কবি রণেশ রায়ের কবিতা
*
নির্ভয়া
কবি রণেশ রায়
অ্যানি ফ্রাঙ্কের জন্ম ১৯২৯সাল, ১২ই জুন। মৃত্যু ১৯৪৫সাল। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে।
পনের বছরের কিশোরী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে লুকিয়ে তার দিনলিপি লেখা  
শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৭৬১ দিন লুকিয়ে থাকার পর, হিটলারের গেষ্টাপো  
বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। শেষ ডায়েরি লেখে পয়লা আগস্ট, ১৯৪৪সাল। নাৎসি বাহিনীর
নির্যাতন ক্যাম্পে দীর্ঘ অত্যাচারের পর তার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তার দিনলিপি পৃথিবীর  
মানুষের কাছে বাঁচার কবিতা হয়ে ওঠে। রচনা রাত বারোটা, ১৩.৬.২০২২।

উজান ব্যানার্জির কবিতার সৌজন্যে।

অস্ত্রহাতে নাৎসি বাহিনী
নেকড়ের মত খুঁজে বেড়ায়
রাজপথ থেকে অলিগলি
কোথায় তাকে পাওয়া যায়,
বাতাসে বারুদের গন্ধ
আকাশে সাইরেন বেজে যায়
মৃত্যুর হানা প্রতিমুহূর্ত।

বস্তির অন্ধকার ঘুপচি ঘর
বন্ধুরা সবাই জনকোলাহলে
ষোড়শী লুকিয়ে তাদেরই আশ্রয়ে,
পৃথিবীর রং তার স্বপ্নের কলকলে
খুঁজে পায় না ওরা তাকে ।

মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে ভাবে,
এ কি ভয়ঙ্কর হিংস্রতা এ সভ্য জগতে !
কার অভিশাপে আজ
এ আঁধার সোনালী প্রভাতে,
কলঙ্কিত আজ এ সুন্দর মুক্ত পৃথ্বী আমার।

সে লিখে চলে দিন লিপি তার
কালি কলমে উদ্ভাসিত স্বপ্নের প্রচ্ছদ
সাদা পাতায় ভেসে ওঠে রক্তের অক্ষর
স্বপ্ন ভগ্ন হতে পারে না তার,
তার লেখনীতে ফুটে ওঠে সে সুন্দর
না ফোঁটা সে ভোরের কলি
অকৃত্রিম তার ভালোবাসা  বিশ্বাস
নির্ভয়া সে বাঁচে গভীর প্রত্যয়ে তার।

তার প্রত্যয়ে সুন্দর এ পৃথ্বী
রূপে গন্ধে বর্ণে আকাশে বাতাসে
মেঘের আঁখির অশ্রুতে
মরমিয়া মানুষের সুখে দুঃখে।

সৌন্দর্য রাশি কত না পৃথিবী বক্ষে
মাটির গভীরে শিকড়ে শিকড়ে
সমুদ্র অতলে হৃদয় গভীরে
সোনালী সকালে রাতের জ্যোৎস্নায়
তার প্রাণ বেঁচে থাকে সকলের ভালোবাসায়।

নির্ভয়া সে মৃত্যুকে করেছে জয়
সে খুঁজে ফেরে অসীম সুন্দর
সে বাঁচতে চায় মুক্ত চেতনায়
স্বাধীনতার স্বপ্ন তার ভাবনায় অনড়।

উপলব্ধি তার গভীর মনন
হাতিয়ার তার লেখার কলম
দরদী মন তার করনে বলনে
বার্তা তার লেখনে।

নাৎসিরা খুঁজে তাকে পায়
ছিন্ন ভিন্ন দেহ রক্ত ঝরে অবিরাম
জ্যোৎস্না রাতে অন্ধকার ঘনায়
মৃত্যু তার বন্দুকের নলে
নির্ভয়া আগামীর বার্তা পাঠায়
উত্তোলিত মুষ্টিবদ্ধ হাত তার
সুন্দর এ পৃথিবী বাঁচে তার প্রেরণায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দুর্মূল্যের বাজারে কবি আর কবিতা
কবি রণেশ রায়

এই দুর্মূল্যের বাজারে
দর হাঁকে সবে একশো দুশো পাঁচশ,
হুঁ হুঁ করে ওড়ে বিকয় চড়া দামে।
শুধু কবিতাই দামহীন মূল্যহীন
বিকয় না কোন দামে,
ক্ষুধার্থ কবি অন্নহীন
ডিসকাউন্ট হতে হতে নামে শুন্যে,
বোবা চোখে তাকিয়ে থাকে কবি
প্রাণহীন কাটা শবের মত,
অপেক্ষায় থাকে কখন চিল নামে
কখন ভারমুক্ত করবে তাকে
ভাগাড়ে এসে খাবে খুঁটে খুঁটে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাত্রাপথে
কবি রণেশ রায়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হঠাৎ দেখা অবলম্বনে।

জীবন যাত্রার পথে
হঠাৎ দেখা দুজনে
কোন এক রেলগাড়ির কামরায়
দেখা পরস্পর স্বজনে,
সে বসে বিপরীত বেঞ্চিটায়
কত না গুণগ্রাহী তাকে ঘিরে;
অনেকদিনের সে অপেক্ষা
আমি বসে দোটানায়
হয়তো মিটবে সে তিতিক্ষা।

আগে ও এসেছে কচি সবুজ শাড়িতে
এই অভাগার মানস তটে,
যেন ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত
কচি ঘাসের মাথায় শিশিরবিন্দু
জ্বল জ্বল করে, অপেক্ষারত
বাষ্প হয়ে কখন উড়বে
আকাশে সূর্যের সঙ্গে মিলবে।

আজ দেখি ওকে সাদা বুটি তোলা কালো শাড়িতে
ফুটে উঠেছে বয়সের গাম্ভীর্য পাহাড়ের প্রত্যয়
সে প্রত্যয় লেখা থাকে জীবনের শেষ প্রান্তে।

আমি মূক হয়ে থাকি আনমনে,
ভরসা পাই না চিনতে,
ভয়ে থাকি, সে যদি না চেনে!
লজ্জা পাই তার দিকে তাকাতে,
ভাবি স্তব্ধতাই সবচেয়ে ভালো;
যে ক্ষত বয়ে চলি চিরন্তন
রক্তক্ষরণ সেখান থেকে
স্তব্ধতাই তার নিরাময়
বন্ধ হবে রক্তক্ষরণ।

জাবর কেটে চলে স্মৃতি
বিস্মৃতির সমুদ্র মন্থন
যৌবনের সেই রঙিন সন্ধ্যা
অতীতের কত না সাতকাহন,
পথ ধরে হেঁটে চলা
নির্জন পার্কে মজলিস দুজনে
সময় কাটে একান্ত নিভৃতে
গ্রীষ্মের মধ্য গগণে সূর্যের দহনে,
নেয়ে উঠি দুজনে
ভবিষ্যতের ছবি এঁকে চলি
সমুদ্রের বালু তটে,
বাধি বালির বাঁধ,
তারপর! দুটি পথ দুদিকে।

মনে হয় আমাকে দেখেছে
দেখেও না দেখার ভঙ্গিতে,
সে আমাকে আজ থোড়াই পোছে
যদিও বসে বিপরীতে,
নিজেকে রাখতে চায় আলো আঁধারে
এক কুহেলির আড়ালে।

তাকে চিনি নি কোন দিন,
জানি না কোথায় তার যাত্রা শেষ
কোন ইস্টিশনে সে নামবে,
তাও আমার কৌতূহল তাকে ঘিরে
সে কৌতূহল ঘিরে থাকে তার পরনের শাড়িতে
শিরিষের মাথায় ভোরের শিশিরের নাচনে
অথবা আকাশের নিলাঞ্জনে
সে আজও আমার কুহেলিবনে।

স্টেশনের পর ষ্টেশন চলে যায়
কথা নেই দুজনায়
নিরুদ্বেগ তার, উদ্বেগ আমার
আমার নামার সময় হল বলে এবার,
তবে কি নিরর্থক রয়ে গেল এ অভিসার!
পূরণ ব্যথাটা যেন গুমরে মরে
রক্তক্ষরণ সে ক্ষতে আবার।

স্টেশন এসেছে, আমি উঠি নামব বলে
হঠাৎ ই সে চিনতে পারে সেই পূরণ আদলে,
জ্বলে ওঠে আলো রাতের জ্যোৎস্নায়
আমায় হাত নেড়ে দেয় বিদায়,
আমার মনে হয় এই বিদায় কালে,
'মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সূর্য আজও হাসে
নিজেকে লুকিয়ে মেঘের আড়ালে'।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমাকে পাবে
কবি রণেশ রায়

জানতে চেয়েছো আমাকে কোথায় পাবে,
কি ঠিকানা আমার?
পেতে পার আমাকে বৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে
যদি ইচ্ছে তোমার চলার পথে  হবে সওয়ার।

বন্ধু, পথই বাস আমার,
ঠিকানা আমার হারিয়ে গেছে
আজও পাইনি খোঁজ ঠিকানার।

তাও যদি খোঁজ, পেতে পার আমায়,
আমি পেয়েছি খুঁজে
পেয়েছি নিজেকে সে ঠিকানায়।

আমাকে পেতে পার রবির গানে
উদয়ের পথে 'আজি এ প্রভাতে'
কাজীর বিদ্রোহে দুপুরের দহনে,
সন্ধ্যার রক্তরাগে দুখি মিঞার গানে
নূপুর বাজে শ্রবণে।

তাও যদি না পাও আমাকে
খুঁজে দেখ কিশোর কবির হৃদয়ে,
পাবে আমায় রানার পাঠানো খবরে
পূর্ণিমার রাতে গভীর আঁধারে
ঝলসানো রুটির গন্ধে,
আমাকে পাবে সেই সুদূরে
নতুনের আগমনে গোর্কির আহ্বানে।

যদি আমায় পেতে চাও
আজকের কবিতার বাসরে
পেতে পার বনলতার আলিঙ্গণে
অথবা রূপসী বাংলার ঘরে ঘরে
সুদূর সবুজ সে মালয় দ্বীপে একান্ত নির্জনে।

যদিও ফুল খেলবার দিন নয় আজকে
আমাকে পাবে তুমি ফুলের মজলিসে,
খুঁজে দেখো পাবে মালবিকার আহ্বানে
কলেজ স্ট্রিটে পাবে আমাকে বন্ধু সজনে,
আমাকে পাবে কালো কফির আলয়
পেতে পার আমাকে সুরার সুরালয়।

শঙ্খধ্বনিতে পাবে আমাকে মিছিলে মিছিলে
আমাকে পাবে উলংগ রাজার অন্বেষণে
আমাকে পেতে পার গভীর রাতের ভাষণে,
অবাক হয়ো না বন্ধু যদি কবিকে দেখ রাজাসনে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর