কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
মানুষের মানচিত্র ১
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৮.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  


আহারে বৃষ্টির রাত, সোহাগি লো, আমি থাকি দূর পরবাসে।
কান্দে না তোমার বুকে একঝাঁক বুনোপাধি অবুঝ কৈতর?
কেমনে ফুরায় নিশি? বলো সই. কেমনেবা কাটাও প্রহর?
পরান ছাপায়ে নামে বাউরি বাতাস দারুন বৃষ্টির মাসে।

যে বলে সে বলে কথা, কাছে বসে, হাতে খিলিপান দিয়ে কয়---
এতো জল ঝরে তবু পরান ভেজে না কেন, কও তো মরদ?
দুয়ারে লাগায়ে খিল যদি কেউ থাকে তারে কে দেবে দরোদ।
শরীরের মোহনায় দেখি তার বুনো ঢেউ রক্ত-মাংশময়।

শরীর গুটায়ে রাখি, শামুকের মতো যাই গুটায়ে ভেতরে।
অন্ধকার চিরে চিরে বিজুলির ধলা দাঁত উপহাসে হাসে,
আমি বলি---ক্ষমা দাও, পরান বন্ধুয়া মোর থাকে  পরবাসে,
দেহের রেকাবি খুলে পরানের খিলিপান কে খাওয়াবে তোরে।

গতবার আষাঢ়ও পার হয়ে গেল তা-ও নামে না বাদল,
এবার জোষ্ঠিতে মাঠে নেমে গেছে কিসানের লাঙল জোয়াল।
আমাদের মাঝে দ্যাখো জমির ভাগের মতো কতো-শতো আল,
এই দূর পরবাস কবে যাবে? জমিনের আসল আদোল।

কবে পাবো? কবে পাবো আলহীন একখণ্ড মানব-জমিন?
পরবাস থাকবে না, থাকবে না দূরত্বের এই রীতি-নীতি।
মহুয়ার মদ খেয়ে মত্ত হয়ে থাকা সেই পার্বনের তিথি
কবে পাবো? কবে পাবো শর্তহীন আবাদের নির্বিরোধ দিন॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৮.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ৮.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত
“মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  


পাখির নাহান ডাকো মাঝরাতে ডাক দাও পাখির গলায়।
আমি কি বুঝি না ভাবো? কাতলা মাছের মতো ঘাই মারে বুকে
ওই ডাক ঘাই মারে রক্তেমাংশে। ভাবো ঘরে আছি খুব সুখে।
আহারে পোড়ার সুখ---তুফানের গাঙ দেখে নাকি সে পলায়।

বুড়ো ভাতারের ঘর কোন সুখে করি তুমি বোঝো না নাগর?
পাখির নাহান শুধু ডাক পাড়ো মাঝরাতে ঘরের কিনারে।
হাঁপানির চোট খুব গরম তেলের জাব দিতে হয় তারে,
আমার হাঁপানি থাকে বুকের তুষের নিচে অনল-সাগর।

সারাদিন রান্নাঘরে। একপাল পোলাপান তাদের যতন।
আর তিন বউ তারা দিন-রাত পান খেয়ে মুখে দেয় শান্।
তাদের শানানো কথা গতর জ্বালায়ে ছাড়ে, জ্বালায় পরান।
আহারে পোড়ার সুখ! দিন কাটে, রাত তা-ও দিনের মতোন---

রাত্তির কাটে না আর। দেহের আগুন নেভে, পরান নেভে না।
কোনোদিন সখ হলে কাটা ঘায়ে ফের তিনি ছিটান লবন,
দিনভর দেহ জ্বলে, সারারাত জ্বলে এই নওল যৈবন।
পোড়ার জীবন নেবে, পোড়া-কপালিরে তবু মরন নেবে না . . .

পাখির নাহান কেন ডাক দাও নিশিরাতে? বিহান বেলায়
যদি পারো ডাক দিও, ডাক দিও রোদ্দুরের তাতানো দুপুরে,
কেমন ছিঁড়তে পারি শিকলের শিক দেখো জীবন-নূপুরে
গান তুলে কেমন আসতে পারি স্বপ্নধোয়া হৃদয় তলায়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৩
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৯.২.৮
মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  


মেম্বারের ছেলে দুটো ইশকুলে পড়ে, আমার হাড়িতে টান।
বেশুমার দায় দেনা, খাওয়াইয়া সাতজন, পঙ্গু বাপ ঘরে,
বেজাত আকাল যেন ঝা'পায়ে পড়েছে এসে জীবনের 'পরে।
এতো যে সেয়ানা মাঝি, আমার নদীতে তবু বেজায় উজান।

আমি গাঙে নাও দিলে সব নাও পাছে পড়ে উজানে কি গোনে,
আমার জীবন-নাও সবার পেছনে কেন তবু প’ড়ে রবে?
পশরের গাঙে এক তুখোড় জোয়ান মাঝি এই কথা ভাবে।
চারপাশে অন্ধকার, সে তার বুকের ক্ষেতে এই প্রশ্ন বোনে।

রাত্তির গভীর হয়, তুফানের শব্দ বাড়ে, জলে জ্বলে নুন,
দিনের রোদ্দুরে পোড়া তাতানো গতর থেকে গন্ধ আসে তার।
জীবনের চাদ্দিকে হাতড়ায় মাঝি---আলো নেই, শুধু অন্ধকার,
কাঞ্চা বাঁশের নাহান জোয়ান শরীরে তার ধ’রে গেছে ঘুন!

জলের সংসারে ভাসে তবু তো শিকড় তার রয়েছে মাটিতে,
তবু তো শিকড় তার রয়েছে জীবনে, জীবনের পুষ্টিহীন
উষর মাটিতে আজো, আজো মাঝি শুধে যায় জীবনের ঋন।
জোয়ারের নাওখানি বার বার কাঁপে তার দুখের ভাটিততো।

রাত তো পোহায়ে এলো, লগি খুলে স্রোতে দিতে হবে নাওখানা,
আমার রজলী কবে পোহাবে দয়াল? ভাঙা নাওখানি কবে
গোনে বা বেগোন স্রোতে জীবনের মত্ত গাঙে একথারা ব’বে!
এ-প্রশ্নের চারা হবে সে কোন অঘ্রানে তার উত্তরের ধান?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৪
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৯.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  


ভাসান যে দিতে চাও, কোন দেশে যাবা? যাবা সে কোন বন্দরে
আমারে একলা থুয়ে? এই ঘর, যৈবনের কে দেবে পাহারা?
এমন কদম ফুল---ফোটা ফুল থুয়ে কেউ পরবাসে যায়!
তুমি কেন যেতে চাও বুঝি সব, তবু এই পরান মানে না।

লোকে কয় ভিন ধেশে মেয়ে মানুষেরা নাকি বেজায় বেহায়া,
শরীরের মন্ত্রদিয়ে আটকায় শাদা-সিদে পুরুষ মানুষ।
তোমারে না হারাই যেন সেই দিব্যি দিয়ে যাও জলের কসম,
আর বলি মাস মাস খোরাকি পাঠাতে যেন হয়নাকো দেরি।

পুবের না পশ্চিমের দেশ, কোন দেশে যাবা মাঝি. কোন দেশ?
সেখানে কেমন জানি লোকজন, মানুষের আচার বিচার!
শুনেছি দক্ষিনে ভয়, আজদাহা দরিয়ায় বেশুমার খিদে,
পাহাড় সমান ফনা আচমকা টেনে নেয় পেটের ভেতর।

দক্ষিনে যেওনা মাঝি, কালাপানি দরিয়ায় কামোট কুমির।
তোমারে হারাই যদি গলায় কলসি বেঁধে ডুব দেবো জেনো,
তোমারে হারাই যদি ধুতুরার বিষ খেয়ে জুড়োবো পরান।
পরবাসে যাবা নাঝি, মনে ভেবো ভরা গোলা রেখে গেছ ঘরে---

সোমত্ত বয়স দেহে মাঝি-বউ দিন গোনে, ফেরে না ভাতার,
গলায় কলসি বাঁধা হয়নাকো তার। পেটের আগুনে পোড়ে
অতপর ঘরদোর, সোনার গতর আর সব শেষে পোড়ে
তার যৌবনের কড়ি। মাঝি-বউ দিন গোনে, তবু দিন গোনে . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৫
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১
.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৫.
গেল বছরের দেনা এ বছর নিয়ে গেল খোরাকির ধান!
এই সনে দেনা হবে আরো, হালের বলদ-গাই যাবে ব্যাঁচা,
কার্তিকের অনটন সংসারে ডাকবে ঘোর অভাবের প্যাঁচা।
মহাজন ভালো লোক, দেনার বদলে দেবে নাড়ি ধারে টান---

দশানা ছআনা ভাগ, ধানের মাড়াই শেষে থাকে না কিছুই,
রাজভাগ মহাজন, বাদবাকি দায়-দেনা তবু সদা থাকে।
জীবন জডায়ে গেছে জীবনের এই অন্ধ অন্যায়ের পাঁকে,
যতোই টান না কেন, একতিল এগোবে না, টানবে পিছুই

উপরে যে আছে তার বাড়ছে প্রশাখা-ডাল-পাতা-ফল-ফুল,
নিচের তরুটি আর বাড়েনাকো দিনে-দিনে খসে তার দেহ।
এমনি নিয়ম নিকি, ওরা বলে---নিয়তির এরকমই স্নেহ,
ভালোরা উপরে থাকে, অধমের চিরকাল বেঙে যায় কূল।

এ-কথা বিশ্বাস কোরে এতোকাল বেঁচে আছে মাঠের চাষারা,
তামাদি হয়েছে সুখ, নোনা ধ'রে গেছে সারা জীবনের গায়,
মজ্জায় জমেছে শীত, আন্ধার বেঁধেছে জট বুকের খাঁচায়---
ভাঙতে ভাঙতে কূল ঠেকে গেছে ভিতে, শুধু বাঁচার আশারা

বেঁচে আছে তাই নিয়ে প্রতিদিন জীবনের সাথে হয় দ্যাখা।
মৃত স্বজনের হাড় মাঝরাতে জেগে উঠে শোনায় কাহিনী,
মাংশের ভেতরে সেই কাহিনীরা জমা হয়, রক্তের ধমনী
সেই কথা শোনে, আজ শুনে রাখে---যে-কাহিনী হয়নাকো লেখা।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৬
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১০.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৬.
কুটুম এসেছে ঘরে, সাঁচিপান সাজো বউ রূপোর বাটায়।
চিডে মুড়ি আছে কিছু? নয়তো বাতাসা দাও সাথে নারকেল।
একেবারে খালিমুখ, আর কি সেদিন আছে, আহারে আকাল
শ্রাবনের বানের নাহান ভেসে গেছে সব---হায়রে সুদিন।

কি সুখে ছিলাম বউ! ভাত মাছ তরকারি কিসের অভাব?
অতিত্তি বাড়িতে এসে খালিমুখে ফিরে যাবে সে কেমন কথা।
আর কি সেদিন আছে---কতো রাজা বদলায়, দিন তো ফেরে না।
কিছুই মেলে না আর, কেতাবের কলিকাল এরে বুঝি কয়?

ও বউ মাদুর দাও, ছায়ায় বসুক এসে, বাইরে যা খরা---
ছেলেরা সবাই মাঠে, পুকুরে যে জাল ফ্যালে তা-ও কেউ নেই।
দুপুর গড়ায়ে এলো---ও বউ রান্না চড়াও, চাল দাও বেশি,
আর কি সেদিন আছে! কিছুই নেলে না আর, কিছুই মেলে না।

ঝুড়িভরা ফলমুল, দুই বেলা দুধ আহা কী সারান্ত গাই,
খাটাশ আটার রুটি কোনোদিন ছুঁয়ে কি দেখেছি কোনোদিন?
কত রাজা বদলায়, দিন বদলের কথা শোনায় ছেলেরা,
দিন তো ফেরে না বউ? বানের জলের মতো ভেসে যায় সব . . .

পশরের পাড়ে আজো এই দৃশ্য বেঁচে আছে দৃশ্যের মানুষ।
সব গেছে, আছে শুধু আহ্লাদটুকু, আছে অতীতের স্মৃতি।
এইসব প্রবীনেরা হারানো দিনের গন্ধ ধ'রে রাখে আজো,
আজো তার স্বাদ পায়, আজো তার স্বাদ চায় বিলাতে অন্যকে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৭
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১১.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৭.
বনের হরিন নয়, বাঘ নয়, এতোরাতে চৌকিদার চলে।
হোই কে যায়? কে যায়? গঞ্জের বাতাস ফেরে হিম, নিরুত্তর
কে যায়? কে যাবে আর! দশমীর অন্ধকার একা একা যায়,
একা একা চৌকিদার আঁধারের বাঁকে বাঁকে নিজেকে তাড়ায়।

নিজেকেই প্রশ্ন করে, কে যায়? কি নাম তোর? কোথায় থাকিস?
কী তুই পাহারা দিবি, জীবনের কতোটুকু আগলাবি তুই!
ছিঁচকে সিঁদেল চোর---আর যেই চোর থাকে দিনের আলোয়?
আর যেই চোর থাকে দেহের ভেতর, শরীরের অন্ধকারে?

রাতের আঁধারে খুঁজে তারে তুই পাবি? চৌকিদার, পাবি তারে?
যে-চোর পাহারা দেয়, পাহারার নামে করে ভয়ানক চুরি,
চুরি করে মানুষের ঘিলু-মাংশ-রক্ত-হাড় বুকের বাসনা,
তারে পাবি, যে-তোর জীবন থেকে চুরি করে পূর্নিমার রাত?

যে-তোর জীবন থেকে চুরি করে পয়মন্ত দিনের খোয়াব,
যে-তোর শিশুর স্বাস্থ্য, দুধভাত, চুরি করে বোনের সিঁদুর।
তারে পাবি, যে-তোর গতর থেকে খুলে নেয় মানব-শরীর?
কিসের পাহারা তবে? কেন তবে রাত ভর রাতকে তাড়ানো?

অন্ধকার পৃথিবীতে শুধু কিছু তারা জ্বলে, দূরের নক্ষত্র।
ঝিঁঝিঁ ডাকে। পাটের পচানি থেকে গন্ধ আনে রাতের বাতাস।
পুরোনো কবর খুঁড়ে শেয়ালেরা বের করে আধপচা লাশ
হোই কে যায়? কে যায়? পৃথিবীর অন্ধকারে চৌকিদার চলে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৮
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৮.
‘উঠানে ছড়ালে ভাত কাকের অভাব হয়? শত কাক আসে।'
সব পাখি কাক নয়, জানা ভালো, সব কাক আসে না তবুও,
কিছু কিছু কাক আছে চিরকাল উড়ে চলে উজান বাতাসে---
আমিও তেমন কাক, তোমার উজান স্রোতে দাঁড়ায়ে রয়েছি।

ডাঙায় ডাঙর হয় গভীর ফাটল আর জলে বাড়ে নোনা।
এই তো আমার ঘর, রোদে জ্বলা, জলে ভেজা আমার বসতি,
এই তো আমার দেশ, এই তো আমার প্রেম, আমার হৃদয়---
তিনভাগ জলের উপরে ভাসা একভাগ মানবিক মাটি।

তবু সে-মাটিতে নেই আমার দখল, আমার দখলে নেই,
জীবনের কোনো মাটি। উজান জলের এক বিশাল ভূবনে।
দাঁডায়ে রয়েছি জানি দাঁড়ায়ে থাকার নাম প্রকৃত জীবন!
সকলে বসতে চায়, কেউ কেউ থাকে তবু বিরুদ্ধ স্বভাব।

বানের জলের শেষে প’ড়ে থাকে অকৃপন পালির সংসার,
আর তাই দেখে দেখে জঙধরা বক্ষে, প্রানে বেজে ওঠে বাঁশি।
গাঙের জলেতে চুল খুলে দিয়ে এক বউ শরীর ভেজায়---
এই তো আমার ঘর, দিনে রাতে সে-ঘরের খ’সে পড়ে আয়ু।

গোপন ইঁদুরে কাটে, ফাটে এক সর্বনাশা সোনার কামোট,
আমার ঘরের ভিতে গর্ত করে অঘ্রানের কাতর সাপেরা।
এই তো আমার প্রেম, এই তো আমার ঘর, আমার স্বদেশ---
তিনভাগ জলের উপরে ভাসা একভাগ মানবিক মাটি॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৯
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৮.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৯.
সিঙেল বয়ারগুলো সারাদিন জলে ডূবে ঝাপটায় মাথা।
দু-চারিটি ধোড়াসাপ ভয়ে ভয়ে ঘোরে ফেরে খালের কিনারে।
মাছ খায়। পাড়ে কিছু গোরাই শালিক আর খয়েরি শালিক---
ভাবো তো এমন দৃশ্য কবে তুমি দেখেছিল, কতোকাল আগে?

গোরুর বাথালে এক শ্যামলা রাখাল তার কী সুরেলা বাঁশি
মনে পড়ে রোদের পাহারা-ঘেরা দূর এক বিরান প্রান্তরে
সেই বাঁকা ঝাউগাছ, রাজা-প্রজাপতি আর ঝাঁক ঝাঁক টিয়ে?
মহুয়ার পালা শুনে কী যে কষ্ট বুকে নিয়ে ফেরা---মনে পড়ে?

জীবনের খোলা রাতে আজো ফুরোয় না সেই মহুয়ার পালা,
হোমরা বাইদ্যার রোষ ফেরে আজো মহুয়ার পেছন পেছন,
বিষের খঞ্জরে বেঁধে স্বপ্নবান জীবনের চাঁদ সদাগর----
বুকের খোয়াব নিয়ে জীবনের ঘোরতম আঁধারে পালাই।

খঞ্জর ছাড়ে না তবু। কী দিয়ে ফেরাবে! এই বিষের খঞ্জর?
নাচেব মুদ্রার মধ্যে ঝলোমলো কোরে ওঠে মৃত্যুর সমন,
ঢোলের শব্দের মাঝে বেজে ওঠে ঘাতকের অনিবার্য রোষ।
বিষের খঞ্জর আমি কী দিয়ে ফেরাবো বলো, কী দিয়ে ফেরাবো?

মরা নদীটির পাড়ে এক শঙ্খচিল কাঁদে। দুপুর গড়ায়।
কে যেন আকাশে ভাঙে একরাশ শাদা কালো মেঘের শিমুল।
রাত নামে। অন্ধকার ঘিরে আসে বাইদ্যার দলের নাহান
বিষের খঞ্জর হাতে---এ জীবনে ফুরোয় না মহুয়ার পালা॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ১
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২
.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

১০.
তালাক হয়েছে তার আশ্বিনের শেষ দিন অপর বেলায়।
অকারনে। লোকে বলে---সোয়ামির দিকে তার ছিলো না নজর,
পাড়া বেড়ানিয়া মাগি যার তার ঘরে গেছে সন্ধা কি ফজর---
অপরাধ বড়ো তার, পাথর ভেঙেছে সে-যে মাটির ঢেলায়।

সোমত্ত জোয়ান ঘাড় ফেরায়ে বলেছে মেয়ে---যাবো না, যাবো না!
ভরা অভাবের মাসে এখন কোথায় যাবো, কে দেবে খোরাকি?
যে অঙ্গ সোহাগ চায় সেইখানে লাথি মেরেছে একাকি!
অন্ধকারে। নামতে হয়েছে তাকে, তার কথা হয় নাই শোনা!

সোয়ামির ঘর থেকে তালাক হয়েছে তার, জোটেনি তালাক
জীবনের কাছ থেকে। জীবন নিয়েছে তারে অন্ধকারে টেনে।
মজা পুকুরের পাড়ে ভিন পুরুষেরা তার দেহখানা ছেনে
চিনিয়ে দিয়েছে দেহ, জীবনের কানাগলি, অন্ধকার বাঁক।

বুকের আগুন আজ জ্বেলেছে সে তার দেহে, দেহের খাঁচায়।
বধু নয়, মাতা নয, সে এখন শুধু এক সর্বনাশা মেয়ে---
সংসারের কূল ভাঙে উথাল গাঙের কালো অন্ধজল হয়ে,
মেঘের মতোন সে-যে রোদে পোড়া কিষানের আশাকে নাচায়।

ঘোলাটে জোস্নার রাতে দড়ি হাতে যায়নি সে গাবগাছ তলা,
এনডিন ভালোবেসে পরান জুড়াতে তার হয় নাই সাধ।
বেঁচে থেকে জীবনের পচাগলা অন্ধকারে নিয়েছে সে স্বাদ
জীবনের---জীবন দেখুক এক মানুষের অন্ধকারে জ্বলা।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর