কবি রণেশ রায়ের কবিতা
*
আবার আগুন জ্বালো
কবি রণেশ রায়

নিভন্ত এই চুল্লিতে
মা, আবার জ্বলে ওঠো
আগুনে সব ভস্ম হোক
জঞ্জাল জমে যত।

যদি নেভে চুল্লি তোমার
আগুন আবার জ্বালো
সেই আগুনে সবাই জ্বল
আগুনে ঘি ঢালো।

নিস্তরঙ্গ বাতাসে
তুফান তুমি তোল
মেঘ ভেঙে বর্ষা নামুক
শৃঙ্খল তোমার খোল।

নিভন্ত তোমার চেতনায়
অগ্নি সংযোগ কর
সাজ তুমি নতুন ভাবনায়
নিশান তুলে ধর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যদি শব্দ দাও
কবি রণেশ রায়

যদি শব্দ দাও আমাকে
কবিতার মালা প
রাব তোমাকে
যদি সুর দাও আমায়
শোনাবো গান তোমায়
যদি বীজ বোন ফুলের
রামধনু রঙে ফুটে উঠি
যদি তোমার হৃদয়ের উত্তাপে
তপ্ত কর আমাকে
দগ্ধ আমি তোমার তাপে
আমি বাষ্প হয়ে উড়ি
মেঘ আমি আকাশে
বৃষ্টি হয়ে নামি
নব জন্ম আমার এ ধরার ধূলিতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সামাজিক দূরত্ব
কবি রণেশ রায়

আমি ঘরে বসে একাকী একান্ত নিরালায়
কেউ নেই ধারে কাছে আমার
বিষণ্ণ না জানা মনোবেদনায়,
হাতে গল্পের বই
মোবাইলটা শুয়ে জানালায়।

হঠাৎ কে যেন ডাকে
টক্ টক্ টক্,
করাঘাত দরজায়
আমি পা বাড়াই
"সামাজিক দূরত্ব" রেখে বজায়
জ্বালিয়ে পাশের ঘরের বাতি
যেই দরজাটা খুলে দাঁড়াই
দুবাহু বাড়িয়ে নাতি
ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়,
আমি ভয়ে সরে যাই
কি জানি যদি ছোঁয়া লাগে গায়,
কর্কশ স্বরে বলি
কাছে এসো না আমার।

অভিমানী সে পিছে ফিরে যায়
চোখে জল তার
আমি মরি লজ্জায়
সে আসে না আর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্তব্ধ আজ
কবি রণেশ রায়

নির্বাক লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে ঘড়ির কাঁটাটা
স্তব্ধ হয়ে গেছে জানা নেই কবে,
সন্ধ্যে বা সকাল ছটা ;
তারপর ! দিন থেকে রাত বা রাত থেকে দিন
পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছে নিজেকে বহুবার,
কিন্তু ঘড়ির কাঁটা স্থির নির্বিকার,
আজকের সভ্যতার মত
বিধ্বস্ত করোনায় আক্রান্ত
কোলাহল বন্ধ।
আমিও তার সঙ্গে বিভ্রান্ত
মেরুদন্ডহীন এক সরীসৃপ
নিজেকে নিজে প্রদক্ষিণ করি না
স্থির হয়ে লম্বালম্বি  দাঁড়িয়ে,
দুপায়ে শেকল পড়া আমার পায়ে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঢেউ
কবি রণেশ রায়

ওরা বলে,
ঢেউ তোল ঢেউ
ঢেউ তোল নির্বাচনের
ঢেউ তোল জমায়েতের
ঢেউ তোল হাহাকারের
ঢেউ তোল শোষণের
ঢেউ তোল ধর্মের
ঢেউ তোল ধর্ষণের।

ঢেউ ওঠে অস্পৃশ্যতার,
ঢেউ ওঠে করোনার,
ঢেউ ওঠে কান্নার
ঢেউ ওঠে ক্ষমতার
ঢেউয়ে ঢেউয়ে হুঙ্কার।

ঢেউ তোল লাশের
ঢেউ তোল আতঙ্কের
ঢেউ তোল বিভেদের
ঢেউ তোল ধান্ধার
ঢেউ তোল লুঠেরার।

আমরা বলি,
তোমরা দেখ এ ধরায়
ক্ষমতার অলিন্দ ধরে
ঢেউ বয়ে যায়,
বসে ঢেউয়ের মাথায়
ক্ষমতা চোখ রাঙায়,
সংস্কারের ঢেউয়ে
দেশ ভেসে যায়
কাজ নেই, জঠর মরে ক্ষুধায়
মানুষ মরে করোনার থাবায়
তবু নির্বাচনের ঢেউ বয়ে যায়,
ঢেউয়ে ঢেউয়ে লাশ ডিঙিয়ে
কে আসবে ক্ষমতায়!

ঢেউ ওঠে এক নম্বর
ঢেউ ওঠে দুই নম্বর
উঠবে ঢেউ ভয়ংকর
উঠবে ঢেউ শুভঙ্কর।

ঢেউ ওঠে উত্থানে ঢেউ ওঠে পতনে
ঢেউ ওঠে প্রতিবাদে ঢেউ ওঠে প্রতিরোধে
ঢেউ ওঠে জনকোলাহলে
ঢেউ ওঠে বাতাসের হিল্লোলে
ঢেউ ওঠে সূর্যের কিরণে
ঢেউ ওঠে বাতাসের তুফানে
ঢেউ ওঠে সমুদ্রের গর্জনে
ঢেউ ওঠে মানুষের মননে
ঢেউ ওঠে মেঘের বজ্রপাতে
ঢেউ ওঠে সূর্যের উদয় প্রভাতে।

অপেক্ষায় থাকি,
কোন এক শুভক্ষণে
বর্বর এই সভ্যতার বিরুদ্ধে
ঢেউ উঠবে গণঅভ্যুত্থানে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালের গর্ভে নতুন অবতার
কবি রণেশ রায়

দৌড়ে চলে অশ্বমেধের ঘোড়া
নেই তার বিশ্রাম
রাজার নিশান রথে
এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে
চলা তার অবিরাম,
মহাকালের বাহন সে,
সে এক যুগের অবতার
বেনিয়ার বেশ আজ তার  
রাজপথ ধরে জঙ্গল বিহনে
চলতে হয় তাকে যাত্রা পথে,
সমুদ্র তট হয়ে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে
তুষার শুভ্র পাহাড় শিখরে।
ঘাড়ে তার বোঝা  
রাজ্য থেকে রাজ্যে ছুটে চলে আজও
হাতে নিয়ে রাজার ধ্বজা
অশ্বমেধের সে ঘোড়া।
     
রাজার আদেশে ছিনিয়ে নিতে হয়
পররাজ্য সম্পদ অপরের
তার আজ বেনিয়ার সাজ
প্রতিষ্ঠিত হয় বেনিয়া রাজ
কালের প্রবাহে,
সেকাল একাল হয়ে ভাবী কাল
এমনি করে চলে দখলের কাজ।

সময়ের প্রবাহে কাল বদলায়
বার্তা পাঠায় মহাকাল
পশ্চিমাকাশে অন্ধকার ঘনায়
ক্লান্ত শ্রান্ত পঙ্গু আজ তার  অবতার।

এ ধরণী মাঝে
জন্ম নেয় নতুন অবতার  
জন্ম নেয় নতুন সূর্য
আজকের এ সভ্যতার বিদায় বেলায়
কালের গর্ভে জন্ম বিদ্রোহী জনতার
এ ধরণী পরিবর্তনের অপেক্ষায়।

অশ্বমেধের ঘোড়া
আর নহে বার্তাবহ রাজার
আজ সে জয়ধ্বজাবাহী
আম জনতার।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খাবলে নিও না
কবি রণেশ রায়

খাবলে নিও না প্রেম আমার,
কাঙ্খিত সে ভালোবাসা
তোমার নখের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত,
হত আজ আমার সব আশা,
বেদনা বিধুর হৃদয়ে আমার
রক্ত ঝরে অবিরাম
সে যে তোমার অনাচার।
     
ফুটতে দাও তাকে ধীরে ধীরে
আদরে সোহাগে চুম্বনে,
একটু একটু করে স্তরে স্তরে
রাতের জ্যোৎস্নায় ভোরের উদয়ে
পাপড়ি মেলুক একটা একটা করে,
সময়ের জলসিঞ্চনে প্রস্ফুটন তার
নিরাময় হোক ক্ষত হৃদয় আমার

ডানা মেলুক বিরহ বেদনা
সুখ দুঃখের খেয়া ঘাটে
জীবনের দেওয়া নেওয়ার হাটে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শুরু
কবি রণেশ রায়

দুহাজার  উনিশের শেষ মুহূর্ত
রাত বারোটা,
ঘড়ির কাঁটাটা লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে
বন্ধ হয়ে গেছে তার চলন।
অন্ধকার আকাশ, নিস্তরঙ্গ পৃথিবী
চাঁদ আজ ফেরার
জনকোলাহল বারণ।
চার্চের ঘন্টা বাজে
জানিয়ে যায় বছর শেষ
ফাঁসিকাঠে ঝুলে থাকে এ পৃথিবী।

কিন্ত সময় তো থেমে থাকে না,
স্রোতস্বিনী নদী
সম্মুখ পানে তার গতি,
রাত বারোটার শেষ মুহূর্তের পর
যাত্রা নতুনের,
রাত এগিয়ে চলে
নতুন দিনে চলা,
সময়ের যাত্রা রথে মিলবে মোহনায়
অপেক্ষায় রাত, কখন ভোর হয় !
পূবে সূর্যের উদয়
ভোরের শিশির উত্তপ্ত হয়ে
মেলে সূর্যের কিরণে,
প্রানের স্পন্দন ফিরে আসে
আবার টিক্ টিক্
জীবনের ঘড়ি চলতে থাকে
দুহাজার পেরিয়ে দুহাজার একে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হ্যাঁ কবি পাগল
কবি রণেশ রায়
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য স্মরণে, তাঁর কবিতার সৌজন্যে।

পড়ে আছে লাশ ছেলেটার
সনাক্ত করে না পিতা তার,
ভয় তার চোখে মুখে
কবির কলমে ঘৃণা ঝরে পড়ে
কবি চিৎকার করে ওঠে
"আমি ঘৃণা করি তাকে"।

হ্যাঁ কবি পাগল, আমি তাকে পাগল বলি,
শিক্ষক লেখক বুদ্ধিজীবী
নীরব তাদের কন্ঠ, প্রতিবাদ করে না,
মিছিলে মিছিলে হাঁটে না,
কবি চিৎকার করে ওঠে,
"আমি ঘৃণা করি তাকে"।
হ্যাঁ কবি পাগল
আমি তাকে পাগল বলি।

ছেলেটার লাশ পড়ে আছে
ভাই তার নির্বিকার
হোটেল রেস্তোরাঁয় তার দিন কাটে,
কবি চিৎকার করে ওঠে,
"আমি তাকে ঘৃণা করি"
হ্যাঁ কবি পাগল, আমি তাকে পাগল বলি।

লাশগুলো পরে আছে
চেতনার পথ রুদ্ধ করে
লাশগুলো একধারে সরিয়ে
ওরা পথ চলে,
কবি উন্মাদ হয়ে ওঠে,
কবি চিৎকার করে বলে,
"আমি তাকে ঘৃণা করি"
হ্যাঁ কবি পাগল, আমি তাকে পাগল বলি।

আদিবাসী মেয়েরা রাইফেল হাতে
জমি জঙ্গল লুঠের বিরুদ্ধে লড়াই ওদের
কোন এক আস্তানায় লুকিয়ে,
ওরা আসে ধর্ষণ করে যায়
মেয়েগুলোর লাশ বাঁশে ঝোলে
কবি উন্মাদ হয়ে ওঠে
কবি চিৎকার করে বলে,
"আমি তাকে ঘৃণা করি"
হ্যাঁ কবি পাগল, আমি তাকে পাগল বলি।

কবি অপ্রকৃতিস্থ, ভুল বকে
কলমে লেখা আসে না
কবিতায় প্রেম বিদায় নেয়,
হাতিয়ার তুলে ধরে,
কবি উন্মাদ হয়ে ওঠে,
কবি চিৎকার করে বলে,
"আমি তাকে ঘৃণা করি"
হ্যাঁ কবি পাগল, আমি তাকে পাগল বলি।

কবি আমাকেও পাগল বানায়
আমার স্নায়ুতে রক্তক্ষরণ আজ
আমার অন্তর জেগে ওঠে
কোন এক দানবী বাসা বাঁধে
উন্মাদ আমি আমি খুনি
চিৎকার করে উঠি,
তফাৎ যাও রাষ্ট্রযন্ত্র।
কবি বলে, "তুইও পাগল হলি
হ্যাঁ আমিও আজ তোকে পাগল বলি"।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুকন্যা
কবি রণেশ রায়
জীবনন্দ দাশের "সুচেতনা" অবলম্বনে।

মুখ তুলে তাকাও, সুকন্যা তুমি,
কোন সুদূর ওপারে নক্ষত্র জগতে
তুমি যেন দূরতম কোন সে দ্বীপ
যেন এক ঘন সবুজ বনানী ঘুমায়
এক নিঠুর নির্জনতা ঘিরে থাকে তাকে।

রক্তস্নাত আজ আমাদের পৃথিবী
তবু এ রক্তক্ষরণই শেষ কথা নয়,
সে একদিন প্রজ্ঞা মহিয়সী হবে,
তবু তুমি আমারই,
এ হৃদয় মাঝে চিরকাল রবে।

আজ এ জৈষ্ঠ্যের খরার দুপুর দহনে
খুঁজে ফিরি মানব সমাজ মাঝে
এক নিবিড় অকৃত্রিম ভালোবাসা এ হৃদয়ে,
সে ভালোবাসা দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াই
আমিই খুন করেছি তোমাকে
পড়ে আছ আমার হাতে নিহত গোলাপ ;

পৃথিবী আজ পরাহত, গভীরতম অসুখ তার,
মানুষ তবুও বাঁচে তারই দোয়ায়
ঋণ তার এ পৃথিবীরই কাছে।

ব্যাপারীর জাহাজ ভেড়ে বন্দরে রৌদ্রলোকে
পণ্যের সরবরাহ আসে পশ্চিমে কোথা থেকে
পণ্য যেন চির শয়নে শায়িত অগণন শব
তার থেকে উৎসারিত স্বর্ণ মুকুল
সে যে বিস্ময় ব্যাপারীর লুঠের পারাবারে।
কবে থেকে পিতা পিতামহ আমাদের
মূক হয়ে বসে সাক্ষী এ ব্যাপারীর হাটে
তবু আমরা দাস আজও রক্তস্নাত এ দাসত্বে।

সুকন্যা, তুমি আবার জাগবে কবে,
এ পথেই মশাল হাতে চলা আমাদের,
এ পথেই মুক্তির দিশা,
দাসত্বের শৃঙ্খল মুক্তি সকলের আমাদের
মুক্তির সে শরতের সকাল বসন্তের বাতাস
খরার দুনিয়ায় শ্রাবনের রাতে মেঘ ভেঙে বৃষ্টি
পৌষের দুপুরে সোনালী ফসল
সে যে নবজীবন আমাদের,
গড়ে উঠবে নয়া দুনিয়া আমাদেরই শ্রমে
আঁধার শেষে রাত্রির বুকে সমুজ্জ্বল ভোরে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর