কবির মা সুধারানি দেবী খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয় বলে আনুষ্ঠানিক পড়াশুনায় তেমন এগোতে পারেন নি।
তবে কবির প্রাথমিক সাহিত্য চর্চা তাঁর মায়ের হাত ধরেই। ক্লাস সেভেনের বিদ্যা নিয়ে তাঁর মা অবলীলায়
রামায়ন মহাভারত থেকে রবীন্দ্রনাথ মধুসদনের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন।
কবি বালিগঞ্জের শরৎ বোস রোডে স্থিত সাউথ সাবার্বান ব্রাঞ্চ স্কুল থেকে স্কুলজীবন শেষ করে নরেন্দ্রপুর
রামকৃষ্ণ মিশন থেকে স্নাতক হয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকনমিকস-এ উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
কর্মজীবনে কবি অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন কলকাতার খিদিরপুর কলেজে। এর সাথে তিনি পার্টটাইম
অধ্যাপনা করেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজ ও প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে এবং গেস্ট লেকচারার হিসেবে নরেন্দ্রপুর
কলেজে। এর সাথে তিনি সমাজ কর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন।
কবি মূলত প্রবন্ধই লিখতেন যা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি
ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর, গত বছর দশ ধরে কবি কবিতা লিখেছেন বিছানায় শুয়ে যাতে
নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে বাঁচতে পারেন। তাই কবিতা ও ছড়া লেখা কবির সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা।
তাঁর প্রবন্ধের মূল বিষয় সমাজ আন্দোলন। নিজের ছড়া-কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি শেক্সপিয়ার থেকে
আজকের যুগের কিছু ইংরেজি কবিতাও অনুবাদ করেছেন। কবি ও সাহিত্যিক খলিল জিবরানের সাহিত্য
চর্চা ও তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ নিয়ে একটা বই প্রকাশিত করেছেন। অনুবাদ করেছেন বিদেশে
বসবাসকারি ভারতীয় নারীবাদী কবি শ্রীমতী নিকিতা গিলের কবিতার বইয়ের।
কবির প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “পরবর্তী প্রজন্মের মুখোমুখি”, “লুট হয়ে যায় স্বদেশ আমার”, “সংকটের
সভ্যতা”, “বিক্ষুব্ধ এ ভারত”, “ভুখা অর্থনীতি” (আন্তর্জাতিক প্রকাশনা), “ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতি”
(প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স), “ভারতের অর্থনীতি” (মিত্রম), “Colonial Economy” (বাকচক্র), “Plunder My Motherland”
(বাকচক্র)।
কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “ছড়া ও ছবিতে শৈশব”, “উল্টোপাল্টা” (দুটিই কালি কলম ইজেল
প্রকাশিত)। “টাগডুম বাগডুম” (বাকচক্র পাবলিশার্স)।
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
“কেন কার জন্য কবিতা লেখা”
দুর্দম ক্যানসারের কাছে মাথা নত না করা কবি রণেশ রায়ের কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর লেখা “কেন
কার জন্য কবিতা লেখা” আলেখ্যটি আমরা পাঠকের জন্য এখানে তুলে দিলাম . . .
“অনেকে আমাকে আমার কবিতা লেখা নিয়ে কিছু লিখতে বলেছেন। কবে থেকে লিখি কেন লিখি,
লেখালেখির জন্য বিশেষ তালিম নেওয়ার দরকার আছে কিনা, লেখার প্রেরণা কি, লেখার জন্য পড়াশুনা
করতে হয় কি না ইত্যাদি। বিষয় গুলো নিয়ে আমিও ভাবি। তবে সব কটা প্রশ্নের যথার্থ উত্তর পাই না।
বলে রাখা দরকার আমি সাহিত্যের লোক নই। অর্থনীতি আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশুনার বিষয় যা আমার
সারাজীবনের জীবিকার উৎস। সে অর্থে আমি মেঠো সাহিত্যিক। আর আমার সাহিত্য মেঠো সাহিত্য।
তবে আমি বিষয়গুলো নিয়ে যেভাবে ভাবি তা লিখছি। প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছি। কবিতা লেখা নিয়েই
আমার এই প্রতিবেদন।
আমি কবিতা লেখা শুরু করি বছর নয় দশেক আগে। জীবনে একটা অঘটন ঘটে যাওয়ায় তার ঋণাত্বক
সম্ভাব্য প্রভাবের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি কবিতা লেখা শুরু করি। অর্থাৎ একটা ঋণাত্বক
বিষয়কে ধনাত্বকে পরিণত করার একটা প্রচেষ্টা এটা। এটা আমার জীবনের বিশ্বাসের অঙ্গ যা নিয়ে আমি
বেঁচে থাকায় বিশ্বাস করি। এতেই আনন্দের সঙ্গে ভবিষ্যতের আশা নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব বলে মনে করি।
সেই অর্থে আমার কবিতা লেখাটা সমাজ আন্দোলনের অঙ্গ বলে মনে করা যেতে পারে। লেখার
জন্য লেখায় আমি বিশ্বাস করি না। জীবনের চিন্তা ভাবনার প্রতিফলন ঘটা উচিত লেখায় বলে মনে করি।
দুরূহ বিমূর্ত লেখায় আমি বিশ্বাসী নই।
আমি বহুদিন ধরে কাগজপত্রে সেমিনারে প্রবন্ধ লিখি। আমার প্রবন্ধের মূল বিষয় সমাজ আন্দোলন। কবিতা
ও ছড়া লেখা আমার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা। শেক্সপিযার থেকে আজকের যুগের কিছু ইংরেজি কবিতাও
অনুবাদ করেছি। কবি ও সাহিত্যিক খলিল জিবরানের সাহিত্য চর্চা ও তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ নিয়ে
একটা বই করা আছে। আর আছে আজকের বিদেশে বসবাসকারি ভারতীয় নারীবাদী কবি শ্রীমতী নিকিতা
গিলের কবিতার বই এর অনুবাদ।
কবিতার ব্যাকরণ আমার জানা নেই। লেখার জন্য কোন তালিম নিই নি। কবিতা মানুষের একটা মনের
ভাবগত বিষয়। বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পড়াশুনা না জানা গ্রামের নিরক্ষকর মানুষ কি অসাধারন
কবিতা ছড়া মুখে মুখে বলে যায় সেটা আমরা জানি। তারা লিখতে পড়তেও জানে না। সুতরাং তালিম
নেওয়াটা আজ শহুরে শিক্ষিত কবিদের দরকার হলেও স্বভাব কবিদের ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য নয়। আর
আমি কবিতার নিদৃষ্ট ব্যাকরণে বিশ্বাস করি না। সমাজ ও প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো জীবনটাই ছন্দময়, লয়
গতিতে ভরপুর। নিজের মননে কবিগুন থাকলে সেটা কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। আধুনিক কবিতার অস্পষ্ট
বিমূর্ত রূপের চর্চা আমি করি না। কারণ তা সমাজের প্রয়োজন মেটায় না। দুরুহের জাল বোনে। তবে
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার ধরন বদলায়। তা যদি সঞ্চিত বাস্তব অভিজ্ঞতাকে রূপ দিতে পারে তবে
নি:সন্দেহে আধুনিক কবিতা অসাধারণ হয়ে ওঠে। ছন্দময় হয়ে ওঠে গদ্যের আকারে তার প্রকাশ ঘটলেও।
তবে যে কবি যে যুগে বাস করে তার বাস্তব রূপায়ন ঘটে তার কবিতায়। সেই অর্থে কবিতা যেন জীবনের
আয়না। একটা সময়কালকে সে তুলে ধরে এই আয়নায়। যুগের প্রেক্ষাপটে নিজের যুগের আধুনিক কবি
সবাই। কৃত্রিম ভাবে আধুনিক আর সাবেকি কবিতায় কবিতাকে ভাগ করার দরকার হয় না। কবিতা
মানুষের জন্য লেখা দরকার। সে যেন ভবিষ্যৎকে আমরা যেভাবে অবলোকন করতে চাই তার ছবি আঁকতে
পারে। আমার কবিতা কেন কার জন্য তার প্রেরণা কি তা নিয়ে দু একটা কথা বলি : আমি মনে করি না
কবি তার কবিতার মূল্যায়ন চায় না। সে নেহাৎ তার খেয়াল চরিতার্থ করতে কবিতা লেখে। বরং আমি
মনে করি নিজের কাজের জন্য সবাই প্রশংসা আশা করে। পাঠকের কাছে সেটা পেলে তার লেখা
অনুপ্রাণিত হয়। এখানে বিনয়ের কোন জায়গা নেই। আমার ক্ষেত্রে সেটা যে সত্য সেটা আমি জানি।
সাহিত্যের বিবর্তনে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই লেখকের লেখক সত্তা লুকিয়ে থাকে। কবি ও
কবিতার ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। কোন সাহিত্য ও সাহিত্যিকই স্বয়ংসম্পূর্ণ নন। তাঁর মৌলিকত্ব থাকলেও
তিনি তাঁর অগ্রজ ও সমসাময়িক লেখকদের একজন। এক ধারাবাহিকতা।তিনি প্ৰতক্ষ বা পরোক্ষভাবে
তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত। কবিতার জগতে কারও ওপরে ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রভাব বেশি কারো ওপর চারণ
কবির কারো ওপর রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ-এর প্রভাব বিশেষ ভাবে লক্ষিত হয়। আবার কারো ওপরে
সুভাষ মুখোপধ্যায়, শক্তি চ্যাটার্জি, সুনীল গাঙ্গুলির মত সমসাময়িক কবির প্রভাব বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা
যায়।
আমি যেন আমার লেখার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাই। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করি। অস্বীকার করব
না একটা অহং আমার মধ্যে কাজ করে। মনে হয় এই লেখাই ছিল আমার জীবন। সে পথে অনেক আগেই
যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা না করে ভুল করেছি। ফলে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারি নি। অসম্পূর্ণ
এক মানুষ আমি। নিজের পথ নিজে ধরি নি। তাই বুড়ো বয়সে এই প্রচেষ্টায় খামতি রয়ে গেছে। আবার
লজ্জা পাই এই ভেবে যে এ হযত আমার অহেতুক অহং। কিন্তু সেটাই বা কেন? এই অহংটাই জীবনের
সম্পদ যেটা না থাকলে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়। যেটা আমি পারি সেটা করা হয় না। আত্মপ্রত্যয়ে অভাব ঘটে।
এই বোধ থেকেই তো এই বয়সে আমার নিজেকে খুঁজে পাওয়া। অক্লান্ত পরিশ্রমে আমার আনন্দ। রাতের
পর রাত জাগা। ভাবনাগুলো তখন জড় হয়। লেখা আসে কলমে। তারই ফসল এই কবিতাগুচ্ছ যা আমি
পাঠক পাঠিকাদের উপহার দিতে পারি। বলা চলে জীবন সায়াহ্নে এটাই আমার বিশ্রাম যেটা আগে পাই নি।
আমার জীবন ভাবনাকে তুলে ধরার চেষ্টা। নিচে একটা কবিতার সাহায্যে আমি এটা তুলে ধরার চেষ্টা
করেছি :
মালা গাঁথা
কবিতা আমার স্মৃতির খেয়া বায়,
বিস্মৃতির অন্ধকার অতলে
অনিশ্চয়তার তরী বয়ে যায়,
জানা অজানার সমুদ্র মন্থন তার,
চেনা অচেনা কত না বিস্মৃত কথা
কত না শব্দের ভান্ডার,
ঘুমিয়ে রয় স্নায়ুর শয্যায়।
আজ গোধূলি এ বেলায়
জীবনের অনিশ্চিত এ খেলায়
স্মৃতির প্রাণ স্পর্শে কবিতার প্রত্যয়ে
ফুটে ওঠে ফুল চেতনার গালিচায়,
জীবনের প্রচ্ছদে
সে ফুলে মালা গাঁথা কবিতায়।
দূর হয় আঁধারের কালো
আমার কবিতার প্রাঙ্গনে
জ্বলে ওঠে নবজীবনের আলো।
কবি হল হ্যাংলা আর ক্ষুধার্ত পাঠকই তার ক্ষুধা মেটায়। আহারের ব্যবস্থা করে, পাঠকের শংসাই তার
আহার। তা নইলে তাকে উপোসে থাকতে হয়, উপোসে থাকতে থাকতে ক্ষিধেটাই মরে যায়। উৎসাহে
ভাটা পড়ে, লেখা আসে না কলমে। হয়ত পাঠক/পাঠিকা কবিতা পড়েলেও তাদের খিদে মেটে নি, ভালো
লাগে নি। ভালো লাগাটাই যে পাঠকের আহার। সেটার না পেলে পাঠকও উপোসে, উপোসে থাকতে থাকতে
তার ক্ষিধেও মরে যায়। ফলে পাঠকের অপমৃত্যু, সঙ্গে কবিরও। আর বাচিক শিল্পীর কণ্ঠে কবিতার প্রাণ
প্রতিষ্ঠিত হয়। মুর্ত হয়ে ওঠে।”
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
আমরা মিলনসাগরে কবি রণেশ রায়ের কবিতা তুলে আনন্দিত।
উত্স -
- কবির সঙ্গে ইমেলে যোগাযোগ।
কবির সঙ্গে যোগাযোগ -
কবি রণেশ রায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২৭.৬.২০২২।
২৬টি দ্বিভাষিক কবিতার সংযোজন - ৩.১১.২০২২।
. ^^ উপরে ফেরত
...
কবি রণেশ রায় - জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার
ময়মনসিংহ জেলার দুর্গাপুর গ্রামে। পিতা সুখদা চরণ রায়
মাতা সুধারাণী দেবী। বাবা ছিলেন কর্পোরেট কোম্পানির
ব্যবস্থাপনায় চাকুরীরত। তিনি একই সঙ্গে সুলেখকও ছিলেন।
কর্পোরেট ব্যবস্থাপনার ওপর তাঁর লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত
হয়েছিল। এ ছাড়া তিনি বেশ কিছু ছড়া লিখেছেন যার
কয়েকটি নিয়ে একটা বই প্রকাশিত হয়েছে।