কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
স্বাস্থ্যসম্মত প্রত্যাখ্যান
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৩.০২.৭৬ বাংলা একাডেমি ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

উঁহু,
ওভাবে নয়---ওভাবে দৃষ্টি ফেরাতে নেই,
ওরকম প্রত্যাখ্যান স্বাস্থসম্মত নয়।

ঠিক ওভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হয় না---
কিছুটা শিল্পিত হও, না হলে অনিদ্রাকে
ইচ্ছাহীন ভালোবেসে বাড়বে বয়স।

কিছুটা শস্যসুলভ. কিছুটা বৃক্ষ ছায়াময়
কিছুটা প্রস্ফূটিত না হলে ঘ্রানার্দ্র হবে না নারী।

ওভাবে নয়---ওরকম প্রত্যাখ্যান তঅস্বাস্থ্যকর তরুনিকা
আরো চান্দ্রিক বেদনাধৌত হতে হয়
হতে হয় আরো স্নিগ্ধ, মুগ্ধ মেঘমালা।
প্রত্যাখ্যান দিয়েছো যখন
কিছুটা প্রত্যাশা রেখে যাও,
না হলে তোমার কৃষ্ণচূড়াহীন কেটে যাবে ফলন্ত ফাল্গুন॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শ্মশান
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৭-১১.৮৬ মিঠেখালি মংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

বাড়াই তৃষ্ণার হাত ফিরে আসে শূন্যতাকে ছুঁয়ে---
তুমি নেই, নিশ্প্রদীপ মহড়ায় জ্ব'লে থাকে একা
পাথরের মতো ঠাণ্ডা একজোড়া মানবিক চোখ,
তৃষ্ণার্ত শরীর জুড়ে জেগে থাকে ব্যথিত রেদন।

নরোম আলোর চাঁদ ম'রে যায় অঘ্রানের রাতে,
বেঁচে থাকে ভালোবাসা, নক্ষত্রের আলোকিত স্মৃতি।
তোমার শূন্যতা ঘিরে দীর্ঘশ্বাস, বেদনার ঘ্রান,
তোমার না-থাকা জুড়ে জেগে থাকে সহস্র শ্মশান॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উল্টো ঘুড়ি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২০.০৪.৭৭ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা---

দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে
স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি,
কোন বেদনার বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?

সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি, সহজে ভুলি না কিছু---
না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি,
যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে
উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।

সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি
সহজে থাকি না কাছে,
পাছে বাঁধা পাড়ে যাই!
বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন-সুতো ধ’রে,
আমি শুধু যাই দূরে।

আমি দূরে যাই---
স্বপ্নের চোখে তুমি মেখে নাও ব্যতা-চন্দন-চুয়া,
সারাটি রাত্রি ভাসো উদাসীন বেদনার বেনোজলে . . .
এতো সহজেই ভাোবেসে ফ্যালো কেন?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কানামাছি ভোঁ ভোঁ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০১.০৪.৮৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমাকে ছুঁয়ো না, দ্যাখো!
আমি তো পাখর, প্রস্তরনির্মিত কোনো গহন ভাস্কর্য।
দ্যাখো তার মিহি কাজ,
ললাটে নিখুত মসৃনতা, তুমুল তর্জনী।
সহিষ্ণু পাঁজরে কালো কারুকাজ---দ্যাখো,
কখনো ছুঁয়ো না।

স্পর্শ কোরো না আমাকে---আমি তো আগুন।
অন্তর্গত দ্বিধা, ভয়, শোক, বিস্ময়, বেদনা আর
জীর্ন কুয়াসার ঠুলি,

আমার ভেতরে জ্বলে নিশিদিন।
আমি পুড়ে যাই। পোড়াই দহনযোগ্য সব প্রতিবেশ---
আমাকে ছুঁয়ো না, দূর থেকে দ্যাখো
আগুনের দহন ক্ষমতা, তার নীল হয়ে আসা গভীর হৃদয়।
আমাকে ছুঁয়ো না---আমি তো অসুখ
সংক্রামক ভাইরাস আমি আনন্দের।
আমি অস্থির কিশোরী সভ্যতার কানামাছি ভোঁ ভোঁ . . .
আমাকে ছুঁয়ো না।

আমাকে ছুঁয়ো না আড়ষ্টতা, গতিহীন স্মৃতি,
পাখির ডানার স্বপ্ন স্পর্শ করো আমার চিবুক।
আমাকে ছুঁয়ো না পরাজয়,
সমুদ্র আমাকে স্পর্শ করো।
এখন আমাকে স্পর্শ করো সম্মিলিত মানুষের গান॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উড়িয়ে দাও দুপুর তোমার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৩.০১.১৩৯৪ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

মেলার মধ্যে একটুখানি খোলামেলা---
একটুখানি কেন?
খোলামেলা একটুখানি কেন?

খুলতে পারো হৃদয় তোমার সমস্তটুক্
দেবদারু চুল খুলতে পারো
ভুরুর পাশে কাটা দাগের সবুজ স্মৃতি
স্বপ্ন এবং আগামিকাল এবং তোমার
সবচে’ গোপন লজ্জাটিও খুলতে পারো।
উড়িয়ে দিতে পারো তোমার স্মৃতির ফসিল---

উড়িয়ে দাও দুপুর তোমার শিমুল তুলো,
মেঘের খোঁপায় মুখর বিকেল উড়িয়ে দাও,
উড়িয়ে দাও ব্রীজের নিচের স্বচ্ছ জলে
স্বপ্নলেখা সবুজ কাগজ।

এ বৈশাখে হাত মেলে চাও ঝড়ের ঝাপটা,
ভেজা মাটির গন্ধে ফেলে পায়ের আঙুল
এ বৈশাখে হাত মেলে চাও জীবন বদল॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফিরে এসো নিশ্চয়তা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০২.১১.৮৬ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ফিরে এসো নিশ্চয়তা, ফিরে এসো সর্বগ্রাসী প্রেম।

ব্যথিত স্রোতের তোড়ে ভেসে যাচ্ছি নিরুদ্দেশ খেয়া,
কোথাও বন্ধন নেই, স্নেহময় শীতলতা নেই,
কোথাও আশ্রয় নেই, ক্ষমা নেই, সুবিপুল ক্ষমা।

সারাদিন অন্ধকার চাষ কোরে ফিরে আমি ঘরে,
সারারাত বেদনার বীজ বুনি বুকের ভেতর---
তুমি তো আশ্রয় জানি, ফিরে আসবার স্নিগ্ধ নীড়,
মায়ের আঁচল তুমি---ফিরে এসো নিকষিত হেম।

আমাকে ভাঙছে ঋতু প্রকৃতি ও বিরুদ্ধ সময়,
মানুষের নৃশংসতা ক্ষমাহীন চেতনার নোখ।
আমাকে ভাঙেই প্রেম, একই সাথে প্রেমহীনতাও---
না-পেয়ে কেঁদোছি যতো, পেয়ে বুঝি তারচে' অধিক।

আমাকে জবাই করে নৈরাজ্যের নিরাকার চাকু,
অস্থির অশ্বের ক্ষুর অবিশ্বাস আমাকে পোড়ায়।
সভয়ে গুটিয়ে রাখি বিশ্বাসের সুকোমল ডানা,
আশ্বিনের চাঁদ ওঠে, জেনে যায় অবিশ্বাসী নাম।

চারপাশে ফনা তোলে অন্ধ জল---ফিরে এসো তীর,
ফিরে এসো খড়কুটো, ভাসমান কাঠের শরীর।
পরিত্রান ফিরে এসো, তুলে নাও আমার সকল,
আমার ব্যর্থতা, পাপ, ভালোবাসা, ঘৃনা ও আদোর।
রাতেব সুতীব্র স্রোত, হু হু কোরে টেনে নিয়ে যায়,
ফিরে এসো নিশ্চয়তা, ফিরে এসো রোদের সকাল॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দূরে আছো দূরে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১০.০১.৮৭ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে---
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ.
পরস্পর খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খুঁজেছি!
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।

যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্তো খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।

শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি---
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।

জীবনের 'পরে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিখিল হয়ে ঝ’রে গেছে লতা।
কখন হাদয় ফেলে হৃদপিণ্ড ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দমেলায়---

তোমাকে পারিনি ছুঁতে---আমার তোমাকে,
ক্ষ্যাপাটে গ্রীবাজ যেন নীল পটভূমি
তছনছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া---

তোমার তোমাকে আজো ছুঁতে পারি নাই।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একাকি সেফটিপিন
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০২.০৪.৮৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

রমনীরা দূরে চ'লে গেছে---কেউ নেই।
যেন তারা উত্তরমেরুর পাখি ফিরে গেছে শীত শেষে।
যেন তারা নীল মেঘ
.                ভেসে ভেসে অন্য আকাশের দিকে
.                অন্যত্র কোথাও, অন্য কোনোখানে . . .

কেউ নেই। রমনীরা চ'লে গেছে৷

প্রকৃত রমন শেষে রমনীরা ফিরে যায় দূরে,
রেখে যায় সতেজ তীক্ষ্বতা
.                শরীরের
.                        টান টান স্রোত
চদোরের বুক জুড়ে রক্তছাপ
.                        চুম্বনের তৃষ্ণা
.                        রেখে যায়
.                        একাকি সেফটিপিন
তৃষ্ণার্ত পেশীর ক্লান্তি
.        জোস্নায় ভিজে যাওয়া ঠাণ্ডা ছাদ
.                        চেনা ঘ্রান
শূন্যতার সুতীক্ষ্ম সজীব শব
.                        হিরন্ময় হাহাকার---
রমনীরা দূরে চ'লে গেছে।
প্রকৃত রমন শেষে রমনীরা দূরে চ’লে যায়,
হায়! প্রকৃত রমন কবে হয়েছিলো শেষ?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শোধবোদ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.০১.১৩৯৪ মেথরপট্টি ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমারও ইচ্ছে করে বৈশাখের ঝড়ের সন্ধায়
অন্য কোনো তরুনীর হাত ধ’রে সুদূরে হারাই,
বৃষ্টি ও বাতাসে মেলি
যুগল ডানার স্বপ্ন।
আমারও ইচ্ছে করে ফুটে থাকি অসংখ্য শিমুল।

দুপুরের রোদে পোড়া চিবুকের উদাসীন তিল
ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে ভালোবাসা, নীল চোখ,
চাঁদের শরীর---
আমারও ইচ্ছে করে আঙুলে জড়াই মিহি স্মৃতি,
স্বপ্নের কপাল থেকে
ঝ’রে পড়া চুলগুলো আলতো সরাই।

আমারও ইচ্ছে করে নগরের নিয়ন্ত্রিত পথে
সমস্ত নিষেধ মানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে
উড়িয়ে চুলের মেঘ দুইজন
সড়কের মাঝখান বেয়ে হেঁটে যাই---
আমারও ইচ্ছে হয় কাঁদি।

আমারও ইচ্ছে করে খুলে দিই হাতকড়া বাঁধা হাত,
চক্রান্তের খল বুকে কামড় বসাই।

আমারও ইচ্ছে করে
টুকরো টুকরো কোরে কেটে ফেলি তোমার শরীর॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পরানে চাই দখিন হাওয়া
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০১.০৩.৮০ ফজলুল হক হল ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ক্লান্ত গোলাপ, আমি এখন বিদায় চাচ্ছি।
আমায় এখন বাইরে যাবার সময় ডাকছে,
সময় ডাকছে, করাল সময়---
ক্লান্ত গোলাপ
আমি এখন বাইরে যাবো, বাইরে, খরায়।

ক্লান্ত দুচোখ, ক্লান্ত চিবুক, ঘুমোও তুমি।
ক্লান্ত গোলাপ সারাটি দিন ঘুমোও তুমি।
আমার এখন ভীষন তাড়া,
বাইরে খরা খাপ খুলেছে তরবারির---
সময় ডাকছে, সময় ডাকছে।

আমায় এখন ছুটতে হবে অনিশ্চিতির পথে,
আমায় এখন ফুটতে হবে রোদের বিপরীতে।

ক্লান্ত গোলাপ
এখন আমার বিস্তৃতি চাই, নিভৃতি চাই,
এখন আমার পরানে চাই দখিন হাওয়া।

ফুটতে পারার
ছুটতে পারার
ফুরফুরিয়ে প্রজাপতির উড়তে পারার মতো
এখন আমার চারপাশে চাই বিস্তৃত সংসার . . .

ক্লান্ত গোলাপ, আমি এখন বিদায় চাচ্ছি
ক্লান্ত গোলাপ, আমি এখন বিদায় চাচ্ছি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর