কবি রণেশ রায়ের কবিতা
*
তুমি এসো এ পথে
কবি রণেশ রায়

এ সমাধি পথ ধরে
ওপথে ওরা গেছে চলে
আজ ওপথে যেও না তুমি বিষ কন্যা
ও পথে তোমার বন্ধুরা অপেক্ষায়
জাগিও না ওদের
তারা চির শান্তিতে ঘুমায়।

তুমি কবে আসবে এ পথে
ফিরে আসুক সবুজ
এ জন বনানী প্রান্তরে,
তারপর যেও তুমি ওপথে
বাতাসের ওপারে বাতাস
আকাশের ওপারে আকাশ,
রক্ত আর ঘামের সঙ্গম মেলা সেখানে
তুমি চলে যেও সেখানে
তোমার বিষ উগরে দিয়ে
নিজেকে উজাড় করে
সব যন্ত্রণা শেষে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছোট্ট একটা কথা
কবি রণেশ রায়

ছোট্ট একটা কথা 'হ্যালো'
একটা পরমাণু মাত্র
আকাশে বাতাসে সাগরে পাহাড়ে
স্নায়ুর জঙ্গলে
ঘুরে ফেরে সর্বত্র
প্রচন্ড দূষণের বিস্ফোরণ
হয়ে চলে রক্তক্ষরণ।

একটা মাত্র আঙুলের চাপ
ছোট্ট একটা কথা 'হ্যালো'
অনুভবে তোমার নীরব তাপ
এক বিপুল সম্ভবনা
অদৃশ্য মহাশক্তির আক্রমণ
ঘরে ঘরে দেয় হানা
ভয়ংকর নীরব শব্দের স্খলন
সভ্যতার পদস্খলন
আকাশ বাতাস জঙ্গল পাহাড়
স্নায়ুর জগতে দূষণ
ঘটে চলে অনির্বান
তুমি আমি নির্বিকার
ঘরে ঘরে মনোরোগের হাহাকারে
শিশুরোগের আক্রমণ নিজ দুয়ারে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মালা গাঁথা
কবি রণেশ রায়

কবিতা আমার স্মৃতির খেয়া বায়,
বিস্মৃতির অন্ধকার অতলে
অনিশ্চয়তার তরী বয়ে যায়,
জানা অজানার সমুদ্র মন্থন তার,
চেনা অচেনা কত না বিস্মৃত কথা
কত না শব্দের ভান্ডার,
ঘুমিয়ে রয় স্নায়ুর শয্যায়।
আজ গোধূলি এ বেলায়
জীবনের অনিশ্চিত এ খেলায়
স্মৃতির প্রাণ স্পর্শে কবিতার প্রত্যয়ে
ফুটে ওঠে ফুল চেতনার গালিচায়,
জীবনের প্রচ্ছদে
সে ফুলে মালা গাঁথা কবিতায়।
দূর হয় আঁধারের কালো
আমার কবিতার প্রাঙ্গনে
জ্বলে ওঠে নবজীবনের আলো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যদি হতাম
কবি রণেশ রায়

যদি আমি হতাম তোমার ইয়ে
দৌড়ে এসে ধরতে আমায়
বাঁধতে শিকল দিয়ে।

যদি হতাম তোমার পায়ের ঘুঙুর
নাচতাম আমি তালে তালে
হাতে নিয়ে মুগুর।

যদি হতাম তোমার বুকের পাঁজর
তাক ধিনা ধিন ধিন
তোমায় পেতাম
রাত জ্যোৎস্নায় বাসর।

যদি হতাম তোমার চোখের জল
ঝর ঝরিয়ে নামতাম আমি
হয়ে জলের কল।

যদি আমি হতাম তোমার প্রেম
ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা!
সবাই বলে সেম সেম।

যদি হতাম তোমার আঁখি
ওই আঁখিতে দেখতাম আমি
দিলে কত ফাঁকি।

যদি আমি হতাম তোমার মাথা
বলিহারি বুদ্ধি আমার
থাকতে হত বাধা।

আর যদি হতাম তোমার স্বামী
কোথায় যে পালিয়ে যেতাম
জানি না তা আমি।

তবে যদি হই তোমার প্রিয়
চাইবো না আর কিছু
হৃদয়ে তোমার একটু জায়গা দিও।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফোটে যেন
কবি রণেশ রায়

যে কলি ফোটেনি আজও পুষ্টির অভাবে
পুষ্টি যোগাও তাকে
ফোটে যেন অনাগত ভবিষ্যতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নারী
কবি রণেশ রায়

নারী, তুমি সরব হও
শব্দ হয়ে বাজ
সুর ছন্দ লয়ে
মিছিলে মিছিলে
প্রতিবাদ প্রতিরোধে।

নারী, তুমি স্পর্ধা হয়ে ওঠ
স্পর্ধিত কন্ঠস্বরে আপন ভাষায়
নিজেকে জানান দাও
আপন সত্তায়
নিজের ভাবনার গালিচায় ।

নারী, তুমি ফুল হয়ে ফোট
সৌরভ ছড়াও জীবনে সবার
তুমি মেঘ হয়ে বর্ষাও
মরুভূমির সরোবরে
তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মেটাও।

নারী, তুমি তুফান হয়ে ওঠো
জ্বলে উঠুক দাবানল তোমার রোষে
হয়ে ওঠো বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ
আঘাত হানো পুরুষের "পৌরুষে"
ছিনিয়ে নাও নিজ অধিকার
আপন ক্ষমতা বলে
ভেঙে কর সব চুরমার।

নারী, তুমি সাম্যবাদের পূজারী
সাম্যবাদ তোমার সৃষ্টির ইতিকথায়
সাম্যের লড়াই তোমার জীবন সংগ্রাম
শ্রেনিযুদ্ধ তোমার চেতনায়।

নারী, তুমি ধ্বংস তুমি সৃষ্টি
এ অনাবৃষ্টির আকাশে
মেঘ ভেঙে নাম তুমি বৃষ্টি
অনাসৃষ্টির মাঝে আজ তুমি সৃষ্টি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সে নিয়েছে বিদায়
কবি রণেশ রায়

শীতের রোদ্দুর আমার শৈশবের সহপাঠিনি,
সকাল হলেই
এসে বসতো আমার সঙ্গে পূবের ঘরটায়,
আমি ছড়ার বইটা খুলে বসতাম পড়তে;
ও উপুড় হয়ে আমাকে চুম খেত,
আবদার আমার সঙ্গে ছড়া কাটবে
পড়তে শিখবে অ আ ক খ।
আমাদের এই বাড়াবাড়ি দেখে
বাবা দরজায় খিল দিয়ে দেয়,
ও আর ঘরে ঢোকে না।

আমার তখন কৈশোর, ও কিশোরী সূর্য তনয়া,
লুকিয়ে আসত, বারান্দা দিয়ে তার ইশারা,
তখন আমার বর্ণ পরিচয় শেষ
হাতে আমার দেহ তথ্যের  বই;
বাবার নির্দেশে পাশের বাড়ির কাকা দেওয়াল তোলে
ও যাতে আসতে না পারে,
তাও ও আসতো পাচিল টপকে,
গুটি গুটি পায়ে একফালি রোদ্দুর,
আমাদের প্রেমের ঘনত্ব টের পেত না কেউ।

তখন আমার যৌবন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই
এবার প্রমোটার বাদ সাধলো,
দেওয়াল ভেঙে তুলে দিল বহুতল বাড়ি,
রোদ্দুরকে দিলো  চির বিদায়।
আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল রোদ্দুর,
আমার শাশ্বত প্রেম।

আমি স্যাঁতস্যাঁতে  ঘরে,
ইতিমধ্যে বাবা মা দুজনেই নিয়েছেন বিদায়,
এখন আমার বার্ধক্য,
রোদ্দুরের অভাব সর্বশরীরে,
হাঁপানি ধরেছে,
মনে পড়ে রোদ্দুরকে কিন্তু পাই না কাছে;
শুনেছি সেও বিরহিনী,
কেঁদে ফেরে মেঘের আড়ালে
মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়ে নামে
আমার তৃষ্ণা মেটে,
তবে শ্রাবণ নিয়েছে বিদায়
জীবনের এ মরু প্রান্তে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ কি দেখি
কবি রণেশ রায়

তুমি ছিলে পদাতিক
সৈনিক বিপ্লবের,
রক্তলাল নিশান হাতে
মিছিলে মিছিলে দৃপ্ত পদক্ষেপে
সম্মুখ গমন তোমার
তোমার কবিতার রঙে
রাঙিয়েছ আমাকে
শোষণ নিপীড়নের ক্ষত থেকে
রক্ত ঝরত তোমার বুকে।

আজ এ কি দেখি!
রাজসভায় আমন্ত্রিত তুমি
রাজভোগে তোমার ভাগ,
গিরগিটি বাসা বাঁধে
তোমার স্নায়ুর আকাশে
তুমি করে চল রাজার গুনগান
চেটেপুটে খাও রাজপ্রসাদ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তাও সে লেখে
কবি রণেশ রায়

কবি বুভুক্ষু
পাঠক জোটে না
তাও সে লিখে যায়।

কবি বিবস্ত্র
কাপড় নেই পরনে
তাও সে হেঁটে বেড়ায়॥

কবি তৃষ্ণার্ত
জল পাবে কোথায়
আকাশ পানে চায়।

কবি ক্ষুধার্থ
খাবার জোটে না
কবিতা খাবার জোটায়॥

কবি দৃষ্টিহীন
তাও সে দেখে
সে দেখে কবিতায়।

কবি আহত
তাও সে লড়ে
লড়ে মসি চালনায়॥

কবির ঘুম নেই
সে রাতের প্রহরী
সে লিখে যায়।

কবি মূর্খ
বোঝে না কিছু
তাও বোঝে কবিতায়॥

কবি সব হারা
তাও আছে সব
সব মেলে কবিতায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমি
কবি রণেশ রায়
রচনা ৪.৬.২০২২।

নজরুল স্মরণে

তোমরা বল, আমি সমাজবিরোধী
আমি রাষ্ট্র বিরোধী, আমি রাষ্ট্রদ্রোহী,
হ্যাঁ, আমি রাষ্ট্রদ্রোহী আমি বিদ্রোহী
আমি বিশৃঙ্খল, মানি না কোন শৃঙ্খল
আমি অনিয়ম আমি উশৃঙ্খল,
আমি মানি না অন্যায়
অন্যায়ের জগতে আমি ন্যায়
শোষণের কারাগারে আমি সন্ত্রাস
তোমার সন্ত্রাসের রাজে আমি ত্রাস।
আমার চোখে তোমার সর্বনাশ
আমার শৌর্য তোমার বিনাশ,
আমি আশা আমি নিরাশা
সব হারার হৃদয়ে আমি ভরসা
সূর্যোদয়ের পথে আমার যাত্রারথ
ভগবানের কাছে চাই আমি কৈফিয়ত,
আমার নেই আচার নেই আমার বিচার
জানি সেটা আমার স্বেচ্ছাচার,
আমি দলে যাই তোমার রাজ, আমি স্বরাজ
ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টিই আমার সাজ।
তোমার হিংস্র বুকে এঁকে যাই পদচিহ্ন
জনকোলাহলে আমি অভিন্ন,
আমি হট্টগোল আমি কোলাহল
আমি দুর্বার আমি বাহুবল,  
দেশমাতৃকার হৃদয়ে আমি অবুঝ
বর্ষার বনানীতে আমি সবুজ,  
জৈষ্ঠ্যের দুপুরে আমি সূর্যের দহন
বসন্তের সন্ধ্যায়  বয়ে চলি পবন।
আমি অগ্নি বীণার সুরের আগুন
আমি বিদ্রোহীর বসন্তের ফাগুন
আমি রূপসী কন্যার আঁখির চুম্বন
দৃষ্টি হারার দৃষ্টি অনুক্ষণ,
আমি ভেঙে চলি সব বন্ধন
পান্নার সন্ধানে আমার সমুদ্র মন্থন।

আমি নব বধূর প্রণয় দৃষ্টি
মেঘ ভেঙে নামি বৃষ্টি,
আমি রাগ আমি অনুরাগ
বৈশাখী ঝরে আমি বিরাগ,
অমাবস্যার অন্ধকারে আমি জ্যোৎস্নার হাসি
দানবের মুখে দেখ আমার অট্টহাসি,
আমি নজরুল আমি সুকান্ত
রবির আকাশে আমি বিভ্রান্ত ।

মৌবনে আমি মৌএর গুঞ্জন
অষ্টাদশীর হৃদয়ে আমার মন্থন
বিদ্রোহীর বুকে জ্বলী আমি বহ্নি
একুশের চোখে ঝলসাই অগ্নি,
পূর্ণিমার আকাশে চাঁদ সোহাগিনী
আমার বাসর শয্যায় সুরের রাগিনী।

আমি আদিম সে বন্য
আমি অনন্য
ফিরে পেতে চাই অরণ্য,
আমি প্রকৃতি আমি পুরুষ
ভেঙে করি সব দুরমুস,
বাক হারা আমি মাতৃজঠরে ক্রন্দন
আমি নব জাতকের হৃদয় স্পন্দন,
আমি নব প্রভাতের ভৈরোর গান
স্পন্দিত বুকে নতুনের প্রাণ,
আমি নষ্টা মেয়ের নয়নের মণি
লুণ্ঠিতা মায়ের ক্রন্দন ধ্বনি
আমি হতভাগ্যের ভাগ্য  বিধাতা
আমি নরক যন্ত্রনায় মানুষের ত্রাতা,
আমি মহাকালের মহা প্রলয়
আমি সৃষ্টি আমি ক্ষয় আমি লয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর