হে নদী দূরের মেঘ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১০.০১.৭৮ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এই শূন্য বালুচর প'ড়ে আছে নদীর কিনারে শস্যহীন তৃনহীন---সামান্য সবুজ তার ফোটেনি কোথাও।
শ্রাবনে সে শোনে নাই জলবতী মেঘেপ নিশ্বাস, দ্যাখে নাই বাষ্পের পেখম মলে ভেসে থাকা জল, নদী তার ঋন ভুলে নেমে গেছে কৃতঘ্ন মানুষের মতো।
কি ভীষন ব্যর্থ বালুচর জেগে আছে নিদ্রার কিনারে স্নেহহীন, স্বপ্নহীন, আড়ষ্ট পাথর---
হে নদী, দূরের মেঘ তারে কিছু জল দাও, দাও কিছু পাললিক মাটি।
এক বুক তৃষা নিয়ে, এক বুক বালুভূমি নিয়ে তোমার নদীর পাশে জেগে থকা বিষন্ন প্রান্তর, তুমি কিছু স্বপ্ন দাও, তারে কিছু জল দাও তুমি।
ঘুমন্ত ঘুঙুর আমি বেজে উঠি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৫.০৩.৮৭ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
মগ্ন চিতা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৯.০৬.৮৫ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ভালোবেসে আমরাই হাতে তুলে নিয়েছি গন্ধম, আমরাই সাজিয়েছি নিভৃতের মগ্ন মুগ্ধ চিতা।
পুর্নিমার মদে আজ হরিনেরা মাতাল যখন, যখন জলের ফেনা অরন্যের আঙুল ছুঁয়েছে, আমাদের টেবিলে তখন এলোমেলো গ্লাস প্লেট এ্যাশট্রে উপচে পড়া সিগারেট, ঢুলে আসা চোখ, জিভ ও দাঁতের সাথে বনিবনা শেষ হয়ে গেছে।
জীবনের শেষ বিন্দু পান করা কখনো হলো না--- এই শোকে একজন কাঁপা হাতে ছুঁড়ে দিলো গ্লাস, যেন কোনো দূরের নক্ষত্রে লেগে ভেঙে গেল কাঁচ।
আমরা ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে একবার মনে হলো পুর্নিমায় হবিনেরা মাতাল এখন, আকাশের ঢুলু ঢুলু চোখ ঢুলে সমুদ্রে পড়েছে---
দৃশ্যকাব্য ১ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৭.০২.৮৭ মোহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমি তোমার নাম জানি ন। দেখলে চিনি। এখন আমি কোথায় গিয়ে খুঁজবো তোমায়? খুঁজতে খুঁজতে কোথায় যাবো?
সিরামিকের গাছগাছালি, ইটের ঝাউ বনের ভেতর কোথায় আমি খুঁজবো তোমায়?
দৃশ্যকাব্য ২ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৮.০৩.৮৭ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ঘুমও যে তোমাকে খুঁজতে গেছে সকালে টের পেলাম।
ধুনা গেছে গতকাল ব্রহ্মাণ্ডের মতো এক বিশাল বিস্ময় নিয়ে, অথবা ব্রহ্মাণ্ড নয়, ঘাসের ডগার মিহি লোম তার মতো তন্ময়তা নিয়ে।
আমরা কজন সূর্যোদয়ের গিকে তাকিয়ে আছি। আমরা শ্রবন মেলে আছি উষালগ্নে গেয়ে ওঠা পাখিদের প্রথম কণ্ঠস্বরের দিকে। আমরা তাকিয়ে আছি ঝরা পাতা আর বৃক্ষদের শূন্য ডালপালার সম্ভাবনার দিকে।
আমরা তাকিয়ে আছি আমাদের নিজেদের দিকে। তুমি নেই, কোখাও তোমার ছায়া নেই, ঘ্রান নেই---
দৃশ্যকাব্য ৩ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৪.০৩.৮৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
খুঁজতে খুঁজতে এই তো নদী, সামনে সাগর--- বাঁকানো চুল ঢেউয়ের মাথায় খুঁজতে খুঁজতে এই তো নোনা ঘোলা জলের বিপুল বিশ্ব।
ভেসে যাও অনন্ত অবধি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৪.০১.১৩৯৪ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এখন তুমিও ছুঁয়ে আছো অন্য ফুল অন্যান্য আকাশে নানান রঙের ঘুড়ি তুমি ভাসমান হাওয়ায় হাওয়ায়--- এখন তুমিও পাখি, অচেনা ফুলের ঘ্রান ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া যে কোনো নীলাভ ভ্রমর।
তোমার পালক থেকে খসে পড়ছে বিষন্ন দিনমান, চিবুকে চুম্বন স্মৃতির 'পরে অন্য আঙুল ছুঁয়ে যায় তোমার সৌরভ, এখন তোমার স্মৃতি গ'লে পড়ে নিঃশেষিত মোম।
এখন তুমিও নদী, শাদা হাঁস স্রোতের শরীরে, নিসর্গ নিয়মে তুমি চিনে নেবে হাঙরের দাঁত, বাতাসের বিরুদ্ধ ভূমিকা। চিনে নেবে সূর্যজ্বলা দিন, নক্ষত্রের আদিম রাত্তিরে মানুষের মৌলিক স্বভাব তুমি চিনে নেবে হেমলক, হরিতকি গভীর উড়াল
তোমার দুচোখে এক অস্পষ্ট স্বপ্নের ছায়া, তুমি ভেসে যাও, ভেসে ভেসে চিনে নাও দূরবর্তী কূলের ঠিকানা, অথবা নিজের মুখ দ্যাখো তুমি নিসর্গে, নির্জন আয়নায়।
ফাঁদে অন্ধকারে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.০৩.৮৭ মোংলো বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
কারো জন্যই তো কেউ অপেক্ষা করে না, যে যার মতোন ব’য়ে যায়---
আমার দিবস রাত ছিলো ফাঁদে আর অন্ধকারে তৃষ্ণায় এবং হাহাকারে শ্রাবনের নদীর মতো প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ।
বিক্ষোভ নিজের প্রতি বিক্ষোভ স্বজনের প্রতি বিক্ষোভ প্রতিবেশ এবং জীবনের প্রতি---
আমি ছিঁড়তে পেরেছি ফাঁদ। আজ আমি মাকড়শার জালগুলো আলতো হাতে সবিয়ে দিতে পারি। 'আমি এখন অন্ধকারেও ঠিক চিনতে পারি কোনটি মুদ্রা আর কারা সব রমনকাঙাল নারী, কারা মৃগনাভি কারা অরন্যের কামুক হরিন---
রোদের মতোন আজ আমিও আঙুল তুলে চিহ্নিত করতে পারি কে পনেরো এবং কে পঁচাশি
কারা স্বর্নলতা, কারা পরগাছা তরু---মূলত শোষক . . .
তা হলে অপেক্ষা কেন? কার জন্যে বোসে থাকা প্রতীক্ষায়? কার জন্যে এই মঞ্চ সামনে সাজিয়ে নিয়ে বোসে থাকা? মঞ্চ মঞ্চ খেলা কতো আর! আমি তখন তোমার দিকে এগুচ্ছিলাম। আমি ঝেড়ে ফেলতে চাইছিলাম আমার খাঁচার কষ্ট। ছিন্নভিন্ন আমার শরীর, অন্ধকারের চাবুকে খ্যাতলানো স্পর্শকাতরতা, আমি শুশ্রূষা চাইছিলাম---
আমি তখন তোমার দিকেই দূরত্ব ডিঙোচ্ছিলাম, আমি ছেটে ফেলছিলাম আমার ডালপালা অপ্রয়োজনীয় শিকড়।
আমি কেবল তোমার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম--- আর ঠিক তখনি ফাঁদে আটকে ফেল্লে তোমার পা একজন তরুন-স্বাধীনতার জন্যে একজন শ্রমিক-পাখির জন্যে যে ফাঁদ রেখেছে পেতে এই তৃতীয় পৃথিবীর সভ্যতা, সেই জলপাই ফাঁদে তোমার পা তোমার চারপাশে মাকড়শার জাল---খাঁচা খাঁচায় তোমার স্বপ্ন তুমি আবর্তিত হচ্ছো এক বৃত্তাকার অর্থহীনতায়---
আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না, দূরত্বের কাঁচে ঠেকে ফিরে আসছে আঙুল।
আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না, মাকড়শার জালের চতুরতা ঘিরে রেখেছে তোমাকে। আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না, জলপাই আদালতে পাখিদের নামে হুলিয়া ঝুলছে--- প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করছে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে॥
প্রেসক্লাবের জুয়োর টেবিলে আমার জমবে ভিড়, দেনিক কাগজে ছাপা হবে নৈমিত্তিক শীতল খবর। বিষন্ন হাসপাতাল থেকে স্বজনের কাঁধে হাত রেখে বাড়ি ফিরে যাবে অঙ্গহীন কলেজ তরুন। শরীর বেচবে শেষে শরীরের টানে, হাত ভাঙা টোকায়ের হাতে উঠবে ভিক্ষার থালা, আর আহত হবার অপূর্ন বাসনা বুকে নিয়ে ছাউনিতে ঝিমুবে পুলিশ।
চুল ছেঁটে, নোখ কেটে কবিরা বাড়িয়ে দেবে পরাজিত জিরাফের গলা শিল্পীরা আঁকতে বোসে যাবে দুটি সন্তান যথেষ্ট, গলাবাজ গায়কেরা গেয়ে উঠবে নোতুন বাংলাদেশ . . . . পাঁচতারায় উথলে উপচে পড়বে কৌটোবন্দি ভল্লুকের ফেনা।
আবার সচল হবে শোষনের সনাতন চাকা, সন্তান হারানো জননীর হৃদপিন্ডে গুমরে মরবে ঈশানের মেঘ। শকুন কুকুর আর শেয়ালের বিমূর্ত উল্লাসে মুছে যাবে কার্তিকের ঝলসানো দুরন্ত প্রহরগুলো।
যদি না জন্মায় আজ স্বপ্নবান একটি কুসুম বিশ্বাসের বিপন্ন উঠোনে, যদি না সঞ্চার হয় অগ্রিগর্ভা এই সময়ের জরায়ুতে 'দিন-বদলের ভ্রূন।