অভিমানের খেয়া কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩১.০৫.৭৬ কাঁঠালবগান ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এতোদিন কিছু একা থেকে শুধু খেলেছি একাই, পরাজিত প্রেম তনুর তিমিরে হেনেছে আঘাত পারিজাতহীন কঠিন পাথরে।
প্রাপ্য পাইনি করাল দুপুরে, নির্মম ক্লেদে মাথা রেখে রাত কেটেছে প্রহর বেলা--- এই খেলা আর কতোকাল আর কতোটা জীবন! কিছুটাতো চাই---হোক ভুল, হোক মিথ্যে প্রবোধ, অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক জোস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই, কিছুটাতো চাই, কিছুটাতো চাই।
আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন---আর কতোদিন? ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে? কতো আর এই রক্ত তিলকে তপ্ত প্রনাম! জীবনে কাছে জন্ম কি তবে প্রতারনাময়?
আজীবন জন্মের ঘ্রানে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৭.০৭.৭৬, মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তখন আকাশে শেষ জিজ্ঞাসার মতো বাঁকা চাঁদ হয়তো ছিলো---হয়তো ছিলো না। পাশের মাঠ থেকে কালো সব বাতাসের অলস শরীর কেঁপে কেঁপে শীতের অসুখে স্নান রোগীদের মতো এসেছিলো, আভিনার চারপাশে হয়তো তখনো কুয়াশারা প্রম এনে দিতেছিলো রাত জাগা মানুষের মনে।
মনে নেই---হয়তোবা আমি তার বুকের গম্বুজে প্রেমিকার ঠোঁট ভেবে প্রথম চুম্বন এঁকেছিলাম। মনে নেই, মনে নেই---পৃথিবীর জল---ধুলোবালি, কালোরাত, জননীর কত্চমাখা এটুকু দেহকে কারা সব কতোটুকু বিস্ময়ে পাহারা দিয়েছিলো!
জন্মের গন্ধের কথা মনে হলে শরীরে তাকাই, আজো এক ঘ্রান আছে---আজো এক অক্ষম বিক্ষোভ শোনিতের অভ্যন্তরে, জন্মের প্রথম চিৎকারের মতো অক্ষম হাত-পা ছুঁড়ে আজো সে তছনছ করে শুধু নিজের বাসনাগুলো, ডেটলের শিশি---শাদাতুলো---পৃথিবীর রক্তমাখা করুন কাপড়॥
বাতাসে লাশের গন্ধ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৩.১২.৭৭, সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। ১৯৭৯ সালে, কবি আহমদ ছফা দ্বারা প্রকাশিত, কবির “উপদ্রুত উপকূল” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। স্বাধীনতার পর দেশের অরাজকতা দেখে প্রতিবাদ করেছেন এই কবিতায়। ১৯৭৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে অরণি গোষ্ঠী আয়োজিত টাঙ্গাইলের দুদিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতাটি পাঠ করে ছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শামসুর রহমান, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা সহ শতাধিক কবির উপস্থিতিতে। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে--- এ-দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে, মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ। এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো, জীর্ন জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার। আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী, স্বাধীনতা--- একি তবে নষ্ট জন্ম? এ-কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?
এ-চোখে ঘুম আসে না। সারারাত আমার ঘুম আসে না--- তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুন চিৎকার, নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশ, মুণ্ডুহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বীভৎস শরীর ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে---আমি ঘুমুতে পারি না, আমি ঘুমুতে পারি না . . .
রক্তের কাফনে মোড়া---কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুন খেয়েছে যারে, সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা। স্বাধীনতা---সে-আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন, স্বাধীনতা---সে-আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
আধখানা বেলা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১০.০১.৭৭, মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
মুখরিত মর্মমূল কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৮.০৩.৭৬, মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এ কোন কথা চিৎকার কোরে ওঠে বুকের ভেতরে, চোখের ভেতরে খুলে দিয়ে চোখ অতন্দ্রা আসে! এ কোন কথার আগুনে পুড়ে কেটে যায় বেলা! রক্তে জ্বলে ওঠে ধবল কনিকারাশি। কি কথা পোড়ায়
মেধা ও মাধবী আমি তাকে বলতে জানি না।
প্রিয় মুখ, প্রিয় চোখের চন্দ্রকলায় মেঘের কালিমা মেখে প্রিয় পরিচিত পথ ভুলে নেমে যায় ভিন্ন ভুগোলে ঠোঁটের বন্ধনে ভুল ফসলের সঞ্চয় নিয়ে ফিরে যায় পাখি, কি এক কথার কান্না তখন কেঁদে ওঠে বুকের বিজনে--- আমি তাকে বলতে বুঝি না---
যে-কথা চিৎকার করে, বুকের সভ্যতায় ভাঙে শিল্পের কারুকাজ, আমি তাকে বলতে জানি না, বলতে বুঝি না--- শুধু চিতার তরঙ্গে ভুলে যাই দ্বিধাহত মর্মমূল।
দ্বিমুখি সত্যের নিকটে খণ্ডিত তরুন তাপস, আর কতো মৃত্যু মথিত হবো, মর্মস্থলে পোড়াবো নিজেকে! আপন কথার কাছে আপনার না-বোঝা গ্লানির ক্লান্তিতে কতো আর নিরুক্ত নিশ্বাস বুকের ভেতরে রেখে বাড়াবো দীর্ঘাশ্বাস।
প্রিয়মুখ---প্রিয় পাখি---প্রিয় পাওয়া ফিরে যাবে ভেজাচোখ করুন কাতর!!
বিমানবালা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৩.০২.৭৬, লালমাটিয়া ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
উইণ্ডোস্ক্রীনে মুখ রেখে চেয়ে থাকা বিদায়ের বিষন্ন মুখ---
এইবার উড়ে যাও, যাও পাখি পরবাসে যাও . . .
ওইখানে কেউ থাকে? মাখে তুষারের শিহরন বুকে ও মুখে? ক্রিসেনথিমাম হাতে কেউ এসে দাঁড়াবে কি সুহাস, উন্নত বাহুতে সম্ভাষন, নড়বে আঙুল তার সোনালীমা নোখ?
হয়তোবা ভ্রূর নিচে তার অনিদ্রা-হলুদ চোখে আঁকাবাঁকা সাপের মতো শুয়ে থাকা নদী--- পদ্মা, নীল, হোয়াংহো। তোমার চোখেও কি নদী নয় ভীষন জমাট জল বরফিত দীর্ঘস্বাস?
বিশ্রামের রাতে নিসঙ্গ ক্লান্তিতে রানওয়ে যেমন আঁধারের আলিঙ্গনে কাঁপে থরো হিমেল ব্যথায়, তেম্নি তোমারো চোখের খুব গভীরে এক বর্নহীন দাহ--- হৃদয়ের ক্ষতের মতো তুমি তাকে গোপনে লুকিয়ে রেখে মুখে শুধু এঁকেছো এক সুদূরের অচেনা হাসি।
নষ্ট অন্ধকারে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৬.০৭.৭৬, মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
শোনিতে বিক্ষোভ নিয়ে তোমার নিকটে যাই, লালিত হত্যার হাত বুকের ভেতরে কাঁপে উষ্ণতায়। যদি নতজানু হোই, যদি দ্বিধায় থমকে যেতে থাকি, যদি ফুলের মমতা এসে মুগ্ধতা বাড়ায়---এই বুকে করাঘাত কোরো, আমি ঠিকই ফিরে যাবো, ঠিকই চিনে নেবো পথ।
শংখ শরীরের সুখে একদিন কিছু ভুল ভালোবেসে, রুগ্ন তরুদের মতো আমিও স্খলন হয়ে পচা আঙুরের নীল অন্ধকারে সারারাত, আমিও সাবারাত মৃত মানুষের শীতে শীতার্দ্র হয়েছিলাম---
বহুদূরে--- একখানা হাত, একখানা আঙুলের হাত প্রত্যাশার মতো জেগে থেকে একা শুধু শুনিয়েছে গাঢ় স্বরে : এই মাঠে, এই বুকে ফসল ফলাবে দেখো নোতুন কিষান, তাদের আশ্বাস পেয়ে অবশেষে কেটে যাবে কুয়াশার দিন।
মাটি জানে, বৃক্ষ জানে, আমি ভুল ভালোবেসে অন্ধকারে নষ্ট ফলের মতো ঘুমপোকা পুষেছি বুকের ভেতর। শোনিতে বিক্ষোভ ছিলো প্রতিজ্ঞায় গাঢ় ছিলো হৃদপিণ্ডের সাহস, শুধু কিছুদিন এক মাংশ মোহে আবরিত ছিলাম কলুষ পাখি। এইবার ফিরে যাবো---যদি নতজানু হোই, যদি দ্বিধায় থমকে থাকি, ঘৃনা কোরো, গ্লানি ছুঁড়ে দিও কঠিন আঘাত জন্মে জীবনে বোধে--- ললাটের মাঝখানে লিখে দিও--- পরাজয়, দুষিত মৃত্যু॥
স্মৃতি বন্টন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.০৩.৭৬ রামপাল বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এই সব ব্যর্থতা, গ্লানির দহন, এগুলো আমার থাক
তুমি শুধু শুভ্রতাটুকু নিয়ে যাও প্রত্যাশার শেফালিকা পরাবত।
বিনিদ্র রাতের বাতাসে দ্বিধায় ভাসমান আত্মাবিনাশী সন্ধানে দুলে ওঠা নিরুদ্দেশ খেয়া, ক্লান্তির কাছে নুয়ে আসা একাকি নির্জন পাখি, এসব আমার থাক।
ইচ্ছের দরোজায় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৭.০৩.৭৬ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সব কথা হয়ে গেলে শেষ শব্দের প্লাবনে একা জেগে রবো নির্জন ঢেউ, ভেসে ভেসে জড়াবো নিজেকে। শরীরের সকল নগ্নতায় আমি খেলা কোরে যাবো, তীর ভেবে ভেঙে পড়বো আমার যৌবনে।
কথা কি শেষ হয়ে যায়---সব কথা? নাকি বুকের ভেতরে সব অসমাপ্ত ইচ্ছের মতো দ্বিধাগ্রস্ত জেগে থাকে বুকে নিয়ে বিনিদ্র রাত, জেগে জেগে নিজেকে দ্যাখে ভীষণ উৎসাহে?
সব কথা শেষ হলে দরোজায় করাঘাত রেখে যাবো, উৎকণ্ঠার ধ্বনিরা বিলীন হবে ইথারের স্বাস্থ্যে--- দ্যাখা হবে না।
শিথানের জানালা খুলে রেখে যাবো একটি চোখ, শিশির চুমু খাবে চোখের উত্তাপে--- চুমু খাবে। জানালায় রেখে যাবো একটি বিনিদ্র চোখ, যে-চোখ আকাশ দ্যাখে, মানুষের স্বভাব দ্যাখে, যে-চোখ স্বাতির মগ্নতা দেখে প্রেমার্দ বুকে অনুভব জ্বেলে রাখে অশেষ বাসনা।
সব কথা শেষ হলে ফিরে যাবো, একটি চোখ রেখে যাবো শিথানের জানালায়। সব কথা শেষ হলে করাঘাত জাগাবে তোমায়, তুমি এসে খুলবে দুয়োর--- দ্যাখা হবে না॥
শব্দ-শ্রমিক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫.০৩.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমি কবি নই---শব্দ-শ্রমিক। শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়, হৃদয়ের কালো বেদনায়।
করি পাথরের মতো চূর্ন, ছিঁড়ি পরান সে ভুলে পূর্ন! রক্তের পথে রক্ত বিছিয়ে প্রতিরোধ করি পরাজয়, হাতুড়ি পেটাই চেতনায়।
ভাষা-সৈনিক আমি জানি শুধু যুদ্ধ, আমার সমুখে আলোর দরোজা রুদ্ধ--- তাই বারুদে সাজাই কোমল বর্নমালা, তাই শব্দে শানিত আনবিক বিষ-জ্বালা ধূর্জুটি-জটা পেতে রোধ করি অবক্ষয়ের সংশয়, আমার এ-হাতে শব্দ কাস্তে ঝলসায়।
ভাষার কিষান চোখ মেলে চেয়ে দেখি, চারিপাশে ঘোর অসম জীবন, সভ্য পোষাকে পাশবিক বন। সমতার নামে ক্ষমতাকে কোরে রপ্ত, আমি জানি কারা জীবনে ছড়ায় পুঁজ-পোকা-বিষ তপ্ত--- জানি আমাদের কারা ধুতুরার ফুলে অন্ধ করেছে অবেলায়, ছুঁড়ে দিয়ে গেছে নষ্ট নগ্ন বেদনায়।
আমি সেই পোড়া ভিত ভেঙে জেগে উঠেছি জীবনে, আমি সেই কালো ঘোড়ার লাগাম ধ'রে আছি টেনে। বুকের ভাষাকে সাজিয়ে রনের সজ্জায়, আমি বুনে দিই শব্দ-প্রেরনা মানুষের লোহু মজ্জায়॥