কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
পাখিদের গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১২.০৪.৮৫ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

আমাৰ স্নায়ুর সকল ইচ্ছা দিয়ে
তোমাকে চাইছি হৃদয়ের কাছে পেতে।
তোমাকে চাইছি মানবিক স্নেহে, প্রেমে,
মানবিক মোহে, শরীরে ও পিপাসায়।

পাখিরা যেমন মৌশুমি ঘর বাঁধে,
উত্তর থেকে নাতিশীতোষ্ণ বিলে।
আমরাও বাঁধি পাখিদের মতো নীড়,
চলো গ’ড়ে তুলি নীলিমার সংসার।

সন্ধায় চলো মহুয়া ফুলের বনে,
উঠাই দুজনে চোলাই মদের হাঁড়ি।
জোস্না যদিবা না-ও ফোটে আসমানে,
আমরা দুজনে ফোটাবো জোস্না শিখা।

অথবা দুজনে ডানা মেলে চলো উড়ি,
রোদ্দুৰে পুড়ি, ভিজি শিশিরের জলে,
পাখা মেলে ভাসি আকাশের অঙ্গনে
চলো দুইজনে জীবনের মানে খুঁজি।

চলো ভেসে যাই সমুদ্রগামী স্রোতে,
অচেনা জলের অকূল পরিধি জুড়ে
হাতছানি দেয় অনিশ্চিতের ঢেউ,
মুক্ত জীবনে ডাকে দরিয়ার চিঠি।

শরীরে জড়ানো সামাজিক শৃংখল,
চেতনা অলস অনিশ্চিতের ভয়ে।
অনিশ্চয়তা জীবনের সম্পদ,
চলো ছিঁড়ে ফেলি ফানুসের কারুকাজ।

কৌম জীবনে পূর্বসূরীর মন,
হারায়ে এসেছি হাজার বছর আগে।
হারায়ে এসেছি মানুষের মূল ভাষা
নিসর্গচারী খাঁটি শরীরের স্বাদ।

খুঁজে দেখি চলো হারানো প্রানের গান,
হারানো ফসল, পূর্নিমা উৎসব।
চলো খুঁজে দেখি নিসর্গ-অভিধান,
জীবনের মূল শব্দ, অর্থগুলো।

সম্মিলিতের সাম্য জীবন খুঁজে,
আমরা সরাবো ব্যক্তিক জঞ্জাল।
আমরা ছিঁড়বো চেতনার শৃংখল,
মুক্ত বিশ্বে পাখি হবো দুইজনে।

মেধার সফল সূক্ষ্মতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে,
ভাষার সকল প্রকাশ ক্ষমতা দিয়ে
তোমাকে চাইছি শরীরের কাছে পেতে,
তোমাকে চাইছি জীরনের কাছে পেতে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সকালের গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৪.০৪.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

লাল সফলের সূর্যটা উঠি উঠি,
বৈশাখ মাস বইছে দখিনা হাওয়া।
আলোর সূচনা গুটি গুটি পায়ে এসে
কেবল হয়েছে কণ্ঠার কালো তিল,

কেবল তোমার ছুঁয়েছে চোখের পাতা।
কপালের পাশে ঝ'রে-পড়া কটি চুল
রেশমি বাতাসে হয়েছে আত্মহারা,
বাতাসও হয়েছে মাতাল তোমাকে ছুঁয়ে।

ঘামে চিক্ চিক্ চিবুকের মিহি লোমে
খেলছে দিনেব প্রথম সোনালি রোদ,
ফুল ফুটবার মতোন তোমার চোখ
মেলেই দেখলে অভাবের ক্রুর থাবা,

খুবলে নিয়েছে দেয়ালের যৌবন।
জীর্ন ঘরের হেঁশেল হাৎড়ে ঘেটে
নিশাচর কটি সুপ্রাচীন তেলাপোকা,
শ্লথ পায়ে ফিরে চলেছে আঁস্তাকুড়ে।

গত রাত্রির অনটনে ভেজা স্মৃতি
আজকের তাজা সকালেও অম্লান।
অনিশ্চয়তা ড্রাগনের মতো মুখ,
দুটো টিকটিকি শৃংগারে নিমগন।

বুনো মাকড়শা মেলেছে সুক্ষ্ম জাল,
খাদ্যের খোঁজে ধাবমান নীল মাছি
বেঁধে আছে জালে নিজেই খাদ্য হয়ে।
কালো মাকড়শা ফেলেছে জটিল জাল।

কালো মাকড়শা তোমাকে বেঁধেছে জালে,
বেঁধেছে তোমার জীবনের যত সাধ,
সাধ্যের জালে আটকা পড়েছো তুমি,
টের পাও আজ সকালের সৌরভ?

টের পাও তুমি দিখিনা হাওয়ার মানে?
অবসরে স্মৃতি শৈশব কানামাছি
টের পাও আজ জোস্নার কোলাহল?
সাধ্যের জালে বন্দি তোমার স্বাদ।

শ্রমের মূল্য, মজুরীর ঘেরাটোপে
তোমার স্বপ্ন বহুদিন থেকে বাঁধা,
মাকড়শা-জালে মৃত মাছিটির মতো
তুমিও আটকা সামাজিক শৃংখলে।

তোমার হেঁশেলে খাদ্য পাবে না মাছি,
স্বপ্ন-ব্যর্থ তেলাপোকা যাবে ফিরে।
দখিন হাওয়ারা তোমাব জানালা খুঁজে
কখনো পাবে না সৌভাগ্যের ঘ্রান।

বিকেলে লেকের পাশের নির্জনতা
সূর্যাস্তের রঙ বদলানো মেঘ,
কখনো পাবে না তোমার ঠিকানা খুঁজে।
মাছিটির মতো তুমিও বন্দি জালে।

তোমার দুপাশে ছুটে যাবে দ্রুতযান,
আলো ঝলমল পরিপাটি হাসি মুখ
পাশ কেটে যাবে সুখের মুখোশ এঁটে---
তুমি জানো সুখি এভাবে হয় না কেউ।

তুমি জানো এই নগরের উৎসব
কেড়ে নিয়ে গেছে তোমার অনেক সাধ,
তোমার অনেক অবশ্য-প্রয়োজন।
তুমি জানো তুমি অর্থনীতিতে বাঁধা।

তোমার জীবন আটকা পড়েছে জালে
তোমার স্বপ্ন আটকা পড়েছে জালে
তোমার শরীর আটকা পড়েছে জালে
(তোমার স্নায়ুরা আটকা পড়েছে জালে---

তুমি জানো তুমি নিরুপায় মাছি নও
তোমার স্বপ্ন সচেতনতার ভাষা
ভেঙে দিতে চায় ভাঙা জীবনের ভিত---
তুমি জানো তুমি মিছিলের একজন॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শাড়িকাপড়ের গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫.০৪.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

শাড়িতে তোমাকে মানায় সবচে’ বেশি
এবং তা যদি স্বদেশের তাঁত হয়।

অস্ত্রিকভাষী ভেড্ডিড জনধারা
বয়ে এনেছিলো যে-পোষাক দেহে কোরে,
আজকে তা শাড়ি নাম নিয়ে আছে বেঁচে।
পুরুশের ধুতি লুপ্ত হয়েছে প্রায়।

মাটি ও জলের মাতৃভাষার সাথে
মিশে আছে স্বাদ, দিনযাপনে ভাষা।
শ্রমের স্বভাবে গাঁথা মানুষের দিন,
অর সাথে গাঁথা প্রানের স্বভাবগুলো।

শাড়িতে তোমাকে মানায় সবচে' বেশি
এবং তা যদি দেশের তাঁত হয়।
নগ্ন দেহের শ্যামল প্রকৃতি ঘিরে
নদীর মতোন জড়িয়ে থাকবে শাড়ি।

কূলের সবুজ নিসর্গ পরিচয়
মসৃন ত্বকে তৃষ্ণা উঠবে জ্বলে,
প্রকাশিত বাহু লাবন্যে অপরূপ
ডানা মেলে যেন উড়বে আকাশে পাখি।

শাড়িতে তোমাকে মানায় সবচে' বেশি
এবং তা যদি দেশের তাঁত হয়।
মসলিন-স্মৃতি যে সব আঙুলে মাখা,
তারাই সাজাবে তোমার শরীরখানি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নারী ও নদীর গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬.০৪.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।

খোলা জানালায় দাঁড়ালে, বাইরে চোখ,
জোয়ারে ভাটার বহমান নদী পাশে।
ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাওয়ার পঙ্গপাল
তোমার দেহের সবুজ শস্যক্ষেতে।

তাকিয়ে দেখছো বিকেলের ভেজা আলো
ভিজিয়ে দিয়েছে জলের বস্ত্রখানা।
নদী আর নেই প্রকৃতির স্রোতস্বিনী,
যান্ত্রিক স্রোতে সে-নদী গিয়েছে খোয়া।

ভেঁপুর শব্দে কাঁপিয়ে বসুন্ধরা
ছুটে চলিতেছে জল-সকটের ঝাঁক।
ছড়ানো ছিটানো গতিহীন গাধা-বোট,
মুখে ফেনা তুলে ঝিমুচ্ছে অবিরাম।

নদীকে আদৌ নদীই হয় না মনে,
মনে হয় জালে আবদ্ধ খরগোশ।
মনে হয় যেন ধাবমান হরিনেরা
বাঁধা পড়ে গেছে শিকারির পাতা ফাঁদে।

সহসা অমন চমকে তাকালে কেন?
সহসা নিজেই তাকালে নিজের দিকে---
তুমিও তো নেই প্রকৃতির সেই নারী,
শস্য শ্রমবান শ্যামলিমা।

তুমিও তো নেই বীজ বপনের মাঠে
তুমিও তো নেই ফসল তোলার গানে।
মহুয়া মদের উদ্দাম জোস্নায়
মাতাল তোমার শরীরে সে-নাচ নেই।

তোমাকে এখন নারীই হয় না মনে,
মনে হয় যেন মহিলা-জাতীয় লোক।
সূর্যদীঘল শস্যের ক্ষেতখানি,
কেউ যেন এনে রেখেছে ড্রয়িংরুমে।

খোলা জানালায় উড়ছে তোমার চুল,
বাইরে দিন ও রাতের সন্ধিক্ষন।
তোমার সামনে বহমান ঘোলা নদী,
সংঘাতময় রক্ত বিছানো দিন।

পেছনে তোমার দেয়ালের কংক্রিট,
সভ্যতা শেখা মানুষের ইতিহাস।
সামাজিক পালা বদলের সংঘাতে
হারানো তোমার মানবিক অধিকার।

পেছনে তোমার মুক্ত দিনের স্মৃতি,
বন্ধনহীন জীবনের দায়ভার।
পেছনে তোমার প্রেরনার পাটাতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে সাহসের শিখা হাতে।

খোলা জানালায় মাতাল তোমার চুল,
এখন দিন ও রাতের সন্ধিক্ষন।
তোমার সামনে জানালায় শিক আঁটা,
পেছনে তোমার সামাজিক কংক্রিট।

এখন দিন ও রাতের সন্ধিক্ষন,
নদীতে জোয়ার ও ভাঁটির ক্রান্তিকাল।
তোমার স্নায়ুতে বিক্ষোভ দানা বাঁধে,
টের পায় জল জোয়ারের জাগরন।

ইচ্ছা তোমার সচেতন প্রতিবাদে
ভেঙে দিতে চায় জানালার কালো শিক।
দুচোখে তোমার বিশ্বাস জ্ব’লে ওঠে,
জোয়ারের জল প্লাবনে ভাসায় নদী॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কবিতার গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৭.০৪.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।

এই কথা তৃমি সবচেয়ে ভালো জানো,
তোমার পড়শি কবিতা বোঝে না কেউ।
তুমি জানো তারা সোনাদানা বোঝে ঢের,
ঢের বোঝে তারা ঈর্ষার কারুকাজ।

কবিতা বোঝে না মিল মালিকের বউ,
বনিক শহরে বানিজ্য মতিঝিল,
কবিতা বোঝে না বনিক নাগরিকেরা।
কবিতা বোঝে না বিটিভি জেনারেশন।

কবিতা বোঝে না ভাড়াটিয়া পণ্ডিত,
দীপ্তচক্ষু কোমল অধ্যাপক,
রবি ঠাকুরের শততম মুদ্রন---
কবিতা বোঝে না কবিতা-সমালোচক।

কবিতা বোঝে না রাজ্যের সেনাপতি,
কবিতা বোঝে না পারিষদ পরিজন।
নৌ-পদাতিক অশ্ব আকাশচারী,
কবিতা বোঝে না দারোগার ঘাটমাঝি।

কবিতা এখন কি-যে হাবিজাবি ভাষা,
নোংবা মানুষ ও নোংরা কথার ঢেউ
ভাসিয়ে নিয়েছে যাবতীয় সুবচন।
কবিতা এখন মিছিলের সাথে চলে।

এখন কবিতা ফুল নদী জোস্নার
'শিল্প-সফল ভাষা’ই গিয়েছে ভুলে।
কবিতা এখন খিস্তি-খেউড়ে ঠাসা,
কালিঝুলি মাখা শ্রমিকের ভেজা হাত।

কবিতা এখন ক্ষুধার্ত সারাদিন,
কবিতা এখন মলিন বস্ত্র দেহে,
কবিতা এখন প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে,
অনিশ্চয়তা রাত্রির মতো কালো।

কবিতা এখন মিছিলে ক্ষুব্ধ হাত,
স্বৈরশাসন বিরোধী প্রথম ভাষা।
কবিতা এখন ট্রাকে চাপা দেয়া লাশ,
রক্ত মগজ পেষা মাংশের থুপ।

কবিতা এখন গুলি খাওয়া জমায়েত,
কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় রক্ত চোখ।
কবিতা এখন অস্ত্রের মুখোমুখি,
কবিতা এখন অস্ত্রের অধিকার।

কবিতা এখন বোঝে না ফুলের ভাষা,
এখন কবিতা জীবনের কথা বলে।
কবিতা এখন বোঝে না কোমল স্বর,
কবিতা এখন শত মানুষের ধ্বনি।

এখন কবিতা খাপখোলা তলোয়ার,
এখন কবিতা মেদহীন খজুদেহ।
কবিতা এখন স্বপ্নের প্ররোচনা,
কবিতা এখন বিশ্বাসী হাতিয়ার॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মিছিল ও নারীর গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৮.০৪.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।

মিছিলে তোমার দৃপ্ত পদক্ষেপ,
উন্নত হাতে জীবনের দাবি মাথা।
মিছিলেই তুমি নারী হয়ে ওঠো বেশি,
যেমন শিশু ও শস্যের উৎসবে।

মিছিল তোমাব মুক্ত পায়ের পথ,
মিছিল তোমার খোলা দরোজায় নদী।
মিছিল তোমার প্রধান অলংকার,
মিছিলেই ভুমি সবচেয়ে অপরূপ।

তোমার শিসুর ঘাড়ে জোড়া হবে ঘানি,
যে-ঘানি তুমিও টেনে চলো অবিরাম।
জোমার শিসুর ঘাড় ভেঙে যাবে ঋনে,
সাতপুরুষের যে ঋন তুমিও টানো।

মিছিলে তোমার বিশাল দীর্ঘ হাত,
ভেঙে দিত চায় জীবনের ভাঙা ভিত।
মিছিল তোমার বাঁচবার অধিকার,
মিছিলে তোমার শিশুর পক্ষে তুমি।

মিছিলে তোমার ক্ষুধার পক্ষ তুমি,
মিছিলে তোমার মাথা গুঁজবার ঠাঁই,
পরনে কাপড়, শিশুর নিশ্চয়তা।
মিছিল তোমার প্রানের অঙ্গীকার।

মিছিলেই তুমি সবচেয়ে লোভনীয়,
মিছিলেই তুমি সবচেয়ে বেশি নারী॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চিঠিপত্রের গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৯.০৪.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।

চিঠিগুলো রোজ চুরি হয়ে যায় শুধু
খালি খাম এসে জ'মে থাকে রাশি রাশি।
সব খামেরাই তোমার ঠিকানা চেনে
একটি চিঠিও পায় না তোমার দ্যাথা।

ডাক বিভাগের মোষের চামড়া জানি,
কোনো আঘাতেই ভাঙে না তাদের ঘুম।
উদাসিনতার প্রামান্য ছায়াছবি,
দ্যাথা যেতে পারে যে কোনো পোস্টাপিসে।

চিঠিগুলো রোজ চুরি হয়ে যায় কেন!
উৎকণ্ঠার দিন ও রাত্রি কাটে
বিস্ময় এসে স্নায়ুতে পাকায় জট,
জীবনের কোনো খবর পাও না তুমি।

আমার কষ্ট, বেদনা ঝরানো দিন,
প্রবল আমার স্নায়বিক-বিবমিষা,
আমার রক্ত উত্তাল করা স্মৃতি,
প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---

বাজারে তালের হুহু বেড়ে যাওয়া দাম,
মরিচ তেলের কৃত্রিম সংকট,
প্রশাসন জুড়ে লুটের মহোৎসব,
প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---

চিঠিগুলো রোজ চুরি করে কে বা কারা?
আমার মকল দুর্ভাবনার কথা,
দুঃশাসনের সকল স্বৈরাচার,
চতুর্পার্শ্বে রাতের বাড়ানো থাবা,

প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---
মাথার উপরে খড়গ রয়েছে খাড়া,
বাঘের থাবায় অসহায় খরগোশ,
পিচের সড়কে রক্তের কারুকাজ,

প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---
মিছিলের 'পরে পুলিশের খুনী ট্রাক,
সুবিধাবাদের রমবমা রাজনীতি,
সংলাপে সুখি নেতাদের নটিপনা,

প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---
চিঠিগুলো রোজ চুরি হয়ে যায় কেন,
কেন মানুষের মানব স্বভাব নেই,
রাজপথে কেন নামে জীবনের ঢল,

কেন মাঝপথে 'সংলাপ' জ'মে ওঠে,
পথে লেমে এলে সচেতন শ্রমিকেরা
কেঁপে ওঠে কেন 'প্রগতিশীলের' বুক,
সূতো ছেঁড়া ঘুড়ি এতো প্রতারক কেন,

কেন তত্ত্বের নূপুরে এতটা ধ্বনি
উল্টো কাছিম এত অসহায় কেন,
কেন এতো মেঘ সূর্যের চারিপাশে,
বাতাসে বা কেন ভাসে বারুদের ঘ্রান,

অগ্নিগর্ভা সময়ের অনুবাদ,
তপ্ত রক্তে লেখা হৃগয়ের ক্ষোভ,
প্রতিদিন আমি তোমাকে জানাতে চাই---
চিঠিগুলো তাই চুরি হয়ে যায় রোজ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দাম্পত্যকলহের গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২০.০৪.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।

প্রায়শ আমার স্বভাবের সৎগুনে,
তেতে ওঠো তেলে বেগুন ভাজির মতো।
যেন ছিঁড়ে খাবে আস্ত পৃথিবীটাকে,
দুচোখে তোমার এমনই হিংস্রতা।

আমি চেয়ে দেখি মানুষের অবয়বে,
কতোটুকু ক্রোধ প্রকাশিত হতে পারে।
মানুষের স্বরে কতোটা উচ্চগ্রাম,
নাগরিক নীড়ে শেষাবধি ওঠে ফুটে।

তোমাকে বলিনি এসবের কোনো কিছু,
কারন এসব জানাবার কথা নয়।
তোমাকে বলেছি চোখের নীলাভ চাঁদে
তুষারের মতো স্বপ্ন মাখার কথা।

তোমাকে বলেছি প্রাকৃতিক পৃথিবীতে
এই সভ্যতা মানুষের নির্মান।
তোমাকে বলেছি বিবর্তনের ধারা,
গুহা থেকে গৃহ, বহুতলা ইমারত।

তোমাকে বলেছি অঘ্রানী জোস্নায়
শরীরে জড়িয়ে মসৃন মিহি তাঁত,
গ্রামের সকল মেয়েরা এসেছে মাঠে---
বাতাসে ঝাঁঝালো নোতুন ধানের ঘ্রান।

লজ্জার মতো মৃদু শিশিরের জল,
মহুয়া মদের স্বপ্নে মাতাল চোখে
মাখিয়ে দিয়েছে জীবনের উল্লাস।
বাতাস গভীর মাদলের কলরবে।

দেহে উদ্দাম বুনে জোয়ারের ঢেউ
অবসাদহীন সতেজ ওষ্ঠপুট।
যেন অনস্ত পৃথিবীর মিহি ঘাসে
অমরত্বের পেয়েছে সে সন্ধান।

নক্ষত্রের সুপ্রাচীন রূপকথা,
তোমাকে বলেছি দানবের ইতিহাস।
তোমাকে বলেছি যন্ত্রের ঘেরাটোপে
মানুষের স্নায়ু অসহায় নির্ভর।

তোমাকে বলেছি আঁধারে কাদের সাথে
দ্যাথা হয়েছিলো আমার অনেক দিন,
আঁধাবে মানুষ বীভৎস নোখে দাঁতে
টেনে ছিঁড়ে খায় যকৃত পাকস্থুলি।

তোমাকে বলেছি গোপন ব্যাধির মতো
কার হাত এসে চেপে ধরে ফুসফুস,
কার হাতে ধরা আমাদের শৃংখল।
তোমাকে বলেছি দিন ও রাতের মানে।

তোমাকে বলেছি পাখি ডাকবার আগে
ডেকে দিও প্রেম সকালের সূচনায়।
তোমাকে বলেছি আমরা দুজন পাখি
ডানা মেলে দেবো নিসর্গ পৃথিবীতে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দ্বিধার গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৪.০৫.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।

রক্তে তোমার অচেনা জলের ডাক,
জেগেছে অচেনা ইচ্ছার শিহরন।
রক্তে তোমার অমীমাংসিত সাধ
তছনছ কোরে ফেলছে ভিতর-বাড়ি।

তোমার স্বপ্ন দিনযাপনের ভিড়ে
হঠাৎ ফেলেছে হারিয়ে নিজের ভাষা।
তোমার নিভৃত দৃষ্টির চারিপাশে
জমেছে সোনালি প্রতারক মরিচিকা।

দ্বিধাবিভক্ত করেছে তোমাকে দ্বিধা,
ঠিক মোহনায় দাঁড়িয়েছো এসে তুমি।
দুপাশে তোমার দুই ধরনের স্রোত,
দুদিকে তোমার দুই জীবনের টান।

নভোচারি মন জড়-জীবনের ভাষা
এখনো বোঝেনি স্বকালের সংঘাত।
এখনো তোমার স্নায়ুর তিমির জুড়ে
বিমূর্ত সব স্বপ্নের কোলাহল।

রঙিন কাঁচের বেলোয়াড়ি হাতছানি
তোমাকে ডাকছে উজ্জ্বল উৎসবে।
তোমাকে কাটছে দ্বিধার তীক্ষ্ণ চাকু,
প্রানী জীবনের সামাজিক প্রতিরোধ।

কি লাভ দাঁড়িয়ে জীবনের মোহনায়
'অমিমাংসিত হৃদয়ের বোঝা টেনে?
তার চেয়ে খোলো অকপটে অনুভব,
বেছে নাও প্রিয়-স্বপ্নের স্রোতখানি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গাছগাছালির গল্প
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৪.০৩.৮৬ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।

শেষ হয়ে এলো পাতা ঝরানোর দিন,
দ্বিধার পুরোনো বল্কল গেছে খ’সে।
এখন তোমার শাখায় নোতুন পাতা
ফুটবে যেমন তারা ফোটে আসমানে।

চেতনার 'পরে ধুলোর আস্তরন।
ধুয়ে মুছে গেছে বাস্তব বৃষ্টিতে।
শিকড়ে পেয়েছো মরমি মাটির রস
এখন তোমার শাখারা সবুজ হবে।

বৃক্ষ তোমায় প্রিয় তরু নামে ডাকি।
বৃক্ষ তোমাকে মনোরম তরু ববি।
গাছগাছালির গেরুয়া গৃহস্থালি
রয়েছে পেছনে, এখন তুমি তো তরু---

এখন তুমি তো সবুজের সংসার,
ফুল ও ফলের সম্ভাবনার রেনু
ক্রমশ বাড়ছে তোমার নিভৃত মূলে,
এখন তুমিই প্রকৃতির পরিচয়।

আমাকে জড়াও তোমার সবুজে ফুলে,
আমাকে জড়াও তোমার শিকড়ে ডালে।
স্বপ্নের রেনু মাখাও সারাটি দেহে,
আমাকে বাজাও তোমার নিভৃত সুরে।

আকাশে আজকে কাংখিত প্রিয় মেঘ,
বৃষ্টিকে ডাকো, ভেজাও রুক্ষ মাটি।
চলো দুইজন ভিজে হৃদয়ের জলে
ধুয়ে ফেলি যতো প্রথাগত মলিনতা।

এই সামাজিক নিষ্ফলা প্রান্তরে
ফলবান তরু জন্মে না কতোকাল,
জন্মে না ছায়া সুনিবিড় মহীরুহ।
চারিদিকে শুধু পাতাবাহারের সাড়া---

চারিদিকে শীত রেখে গেছে শীর্নতা,
হলুদে মোড়ানো হরিৎ বধ্যভূমি।
শিরদাঁড়া নুয়ে পড়েছে অচর্তায়,
ইচ্ছারা ঢাকা কালো কুয়াশার জালে।

বৈরি স্বর্ণলতার আঁস্তাকুড়ে,
পরগাছামুখি বিরান বিরোধিতায়
এসো অমলিন সবুজের ভাষা লিখি,
চলো দুইজনে শিখি বৃক্ষের প্রেম।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর