সর্বব্যাপী এক সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে ঘোর অন্ধকার যারা করে গোলামী তারাই চালায় রাজ আজ যারা আজ সন্ত্রাসবাদী তারাই সমাজদার। বোঝে না কিছু যারা সবই আজ বোঝে তারা অন্তঃসার শূন্য প্রাণ যাদের প্রেম প্রীতি ভালোবাসা নেই প্রাণে সমাজ চলে না আজ তাদের ছাড়া।
যারা মানুষকে ভালোবাসে, মনুষ্যত্ব যাদের হৃদয়ে এখনো সোজা যাদের শিরদাঁড়া সত্য যাদের জীবনে ধ্রুবতারা তাদের স্থান আজ রাষ্ট্রের অন্ধকার কারা।
এমনি করে কতদিন চলে আর ! নিতে হয় দুনিয়াটাকে বাঁচাবার দায় চল করি সন্ধান নতুন সে দুনিয়ার লড়াই ছাড়া আসবে না সে দুনিয়া রক্ত দিলেই পেতে পারি সন্ধান সে দুনিয়ার।
তুমি কে? তোমাকে চিনি না আজ, এ কি তোমার সুদূরের সাজ? ছিলে ধরনীতে ধূলিকণা এক শিকড় ছিল নিচে বহু নিচে, দাঁড়িয়ে থাকতে শিরদাঁড়া সোজা করে আমরা ছায়া পেতাম তোমার বাহুর নিচে।
আজ তুমি এখানে নেই শিকড় ছেড়ে ওপরে কোন সে ওপরে প্রিয়জন বন্ধু ছেড়ে চলে গেছ নক্ষত্র লোকে, অসংখ্য নক্ষত্র মাঝে তুমি এক নক্ষত্র দাস; আলো নেই নিজের, নেই সে সৌরভ শিরদাঁড়াহীন তুমি, পর গৃহে বাস, পরের আলোয় চমক তোমার, পরাশ্রয়ী পরগাছা তুমি তুমি এক অবিশ্বাসী অনুচর।
বলি তোমায় শোন প্রিয় সেদিন সেই নক্ষত্ররা যারা আকাশ চ্যুত, মরে গেছে সেদিন তারা বেঁচে উঠেছে আবার এই পৃথিবীতে শিকড় পেয়েছে এই মাটির নিচে, জলে হাওয়ায় মানুষের যত্নে নিজেদের গড়ে তুলেছে নিজেরা স্বাধীন তারা মুক্তবায়ু সেবনে। যদি তুমি খসে পর ওখান থেকে তবে নিশ্চিত যেন বন্ধু, তোমার জন্য কবর খোঁড়া এ মাটিতে প্রাণ ফিরে পাবে না আর, থাকতে হবে মমি হয়ে বিশ্বাসঘাতকের তকমা নিয়ে।
দিন শেষে অনেক ঘেঁটে ঘুঁটে অবশেষে খুঁজে পেলাম খাতাটা, পড়ে ছিল পাংশু মুখে আলমেরার পেছনে, জীবনের ইতিহাস লেখা আছে তাতে কিন্তু সেখানে আজ পেলাম না তোমাকে।
তবে মনে পড়ে ভোরের সকালে যখন সব রং মুছে দিয়ে পৃথিবী উজ্জ্বল সোনালী রঙে নিজেকে নেয় রাঙিয়ে তখন তোমার পৌরুষ সূর্যের কিরণে; সূর্যগ্রহণে পৃথিবী যেমন মলিন আমিও মলিন তোমার গ্রহের ফেরে।
তারপর গ্রহমুক্তি আমার, আমি উঠে দাঁড়াই নিজ পায়ে খুঁজে ফিরি নিজেকে নিজ চেতনায়, তুমি মলিন হতে থাক আমার ইতিহাসের পাতায় মুছে যেতে থাক আস্তে আস্তে, তাই খুঁজে পাওয়া খাতাটায় তুমি অন্তর্হিত খুঁজে পাইনা তোমাকে সেখানে।
তাইবুঝি জীবন খাতাটা হারিয়ে যেতে চায় পড়ে থাকে অবহেলায় আমার চোখ এড়িয়ে, কিন্তু সে আর যাবে কোথায় ! সত্যিটা যে লেখা আছে সে ছেঁড়া পাতায়।
আজ আমি আত্মনির্ভর, ঔজ্জ্বল্য আমার নিজ ভাবনায় আমাকে পাওনা তুমি তোমার ছায়ায় তুমিও নেই আমার জীবন খাতায় সে সত্য স্পষ্ট লেখা তোমারও জীবন খাতায়।
প্রিয়তমা নীলাঞ্জনা, কোথাও যে পাইনি খুঁজে, হারিয়ে গেলে অন্ধকারে কোথায়, সীমান্ত ‘পারে? আলের পথ ধরে ধানক্ষেত পেরিয়ে এসেছিলে এ পারে, তবে কি পথ ভুলে চলে গেলে অজানা পথে? দিবা অবসানে অস্তাচলে, ডুব দিলে কার অন্বেষণে?
নীলাঞ্জনা, এখনও তোমার চোখের ইশারায় আমি খুঁজে পাই পথ যে পথে তুমি ছিলে আমার অপেক্ষায়। তুমি এসেছিলে কাঁটাতার পেরিয়ে, সীমান্ত ওপারের সে মেযে, মিলেছিলে এসে এ কাফেরের সাথে প্রেমের বন্ধনে পরস্পর আলিঙ্গনে, ঘুচিয়ে দিয়েছিলে পার্থক্য জল আর পানিতে তোমাতে আর আমাতে, তবে আজ কেন রচ ব্যবধান বহমান নদীতে, জল আর পানির কেন এ তফাৎ? কেমনে হারিয়ে ফেল সে পথ যা ছিল তোমার আমার।
আজ কাঁটাতার মাঝে দুজনে দুপারে ঘন কুয়াশায় চোখে অন্ধকার ঘনায় কেউ দেখি না কারে তবু আজও বাজে শ্রবণে ভৈরোর গান সুখ দুঃখ বাদ বিবাদ বিরহ মিলন বেজে ওঠে মিলনের গান বহুত্বের তারে সেতারের মূর্ছনায় থাকি অপেক্ষায় কবে কাঁটাতারের বাঁধন ছিড়ে মিলব এসে ঐক্যের কুঞ্জ বনে।
২
নীলাঞ্জনা, দেখা দিয়েছিলে সেদিন সেদিন সে তুফান ঝঞ্জায় তন্বী তনয়া তুমি বার্তা ছিল চোখের ইশারায়, প্রতিশ্রুতি, আমাদের প্রত্যয়ী চেতনায় গঙ্গা পদ্মা মিলবে এসে মোহনায় মেঘনার পানি মেটাবে তৃষ্ণা, ব্রহ্মপুত্রের জলের মিলন আঙিনায় তোমার আমার মিলন সে বেলায়।
কিন্তু নীলাঞ্জনা, আজ! জল আর পানির বিবাদ বেলায় তুমি ছেড়ে গেলে আমায় ধরে রাখতে পারি নি আমিও ভুলেছি তোমায় বিরহের কান্না সে বাসর শয্যায়।
জীবনের অস্তাচলে আজ মুখ তোমার 'শ্রাবস্তীর কারুকার্য' মুখোমুখি অন্ধকার সাজ, তবু শুনি সেই মহাকালের ডাক তোমার তুষার শুভ্র ভোরের আঙিনায় আজের এ বিরহ বেলায় আমাদের ভাষা আজ কথা হারা, আমি থাকি তোমার অপেক্ষায়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, আজ সভ্যতার এই কাল বেলায় প্রস্তুতি দেখি না সে মিলনের অপেক্ষায়, আমাদের আজের এই শেষ প্রান্তে পরপ্রজন্ম কি মিলতে চায়, ফিরে কি যেতে চায় হারিয়ে যাওয়া মিলন আঙিনায়? না নিজেরাই হারায় বিভেদের খেলায়।
মা, তুমি সবসময় ভালো থাকো সারাদিন কাজের পরও ক্লান্তি নেই কোন, নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে শুধু সংসার ! সংসার সুরভিত তোমার সুবাসে সুললিত তোমার হাতের স্পর্শে আমরা গড়ে উঠি তোমার যত্নে তোমার শ্রমে স্বার্থ সিদ্ধি সকলের কিন্তু তোমার অস্তিত্ব পর্দার আড়ালে লুটিয়ে থাকে মাটিতে।
মা, তুমি আর ভালো থেক না তোমাকে ভালো থাকতে দেখতে চাই না এবার তুমি একটু খারাপ থাক; এই ধর নিজের পছন্দে খাওয়া পরা থাকা নিজের কিছু ভালো লাগা, ভালো লাগার জায়গায় বেড়াতে যাওয়া নিজের দিকে একটু নজর দেওয়া, তোমার ভালো লাগার সঙ্গে সবার ভালো লাগা মিলিয়ে দেওয়া, সংসার বাগানে সবার সঙ্গে নিজেরও ফুটে ওঠা।
তুমি তো ভালো গান গাও সন্ধ্যে হলে গান নিয়ে বসা, নিজেকে নিজের মত গড়ে তোলা, নিজের পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করা, মা, নিজের জন্য একটু সময় দেওয়া।
মা, তুমিও যে একটা স্বাধীন সত্তা ! তুমি যদি একটু খারাপ থাক আমি যে আরও ভালো থাকব, তাই আমার ইচ্ছে তুমি একটু খারাপ থাক সেটাই যে ভালো থাকা তোমার ভালো থাকা আমাদের সবার একটু ভেবে দেখ, একটু খারাপ থাক এস গড়ে তুলি সবাই মিলে এ সংসার।
আমি পথ চলি অবিরাম অজান পথে যাত্রা আমার অতীতের পথ ধরে বর্তমান আমি থাকি ভবিষ্যতের আশায়; হাজার যোজন আমি চলেছি পদব্রজে ভারতের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে, পথিক আমি খুঁজে ফিরি পথ জনপদ ধরে শস্য ক্ষেত পেরিয়ে জঙ্গল বিহনে সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে চড়াই উৎরাই পথে পর্বত শিখরে।
পরিচয়হীন ক্ষুদ্র আমি, খুঁজে পাই না পথ, তাও চলা আমার অজান সে পথে যে পথে চলা হয় নি আগে, নই আমি জ্ঞানী নই আমি গুণী নই আমি অশরীরি কোন শক্তিমান; আমার চলার পথে মাটির গন্ধ আমি পাই মানুষের রক্ত ঘামে রাঙাই নিজেকে খুঁজে ফিরি বন্ধু সুজনে বহুত্বের বীণায় একতারার বন্ধন আমার।
দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে এসেছি নদী মোহনায় যেখানে জ্যোৎস্নার রাতে ব্রহ্মপুত্র এসে মেলে গঙ্গায় কাবেরিকে দেখি কৃষ্ণার আলিঙ্গন মেলায়, তৃষ্ণার্ত আমি বহুদূর পথ হেটে ক্লান্ত যমুনার শীতল জল তৃষ্ণা মেটায়; কন্যা কুমারী থেকে কাশ্মীর যাত্রা আমার আমি পথ চলি অন্ধকার তমসায় বিন্ধ পর্বত পার হয়ে আমি পথ চলি পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায়, কোনারকের সূর্য মন্দির হয়ে পৌঁছে যাই তাজ দর্শনে আগ্রায় যাত্রা আমার খাজুরাহের আদিম কামনায় সেখান থেকে হিমালয়ের পাহাড় চূড়ায় আমি উপস্থিত সূর্যের জ্যোৎস্নায়।
একদা তক্ষশীলাবাসী আমি আমি নালন্দায় জ্ঞান পিয়াসী আমি ছিলাম জ্ঞানের সন্ধানী ছিল আমার যশের আকুতি।
বুঝি আমি জ্ঞান আমার নিজ গৃহে রক্তে ভিজে ভেজা মাটির গন্ধ শুকে, আজ তাই বাস আমার বাংলার নগর প্রান্তে নিজ মেহনতে বাঁচি আমি কোন এক কলে, মাঝে মাঝে যাই আমি ওপারে ধানক্ষেত পেরিয়ে এ গ্রামে সে গ্রামে, খুঁজে ফিরি বন্ধুকে।
অন্তহীন এ যাত্রা আমার, মাতৃগর্ভে অন্ধকার পেরিয়ে দিনের আলো ধরে জন্ম থেকে মৃত্যু আদি থেকে অন্ত শৈশবের খেয়া বেয়ে কৈশোরের প্রাঙ্গনে। উদ্ধত সে যৌবনের রথে আমি সওয়ারী জীবন যুদ্ধে আমি এক সৈনিক।
যারা চলে গেছে লড়াইয়ের পথ ধরে নিজেকে দেয় নি বিকিয়ে রক্ত ক্লান্ত সে পথে যাত্রা যাদের আমি থাকি তাদের সাথে আমার চেতনায় আমার মননে খুঁজে ফিরি তাদের নক্ষত্র মাঝে জনকোলাহলে।
পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে এখানে মৃত্যুর চিহ্ন আজও দেখা যায় রক্তের অক্ষরে লেখা হয়ে আছে ; সূর্যের দহন, বাতাসে তুফান, আকাশের বর্ষা, গৃহস্থের ঝাঁটা, যমের সমন কিছুই মুছতে পারে নি সে দাগ।
ঘরের সামনে রাস্তাটায়, নারকেল গাছের গোড়ায় অমলিন সে চিহ্ন বুকে এঁকে গেছে ; মৃত্যুঞ্জয়ী সে দাগ পোড়ে না আগুনে, ঢোকে না কবরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে আকাশ মুখে খুঁজে ফেরে নতুন সূর্যোদয়, আজও সে দাগ ডেকে ফেরে স্লোগানে মিছিলে শহীদের পদধ্বনি আকাশে বাতাসে স্মৃতি হয়ে বাঁচে আমাদের স্নায়ুতে।