কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
হে নদী দূরের মেঘ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১০.০১.৭৮ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

এই শূন্য বালুচর প'ড়ে আছে নদীর কিনারে
শস্যহীন তৃনহীন---সামান্য সবুজ তার ফোটেনি কোথাও।

শ্রাবনে সে শোনে নাই জলবতী মেঘেপ নিশ্বাস,
দ্যাখে নাই বাষ্পের পেখম মলে ভেসে থাকা জল,
নদী তার ঋন ভুলে নেমে গেছে কৃতঘ্ন মানুষের মতো।

কি ভীষন ব্যর্থ বালুচর জেগে আছে নিদ্রার কিনারে
স্নেহহীন, স্বপ্নহীন, আড়ষ্ট পাথর---

হে নদী, দূরের মেঘ তারে কিছু জল দাও,
দাও কিছু পাললিক মাটি।

এক বুক তৃষা নিয়ে, এক বুক বালুভূমি নিয়ে
তোমার নদীর পাশে জেগে থকা বিষন্ন প্রান্তর,
তুমি কিছু স্বপ্ন দাও, তারে কিছু জল দাও তুমি।

হে শরম, নিভৃত ব্যথা, হে বিবহ সুখের অনল,
পতিত জমিন চ'ষে এই বুকে ফসল ফলাও,

অনিদ্রা মলিন চোখ তুমি তারে স্বপ্নমুগ্ধ করো।
তুমি তারে প্রেম দাও, বিরহ অনল দাও---উপেক্ষা দিও না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘুমন্ত ঘুঙুর আমি বেজে উঠি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৫.০৩.৮৭ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

স্পর্শে ভেঙে যাবো আমি,
আলতো ছুঁলেই আমি ঝ'রে যাবো
স্মৃতিময় ম্লান মসলিন।

ছুঁয়ে দাও।
আমি ভাসমান মগ্ন মেঘেদের মতো ঝ'রে পড়ি
বৃষ্টির পালক,
ঝ'রে পড়ি পাখির ডানার স্মৃতি,
মানিপ্লান্টে টলোমলে এক ফোঁটা জল।

স্পর্শ করো, ছুঁয়ে দ্যাখো পাথরের পরম পিপাসা,
কঠিন শিলার ঘাম
ছুঁয়ে দাও তৃষ্ণার্ত চিবুক।

টোকা দাও
আমি ঝ’রে পড়ি বিনম্র আঙুর।
টোকা দাও, ঘুমন্ত ঘুঙুর আমি বেজে উঠি,
বাজাই বিজন ব্যথা
সুদূরেব নিসঙ্গ মাস্তুল---

স্পর্শ করো আমি ভেঙে যাই, ঝ'রে পড়ি ঘাসে,
নীলিমায় পাখা মেলি
বৈশাখের স্বপ্নার্দ কার্পাশ।
নদী হোই।
স্পর্শ করো, একবিন্দু জল হোই---অশ্রুজল॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মগ্ন চিতা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৯.০৬.৮৫ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ভালোবেসে আমরাই হাতে তুলে নিয়েছি গন্ধম,
আমরাই সাজিয়েছি নিভৃতের মগ্ন মুগ্ধ চিতা।

পুর্নিমার মদে আজ হরিনেরা মাতাল যখন,
যখন জলের ফেনা অরন্যের আঙুল ছুঁয়েছে,
আমাদের টেবিলে তখন এলোমেলো গ্লাস প্লেট
এ্যাশট্রে উপচে পড়া সিগারেট, ঢুলে আসা চোখ,
জিভ ও দাঁতের সাথে বনিবনা শেষ হয়ে গেছে।

জীবনের শেষ বিন্দু পান করা কখনো হলো না---
এই শোকে একজন কাঁপা হাতে ছুঁড়ে দিলো গ্লাস,
যেন কোনো দূরের নক্ষত্রে লেগে ভেঙে গেল কাঁচ।

আমরা ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে একবার
মনে হলো পুর্নিমায় হবিনেরা মাতাল এখন,
আকাশের ঢুলু ঢুলু চোখ ঢুলে সমুদ্রে পড়েছে---

নিভৃতের মগ্ন চিতা বাড়িয়েছে লেলিহান জিভ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দৃশ্যকাব্য ১
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৭.০২.৮৭ মোহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ
শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

আমি তোমার নাম জানি ন।
দেখলে চিনি।
এখন আমি কোথায় গিয়ে খুঁজবো তোমায়?
খুঁজতে খুঁজতে কোথায় যাবো?

সিরামিকের গাছগাছালি,
ইটের ঝাউ বনের ভেতর
কোথায় আমি খুঁজবো তোমায়?

কোথায় তোমার সৌম সকাল, শান্ত দুপুর?
কোথায় তোমার মুখর বিকেল, একাকি রাত?

খুঁজবো কোথায়---ঝরা পাতায় সাজানো ঘাস
সন্ধাবেলায়? কোথায় খুঁজবো?

এই যে আমি খুঁজছি তোমায়---কিন্তু কেন??

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দৃশ্যকাব্য ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.০৩.৮৭ রাজাবাজার ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

ঘুমও যে তোমাকে খুঁজতে গেছে
সকালে টের পেলাম।

ধুনা গেছে গতকাল
ব্রহ্মাণ্ডের মতো এক বিশাল বিস্ময় নিয়ে,
অথবা ব্রহ্মাণ্ড নয়, ঘাসের ডগার মিহি লোম
তার মতো তন্ময়তা নিয়ে।

আমরা কজন সূর্যোদয়ের গিকে তাকিয়ে আছি।
আমরা শ্রবন মেলে আছি উষালগ্নে গেয়ে ওঠা
পাখিদের প্রথম কণ্ঠস্বরের দিকে।
আমরা তাকিয়ে আছি
ঝরা পাতা আর বৃক্ষদের শূন্য ডালপালার সম্ভাবনার দিকে।

আমরা তাকিয়ে আছি আমাদের নিজেদের দিকে।
তুমি নেই, কোখাও তোমার ছায়া নেই, ঘ্রান নেই---

সূর্যোদয়ের ভেতরে তুমি নেই,
তোমাকে খুঁজতে গেছে নিদ্রাহীন চোখের তীক্ষ্ণতা।
তোমাকে খুঁজতে গেছে
অপরাজিত বাংলার পাদদেশে জড়ো মিছিলের হাত,
একটি সবুজ প্রজাপতি।

তোমাকে খুঁজতে গেছে স্বপ্নে পোড়া মানবিক একটি হৃদয়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দৃশ্যকাব্য ৩
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.০৩.৮৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

খুঁজতে খুঁজতে এই তো নদী,
সামনে সাগর---
বাঁকানো চুল ঢেউয়ের মাথায় খুঁজতে খুঁজতে
এই তো নোনা ঘোলা জলের বিপুল বিশ্ব।

খুঁজতে খুঁজতে বিস্তৃত মাঠ
শুন্য খা খা খড় ও নাড়ায়
অগ্রহায়ন শস্যস্মৃতি---এখন ফাটল স্মৃতির ফাটল।
সামনে বৃষ্টি এবং মেঘের
মেঘের স্বপ্ন---কোথায় তুমি?

খুঁজতে খুঁজতে চুল ছাঁটা গাছ সুন্দরী বন,
নির্জনতার নিখুঁত নগর খুঁজতে খুঁজতে---

জনপদের একটি মানুষ
খুঁজতে খুঁজতে শিকলভাঙা একটি মানুষ
মানুষ পাখি---কই দেখিনা!

খুঁজতে খুঁজতে এই তো পাখি
হাওয়া ডানায় দিগন্তে চোখ এই তো পাখি।
মানুষ পাখি কোথায় খুঁজবো?

প্রাচীন বটের সবুজ ফ্ল্যাটে?
খুঁজবো তোমায় মানুষ পাখি কোথায় মানুষ?

খুঁজতে খুঁজতে অখৈ সাগর,
সাগর মানে তিন ফোঁটা জল।
এক ফোঁটা এই জনপদের গলি ঘুপচি, দেশ সীমানা।
শাদা কালোর মূর্খ লড়াই।
নিরর্থক এক বৈষম্যের ভুল সাধনায় মত্ত কজন
কজন মানুষ ভ্রান্ত মানুষ।

সর্বগ্রাসী ধংশ হাতে কজন মানুষ
ভ্রান্ত কজন ধংশ স্বপ্নে নিমজ্জমান
এবং মাতাল

এবং তারা মুখোমুখি
দাঁত নোখ শিং মুখোমুখি---

খুঁজতে খুঁজতে পৃথিবীর এই ক্লান্তি বেলায়
খুঁজতে খুঁজতে
সবুজ মাটির শেষ সীমানা
খুঁজতে খুঁজতে দিগন্তে মেঘ
শূন্য আকাশ
খুঁজতে খুঁজতে নিজের ছায়া ছায়ায় শরীর
শরীর এবং স্নায়ু সকল
খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভেসে যাও অনন্ত অবধি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৪.০১.১৩৯৪ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

এখন তুমিও ছুঁয়ে আছো অন্য ফুল অন্যান্য আকাশে
নানান রঙের ঘুড়ি
তুমি ভাসমান হাওয়ায় হাওয়ায়---
এখন তুমিও পাখি, অচেনা ফুলের ঘ্রান
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া যে কোনো নীলাভ ভ্রমর।

তোমার পালক থেকে খসে পড়ছে বিষন্ন দিনমান,
চিবুকে চুম্বন স্মৃতির 'পরে অন্য আঙুল
ছুঁয়ে যায় তোমার সৌরভ,
এখন তোমার স্মৃতি গ'লে পড়ে নিঃশেষিত মোম।

এখন তুমিও নদী, শাদা হাঁস স্রোতের শরীরে,
নিসর্গ নিয়মে তুমি চিনে নেবে হাঙরের দাঁত,
বাতাসের বিরুদ্ধ ভূমিকা।
চিনে নেবে সূর্যজ্বলা দিন, নক্ষত্রের আদিম রাত্তিরে
মানুষের মৌলিক স্বভাব
তুমি চিনে নেবে হেমলক, হরিতকি
গভীর উড়াল

তোমার দুচোখে এক অস্পষ্ট স্বপ্নের ছায়া,
তুমি ভেসে যাও,
ভেসে ভেসে চিনে নাও
দূরবর্তী কূলের ঠিকানা,
অথবা নিজের মুখ দ্যাখো তুমি নিসর্গে, নির্জন আয়নায়।

তুমি তো উড়তে চাও বিভিন্ন আকাশে,
তবে পলাতক পাখিদের ডাক নাম ধ'রে
ডেকে ওঠো প্রেম তুমি গোধুলি আলোয়,
ভেসে যাও---
বেহুলার বিশ্বাসী ভেলায় তুমি ভেসে যাও অনন্ত অবধি . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফাঁদে অন্ধকারে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫.০৩.৮৭ মোংলো বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

কারো জন্যই তো কেউ অপেক্ষা করে না,
যে যার মতোন ব’য়ে যায়---

আমার দিবস রাত ছিলো ফাঁদে আর অন্ধকারে
তৃষ্ণায় এবং হাহাকারে শ্রাবনের নদীর মতো
প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ।

বিক্ষোভ নিজের প্রতি বিক্ষোভ স্বজনের প্রতি
বিক্ষোভ প্রতিবেশ এবং জীবনের প্রতি---

আমি ছিঁড়তে পেরেছি ফাঁদ।
আজ আমি মাকড়শার জালগুলো
আলতো হাতে সবিয়ে দিতে পারি।
'আমি এখন অন্ধকারেও ঠিক চিনতে পারি কোনটি মুদ্রা
আর কারা সব রমনকাঙাল নারী, কারা মৃগনাভি
কারা অরন্যের কামুক হরিন---

রোদের মতোন আজ আমিও আঙুল তুলে
চিহ্নিত করতে পারি
কে পনেরো এবং কে পঁচাশি

কারা স্বর্নলতা, কারা পরগাছা তরু---মূলত শোষক . . .

তা হলে অপেক্ষা কেন?
কার জন্যে বোসে থাকা প্রতীক্ষায়?
কার জন্যে এই মঞ্চ সামনে সাজিয়ে নিয়ে বোসে থাকা?
মঞ্চ মঞ্চ খেলা কতো আর!
আমি তখন তোমার দিকে এগুচ্ছিলাম।
আমি ঝেড়ে ফেলতে চাইছিলাম আমার খাঁচার কষ্ট।
ছিন্নভিন্ন আমার শরীর, অন্ধকারের চাবুকে
খ্যাতলানো স্পর্শকাতরতা,
আমি শুশ্রূষা চাইছিলাম---

তুমি ঝাপিয়ে পড়লে আমার রক্তাক্ত কাতরতার উপর,
তোমার স্নেহার্দ্র নোখ লেগে
তোমার তৃষ্ণার্ত চুম্বনের ঘ্রানে
আমি জেগে উঠলাম
দেখলাম তোমার কোলজোড়া অন্ধকার,
শাদা সিঁথি, ললাটে লেপ্টে যাওয়া প্রার্থিত সিঁদুর---

আমি তখন তোমার দিকেই দূরত্ব ডিঙোচ্ছিলাম,
আমি ছেটে ফেলছিলাম আমার ডালপালা
অপ্রয়োজনীয় শিকড়।

আমি কেবল তোমার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম---
আর ঠিক তখনি ফাঁদে আটকে ফেল্লে তোমার পা
একজন তরুন-স্বাধীনতার জন্যে
একজন শ্রমিক-পাখির জন্যে
যে ফাঁদ রেখেছে পেতে
এই তৃতীয় পৃথিবীর সভ্যতা,
সেই জলপাই ফাঁদে তোমার পা
তোমার চারপাশে মাকড়শার জাল---খাঁচা
খাঁচায় তোমার স্বপ্ন
তুমি আবর্তিত হচ্ছো এক বৃত্তাকার অর্থহীনতায়---

আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না,
দূরত্বের কাঁচে ঠেকে ফিরে আসছে আঙুল।

আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না,
মাকড়শার জালের চতুরতা ঘিরে রেখেছে তোমাকে।
আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারছি না,
জলপাই আদালতে পাখিদের নামে হুলিয়া ঝুলছে---
প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করছে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এক্সরে রিপোর্ট
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৯.৮.১৩৯৪, মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা
সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।

রোদ্দুরে শুকিয়ে যাবে।
আর যদি বৃষ্টি নামে
অঘ্রানের পড়ন্ত বেলায়,
ধুয়ে যাবে রক্তের সমস্ত দাগ,
বুলেটে ছিটকে পড়া হলুদ মগজ।

মেথর পট্টির মেয়েগুলো কুয়াশার প্রথম সকালে
দৈনন্দিন ঝাড়ু দিয়ে তুলে নেবে ইঁটের টুকরোগুলো।
বোমার ধাতব কুচি, আইল্যান্ডের উল্টানো গ্রীল।
পোড়া গাড়ির ভগ্নাংশ
পৌরসভার পোয়াতি ট্রাকে চেপে পৌঁছে যাবে
শহরের প্রান্ত সীমানায়।

প্রেসক্লাবের জুয়োর টেবিলে আমার জমবে ভিড়,
দেনিক কাগজে ছাপা হবে নৈমিত্তিক শীতল খবর।
বিষন্ন হাসপাতাল থেকে স্বজনের কাঁধে হাত রেখে
বাড়ি ফিরে যাবে অঙ্গহীন কলেজ তরুন।
শরীর বেচবে শেষে শরীরের টানে,
হাত ভাঙা টোকায়ের হাতে উঠবে ভিক্ষার থালা,
আর আহত হবার অপূর্ন বাসনা বুকে নিয়ে
ছাউনিতে ঝিমুবে পুলিশ।

চুল ছেঁটে, নোখ কেটে কবিরা বাড়িয়ে দেবে
পরাজিত জিরাফের গলা
শিল্পীরা আঁকতে বোসে যাবে দুটি সন্তান যথেষ্ট,
গলাবাজ গায়কেরা গেয়ে উঠবে নোতুন বাংলাদেশ . . . .
পাঁচতারায় উথলে উপচে পড়বে
কৌটোবন্দি ভল্লুকের ফেনা।

আবার সচল হবে শোষনের সনাতন চাকা,
সন্তান হারানো জননীর হৃদপিন্ডে
গুমরে মরবে ঈশানের মেঘ।
শকুন কুকুর আর শেয়ালের বিমূর্ত উল্লাসে
মুছে যাবে কার্তিকের ঝলসানো দুরন্ত প্রহরগুলো।

যদি না জন্মায় আজ
স্বপ্নবান একটি কুসুম বিশ্বাসের বিপন্ন উঠোনে,
যদি না সঞ্চার হয় অগ্রিগর্ভা এই সময়ের জরায়ুতে
'দিন-বদলের ভ্রূন।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ময়না তদন্ত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৭.৬.১৩৯৪ (১২.১০.১৯৮৬), হোটেল সরনী নওগাঁ। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।

আত্মপ্রকাশের সামনে দাঁড়িয়েছিলে তুমি।
তুমি--- মানে সামাজিক নারী,
মানে সংসার, সন্তান, বাড়িভাড়া, মরিচ, পেঁয়াজ,
মানে দশটা-পাঁচটা, বিকেলে ক্রিসেন্ট লেক
নয়তো বেইলি রোডে নাগরিক নটনটি
শুধু অভিনয়,
শুধু কথার মুখোশ, চমৎকার, বনেদি মসৃন।

তুমি--- মানে সুস্থতার নামে এক জটিল জীবন,
শাড়ি, টিভি, ভিসিআর,
দুচারটে গোপন চুম্বনে গাঁথা পুরোনো প্রেমের সমৃতি,
মানে সুঘ্রান, মোহময় সেক্সঅ্যাপিল,
মানে সুস্থতা, মূলত যা শোষন,
মানে বেঁচেবর্তে আছি,
এই তো, ভালই . . .

তুমি--- মানে প্রতারনা, শোকেসে সাজিয়ে রাখা কার্লমার্কস, লেনিন,
মানে সভামঞ্চে শ্রমিক শ্রেনীর পক্ষে তেজী শব্দাবলী,
মানে চার ইঞ্চি ফোমে গা ডুবিয়ে
নগ্ন স্তনে হাত, চোখে স্বপ্ন---
ব্যালকনিসহ বাড়ি,
ব্যক্তিগত দ্রুতযানে স্মৃতিসৌধ দেখে আসা।

আত্মপ্রকাশের পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিলে তুমি.
তুমি--- মানে কারাগার, বন্ধনের সোনালি শিকল,
মানে মধ্যরাতে টলোমলো পৃথিবীর ঘরে ফেরা নয়
সুগন্ধি মাতাল মাংশে ডুবে যাওয়া উষ্ন বিছানা।

তুমি--- মানে ঝলোমলো, হীরক-ব্যর্থতা,
মানে ছিন্নমূল দুপুরের ফুটপাথে ডালরুটি নয়
আলস্যের মেদ মেখে বেড়ে ওঠা শোভন জীবন,
ঘুষ, কালোটাকা,
মানে ককটেল পার্টি,
মানে বন্ধুর পত্নীর কাঁধে হাত, আবডালে ছোঁয়াছুঁয়ি,
মানে কন্যার স্বামীর সাথে মা উধাও
ব্লু-ব্লু---
তবু, রমনীরা সতিসাধ্বি, পত্নীপরায়ন স্বামী।

সুস্থতার ভূমিকায় ভাঁড়েরা মানিয়ে যায় অবিকল

কেবল বাড়তে থাকে রক্তচাপ, মুত্রে চিনি আর
নিদ্রাহীন রাত্রির প্রহর---

কোথাও সুস্থতা নেই।
এ সময়ে শোষনের সুশোভন নামই সুস্থতা---
তুমি সেই সুস্থতার নির্বোধ প্রতীক।
আত্মপ্রকাশের সামনে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর