ছিন্নভিন্ন ভালোবাসা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১, এতো যে আমায় ভোলাতে চাও . সহজে কি মন ভোলে? . সব চাবিতে সব তালা কি খোলে?
২. অর্ধেকখানি রেখেছো খুলে বাকি অর্ধেক ঢাকা, . তোমার দুদিকে সবকিছু আছে, আমার দুদিকই ফাঁকা।
সীমাবদ্ধ ভাঙচুর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫.০৮.৮৫ মুহম্মদপুর ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
যেভাবেই ভাঙো---দুজনাই শুধু ভাঙি, যে ভাবেই ভাঙি----ভাঙি শুধু দুজনাই।
তুমি যদি তোলো পাথরের ইমারত, আমি তাকে ভাঙি নিসর্গ ভালোবেসে। আমি যদি বুনি কৃষ্ণচূড়ার প্রেম, তুমি তছনছ কোরে ফ্যালো তার ভূমি।
যে ভাবেই ভাঙো, ভাঙি শুধু দুজনাই---
আমি যদি আঁকি নগরের ইতিহাস, তুমি ছেঁড়ো তাকে প্রেমহীনতার দোষে। তুমি যদি লেখো মাধবীর গাঢ় মালা আমি হাতে নিই হননের হাতিয়ার।
যে ভাবেই ভাঙি, ভাঙি শুধু দুজনাই---
সভ্যতা টানে দিন যাপনের দিকে, নাগরিক চাকা রোখে জীবনের গতি। আমাদের হাত নিসর্গে প্রসারিত, আমাদের হাত দুজনায় উদ্যত।
আমরা ভাঙছি আমাদের স্মৃতি, শোক, আমরা ভাঙছি একঘেয়েমির ঠুলি ; নগর-নরকে নাগরিক গ্লানিবোধ। আমরা ছিঁড়ছি স্বপ্নের শবদেহ--- . **************** . সূচীতে . . .
এখানেও সাধ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫.০৮.৮৫ মুহম্মদপুর ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
জীবন যাপন ১ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.০৫.৮৪ মুহম্মদপুর ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
চলো স্বপ্ন মিলাই।
কাজের ভেতরে ফোটে স্বপ্নের পেখম, চলো কাজগুলো মিলাই।
জীবন যাপন ২ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২০.০৫.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমরা কি পরস্পরকে অবিশ্বাস করছি!
আমাদের ভালোলাগাগুলো বিতর্কিত হয়ে উঠছে। আমাদের চোখ ক্রমশ উদাসিন হয়ে উঠছে। আমাদের স্পর্শগুলো অনুভতিহীন হয়ে পড়ছে।
আমরা কি পরস্পরকে অবিশ্বাস করছি?
আমাদের কথোপকথনে ক্রমশ নেমে আসছে সৌজন্যের কুয়াশা। আমাদের আলিঙ্গনের ভেতর খচ্ খচ্ কোরে বিঁধছে এক সন্দেহের কাঁচ। আমাদের চুম্বন ক্রমশ শুধু লালাসিক্ত ওষ্ঠের ব্যর্থতা হয়ে উঠছে। ক্রমশ শীতল হয়ে পড়ছে আমাদের উদ্দাম ইচ্ছেগুলো।
আমরা কি পরস্পরকে অবিশ্বাস করছি!
সূর্যাস্তের বিকেলে পাশাপাশি দুজনের মাঝখানে শুয়ে থাকছে একটি সাপ। দুজনের উজ্জ্বল হোণ্ডার পেছনে ধাওয়া কোরে আসছে একটি নীল নেকড়ে। একটি হাত কেবলই দুদিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে দুজনের মুখ। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আমরা ক্রমশ অনুতপ্ত হয়ে পড়ছি
আমরা কি অবিশ্বাস করছি আমাদের? আমরা কি পরস্পরকে অবিশ্বার করছি?
জীবন যাপন ৩ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২১.০৫.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমাদের মাথার উপরে ছাদ আছে পায়ের নিচে কংক্রিট। রোদ, বৃষ্টি আর শীত আমাদের নাগাল পাবে না। ইটের দেয়াল আছে পাশে, দেয়ালের উজ্জ্বলতা নেই।
দুই জোড়া কবুতর, কিছু তেলাপোকা আর তিনটি ইঁদুর 'আমাদের বাড়তি বাশিন্দা। আমাদের কোনো দক্ষিন জানালা নেই। সকালের রোদ নেই শরীরের ত্বকে।
বৃষ্টির শহরে নিরাপদ ভ্রমনের জন্যে ব্যক্তিগত কোনো যান নেই আমাদের। গ্রীষ্মের বিরুদ্ধে বৈদ্যুতিক পাখা নেই ঘরে। শীতল জলের জন্যে ফ্রিজ নেই। তেমন উজ্জ্বল আসবাব নেই। পা-ডুবিয়ে হাঁটবার মতো লোমশ কার্পেট নেই আমাদের।
একরাশ বই-এর ভেতরে ডুবে থাকা আছে। আমাদের ঘরে এক পূর্নিমার জোস্না আছে। শ্রম আছে। আছে অনিশ্চয়তার শীতল উল্লাস। আমাদের অনন্ত মুগ্ধতা আছে। দ্বন্দ্বময় দিনমান আছে, আছে তৃষ্ণার্ত শরীর।
আমাদের অবসাদ নেই, ক্লান্তি নেই। সচ্ছলতার মসৃন মেদ নেই দেহে। রক্তের ভেতরে নেই নীল বিষ---আমাদের লাল রক্ত।
আমাদের চোখে নেই ঈর্ষার পিচুটি। আমাদের গায়ে নেই আভিজাত্যের দুর্গন্ধ। আমাদের রক্তাক্ত হৃদয়ে নেই প্রলোভন।
আমাদের স্বপ্ন আছে, মিছিলের স্মৃতি আছে। আর আছে স্নায়ু জুড়ে আন্দোলিত স্বপ্নের স্বদেশ॥ . **************** . সূচীতে . . .
জীবন যাপন ৪ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৭.০৫.৮৪ মোংলা বন্দর। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমি তোমাকে অনুবাদ করেছি শব্দে। আমি তোমাকে অনুবাদ করেছি বাক্যের কাঠামোয়।
তোমার অস্থির চোখ তাকে অনুবাদ করেছি। তোমার ভুরু ও কপালের প্রশান্তি তাকে অনুবাদ করেছি। তোমার চিবুকের টোল তাকে অনুবাদ করেছি।
জীবন যাপন ৫ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৭.০৫.৮৫ মুহম্মদপুর ঢাকা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
দুজনের যৌথ জীবন যাপনের নাম সংসার।
আমরা দুজন পরম্পরের জীবন ভাগ কোরে নিয়েছি আমরা পরস্পর পরম্পরের জীবনে প্রবেশ করেছি
আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের স্বপ্নগুলো আমবা মেলাতে চাইছি আমাদের ভালোলাগাগুলো আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের বোধ ও বেদনাসমূহ ক্ষোভ এবং স্পর্শসমূহ দৃষ্টি এবং আচ্ছন্নতাসমূহ আমরা মেলাতে চাইছি
আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের প্রতিটি স্পর্শকাতরতাকে শরীরের প্রতিটি শিহরনকে ত্বকের প্রতিটি রোমকূপকে
আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের হৃদপিণ্ডের ধ্বনি আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের পাপ ও উদাসিনতাগুলো আমাদের একান্ত স্খলনগুলো অন্তর্গত অরন্য আর বন্যতাগুলো ত্বক, চক্ষু, ঘ্রান, শ্রবন ও জিভের কর্মকাণ্ডসমূহ আমরা মেলাতে চাইছি আমরা মেলাতে চাইছি আমাদের জীবনযাপন
দুজনের যৌথ জীবন যাপনের নাম সংসার--- এর নাম প্রেম, এর নাম বিরহের বিকল্প আগুন॥ . **************** . সূচীতে . . .
জীবন যাপন ৬ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০১.০৬.৮৪ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কবির “গল্প” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তুমি আমাকে তৃষ্ণার্ত করেছো। তুমি বস্তুর দিকে ফিরিয়ে দিয়েছো আমার পথ।
আমার চোখ তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো জড় ও জীবনের দিকে আমার শ্রবন তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো রুক্ষ ধ্বনির দিকে
আমার ত্বক তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো অমসৃন স্পর্শের দিকে আমার ঘ্রান তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো সৌরভের দিকে আমার জিভ তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো স্বাধীনতার দিকে
আমার জিভ আমি তাকে সম্পূর্ন আমার কোরে পেতে চাই। আমি তাকে সেন্সরহীন ব্যবহার করতে চাই আমার ইচ্ছার স্বপক্ষে।
আমার জিভ আমি তাকে রূপশালি ভাতের সুঘ্রান দিতে চাই। দিতে চাই শুভ্র শেফালির মতো শাদা ভাত।
তুমি আমাকে তৃষ্ণার্ত করেছো সকাল। তুমি স্বপ্নের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছো আমার পথ।
আমার বোধ তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো মানচিত্রের দিকে আমার স্মৃতি তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো ইতিহাসের দিকে আমার আকাংখা তুমি ফিরিয়ে দিয়েছো আগামির দিকে
আমার আগামি আমি তাকে পেতে চাই শ্রেনীহীনতার রোদে। আমি তাকে মানুষের প্রাকৃতিক চেহারায় পেতে চাই মানিষের পৃথিবীতে।
আমার আগামি আমি তাকে শ্রমময় উৎসবের দিন দিতে চাই। দিতে চাই বৃক্ষ ও হরিনের মতো নিরাপদ প্রান।
তুমি আমাকে তৃষ্ণার্ত করেছো তুমি শরীরের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছো আমার পথ।
তুমি খুলে দিয়েছে আমার শরীরের নিভৃত কবাট তুমি খুলে দিয়েছো আমার অচেতন গ্রন্থিসমূহের ঘুম তুমি খুলে দিয়েছো আমার অব্যবহৃত মাংশপেশীগুলো
আমার শরীর, আমি তাকে শ্রমহীনতার কারাগার থেক মুক্তি দিতে চাই। আমি তাকে দিতে চাই প্রানীদের প্রাকৃতিক আচরনবিধি দিতে চাই মুগ্ধ শ্রম।
আমার শরীর আমি তাকে ক্ষুধার মীমাংসা দিতে চাই। দিতে চাই তৃষায় রমন আর মীমাংসিত নারী।
আমি স্রষ্টা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
যুগান্তের সৃষ্টি আমি নই, যুগের স্রষ্টা আমি, বেদ বাইবেল কোরানে স্বাধীন অস্তিত্ব আমার বিলুপ্ত নয়। আপন ব্যক্তিত্বকে চাই না দিতে বিসর্জন ধর্ম কিম্বা সমাজের সংস্কারে। মুক্তা ভেবে ঝিনুক নিয়ে উল্লাস করতে চাই না অন্ধকারে। ধর্ম আমি একটাই জানি আমার স্বেচ্ছাচারিত বিদ্রোহ নিশ্চিত ডেকে আনবে সমাব্জে আমার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রোশ, তাদের একান্ত কামনায় হয়তো স্রষ্টা নামের ব্যক্তি আমায় জঘন্যভাবে করবে নিধন কারন আমি জানি---
নিরবিচ্ছন্ন স্রোতে বাধা এলে স্রোতের ধারায় বিপ্লব আসে। তবু আমি পারি না দিতে স্বতস্ফূর্ত স্বীকৃতির মালা বিনা প্রতিবাদে সমাজকে। কারন আমার মাঝে আছে--- আমি তার আভাস পেয়েছি সে আমার বিপুল বিষ-বিদ্রোহ সে বিষ বহ্নিকে আমি করি না ঘৃনা। তাকে করি পরম শ্রদ্ধা। সে আমাকে তুলবে মহাকালের যুগান্তকারী ইতিহাসের সুউচ্চ চূঁড়ায়। ধর্মের পেলব বানী পারে না সৃষ্টি করতে সত্য মানুষ আমার সৃষ্টিকর্তা আমি স্বয়ং,
কারন স্রষ্টা বা ধর্ম আমায় উদ্ধার করতে পারে না আঁধার থেকে, সে শুধু পারে পথনির্দেশ করতে, আর পারে অন্ধ করতে। আমার আপন সৃষ্টিতে আমি চির দীপ্তিময় কারন আমার সৃষ্টিকর্তা আমি। . **************** . সূচীতে . . .