহিনিনির্ভর
তাকে মুক্ত করে এই বোবাযুদ্ধে আমার অক্ষর
কান্না হয়ে ঝুলে পড়া অপমান জর্জরিত রুদালি ভাষায়
তোমা সমর্পিত এই অশ্রুভারানত, তাকে ফিরিয়ে দিও না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদেহী গালিবনামা
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

রেখেছি নির্ভার পথ!পাশে বসা অন্ধকার  গলিতে এখন  
আকাশকে খুঁজে ফেরে নিদাঘকালের ক্লান্তি ,মনে হয় তার ;
এ বাড়ির দরজাগুলো এখনো তো পুরোপুরি তোলেনি আগল
আর ঐ মাছরাঙা হারানো শৈশব তার পাথরের বুক ছুঁয়ে থাকা
হিসেবের প্রান্ত দেশে তুমি যে অতীত মেঘ ;ভুলের আঁচল !  
স্বেদজ মুখের ছাপ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত,যেন,বিদেহী গালিব
কানে কানে বলে চলে : “পদ্য এ আমার যদি অর্থহীন হয়, তবু
পরোয়া করি না,
হৃদয়ের আলো নিয়ে আরও আলোকিত হোক
আমার কবিতা”
এখন উদয়াচলে মানুষের লহুস্রোতে ভাসমান অক্ষর আকার
বিবেকমান্যতাহীন দৃষ্টিলব্ধ হিজিবিজি যথাক্রমে বাঁচার প্রয়াস!


“ভালো তবু, খারাপ লোকেরা ; মহৎ হওয়ার কোনও ছল তো করে না”
সুপারি কিলার তুমি ! কি খারাপ! খুন কর নিজের পেশায় ,ছল তো ছিল না,
নিয়োজক অনুভবী, তিনি তো মহান তাই এই কাজে এরকম সুপারি দিয়েছে
তার কাছে রাজবেদী, তার মুখে ওরকম মানুষের গান
.                           শুনে শুনে সকলের হৃদয় মজেছে
ভালো তার সব ভালো, ভট্টজন আরও ভালো
.                            নিজহাতে খুন তো করে না !

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছদ্ম উচ্চতার
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

অনেক, অনেক বড় দেখাচ্ছে তোমাকে!
আসলে যা চাওয়া হয়ে থাকে তার কিছু তো পূরণ হয়
কিছু থাকে নীলের আভাসে  
খেলনা ফড়িং এক এসে বলেছিল সে মহাশূন্যে যাবে
নাসা থেকে কেউ কিছু জানায়নি তাকে
তবু ইচ্ছা গুলো তার
.                      হাওয়ায় উড্ডীন !

অক্ষরের সমতুল ব্যথার আদলে শূন্যে পাড়ি দিতে দিতে
ভাবে সে সততা যদি থাকত ভিতরে তবে পরিণতি ছিল আস্তাকুঁড়  
কী বল আকাশ? কার বুকে এত মোহ? এমন মুদ্গর !
মৃতবৎসা কোল ভরে এ কোন আলোক ! বিশ্বাস বিধুর
সব কিছু ধ্বস্ত প্রায়, কেউ মেঘালোক ভেঙে আষাঢ় সমান
হাঁটু জল পাড়ি দেয়, কেউ ধ্যানমগ্ন অন্তরালে
তবু সে কৌপীনধারী জনকের কাছে
.                             এসে বলে মায়ার প্রকোপ !  
############
হাত তোল কমরেড, দু’মুঠো অন্ন দাও মায়াবী রাঘব।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একটা কবিতা হোক
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

একটা কবিতা হোক মানুষ রঙের
আলজোড়া মেঘ বসুক তার উপর দিয়ে
একটা কবিতা হোক কলকাতা গ্রামের
পূব মিদনাপুর থেকে পশ্চিমেই যাক  
একটা কবিতাজ্যোতি আকাদেমি ছেড়ে
গায়ের জামাটা খুলে দীপ্রমুখ হোক
একটা কবিতা হোক কোনও অঙ্কহীন
নিখাদ অক্ষরের আনন্দে মাতুন
একটা কবিতা এসে এই বঙ্গের
অপুষ্ট ধানের বুক দুধে ভরে দিন।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অসিলোস্কোপিক
কবি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়

সে আমার স্বপ্নলব্ধ তীব্র গালাগালি
কোথায় যে রাখি তাকে গোপন দেরাজ
আট কুঠুরির চেনা ক্লান্ত অলিগলি
######
ঘুরে ঘুরে ব্যতিব্যস্ত উদগ্রীব সমাজ
ভাষণ তৎপর এই মলাট রঙিন
ভূখণ্ডে নিবিড় যার চাহনি সলাজ
######
মহদাবির্ভাবে সব স্বপ্ন মলিন
খসম তুমিই দেবী, বাকি নাগরিক
তোমার বেতারবার্তা তাদের খলিন
######
জেনেছে সবাই আজ,সকলে শরিক
চিন্তন তোমার দেবী অসিলোস্কোপিক
নীল সাদা সমারোহ দেখছে পথিক
######
দেড়েল বুড়োকে টেনে সঙ্গীত তোমার
তোমার বাহার দেবী,কারুণ্য অপার

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর