কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
পোস্টমর্টেম
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.০৫.৮৫ মুহম্মদপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আর কিছু নয়, এসো শুধু চানাচুর নিয়ে আলোচনা করি,
মচমচে চানাচুর হচ্ছে এখন সবচে' নিরাপদ খাদ্য।
শবমেহের প্রসঙ্গে অনায়াসে আমরা এখন
কথা বলতে পারি এবং তা চানাচুরের মতোই নির্দোষ---

তার রমনে অনুপযুক্ত কিশোরী শরীর,
বহুজাতিক কোম্পানীর হাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে
এসবই এখন সবচেয়ে উপভোগ্য বিষয়।

এখন আমরা ভেতরটাও খুলে ফেলতে পারি,
আমরা আলোকপাত করতে পারি আমাদের
খুব ভেতরের ইচ্ছাগুলোর উপর।

একটি কিশোরী-শরীরে রমনের তীব্রতম সাধ
কবে কোন পুরুষের জাগে নাই রক্তের ভেতর!
এসো এখন আমার পরস্পরের প্রতি আলোকপাত করি---

:        সংবাদপত্রে শবমেহেরের মৃত্যুসংবাদ পাঠ করতে করতে
.        একটি কিশোরী রমনের তৃষ্ণায়
.        আমি খোব কাতর হয়ে পড়েছিলাম।
               
:        আমারও তেম্নি---একবার মনে হয়েছিলো
.        আহা, আমি যদি শবমেহেরের প্রথম ধর্ষনকারী হতাম!
.        একবার, একবারই মনে হয়েছিলো।

:        আমি আমার ভেতরে খুব কান্নার কষ্ট অনুভব করেছিলাম।

:        আমার একবার পাখি হতে ইচ্ছে হয়েছিলো।

:        দৈনিক বাংলার সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে
.        পুড়ে মরতে ইচ্ছা হয়েছিলো আমার

:        আহা আমি যদি শবমেহের হতে পারতাম . . .

আমরা কি পরস্পরের ইচ্ছাগুলোর উপর
আলোকপাত করছি?
আহা আমাদের ইচ্ছাগুলো
আহা আমাদের অপূর্ন গোপন ইচ্ছাগুলো!
তোমাদের জন্যে আমরা এক মিনিট দাঁড়িয়ে
নিরবতা পালন করছি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.০৩.৮৪ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

রাইফেল তাক কোরে আছো মানুষের দিকে।
সঙ্গিন উঁচিয়ে আছো ধূর্ত নেকড়ের মতো।
পায়ে বুট, সুরক্ষিত হেলমেটে ঢেকে আছো মাথা।
সশস্ত্র তোমার হাত, সংগঠিত, কে তোমাকে ছোঁয়!

তোমার বুলেট মানুষের বুক লক্ষ্য কোরে ছুটে যাচ্ছে
তোমার বুলেট মানুষের মাথার খুলি উড়িয়ে নিচ্ছে
তোমার বুলেট মানুষের হৃদপিণ্ড স্তব্ধ কোরে দিচ্ছে
তুমি গুলি ছুঁড়ছো, তুমি গুলি ছুঁড়ছো মানুষের দিকে।

যে মানুষের মধ্য কেউ একজন তোমার ভাই
যে মানুষের মধ্য কেউ একজন তোমার পিতা
যে মানুষের মধ্য কেউ একজন তোমার বোন
যে মানুষের মধ্য কেউ একজন তোমার ছেলে
সেই মানুষের দিকে তোমবা টার্গেট প্র্যাক্টিস করছো . . .

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

প্রকৃতির তেতরে তাকাও, দ্যাখো, আলো এবং অন্ধকার দুটি পক্ষ
নিসর্গের ভেতরে তাকাও, দ্যাখো, পানি এবং মাটি দুটি পক্ষ
পৃথিবীর ভেতরে তাকাও, দ্যাখো, শোষিত এবং শোষক দুটি পক্ষ
মানুষের ভেতরে আকাও, দ্যাখো, গরীব এবং বুর্জোয়া দুটি পক্ষ
এদেশের ভেতরে তাকাও, দ্যাখো, পঁচাশি এবং পনেরো দুটি পক্ষ

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

এদেশের আশি যোগ পাঁচ জন এখনো ক্ষুধার্ত প্রানী
অর্থাৎ এখনো মানুষ নয় তারা এখনো মানবেতর,
তারা এমন কি দরিদ্রও নয়, দরিদ্র-সীমার নিচে।
ক্ষুধার আঘাতে পঙ্গু, বস্ত্রহীন, উদ্বাস্তু-উন্মূল এই
আশি যোগ পাঁচ জন স্বপ্নাহত, নিস্ব, মুমুর্ষু মানুষ---
এই মানুষের দিকে তোমরা টার্গেট প্রাক্টিস করছো।

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

তুমি সেই আশি যোগ পাঁচজন মানুষের ছেলে---
তোমার পিতা একজন চাষা, ক্ষেতে লাঙ্গল চালায়
তোমার পিতা একজন শ্রমিক, মিলে গতর খাটায়
তোমার পিতা একজন মজুর, একজন কর্মচারী
তোমার পিতা একজন পিয়ন, রেলশ্রমিক, কেরানি
তোমার পিতা একজন বাসশ্রমিক, বেশ্যার দালাল
তোমাৰ পিতা একজন স্কুলশিক্ষক, রিকশাওয়ালা---
তোমাদের পিতার পাঁজরে তোমরা টার্গেট প্রাক্টিস করছো . . .

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

সীমান্ত রক্ষার নামে তৈরি করা হয়েছে তোমাকে,
সার্বভৌমত্বের নামে অস্ত্র দেয়া হয়েছে তোমাকে,
শৃংখলা রক্ষার নামে তৈরি করা হয়েছে তোমাকে,
আইন রক্ষার নামে অস্ত্র দেয়া হয়েছে তোমাকে।

সীমান্ত রক্ষাও নয়, সার্বভৌমত্বও নয়, শুধুমাত্র পুঁজি,
শুধুমাত্র পুঁজিবাদ রক্ষাই এখন তোমাদের মৌল কাজ।
তোমরা এখন বিত্তের পাহারাদার, বিত্তবানের প্রহরী,
বিত্তবান তোমাকে ব্যবহার করছে তার বিত্তের সপক্ষে।

বিত্তের বিরুদ্ধে তাই যখন শ্লোগান ওঠে শহরে ও গ্রামে.
যখন মিছিল নামে রাজপথে মানুষের দাবির মিছিল,
যখম মিছিল নামে রাজপথে মানুষের ক্ষুধার মিছিল---

তখন তোমার হাতে গর্জে ওঠে তীক্ষ্ম রাইফেল,
তৃমি ব্যবহৃত হও নিরুপায় ব্যবহৃত হও।
তোমার হাতের ভেতরে তখন শোষকের হাত।
তোমার আঙুল, সে তখন খুনী জান্তার আঙুল।
তোমার সুশিক্ষিত পা, সে তখন স্বৈরাচারের পা।
তোমার চোখ তখন এক ঘাতকের খল চোখ।
তোমার জিভ তখন এক ঘৃন্য দুর্বৃত্তের জিভ।

দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন করো---কোন পক্ষে যাবে?

একদিকে বিত্তবান,
অন্যদিকে বিত্তহীন ক্ষুধার্ত মানুষ।
একদিকে পুঁজিবাদ,
অন্যদিকে সাম্যবাদী শান্তির সমাজ।
ইতিহাস সাক্ষী দ্যাখো, অনিবার্য এ-লডাই--- কোন পক্ষে যাবে??

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চরিত্র বদল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২১.০৪.৮৪ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমার রক্তে বৈরাগ্য,
আমি তাকে সামাজিক কোরে তুলতে চাই।
আমি চাই সে সামাজিক মানুষের মতো দাবি করুক।

দাবি করুক সে তার স্বপ্নের স্বাধীনতা,
আহি চাই সে শিখুক সামাজিক ক্রোধ,
ঈর্ষা শিখুক সে, শিখুক শ্রেনীর ঘৃনা।

আমার রক্তে স্বাধীনতা,
আমি চাই সে স্বধীনতা শিখুক,
অন্তত নিজেকে মানুক সে।
আমি চাই সে শৃংখলের বীজ বপন করুক,
নিজের ভেতরে বুনুক সে রক্তকরবীর গাছ।

আমার রক্তে নিসঙ্গতা,
আমি চাই সে সঙ্গময় হয়ে উঠুক,
হয়ে উঠুক হিংস্র হাঙরের দাঁত।
আমি চাই সে শ্রেনীহিংসায় জ্বলে উঠুক।

আমার রক্তে উৎসব
আহি চাই সে উৎসবহীন হোক
হোক সে অরন্য হত্যার কুঠার,
আমি চাই সে স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠুক।

আমার রক্তে অন্ধকার,
আছি চাই সে আলোকিত হোক,
আমি চাই সে অগ্নিময় হোক।
হোক সে দ্বন্দ্বময় মানুষের ইতিহাস॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘোষনা : ১৯৮৪
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২১.০৪.৮৪ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমাদের নাগরিকবৃন্দ
মলমুত্র ছাড়া আর কোনো ত্যাগেই উৎসাহী নয়।

আমাদের কৃষিমন্ত্রীর সাথে
আমাদের কোনো কৃষকের কখনোই দ্যাখা হয় না।
আমাদের শ্রমমন্ত্রী
শারীরিক কোনো শ্রমের সাথেই জড়িত নয়।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষক নয়।
আমাদের খাদ্যমন্ত্রী নিজের খাদ্যের ব্যাপারেও উদাসিন।

আমাদের সেনামন্ত্রী
সৈন্য পবিচালনার চেয়ে বেশ পছন্দ করেন কবিতা লিখতে।
তিনি বেশি উৎসাহ বোধ করেন রাজ্য পরিচালনায়।
আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মস্তিষ্কের চিকিৎসা প্রয়োজন।

আমাদের জলন্ত্রী
একবার নদীপথে ভ্রমন করেছেন তেষট্টি মাইল---
নদী তাকে মুগ্ধ করেছে।
আমাদের অরন্যমন্ত্রীর অরন্যভীতি
জনপ্রিয় আড্ডার বিষয়।

একজন সাংবাদিক আমাদের প্রধান কবি।
একজন আমলা আমাদের শিল্পকলার খবরদারি করছেন।
আমাদের স্‌জনশীলতা নিয়ন্ত্রন করছেন বন্ধা একটি লোক।

আমাদের প্রশাসন মৌলিক কাজের ব্যাপারে আস্থাহীন।
আমাদের দক্ষ ব্যবসায়ী শুধুমাত্র বাবসায়ীইি নয়
তিনি একন চলচ্চিত্র নির্মাতাও।

আমাদের শ্রম-বিভাগ ক্রুটিপূর্ণ।
অযৌক্তিক আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি।
আমাদের রাজনীতি সুবিধাবাদের দখলে।

শান্তিরক্ষা বাহিনীর বিশেষ প্রযত্নে
বেঁচে আছে আমাদের আবহমান অন্ধকার।
আমাদের আইনের গৃহগুলো
আইনহীনতার প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত এখন।

আমরা এই নৈরাজ্যের অবসান চাই---

আমরা চাই
কৃষক ফিরে পাক তার শ্রমের সকল উপাদান।
নির্মাতা ফিরে পাক তার নির্মানের উপাদানসমূহ।
চিকিৎসক ফিরে পাক তার শুশ্রূষার স্বপ্ন।
শিল্পী ফিরে পাক তার স্বপ্নের স্বাধীনতা।
শিক্ষক ফিরে পাক তার শিক্ষার বাসনা।

আমরা এই দুঃস্বপ্নের অবসান চাই
আমরা এই দুর্ভাবনার অবসান চাই
আমরা এই দুর্ব্যবস্থার অবসান চাই॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এই রক্ত আগুন জ্বালাবে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৪.১২.৮৪ মুহম্মদপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আগুন জ্বালাবে এই গুলিবিদ্ধ মানুষের বুক,
এই রক্ত আগুন জ্বালাবে।

শৃংখল ছিঁড়বে এই ট্রাকে চাপা যুবকের হাড়,
এই রক্ত আগুন জ্বালাবে।

দেয়াল ভাঙবে এই বুটে পোষা তরুনীর দেহ,
এই রক্ত আগুন জ্বালাবে।

শোষন হটাবে এই গুলিবিদ্ধ স্রমিকের লাশ,
এই মৃত্যু আগুন জ্বালাবে।

গ্রেনেড ফাটাবে এই ক্ষুধাজীর্ন দলিত মানুষ
এই মৃত্যু আগুন জ্বালাবে।

কুয়াশা ছিঁড়বে এই কৃষকের প্রানবন্ত চোখ,
এই স্বপ্ন আগুন জ্বালাবে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালোকাঁচ গাড়ি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬.১১.৮৫ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

কে যায়? কি যায়? ওই কালোকাঁচ গাড়ির ভিতর?
কতোটা আড়াল প্রয়োজন আরো কতোটা নেকাব?

উঁচু দেয়ালের নিভৃত আড়ালে মখমল গৃহ,
মখমল দেহে পৌঁছতে পারে না এমন কি ধূলো,
তারও পরে ত্বক, প্রতারক ত্বকে নিবিড় মুখোশ---
আড়ালেই বাড়ে বিষবৃক্ষের প্রশাখা শিকড়।

কি লুকোতে চাও কালোকাঁচে ঢাকা গাড়ির ভিতর?
ঘাতকের চোখ? প্রতারক মুখ? নীল হিংস্রতা?
কি লুকোতে চাও? নোখ ও নোখের বুনো ব্যবহার?
কাটা জিভখানা, চর্বিল তনু কি লুকোতে চাও?
কালোকাঁচ গাড়ি কি লুকোতে চাও নিজেব ভেতরে!

কালোকাঁচে ঢাকা ব্যবসায়া মুখ, সামাজিক নারী,
কালোকাঁচে ঢাকা দল বদলানো মন্ত্রীর মুখ,
বন্টননীতি, সমুদ্রসীমা, ভূমি ও আকাশ,

কালোকাঁচে ঢাকা গনিকার লাল সুরম্য ঠোঁট,
কালোকাঁচে ঢাকা জীবনের কালো এপি ওপিঠ।

কালোকাঁচ গাড়ি কি লুকোতে চাও হননের হাত?
লোভে কামনায় লালায়িত লোল পুঁজ পচা মুখ?
কি লুকোতে চাও কালোকাঁচ গাড়ি পাশবিক থাবা??

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আল্লাহতালার হাত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৩.০৬.৮৩ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

“আল্লাহতালার হাতে মানুষের তামাম ঘটনা।”
সে হাত কেমন হাত? প্রশ্ন করে আক এক শিশু,
প্রশ্ন তার মগজের সূক্ষতম এলাকায় জ্বলে,
আল্লাহতালার হাত---জ্বলে এক প্রশ্নের প্রদীপ।

হাত খুঁজে ফেরে শিশু, হাতড়ায় মাথার ভিতর---
বুঝিবা ভীষন দীর্ঘ সেই হাত, চওড়া ভীষন!
হয়তো নিটোল শাদা, কিংবা কালো, ভয়ানক কালো!
না-কি ঘন নীল রঙ নীলিমার মতো! না-কি লাল!

বিচিত্র বিভিন্ন হাত ঘোরে এসে শিশুর খুলিতে,
বিষন্ন বিবর্ন হাত অধিকাংশ বিচিত্র রঙিন,
বিমূর্ত বিলুপ্ত হাত ঝলোমলো অবয়বহীন।
শিশুর মগজে ভাসে অবিরল হাতের সিরিজ।

অসংখ্য টুকরো হয়ে হাত ভাঙে আয়নার মতো,
লক্ষ লক্ষ হাত, টুকরো টুকরো হাত, ভাঙা হাত,
হাতের মিছিল নামে শিশুটির মাথার সড়কে।
লক্ষ হাত মুষ্টিবদ্ধ, নির্যাতিত মানুষের হাত . . .

আল্লাহতালার হাত খুঁজে পায় অমলিন শিশু,
মানুষেরা খুঁজে পাবেরে কবে ওই গুপ্ত হাতখানা?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নৈশভোজ ’৮৩
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১২.১০.৮৩ মুহম্মদপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

সামরিক ডিনার টেবিলে সুধীবৃন্দ উপস্থিত,
মজাদার পানাহার, অতিথিরা সবাই সজ্জন।
কেউ মন্ত্রী, ব্যবসায়ী কেউ কেউ ঘোড়েল আমলা,
প্রাক্তন গেরিলা কেউ, কেউ বাম, দলত্যাগী নেতা।
সবার মসৃন ত্বক. তেলমাথা, মজবুত খুঁটি,
দিনে প্রতিপক্ষ আর রাতে ফেরে একই প্রাসাদে।

টেবিলের পূর্নিমা-শাদার 'পরে সাজানো খাবার---
চাষার চামড়া দিয়ে তৈরি-করা মোঘল-পরোটা,
রক্তের হালুয়া আর শ্রমিকের যক্ষা, সিফিলিস।
ধর্ষিতা নারীর সূপ, কাটামাথা অজ্ঞাতনামার।
নিহত ছাত্রের লাশ, গুলিবিদ্ধ, রক্ত মাটি মাখা,
বুলেটের কোর্মা আর বুটে পেষা শিশুর কাবাব।

ডিসজোড়া চমৎকার নিহত জয়নালের রোস্ট,
আধাসিদ্ধ গনতন্ত্র আর তাজা মানুষের জিভ,
ভায়ানক চেয়ে থাকা পুলিশের উপড়ানো চোখ---

ডিনার টেবিল জুড়ে মনোরম খাদ্য আয়োজন॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নপুংশক কবিদের প্রতি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৯.০৩.৮৪ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

শিশ্নহীনতাই এতো বেশি নারী-নিমগ্ন করেছে
তোমাদের অক্ষম সঙ্গম তৃষ্ণা, শিথিল শরীর
টেনে নিয়ে গেছে ওই রমনীর চুলের খোঁপায়।
ঢেকেছো অক্ষম সাধ তোমাদের শব্দে, উপমায়।

সহস্র মৃত্যুর মধ্যে গেয়ে ওঠো রমন সঙ্গিত,
জ্বলন্ত ক্ষুধার রাজ্যে স্বপ্নে দ্যাখো পুষ্পের পেখম।
রাজপথে গুলিবিদ্ধ লাশ রেখে হোটেলের ঘরে
জ’মে ওঠে তোমাদের লাস্যময় কবিতা উৎসব।

শুধু ফুল দ্যাখো, শুধু নারী দ্যাখো, স্তন দ্যাখো শুধু,
তোমরা দ্যাখো না রক্ত, মানুষের মৃত্যুর মিছিল,
তোমরা দ্যাখো না ক্ষুধা জরাজীর্ণ পতিত জীবন,
ট্রাকের চাকায় পেষা মাংশপিণ্ড তোমরা দ্যাখো না।

জীবন দেখতে যাও টার্মিনালে, খানকি পাড়ায়
বেশ্যার নাভির নিচে খুঁজে ফেরো শিল্পের আরক---
অথচ সে-জীবনের জন্যে কোনো পক্ষপাত নেই,
সেই কষ্টের বিপক্ষে কোনো বাক্য নেই তোমাদের।

তোমাদের শিল্প মানে ইঁদুরের গর্তে পলায়ন,
তোমাদের শিল্প মানে হিজড়ার অক্ষম রমন।
তোমাদের শিল্প হলো প্রতারনা, শব্দের জোচ্চুরি,
তোমাদের শিল্প হলো অন্ধকারে আঁধার সন্ধান।

শোষক চায় না হোক জীবনের প্রকৃত প্রকাশ,
আঁধার-ইঁটের নিচে চাপা থাক জালি ঘাসগুলো।
দেহের গ্যাংগ্রিন থাক মনোরম পোষাকের তলে,
ক্ষুধার্ত মানুষগুলো পূর্নিমার খোয়াব দেখুক।

তোমাদের ইচ্ছা তাই, তোমাদের একই বাসনা,
তোমরা ঢাকতে চাও হৃদয়ের ব্যাকুল বিক্ষোভ,
তোমরা লুকোতে চাও ক্লীন্তি, কষ্ট, বুকের চিৎকার---
চিত্রকল্প, উপমায় তোমরা ঢাকতে চাও ক্ষুধা।

এ-বিপুল পৃথিবীর আর কিছু নয়, হতভাগা,
শুধু ফুল, লতাপাতা, শুধু নারী তোমরা চিনেছো,
মূর্খের সংকীর্ন চোখ, সেই চোখ তোমাদের চোখে।
মধ্যযুগ চলে গেছে, প’ড়ে আছো সময়ের মল---

তোমরা রয়েছো প'ড়ে জঞ্জালের অবশিষ্ট স্মৃতি,
সাম্রাজ্যাবাদের পুঁজ, সভাতার সর্বনাশা ক্ষতি।
আজ আঁস্তাকুড়েও নেই তোমাদের নির্ধারিত ঠাঁই,
প'ড়ে আছো পচা ঘায়ে মৃত সব মাছির মতোন।

মিছিল এগিয়ে যায় মানুষের স্বপ্নের মিছিল,
তোমরা পেছনে বোসে খুঁড়ে চলো নিজের কবর।
"পুরুষরক্ষা সমিতি" ছাড়া কি আর করার আছে??

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ইটের নিসর্গ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৫.০৫.৮৪ মিঠেখালি বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ইটের নিসর্গ এই নগরের নিখুঁত কংক্রিটে
বিচিত্র বিপনিরাজি, আলো, পন্যে সুশোভিত শাখা,
অক্ষয় বটের মতো কক্ষময় দীর্ঘ ইমারত,
পথপার্শ্বে পানশালা, লাস্য-গানে পরিপূর্ন নীড়।

চিত্রল হরিন যেন প্রসাধনে দীপ্যমান নারী,
উজ্জ্বল ত্বকের পরে ফ্লুরোসেন্ট আলোর ঝলক,
তরঙ্গ-সংকুল তনু তৃষ্ণাময় তুমুল জোয়ারে।
পুকষের ব্যাগ্র প্রানে বেসামাল ব্যাকুল বাসনা।

দ্রুতযানে ধাবমান সেনাপতি, অমাত্য, কোটাল,
লস্কর, তস্কর আর নগরের বনিক স্থপতি,
মূল্যবান পরিধান, সৌম্যকান্তি নারী ও পুরুষ---
শ্রেনীর সৌভাগ্য-সিঁড়ি এরা খুঁজে পেয়েছে সবাই।

বিজ্ঞাপিত অঙ্গসহ ভ্রাম্যমান নগর-গনিকা,
নাভিতে কস্তুরি যেন অরন্যের অবাক হরিন।
হোটেলের নাচঘরে পেয়ালার উপচানো সুরা,
উপচানো সচ্ছলতা শরীরের মেদে ও চর্বিতে।

বিত্তের চূড়ায় বন্দি ভাগ্যবান শোভন মানুষ,
জনতার জঘন্য মিতালি থেকে দূরের সড়কে
গড়েছে সুরম্য খাঁচা, আবাসিক নিসঙ্গ প্রাসাদ,
গড়েছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, মনোরম নাগরিক ব্যাধি।

সচ্ছল বধূরা ঘরে ক্লান্তিপিষ্ট, নিসঙ্গ কাতর,
কেউ নারী-ন্বাধীনতা, কেউ কেউ পীরের মুরিদ,
সভাসমিতির ভিড়ে ব্যস্ত কেউ সমাজসেবায়,
কেউ পরকিয়া প্রিয়, সমকামে সমাহিত কেউ।

স্বেচ্ছাচারী পুরুষের নগরের রঙিন গুহায়
বিচিত্র বিকৃতি আর কামনার অন্তহীন ক্লেদে
রেখেছে সজীব কোরে নারকীয় নষ্ট অন্ধকার
রেখেছে সাজিয়ে পাপ, অনাচার সুদৃশ্য মোড়কে।

যতোটা উজ্জ্বল আলো ততো ম্লান সততার দীপ,
বড়ো ক্ষীন মননের স্নিগ্ধ বোধ, সৃজনশীলতা।
সাহিত্যে আমলাবাদ, রাজনীতি মূর্খের দখলে,
সঙ্গিতেও ষাঁড়তন্ত্র, চলচ্চিত্র গাধার খোঁয়ড়।

বিশাল বৃক্ষের নিচে বুনোঘাস, আগাছার মতো
'অট্টালিকা ঘিরে আছে বস্তিরাশি, মানুষের ঘর,
শ্রীহীন বীভৎস নীড়, কদাকার ইতর মানব---
ইহারা পায়নি খুঁজে সৌভাগ্যের গুপ্ত লুব্ধ সিঁড়ি।

প্রাচুর্যের রোষ আর কোটালের কুটিল ভ্রূকুটি
সহজে উপেক্ষা কোরে ইমারতে কঠিন শিকড়
গেডেছে অক্ষয় বট, জরাজীর্ন ভাগ্যহীন প্রানী।
এদের যুবতী গেছে পন্য হয়ে বিভিন্ন প্রাসাদে।

এদের কিশোর, শিশু প্রাসাদের আনাচে কানাচে
কুকুর, কাকের মতো খুঁজে খুঁজে মরেছে খাবার।
শ্রমের শোনিত ছাড়া অট্টালিকা কখনো ওঠে না,
এদের যুবক গেছে রক্ত দিতে দালানের ভিতে।

এদের তরুনী দেহ, পরিপূর্ণ নিটোল যৌবন,
দিয়েছে উজাড় কোরে সর্বশেষে কানাকড়িটিও।
গিয়েছে বিলাসকক্ষে বৃন্তচ্যুত গন্ধরাজ যেন
পুষ্পময় পানপাত্র তুলে দিতে সৌভাগ্যের হাতে।

উজ্জ্বল উৎসবে উষ্ণ, উৎকেন্দ্রিক, উটের উপমা
ইটের নিসর্গ এই প্রাচুর্যের প্রখর প্রকাশ।
নিয়নের নিয়ন্ত্রনে নিরুপায় নিসঙ্গ নগর,
তার সজ্জিত রাস্তায় আবিষ্কার করে এক প্রানী---
       
প্রকৃতির মতো নগ্ন, নারীত্বের অঙ্গচিহ্নগুলো
ফুটে আছে নিষ্করুন পাঁজরের হাড়ের কুসুম,
উদ্ধত উদোম দেহ, জটাচুল, বলি-রুক্ষ ত্বক,
ক্ষুধাজীর্ন মেরুদণ্ড তবু তার উদ্যত সঙ্গিন।

চক্ষু ফেরাও কেন? তাকাও দেখ হে সভ্য নগর,
হে সচেতন সভ্যতা, তোমার পুঁজি ও বিলাসের চিহ্ন,
তোমার বিজ্ঞান, তোমার অগ্রযাত্রার ইতিহাস
ধারন করেছে ওই নগ্ন, জীর্ন, ক্ষুধার্ত শরীর।

অধিকাংশ মানুষের একজন প্রতিনিধি ওই---
তাকাও, তাকাও, হে নগর তোমার সভ্যতা দ্যাখো॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর