কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
মিছিল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০১.০৪.৮৪ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

যে যাবে না সে থাকুক, চলো, আমরা এগিয়ে যাই।
যে-সত্য জেনেছি পুড়ে, রক্ত দিয়ে যে-মন্ত্র শিখেছি,

আজ সেই মন্ত্রের সপক্ষে নেবো দীপ্র হাতিয়ার।
শ্লোগানে কাঁপুক বিশ্ব, চলো, আমরা এগিয়ে যাই।

প্রথমে পোড়াই চলো অন্তর্গত ভীরুতার পাপ,
বাড়তি মেদের মতো বিশ্বাসের দ্বিধা ও জড়তা।
সহস্র বর্ষের গ্লানি, পরাধীন স্নায়ুতন্ত্রীগুলো,
যুক্তির আঘাতে চলো মুক্ত করি চেতনার জট।

আমরা এগিয়ে যাবো শ্রেনীহীন পৃথিবীর দিকে,
আমাদের সাথে যাবে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস,
অনার্যের উষ্ণ লহু সংঘশক্ত, শিল্পে সুনিপুন
কর্মঠ, উদ্যমশীল, বীর্যবান শ্যামল শরীর।

আমাদের সাথে যাবে ক্ষেত্রভৃমি, খিলক্ষেত্র, নদী,
কৃষি সভ্যতার স্মৃতি, সুপ্রাচীন মহান গৌরব।
কার্পাসের দুকুল, পত্রোর্ন আর মিহি মসলিন,
আমাদের সাথে যাবে তন্তু-দক্ষ শিল্পীর আঙুল।

দ্বিধাহীন ঋজু মাথা. চালো আমরা এগিয়ে যাই,
সামন্ত জঞ্জালগুলো ঝেড়ে ফেলি বলিষ্ঠ আঘাতে।
সম্পর্কের বনেদি পোষাক আর বাতিল নিয়ম
ঝেড়ে ফেলি এসো আজ বৈষম্যের সকল ধারনা।

লক্ষ্যস্থির আমাদের. চলো, সামনে এগিয়ে যাই।
আমাদের সাথে যাবে তিতুমীর, সিপাহী বিপ্লব,
আমাদের সাথে যাবে অস্ত্রাগার দখলের হাত,
কালবোশেখির মতো রক্তবীজ, বিপুল উত্থান।

উত্তাল বাংলার রোষে ছিন্নভিন্ন বেনিয়া বৃটিশ,
বিলুপ্ত নীলের চাষ, পীড়নের দুইশো বছরর।
শোষক বদলে যায়, টিকে থাকে শোষনের ফাঁদ,
মসনদে নব প্রভু জন্ম নেয় নোতুন শোষক।

চলো, আমরা এগিয়ে যাই। আমাদের সাথে যাবে
বায়ান্নর শহীদ মিনার, যাবে গন অভ্যুত্থান।
একাত্তুর অস্ত্র হাতে সুনিপুন গেরিলার মতো।
আমাদের সাথে যাবে ত্রিশ লক্ষ রক্তাক্ত হৃদয়।

শোষক বদলে যায়, টিকে থাকে শোষনের ফাঁদ,
টিকে থাকে শ্রেনীভেদ, ঘুনেজীর্ন সমাজ কাঠামো।
টিকে থাকে গৃহহীন, বস্ত্রহীন ক্ষুধার্ত জীবন।

আমরা এগিয়ে যাই শ্রেনীহীন পৃথিবীর দিকে,
চলো, যে-হাত শ্রমের হাত, যে-হাত শিল্পের হাত,
যে-হাত সেবার হাত, সে-হাত সশস্ত্র করি, চলো,
আমরা সশস্ত্র হোই সমতার পবিত্র বিশ্বাসে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অস্ত্র চাই
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৫.০৭.৮৩ সেনবাড়ি ময়মনসিংহ। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

শুধু রক্তে আজ আর কৃষ্ণচূড়া ফুটবে না ডালে।

প্রতিটি শিরায় বিষ, ভয়ানক বিষের ছোবল,
অনু-পরমানু জুড়ে বিনাশের জটিল ছেনালি,
শিকড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে ঘাতক লবন---
শুধ রক্তে আজ আর কৃষ্ণচূড়া ফুটবে না দেশে।

ওই যে-মিছিলে যায় দুর্বিনীত ঘেরাও মিছিল
ওই যে-প্লাবন যায় মানুষের গভীর প্লাবন
ওই যে-বিনাশ যায় মানুষের মৌলিক বিনাশ
ওই যে-নির্মান যায় জীবনের প্রকৃত নির্মান

তারো মূল ধ’রে টানে কতিপয় বেজন্মা কুকুর,
নিতে চায় ভুল পথে চোরাবালি, অন্ধ সাহারায়।

ওই যে যুবক বুকে বুলেটের দগদগে ক্ষত
ওই যে কিশোর খুলি উড়ে গেছে লুটানো রাস্তায়
ওই হে লাশের স্তূপ স্বদেশি বুটের তলে পেষা
ওই যে রক্তের দাগ, ভাঙা হাত, লাঞ্ছিত কুমারী
ওই যে হাজার হাত জুলুমের বিরুদ্ধে উঁচানো

তা-ও আজ বিক্রি হয়. দালালেরা একাজে নিপুন,
বিক্রি হয় অন্ধকারে মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের ঘিলু---

মাংশের দোকানে আজ পেয়ে যাবে পণ্ডিতের কিমা,
বিশ টাকা সেরে পাবে তাজা মধ্যবিত্তের পাঁজর,
খাশির সিনার পাশে চমৎকার তরুনের রান,
নগরে বেশ্যার মতো পেয়ে যাবে নেতার কলিজা।

শুধু রক্ত দিয়ে আজ পাল্টানো যাবে না জীবন।
শুধু রক্তে আজ আর কৃষ্ণচূড়া ফুটবে না ডালে।
শুধু মৃত্যু দিয়ে আজ পাল্টানো যাবে না আঁধার,
শুধু রক্তে আজ আর কৃষ্ণচূড়া ফুটবে না দেশে।

অস্ত্র চাই, অস্ত্র চাই, স্বপ্নবান অস্ত্র চাই হাতে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পটভূমি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৯.০২.৮৭ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

সুন্দর রক্তাক্ত হও, তিক্ততায় ভেঙে পড়ো, কাঁদো,
না হলে কখনো তুমি কবির বেদনা বুঝবে না॥

জননীর জন্ম-প্রস্তুতির মতো
তুমি বুকে নাও নির্মানের দায়, সুকঠিন শ্রম,
গবাদি আক্রান্ত সব্জিবাগানের মতো তুনি তছনছ হও।
তোমাকে ছিঁড়ুক নোখ, দাঁতের তীক্ষ্ণতা,
না হলে কখনো তুমি কবির বেদনা বুঝবে না।

সুন্দর তুমিও ছিন্নভিন্ন হও, রিক্ত, বিপর্যস্ত হও,
কষ্টের করাল মেঘে ঢেকে যাক তোমার আকাশ,
ভেঙে পড়ুক স্বপ্নের পাড়, পোকায় আক্রান্ত হোক শস্য,
অন্ধকার গিলে খাক যাবতীয় আলোর কুসুম---
না হলে কখনো তুমি কবির বেদনা বুঝবে না।

দক্ষিনের বারান্দায় তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছো
সুন্দর, তোমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে সমুদ্র ফেরত
বাতাসের স্নিগ্ধ ঠোঁট,
লুটিয়ে পড়ছে সূর্য স্বর্নাভ তোমার পায়ের পাতায়
ফুল ফুটছে না পাখিরা বিস্ময়ে ভুলে আছে গান---

তুমি ভেঙে পড়ো, ছিন্নভিন্ন হও, তুমি কাঁদো,
না হলে নিসর্গ স্তব্ধ হবে, প্রকৃতি হারাবে ধারাবাহিকতা।
আর একজন কবি কেবলি কাতর হাতে
জড়ো করতে থাকবে অলিখিত কুমারী কাগজ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শিকল সামাজিক
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০১.০৯.৮৬ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ওই আঁটসাট ছোটো জামাটা
আমার গায়ে পরাবার চেষ্টা কোরো না।
আমাকে থাকতে দাও ঢিলেঢোলা
আমাকে খোলামেলা থাকতে দাও।

সমূদ্রত্র থেকে উঠে আসছে যে নদী
পাখির মতো ডানা মেলে,
আমাকে সে নদীর মতো থাকতে দাও অফুরন্ত,
স্রোতের মতো প্রানবান হতে দাও আমাকে।

চার দেয়ালের ভেতরে আমি ছিলাম
আমি ওই বদ্ধ জলাশয়েও ছিলাম
আমি ছিলাম কবরের সুপ্রাচীন অন্ধকারে,
গতিহীনতার কারাগার আমাকে টুকরো টুকরো কোরে ছিঁড়েছে---

ফিরতে বোলো না।
আমাকে থাকতে দাও স্রোতময় জলের মতোন,
আমাকে থাকতে দাও পতনে উত্থানে---
ওই আঁটসাট জামাটা আমাকে পরতে বোলো না।

সংকীর্ন আস্তিনে আমার বাহু দুটি আটকা প’ড়ে যায়,
আমি পাখা মেলতে পারি না। আমি নিশ্বাস নিতে পারি না।
আমার বুক চেপে রাখে ওই সার্টের সংকীর্নতা।

ঠিক যেমন একজোড়া বুটের নিচে দীর্ঘকাল
চাপা প’ড়ে আছে আমাদের কাংখিত জীবন,
ঠিক যেমন রাইফেলের ডগায় গাঁথা বেয়োনেট
এফোঁড় ওফোঁড় কোরে দিচ্ছে আমাদের স্বপ্ন---

আমি নিশ্বাস নিতে পারি না। আমি স্বপ্ন দেখতে পারি না---
তুমি ওই আঁটসাট জামার শৃঙ্খল আমাকে পরাতে চেয়ো না॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পথ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.০২.৮৭ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

সাথে এসো না, তখনি তো বলেছিলাম।
বলেছিলাম পথটা রুক্ষ। কোথাও নুড়ি পাথর,
কোথাও বা জলকাদা, পিচ্ছিল খাড়াই, এ ছাড়াও
বুনো কাঁটায় ছাওয়া বিস্তীর্ন প্রান্তর---

কাঁটার আঘাত তোমাকে পেতেই হবে,
ছ’ড়ে যাবে পায়ের আঙুল, হোঁচটে রক্তাক্ত হবে নোখ,
তখন বলেছিলাম পথটা বন্ধুর।

ফুলের বাগান নয়, চারিদিকে সুনরোম তপ্ত বালি,
এ-রকমই পথ---এ-রকমই এ-পথের নিয়ম কানুন।

সেই তো এখন তোমার মুখের দিকে চেয়ে
তোমার বিমর্ষ ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে
নিজেরি ভীষন কষ্ট হচ্ছে।

সেই তো এখন তোমার পায়ের দিকে চেয়ে
তোমার রক্তাক্ত ম্লান আঙুলের দিকে চেয়ে
নিজেকে ভীষন অনুতপ্ত মনে হচ্ছে।

সেই তো এখন তোমার চোখের দিকে চেয়ে
তোমার হতাশ স্বপ্নহীন চোখের দিকে তাকিয়ে
নিজেরি ভীষন কষ্ট হচ্ছে।

তা হলে আসলে কেন
তরুন অশ্বের মতো জেদি ঘাড় নেড়ে উড়িয়ে কেশর?
তা হলে আসলে কেন স্বপ্নাহত জোস্নার হলুদ হরিয়াল!

তা হলে আসলে কেন রোদের সকালে,
নিষেধ মাড়িয়ে, পিছু ডাক ছিঁড়ে ফেলে
শৈশবের হিরন্ময় হার?

বলেছিলাম, এ-পথে কোথাও পাবে না জল তৃষ্ণায়---
দেখতে জলের মতো অথচ তা জল নয়
এরকম মরীচিকা কষ্টের পাহাড়
গিলে খাবে অহরহ।

বলেছিলাম, এ-পথে বিশ্বাস হলো শান্তি
আর স্থির লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার নাম সুখ।
চলমান মুহূর্তের পরে বোসে মুহূর্ত নির্মান---পরের মুহূর্ত,
তার নাম ভালোবাসা।
---ভালোবাসা কার নাম?

স্মৃতি নয়, স্বপ্ন হলো গতি।
বলেছিলাম গতিই সুন্দর সবচে’---

তবু তুমি বার বার ফিরে তাকাচ্ছো স্মৃতির দিকে
বার বার ফিরে তাকাচ্ছো রক্তাক্ত আঙুলের দিকে
ছ’ড়ে যাওয়া পায়ের দিকে,
বার বার তুমি ফিরে তাকাচ্ছো তোমার জংধরা
চেতনার দিকে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এই জল এই দুঃসময়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৯.০৮.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

কোথায় পালাতে চাও
পালাতে পালাতে তুমি শৃধু নিজেরই গভীরে লুকাও,
নিজেকে আড়াল করো, লতাগুল্মে ঘিরে রাখো বৃক্ষের ফসল।

নদীতে জোয়ার দেখে ভাবে তারে নুহের প্লাবন,
বাতাসে মাতন এলে দ্রুত হাতে লাগাও কবাট---
নিজেকে আগলে রেখে মনে হয় অসাবধানীরা
চিরদিন ঠকে।

এই জল, এ-বাতাস তুমি ঠেকাবে কি ভাবে?
বুকের ভেতরে জল ফনা তুলে বাতাসে মাতন নিয়ে আসে,
লতাগুল্ম আবরন ছিঁডেখুঁড়ে জেগে ওঠে তরুর ফসল,
কিশোরী কৈশোর ঠেলে ফুটে ওঠে বক্ষময় মাংশময় শোভা---
তুমি তারে কি দিয়ে ঠেকাবে?
কোথায় পালাবে বলো!
শরীরেব সাথে সাথে তাড়া কোরে ফেরে প্রান, জলের নাগিনী
ভেতরের পাতা জুড়ে এঘর ওঘর ঘোরে হলুদ হুলিয়া।

কান পেতে সমুদ্রের জলে
মাল্লারা দিয়েছে খুলে পাল---
পালাতে পালাতে তুমি তবু শেষে যার কাছে যাবে,
দরোজায় করাঘাত কোরে যার নাম ডাকবে দ্বিধায়
সে-তো তোমারই নাম---সে-তো তুমি।

এই জল, এ-বাতাস এই দুঃসময় তুমি ঠেকাবে কিভাবে!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অন্তর্গত যাত্রা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৬.০৫.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

কতোটুকুন ছোঁবে আমায়
অতল বোধে নেমে যাচ্ছি।
বিপুল থেকে বিপুলতর, দীর্ঘ থেকে দিগন্তহীন
হাওয়ার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছি প্রচুর পরিসরে---
অতল বোধে যাচ্ছি নেমে কোথায় আমার ছোঁবে?

বিন্দু থেকে বাড়িয়েছিলাম একখানা হাত প্রেম,
একখানা হাত স্নেহের আঙুল একটি করতলে
অন্য রেখা আনেক নদী সমুদ্রে যার ঘর,
বিন্দু এখন জনারন্য জনতার বিশ্বাস।

কোথায় এখন ছোঁবে আমায়
যাচ্ছি নেমে অতল বোধে,
বৃষ্টি ব্যাথায় উঠছে ন’ড়ে বুকের কবর,
ঝরাচ্ছে রাত অকাল শিশির ক্লান্ত চোখের উপর।

ফসল উঠে যাবার পরে
এ যেন সেই বিস্তৃত মাঠ
বেড়ে যাচ্ছে সীমানাহীন শেষে।

দীর্ঘ থেকে দিগন্তহীন
হাওয়ার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছি প্রচুর পরিসরে---

অতল বোধো যাচ্ছি নেমে কোথায় আমার ছোঁবে!!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পৃথক প্রবেশ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫.০৬.৭৬ আজিমপুর ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমি ভুল কোরে তোমার নামকে ভেবেছি আমার।
এতোদিন এই ভুলের ভেতরে, তোমার নামের মধ্যে
রেখেছি আমাকে---ভুল বুঝতে পারিনি।

তুমি ওই দূর থেকে মৃদু স্বরে যে নামে ডেকেছো,
সে-তো তোমারই নাম, তোমাকেই চিহ্নিতকরন।
অপরের নাম দিয়ে এইভাবে সাজিয়ে নিজেকে
বেড়ে ওঠা মানুষের মানবিক স্বভাবে শরীরে
বলো কতোদিন তবু নিজেকেও ভুলে থাকা যায়।

আমরা তো একদিন মিশে গিয়েছিলাম রক্তে মাংশে মেধায়,
আমাদের দুটো নাম খুলে রাখছিলো রোদের উঠোনে!
হঠাৎ এলোমেলো বাতাসের পর জেগে উঠে আমি
যে নামটি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেটি তোমার
সেই শীতে প্রথম সকালে আমি ওই নামে তোমাকে ডেকেছি।

এইভাবে ভুল কোরে দুজনেই থেকে গেছি কিছুটা দুজনে,
উভয়ের অতি কাছে থেকে গেছি চেতনার মৌলিক শিকড়ে।

ভুলে যাবো ভেবে এতোদূর আসা,
অথচ ভুলে যেতেই ভুলে গেছি---ভুল বুঝতে পারিনি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দূষিত দুপুর
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.১১.৮৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আর একবার তুমি বৃষ্টি দাও, দুরের আকাশ---
তরুন শস্যের ক্ষেত জ্বলে যাচ্ছে করাল খয়ায়।
চাষাবাদ অনভিজ্ঞ কৃষকের নেই কোনো সেচ,
কেবল হৃদয় জুড়ে অকৃত্রিম শস্য-ভালোবাসা।

একবার মেঘ দাও, ক্ষমা দাও বৃষ্টির ভাষায়,
জীবনের একমুঠো শস্য তুমি বিনাশ কোরো না।
আমাকে ফলতে দাও নৈরাজ্যের দূষিত দুপুরে,
হতে দাও শস্য-ভার-অবনত সোনালি খামার।

ফিরে নাও বিরহের তপ্ত খরা, অনল দূরত্ব,
মেঘ দাও, বৃষ্টি দাও জীবনের ব্যথিত শরীরে।
দহনে চৌচির হিয়া, ও আকাশ, মরমিয়া হাত
ছোঁয়াও মেঘের বুকে জল হয়ে ঝরুক আদোর।

লাঙল হৃদয় চিরে বীজ বুনে ভালোবাসা-ধান
একদিন অপেক্ষায় ছিলো এক বিরান প্রান্তর,
তুমি তাকে মেঘ দিলে, বৃষ্টি দিলে, দিলে সম্ভাবনা,
ফসলের স্বপ্ন হলো খরাজীর্ন অনাবাদি মাটি---

অনুতপ্ত অন্ধকার হলো স্নিগ্ধ সকালের রোদ।

যে মাটি পুড়েছে দীর্ঘ সময়ের স্বপ্নহীন ক্লেদে,
প্লাবনের পরাজয় জ’মে জ’মে যে হয়েছে ভূমি---
দিয়েছিলে মেঘ তাকে, বৃষ্টি, জল, সকল আকাশ।

দিয়েছিলে সম্ভাবনা, দিয়েছিলে প্রথম প্রকাশ।
উড়বার স্বপ্ন শুধু দিয়েছিলে, দাও নাই ডানা।
সমস্ত জীবনটারে তুলে এনে দিয়েছিলে হাতে,
দাও নাই অতি তুচ্ছ নিভৃতের একান্ত ঠিকানা॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একজন উদাসীন
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.১২.৭৭ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

কিছুসে চায়নি পেতে ব্যাকুল দুহাত,
না বিত্ত, না বৃক্ষ, সুখ, শ্রীমতী জীবন
রমনীর তাজা মাংশে সুখে জেগে থাকা।

কিছু সে চায়নি যেচে, কিছু সে পায়নি, তবু
কিছু কিছু না-পাওয়া ব্যথা জমেছে সঞ্চয়ে তার,
যে রকম বীজধান তুলে রাখে অভিজ্ঞ কিষান
সুদিন অঘ্রানে।

মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে থেকেছে সে পৃথিবীর বয়সের দিকে,
আলো আর আঁধারের দিকে, বৃত্তাবদ্ধ জীবনের দিকে

কিছু সে চায়নি তবু, চেয়েছে সে সবচেয়ে বেশি---
একথানা গৃহ নয় সারাটা পৃথিবী।

কীর্তিনাশার কূলে মানুষেরা খুলে রাখে হৃদয়ের শোক,
পাঁজরের ব্যথিত সঞ্চয়, বীজধান, আঁধার পোড়ানো আলো---
কূল ভেঙে চ'লে যায় কীর্তিনাশা।

যা কিছু হারায় তার কতোটুকু খুঁজেছে মানুষ!
কতোটুকু পেয়েছে মানুষ!
সময়ের কীর্তিনাশা দুই কূল ভেঙে চ'লে গেছে . . .

সে তবু উদাস চোখ চেয়ে থাকে পৃথিবীর বয়সের দিকে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর