নিসঙ্গতার গল্প কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.০৭.৮৬ বাজাবাজার চাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নিসঙ্গতার চোয়ালে জমেছে ঘাম। বহু খন হলো শেষ বাস ছেড়ে গেছে, গভীর শব্দে দূরপাল্লার ট্রাক ছুটছে, এখন আর কোনো ধ্বনি নেই---
মাথার উপরে মিল্লাত পাখা শো শো, এলোমেলো চুলে বাতাসের শৃংগার। বুকের আঁচল কখন পড়েছে খসে, ফুটে আছে দুটি শুভ্র শংখচুড়।
খুলে যায় নীতিবোধের কবাটখানা, প্ররোচনা দেয় অন্যায় অভিসার। তুমি কি ভাঙবে কাঁচের দেয়ালটিকে? তুমি কি ছিঁড়বে প্রচলিত অভিধান?
দুটি পথ আছে তোমার সামনে খোলা--- গভীর ক্ষুধায় জেগে ওঠা দেহখানি ছেড়ে দিতে পারো যে কোনো নদীর স্রোতে, অথবা নিরব অবদমনের ফ্রিজে
রেখে দিতে পারো সুতনুকা যৌবন সামাজিক নীতি নিষেধের বেড়াজাল পায়ে পায়ে আছে জড়ানো তোমার জেনো, তুমি কি ছিঁড়বে নিয়মের শৃংখল?
এখানে নিয়ম নিষেধের লাল চোখ এখানে নিয়ম কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। তুমি কি ভাঙবে প্রচলিত কারাগার? তুমি কি ভাসবে যে কোনো নদীর স্রোতে? . **************** . সূচীতে . . .
অনুতপ্ত অন্ধকার ১ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৯.৭.৮৩ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ধংশস্তূপের উপর বোসে আছে একটি শালিক--- পাশে এক মৃত্যুামাখা বেদনার ‘বাজপোড়া’ তরু, শূন্যতার খা-খা চোখ চারপাশে ধূসর আকাশ। দুঃখিতা আমার, তুমি জেগে আছো স্বপ্নহীন আঁখি।
তোমার চোখের তীর ভেঙে পড়ে পাড়ভাঙা নদী, তোমার বুকের পাশে জেগে থাকে নিভৃত পাথর। কিসের পার্বন যেন চারিদিকে কোলাহল রটে--- দঃখিতা আমার, তুমি জেগে আছো পরাজিত পাখি।
অনুতপ্ত অন্ধকার ২ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.৭.৮৩ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ভাঙনের শব্দ শুনি, আর যেন শব্দ নেই কোনো, মাথার ভেতর যেন অবিরল ভেঙে পড়ে পাড়। করাত কলের শব্দে জেগে উঠি স্নায়ুতে শিরায় টের পাই বৃক্ষহত্যা সারারাত রক্তের ভেতর।
কেন এতো বৃক্ষহত্যা, এতো ভাঙনের শব্দ কেন? আর কোনো ধ্বনি নেই পৃথিবীতে, ব্রহ্মাণ্ডে, নিখিলে? কোথায় ভাঙছে এতো? কোনখানে? নাকি নিজেরই, গভীর মহলে আজ বিশ্বাসের গোপন ভাঙন!
উদসিন-দূর থেকে ডেকে যাই সকাল, সকাল . . . তবে কি সকাল ভাঙে পৃথিবীতে আমার সকাল! আমার নগর ভাঙে, প্রিয় এই নিভৃত নগর? তবে কি আকাংখা ভাঙে, স্বপ্নময় পরম পিপাসা?
প্লাবনের ক্ষতচিহ মুছে নেয় মানবিক পলি, আগুনের দগ্ধ শোক কবে আর মনে রাখে গৃহ। দুর্যোগের রাত্রি শেষে পুনরায় তুলেছি বসত, চিরকাল তবু এই ভাঙনের শব্দ শুনে যাবো?? . **************** . সূচীতে . . .
অনুতপ্ত অন্ধকার ৩ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৭.১১.৮৩ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
জানি না কখন হাতে বিষপাত্র দিয়েছি তোমার, পিপাসাপ জল ভেবে তুমি তাকে গ্রহন করেছো। জীবনের খামে মোড়া মৃত্যু একে কখন দিয়েছি জানি না কখন হাতে দ্রাক্ষা ভেবে দিয়েছি গন্ধম।
রাত নামে, মত্যুময় রাত নামে শরীরের ঘরে এই রাত জোস্নাহীন, জোনাকিও নেই এই রাতে। কেবল আঁধার, এক ভাঙনের বিশাল আঁধার, কেবল মৃত্যুর ছায়া স্বপ্নমগ্ন দুটি চোখ জুড়ে।
অনুতপ্ত অন্ধকার ৪ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৮.৮.৮৩ মুহম্মদপুর ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নিরবতা কোনো এক উদাসিন পাথরের নাম--- অহল্যা সে কোনোদিন জানি আর হবে না জীবন। হবে না সে পারিজাত, কোনোদিন হবে না সকাল, দিন আর নিশিথের সন্ধিক্ষনে থেকে যাবে জানি---
'অহল্যা সে চিরকাল থেকে যাবে রক্ত মাংশ নিয়ে। যাবে না সে দগ্ধ ক্ষুব্ধ মানুষের মিছিলে কখনো, পোড়া মানুষের ক্ষত, রক্ত, গ্লানি বুকে সে নেবে না, যাবে না সে জানি আর কোনোদিন সবুজ নিভৃতে।
ছোঁবে না সে চিবুকের থরো থরো বিষন্ন উত্তাপ, সেই হাত কখনো ছোঁবে না আর উদাসিন চুল। নিশ্বাসের ঘ্রানে আর জাগবে না ভেজা চোখ দুটি, নক্ষত্রের স্মৃতি শুধু বেঁচে রবে স্নায়ুর তিমিরে।
হবে না বেহুলা জানি সে কখনো গাঙুরের জলে ভাসবে না ভেলা তার, ভাসবে না স্বপ্নের সাহস, বেহুলার স্বপ্ন-ভেলা কোনোদিন জলে ভাসবে না--- নিরবতা কার নাম? কার নামে নির্বাসন জ্বলে?? . **************** . সূচীতে . . .
অনুতপ্ত অন্ধকার ৫ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.৭.৮৩ সেনবাড়ি ময়মনসিংহ। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
কুসুমের মর্মমূল ছিঁড়ে গেছে গোপন-ঘাতক। দখল নিয়েছে ঘুন আজ নীল নক্ষত্রের দেশে, নিয়েছে রঙিন ঘুড়ি ছিঁড়ে ওই দিগন্তের গ্রাম, ফিরে আসে ব্যর্থ সুতো, ফিরে আসে স্বপ্নভাঙা হিয়া।
বিষের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়েছে ঘাতক সময়--- নগ্ন এই দুই চোখে সর্বনাশা অপচয় জ্বলে, সময় দিয়েছে তুলে এই হাতে অফুরন্ত ক্লেদ, আর দিছে রক্তে মাংশে জীবনের তপ্ত অন্ধকার।
অনুতপ্ত অন্ধকার ৬ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.৭.৮৩ সেনবাড়ি ময়মনসিংহ। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ভেঙে যাই দ্বিখণ্ডিত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ’৮৬ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাই। আজ এতো সত্য হলো দুইখানা পথ!
আজ এতো সত্য হলো দুইখানি হিয়া! আমি তবে কার কাছে রাখবো আমার এই বেদনার ভার?
দুখানি সমান তৃষ্ণা, দুই জোডা কাঁপা কাঁপা ঠোঁট---কাকে ছোঁবো? দুইখানি সমান আগুন আমি কাকে ছোঁবো?
নদীতো পেতেছে তার দুই কূলে সমান সংসার আমি তো পারি না, আমি তো পারি না---ভেঙে যাই।
দুইখানি প্রতিশ্রুত প্রান দুই দিকে দুইখানি সত্যবন্ধ হাত দুইদিকে দুইখানি তৃষ্ণামাখা তনু দুইদিকে
দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাই--- কিছুতেই মেলাতে পারি না এই দ্বিমুখি জীবন চাঁদ আর পূর্নিমাকে কোনোদিন মেলাতে পারি না॥ . **************** . সূচীতে . . .
অপরাহ্নের অসুখ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৪ বৈশাখ ’৮৫ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
পশ্চিমে দূর সজনে শাখায় দুপুর ঝুলে আসে, বুকের মধ্যে এমন করে কেন! একটি পাতা পাতার ছায়ে সুখের মতো কাঁপে বুকের মধ্যে এমন করে কেন!
খাঁ খাঁ আকাশ ঝিমোয় খোঁয়াড়-বাঁধা গাভি মেঘ যেন তার ক্ষুধাকাতর শিশু, নিশাসগুলো নিজের কানে শব্দ হয়ে বাজে--- বুকের মাঝে কেমন কোরে ওঠে।
চক্ষু ফেটে জল আসে না, বাধ ভাঙে না নদী কণ্ঠমূলে গহন ব্যথা জমে, নিরবতায় মুগ্ধ পাখি, সোনালি মেঘ, তবু বুকের মধ্যে এমন করে কেন!
শিমুল-রোদে দ্বিধার মতো একটি পাতা কাঁপে 'অনাঘ্রাত অধরখানা যেন, দূরাগত অচেনা এক পাখির কণ্ঠস্বরে বুকের মধ্যে এমন করে কেন!
বাইরে থেকে ভেতরে চাই, আরেক আকাশ খাঁখাঁ মেঘের মতো স্মৃতির চিহ্ন ওড়ে, মাতাল হিয়া যেদিকে হাত বাড়ায় চরাচরে বাতাস শুধু ওড়ায় ধুলোবালি।
সজনে শাখায় ঝিমোচ্ছে রোদ দুপুর ঝুলে আসে, বুকের মধ্যে এমন করে কেন! আমার বুকের মাঝে এমন করে কেন!! . **************** . সূচীতে . . .
আছে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৭.১২.৭৪ লালবাগ ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নির্বাসিতা, নির্বাসিতা আমি তোমাকে বার বার ডেকে যাবো রাতের শহরে। কেউ জেগে নেই, রাত্রিও অচেতন ঘুমের নেশায়, অনিদ্রার মোহময় চশমায় ঢাকা চোখ, আমি শুধু ডেকে যাচ্ছি নির্বাসিতা, নির্বাসিতা . . .
পরিচিত সমস্ত গলিতে, সেই সব দরোজায় একে একে করাঘাত কোরে যাবো, জানালাগুলো জেগে উঠবে ক্রমশ, পর্দা নেড়ে নেড়ে বলবে : ও নামে তো কেউ থাকে না এখানে।
শহর থেকে ফিরে যাবো সাগরে, ঢেউ-এর ভেতর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে হঠাৎ
থেমে যাবে সাগরের সপ্রতিভ গান : না তো, এ নামে কেউ তো আসেনি কখনো।
আমি আবার চিৎকার কোরে ভেঙে দেবো রাত্রির জানালার কাঁচ, নির্জনতা . . .