কবি রণেশ রায়ের কবিতা
*
গড়ে তোলো নয়া-দুনিয়া
কবি রণেশ রায়

পৃথিবীটা আজ পাতাঝরা ধূসর জঙ্গল
দু'পেয়ে সভ্য পশুর ভিড়ে জনসমুদ্র,
ঘাতক ওরা, হায়নার চেয়েও  হিংস্র।
তাদের চোখ থেকে ঝলসে উঠছে-------
ক্ষতবিক্ষত আগুনে ঝলসানো শিশু
যারা ছিল
"কচি লেবুপাতার মত নরম সবুজ" ,
আজ যেন কালচে বাতাপি লেবু
জমাট রক্তের মাংস পিন্ড ।
ধর্ষিতা আমার তোমার কন্যা
পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কচি সবুজ ঘাস,
বিলীন হয়ে গেছে লজ্জা উলংগ সজ্জায়।

আকাশে বাতাসে কান্না শোনা যায়
শরীরে যেন নেশা ছোবল মারে।
আমার চেতনায় টক্ টক্  টক্  -------
কে যেন বলছে,প্রতিশোধ নাও,
অহিংসার মুখোশ পরে বসে থেকো না,
শান্তি চাও তো হিংসাত্মক হয়ে ওঠো
ওদের থেকেও মারাত্বক হোক তোমার ছোবল।
ওদের সঙ্গে মোকাবিলার পর
পৃথিবীকে আবার গড়ে তোলো,
"কচি লেবুপাতার মত নরম সবুজ"
বনানী প্রান্তরের সবুজ ঘাস।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জেগে ওঠ
কবি রণেশ রায়

সূর্য তুমি অট্টহাসি হাসো
ছড়িয়ে দাও হাসি এ ফাগুনে
রোদ্দুর তুমি জ্বল আগুন হয়ে
জ্বলুক জ্বলুক সব সে  আগুনে
আজের পৃথিবীর গর্ভগৃহে
জ্বলে পুড়ুক আবর্জনা যত এ পৃথ্বীতে।

মেঘ, আঁধার শেষে কেঁদে ভাসাও
এ মরু ভেসে যাক  অশ্রুর বন্যায়
তৃষ্ণা মিটুক পোয়াতি মাটির আমার
আগামীতে ফসল উঠুক নবান্নে সবার।

সমুদ্র উত্তাল হয়ে ওঠো
ভাসিয়ে দাও সব ঢেউয়ে ঢেউয়ে
প্রলয় নাচন নাচ
ধ্বংস নামুক সে প্রলয়ে।

পাহাড় কাঁপন তোমার শরীরে
কেঁপে উঠুক পৃথিবী তোমার কাঁপনে
ধ্বংসের সাইরেন বাজুক আকাশে
জঙ্গল উন্মাদ হয়ে উঠুক প্লাবনে।

বাতাস তুমি তুফান হয়ে ওঠো
গর্জে ওঠো মেঘকে নিয়ে সঙ্গে
নেচে চল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে
সূর্য বন্ধু তোমার তার দহনে
সকলে মিলে নামিয়ে আন ধ্বংস
সে যে সৃষ্টির বার্তা এ শুভ লগনে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খুঁজে নাও ঠিকানা তার
কবি রণেশ রায়

ঠিকানা তার পেলে না বন্ধু
পেলে না সন্ধান ঠিকানার
ভোরের আলোয় রাতের জ্যোৎস্নায়
জেনো সে ঠিকানা গচ্ছিত তার।

তাকে খুঁজে পাবে জীবনের স্পন্দনে
বনানী মাঝে নীরব ক্রন্দনে
নদীর প্রবাহে সমুদ্রের ঢেউ এ ঢেউ এ
ঠিকানা তার বাতাসের গুঞ্জনে।

পাবে  তাকে মানুষের কোলাহলে
তার ঠিকানা লেখা আছে পাহাড়ের প্রত্যয়ে
ঠিকানা হেঁটে চলে তার যাত্রাপথে
সে চলে জীবন যুদ্ধে নিশানা ধরে।

ঠিকানা তার পাবে মানুষের সুখে দুখে
সে ঠিকানা লেখা আছে জীবনের প্রচ্ছদে
ঠিকানা আমাকে জানিয়ে যায়,
আমাকে খুঁজে পাবে যখন বর্ষা ঘনায়।

যদি না পাও ঠিকানা কোথাও
খুঁজে দেখ তাকে নিজ চেতনায়
অভিমানী সে চেনো নি তাকে
ঘুমায় সে  হৃদয়ের কৃষ্ণ গুহায়।

খুঁজে নাও তাকে আজের এ নিশি বেলায়
আগল ভাঙ্গ হৃদয়ের দরজার
আমিও আছি তোমাদের সঙ্গে রাত শেষে
নতুন ভোরের উদয় বেলায়।

মাতৃগর্ভে নতুনের আগমন বার্তায়
পুরানো তোমার বিদায় লগনে
বাতাসে নতুন কিশলয়ের দোলায়
ঠিকানা তার খুঁজে পাবে নব বসন্তে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছায়ামূর্তি
কবি রণেশ রায়

আলো আঁধারে ছায়াপথ ধরে
চলতে থাকে ছায়ামূর্তি পথ হাতড়ে
হঠাৎ আলো উধাও হয়ে যায়
অন্ধকার ঘুটঘুটে বেঁধে এসে বর্শা হয়ে
ছায়ামূর্তি উপরে নেয় বর্শা অন্ধকারের বুক চিরে
ছুঁড়ে দেয় পথের ধারে পাথরের বুকে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আগামী
কবি রণেশ রায়

অন্ধকার ঘুপচি ঘর
সুখ দুঃখের বারমাস্যা,
দিনের আলোর প্রবেশ নিষেধ।
সূর্য অস্ত যায়-----
দিনশেষে সন্ধ্যা নামে
অন্ধকার গাঢ় হতে থাকে।

আকাশে বজ্রাঘাত বাতাসে তুফান,
ঘরে সন্ধ্যাদীপ জ্বলে।
আঁধার দূর হয়
ঘুমন্ত শিশু জেগে ওঠে,
আগামী কথা বলে গৃহস্থের ঘরে
কবিতা শব্দে সেজে ওঠে
নতুন পাতায় ভাষা পাবে বোলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নতুন ঠিকানায়
কবি রণেশ রায়

সমুদ্রের ফেনায় ফেনায়
মেঘের তুলোর ভাজে ভাজে
জ্যোৎস্নার আগমন বেলায়
খুঁজে পাবে আমার ঠিকানা,
বর্ষায় ভিজে মনকে রাঙিয়ে
চলে এসো তুমি
সে যে আমার হৃদয় মোহনা।
চাতকের পিপাসা তোমার ভালোবাসা
মনের আকাশে বারিসিন্ধু চোখে অশ্রু হয়ে
মেঘে ভাষাও বৃষ্টি সুধা
ভাবিকালের অদম্য আশা।

আবেশে ছোঁয়া যত কথা
তোলা আছে হৃদয় দেরাজে,
হয়ে আমার তরুলতা,
উজাড় করে দাও রেখ না লুকায়ে।

রাতের প্রহরে সবই যে এলোমেলো,
আমার এ ঠিকানায়
আসবে তুমি সব কিছু গুছিয়ে
মাঘ শেষে ফাগুনের স্পর্শ ছড়িয়ে।

ব্যথাতুর মন কিছুই যে চায় না
সে থাকে অপেক্ষায়
শুধু ভালবাসা এক কণা
তৃষ্ণার্ত সে তোমার ভালোবাসায়।

নিঃশব্দ প্রহর ডেকে ফেরে
অতীত সে তোমার স্মৃতির আঙিনায়
সেদিনের ভোরের সে লাল পলাশ
আজ আবার নিজেকে দিয়েছে মেলে
আমার নতুন ঠিকানায়
রাঙিয়ে তুলেছে নতুন জীবনের আশ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ ইচ্ছা
কবি রণেশ রায়

সুখ দুঃখের পথ ধরে
সময়ের খেয়া বেয়ে
নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
আমরা মিলি গিয়ে মোহনায়।

আমরা চলি সুদূর সে দিগন্তে
সমুদ্র পার হয়ে এপার থেকে ওপারে
বনানী মাঝে যেখানে নীরব আঁধার-----
ঘনিয়ে নেয় অপার এক দূরত্ব
এ পৃথিবী থেকে দূরে বহুদূরে
আকাশের ওপারে আকাশে
মেঘের ওপারে মেঘে।

কে যেন পাশে এসে বসে
বলে, "এতদিন আসনি কেন" ?
পাহাড় শৃঙ্গে ঝর্নার মত
চুল তার দখিনা বাতাস
মুখ তার  কবেকার তুষার শুভ্র সকাল
মন তার শিশির ভেজা সন্ধ্যা।

সূর্য অস্ত যায় সন্ধ্যা আসে
লেনদেন শেষে ব্যাপারীরা ঘরে ফেরে
ফুরায় এ জীবনের সব লেন দেন ;
রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসে,
আমি বলি,
"ক্লান্ত আমি শ্রান্ত
তোমারই দেওয়া সময়ে আজ আসা হ'ল আমার,
কোলে মাথা রেখে একবার ঘুমোতে চাই"।

দিন শেষে সন্ধ্যার রক্তরাগে
পাখির ডাকের মত শব্দ ভেসে আসে
জীবনের সব রং মেলে এসে অন্ধকারে
ভাষা হারা শব্দ জোনাকির গানে কেঁদে মরে
জীবনের পাণ্ডুলিপি ইতিহাসের গহবরে
মিলি এসে আমি আর সুকন্যা হৃদয় দুয়ারে।

সময়ের সাথে নদী এসে মেলে মোহনায়
সুকন্যার কোলে মাথা রেখে আমি ঘুমাই
তাকে যে পেয়েছি আজের জোছনায়
শেষ ইচ্ছা পূরণ আমার
আর কোনোদিন জাগব কি না জানা নাই।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এমনি সে রাতে
কবি রণেশ রায়

এমন উজ্জ্বল জ্যোৎস্না আমি দেখিনি আগে
বৈশাখী সে রাতে তুফান বন্ধু তার
নক্ষত্ররা হাসিমুখে খেলা করে রাত ভরে,
মনটা উপচে পড়ে উদার আগ্রহে
আছড়ে পড়ে তীরে সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে,
দরজার আগল ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায় জনকোলাহলে:
আবার মনে হচ্ছিল আগল নেই দরজার
অসংখ্য তারারা এসে বসেছে ঘরে আমার ।

খসে পড়া নক্ষত্ররা জেগে উঠেছিল সে রাতে আকাশ ভরে
হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মুখ আমি দেখেছি সে  নক্ষত্রের মাঝে
পাহাড় শিখরে অষ্টাদশীর চোখের ইশারায়
ঝলমল করছিল তারার মত চোখের চাহনি তার,
জ্যোৎস্না রাতে পৃথিবীর ওপরে আকাশজুড়ে
জেগে উঠেছিল আগামীর আকাঙ্খা আমার
এমন উজ্জ্বল জ্যোৎস্না আমি দেখিনি আগে আর।

যে নক্ষত্ররা কোন সে অতীতে খসে পরে
জন্ম নিয়েছে এ পৃথিবীর নিবাসে
তারাও আজ আগল ভেঙে আকাশকে সঙ্গে নিয়ে
বসেছে এসে এ দীনের ঘরে ।
যে যুবকদের আমি দেখেছি ফ্রান্সে সোভিয়েতে
তারাও এসেছে জ্যোৎস্নার এ রাতে স্বাধীনতার বাণী নিয়ে
অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘ লাইন দিয়ে
মৃত্যুকে তুচ্ছ করে জীবনের গানে গানে।

বিস্ময় আমার, অভিভূত আমি সে রাতের দূর্জয় জয় গানে,
আকাশের অনন্ত শূন্য গহ্বরে
পৃথিবীর সব আবর্জনা হারিয়ে যায় যেন,
জ্যোৎস্না রাতের সে তুফান এসেছে আমার দুয়ার ভেঙে
আমার হৃদয়ের কাশবনে আকাশ থেকে নেমে
তুফানের হুঙ্কারে আগামীর বার্তা নিয়ে।

হৃদয় সিক্ত আমার  ভোরের শিশিরে শিশিরে
দিগন্ত উদ্ভাসিত সকালের  সূর্যের কিরণে
প্রিয়তমার গভীর ভালবাসার ছোঁয়ায়
তুফানের সে উন্মক্ত গর্জনে
জ্যোৎস্নার আলিঙ্গনে ভোরের আগমনে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আবার পঞ্চাশ বছর পর
কবি রণেশ রায়

আবার পঞ্চাশ বছর পর
যদি তুমি আমার দুয়ারে ----
সূর্য অস্তমিত পশ্চিমাকাশে
আবার পঞ্চাশ বছর পর
তুমি পাবে না আমাকে।

দুয়ার বন্ধ আমার চিরতরে
খাঁচার পাখি কবে গেছে উড়ে
আমার যাত্রা সেদিন অনন্তের পথে
আমি সারথী যাত্রা রথে।

নক্ষত্র দাঁড়িয়ে আকাশে খোলা প্রাঙ্গণে
ছায়া বিছিয়ে তোমার অপেক্ষায়
আবার পঞ্চাশ বছর পর
তুমি পেতে পার আমাকে সে ছায়ায়।

সেদিন জেনো নিশ্চিত
গরানের জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে
বহুতল ন্যাংট হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে
নদী নেই তার প্রবাহে আর
রাতের আঁধারে চাঁদ বাঁকা হাসি হাসে
কবিতা হারিয়েছে ছন্দ তার ।

আবার পঞ্চাশ বছর পরে
যদি তুমি খোঁজ আমাকে -----
দুয়ার বাইরে বহু দূরে আকাশ দিগন্তে
পেতে পার আমাকে
কল্পনার মালা গেঁথে বাতাসের তুফানে।

অথবা পেতে পার বনানী মাঝে
সবুজে সবুজে শীত শেষে নতুন কিশলয়ে
কোন এক বসন্তের সন্ধ্যায়
তুমি সেদিন বনলতা আমার ।

জ্যোৎস্নার রাতে আবার মুখোমুখি দুজনায়
চুল তোমার তুষার শুভ্র
রাত শেষে উদয়ের পথে যাত্রা তোমার
আমি বসে একাকী নিরালায়।

আবার পঞ্চাশ বছর পরে
যদি তুমি খোঁজ আমাকে -----
দুয়ার বাইরে বহু দূরে আকাশ দিগন্তে
পেতে পার আমাকে
কল্পনার মালা গেঁথে হৃদয় দুয়ারে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালের সমাধিতে
কবি রণেশ রায়

যদি তোমরা বল,
এ অহংকার তোমার,
আমি বলি, হ্যাঁ অহংকারী আমি,
এ অহং আমার।
আমি দ্রষ্টা আমি দৃষ্টি
আমি স্রষ্টা আমি সৃষ্টি
মেঘ ভেঙ্গে নামি বৃষ্টি;
আমি করি না তোয়াক্কা কার,
পর প্ৰজন্মতরে
আমি রেখে যেতে চাই
যা আছে আমার।
এ যে বহমানতা,
চাই আমি আমার উত্তরাধিকার,
জন্ম জন্মান্তর ধরে
নদীর প্রবাহ এ যে
এ যে চলমান স্রোতধারা,
এ যে  জীবনের গতি আমার,
নয় এ বদ্ধ কারা
নয় তা কূপের অন্ধকার,
যদি না আমার অহংকার
যদি রেখে যেতে না পারি কিছু
বৃথাই জনম আমার।

যদি বলো, তুমি অতিবিনয়ী,
হ্যাঁ অতিবিনয়ী আমি,
বিনয় যে প্রতিবেদন আমার,
বিনয় আমার অহংকার
বিনয় যে পথিক পথ চলার।
যদি পর প্ৰজন্মতরে
রেখে যেতে পারি কিছু
গ্রহণীয় কিছু থাকে
গ্রহণ কোরো তাকে,
যদি বর্জনীয় হয়
দ্বিধা কোরো না বর্জনে,
আমি পড়ে থাকি পরিত্যক্ত
মরি না আমি শরমে,
সময়ের প্রয়োজনে
উপযুক্ত করে নিও
যা রেখে যাই আমি,
সংকোচ কোরো না তাতে,
খসে পড়ুক আমার অহংকার,
আজও আমি চাই শিখতে
যা হয়নি শেখা এখনও আমার,
জানি আমি শেষ নেই শেখার
শেখাই আমার মূল অধিকার,
পূর্ণিমার রাতের জ্যোৎস্নায়
আমার কালের সমাধিতে
আমি বাঁচি শেখার আশায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর