মানুষের মানচিত্র ১১ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২২.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আজ কোনো জোস্না নেই, আজ কোনো স্বপ্ন নেই মানব পাড়ায়, যে-মাছেরা ঢাকা পড়ে বরফে ও নুনে, যে-মাছেরা গাঙপাড়ে খরায় শুকায় আর শীতে ধলাপোকা জন্মে যে মাছের হাড়ে--- সেই সব মাছের জীবনে আজ বুক ভাঙা মানুষ জড়ায।
জন্মেই জড়ায়ে গেছি মানুষের সুচতুর জালে ও খাঁচায়, তারপর যতোবার জোয়ার এসেছে গাঙে এসেছে প্লাবন কূল ভেঙে গেছে শুধু ভাঙে নাই খাঁচা-জাল, জালের বাঁধন। চিরকাল স্বপ্ন তবু জেলের নৌকোর মতো জীবন ভাসায়---
মানুষের মানচিত্র ১২ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৩.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১২. ভরা বসন্তের দিনে এ-মধুর চাক তুমি ভেঙো না মৌয়াল, মধুপোকা আসবে না, ভাঙা চাকে আসবে না রাঙা মউমাছি। দারুন যক্ষের ধন আমি শুধু এইটুকু স্বপ্ন নিয়ে আছি। ভেঙো না মধুর চাক, বিষ-পিঁপড়েয় তবে ছেয়ে যাবে ডাল---
রাতের শিয়াল আসে, ঝাঁক বেঁধে বানরেরা আসে অসময়, অন্ধকার বাদাবনে পাতার আড়ালে রাখি লুকায়ে শরীর, শরীর লুকোনো যায়, কি কোরে লুকোবো আমি সৌরভের তীর। কি কোরে লুকোবো এই বসন্ত বাহার আমি তপ্ত তৃষ্ণাময়!
এমন চাঁদের রাতে চাকে হাত দিওনাকো রঙিলা নাগর, তিষ্ণার গাঙেতে জল উথালি পাথালি করে সয় না পরানে। অতো কি বোঝাও তুমি পূ্র্নিমার চাঁদ আর বসন্তের মানে? বুঝি সব। জোয়ার এসেছে গাঙে খুলে যায় বুকের দুয়োর।
তুমি যদি কথা দাও আমারি কপালে দেবে সিন্দুরের টিপ, বুক ভরা স্বপ্ন দেবে, আর দেবে জীবনের আধেক সীমানা, দিঘির জলের মতো কালো এক শিশু দেবে তবে নেই মানা, তুমি হয়ো ঘর আর আমি হবো অন্ধকারে ঘরের প্রদীপ।
যদি তুমি কথা দাও কার্তিকের অনটনে দেবে না তালাক, তোমার বুকেব নিচে আমি তবে ভূমি হবো, হবো কি নদী, হৃদয়ের জল দিয়ে ভেজাবো তোমার কূল আমি নিরবধি--- তোমার জবান যদি সত্য হয় তবে তার বাসনা জ্বালাক। . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের মানচিত্র ১৩ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৭.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৩. কলার ভেলায় লাশ, সাথে ভেসে চলে এক স্বপ্নবান বধূ। হাঙর কুমির আসে, আসে ঝড়, অন্ধকার দরিয়ার বান, লাশের শরীর থেকে মাংশ খসে, রেহুলার অসীম পরান, কিছুতে টলে না স্বপ্ন, আকাংখার শত হাত মেলে রাখে বঁধু . . .
ওলো ও বেদেনি শোন, ছোবল দিয়েছে বুকে জাত কাল সাপ, নীলবর্ন হয়ে আসে সোনার গতরখানা অঙ্গ জ্বলে বিষে, কী সাপে দংশিলোলখা? ঘোববর্ন সাপ ছিলো অন্ধকারে মিশে। উদোম নাচন নিয়ে দুই কানে শোনা তুই মন্ত্রের আলাপ।
কী সাপে দংশিলো লখা! জীবন আন্ধার হলো, অঙ্গ হলো কালি, এ-কোন সাপের বিষ জীবন নেয় না শুধু শরীর জ্বালায়, পরান পোড়ায়ে নামে বিষের নহর যেন রক্তের নালায়--- দোহাই বেদেনি তোর, বিষের বাগানে তুই বিষহরা মালি
ওড়ে আকাশে শকুন। উত্তর দিগন্ত ঘিরে কালো মেঘ আসে। কেউ কি বেহুলা নেই স্বপ্নবান কোনো এক তরুন বেদেনি? স্বজন-রক্তের কাছে, স্বজন হাড়ের কাছে দায়বদ্ধ, ঋনী? কেউ কি বেহুলা নেই হাড়ের খোয়াব নিয়ে বৈরী জলে ভাসে? . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের মানচিত্র ১৪ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩১.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
মানুষের মানচিত্র ১৫ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩১.২.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৫. এতোকাল ধরে শুধু আকাশ মেঘলা হয় নামে না বাদল, নাড়ি-ছেঁড়া ব্যথা ওঠে, কাতরায় খালি ঘরে চূড়ান্ত পোয়াতি। পশ্চিমের মেঘ দেখে হাটবারে দোকানিরা গুটায় বেসাতি, বরষা আসে না---শুধু মেঘ জমে ওঠে, বাজে মেঘের মাদল।
সময় গড়ায় আর ভাঙা ঘরে চলে রোজ মৃত্যুর মহড়া। আমাদেরও স্বপ্নগুলো ক্রমশ ঝিমায়ে পড়ে বয়সের ভারে, ভরা পূর্নিমায় কেউ আঙুল রাখে না আর দোতারার তারে, ঘানির জোয়াল টানে একদার স্বপ্নবান প্রানবন্ত ঘোড়া।
বাওয়ালীর দুঃখ বোঝে বাদাবনে জোংড়াখুটা, জেলে ও মৌয়াল, জনপদে তারা আর চেনে না নিজের মুখ। আলাদা মানুষ তারা সব বিষের আগুনে পোড়া বিষমগ্ন মালশার তূষ, পোড়ায় অন্যের ঘর আর পোড়ে নিজে নিজে দগ্ধ চিরকাল।
আমরা দেখিনি আর পরস্পর হাত খুলে গাঢ় কোনো সাঁঝে, প্রতিটি হাতের তালু এক চিহ্ন ধ’রে আছে দেখি নাই কেউ। পরস্পর চেয়ে থেকে দেখি নাই সবার বুকেই এক ঢেউ, সবার একই মুখ, বার একই ভাষা চামড়ার ভাঁজে।
বড়শির সুতা ধ'রে অন্ধকারে বোসে থাকে রুগ্ন এক জেলে, মাছের ধোয়াব তার চোখের পিছুটি হয়ে ঢেকে রাখে চোখ। বুকে তার ক্ষুধায় খরায় পোড়া দূরবর্তী স্বজনের শোক--- এক জেলে চায় যেন নিখিল ধোয়াতে তার ম্লান স্বপ্ন ঢেলে॥ . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের মানচিত্র ১৬ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩.৩.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৬. কোনো কি প্রার্থনা নেই? কিছুই চাওয়ার নেই বিশ্বাসের কাছে? সংসার বিরাগি যেন একতারা হাতে এক বেভুল বাউল, কি সাধে নিয়েছো তুলে মাটি থেকে মানবিক আকাংখার মূল? 'আছে আছে, তোমারো রক্তের স্রোতে বাসনার বেনো জল আছে।
মানুষের মানচিত্র ১৭ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৬.৩.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৭. আমার লাটাই সুতা হাতে র'লো ঘুড্ডিখানা হারালো কোথায়? লিলুয়া বাতাস পেয়ে জীবনের স্বপ্ন-ঘুড়ি উড়ায়ে ছিলাম, হায়রে আকাশ তার অঙনে ডাকলো আজ নীলের নিলাম, কারা যেনন ঢেকে দিলো রোদের সুরুজটারে মেঘের কাঁথায়।
সব কথা ফুরোলো না, চোখ ভ’রে সব দ্যাখা হলোনাকো দ্যাখা, আশ্বিনের মেঘের মতোন ঝ’রে গেল চোখের পলকে সব আকাংখার জল, গেল শিশিরের মতো ঝরে গহিন খোয়াব। সব কথা ফুরোলো না, হৃদয়ের সব তৃষ্ণা হলোনাকো লেখা।
দিনের আহার শেষে ধবল পাখিটি আর ফিরলো না নীড়ে। সব বাঁশি বাজলো না, পেলো না হাতের ছোঁয়া সবকটি তার, ফসল বোনার আগে ভেঙে প’ড়ে গেল জলে গাঙের কিনার। বুকের শিখাটি জ্বলে উঠলো না বেদনার অন্ধকার ছিঁড়ে---
সব কথা ফুরোলো না এই কথা ফুরোবে না তবু একদিন দিনের আহার শেষে ধবল পাখিটি আর ফিরবে না নীড়ে, দুই ফোঁটা নোনাজল মিলে যাবে জীবনের অগনন ভিড়ে। জোয়ারে ভাটায় নদী অবিচল শুধে যাবে পৃথিবীর ঋন॥ . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের মানচিত্র ১৮ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৯.৩.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৮. ঘণ্টায় তিরিশ টাকা। কম নাই। আমাদেরও প্যাট আছে সাব, আমাদেরও সাধ আছে। পাঁচ টাকা সের চাল, কেমনে বাঁচুম! গতরে তুফান তুলে দুয়ারে লাগালো খিল পাড়ার রমনী, তখন ঝিমায়ে গেছে নবমির ঘোলাচাঁদ দূরের আকাশে . . .
জ্বলে সুখ, গেরস্থালি, শীতল আগুনে তার মজ্জা-মাংশ জ্বলে, বয়স্ক জরায়ু যেন ক্রমশ শুকায়ে আসে জীবনের স্বাদ।
পালায় থুবড়ে পড়ে সাধের বাসনাগুলো মাতালের মতো, ব্সুরে হার্মোনিয়াম বাজে তার রঙচটা বর্নহীন বুকে---
ফ্যাকাশে সকাল ভাঙা দেয়ালের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়, নিশিথের ক্ষতটারে মোছাতে পারে না। পারে না রোদের জল ধোয়াতে জীবন, এই নষ্ট ফল, এই মানুষের নষ্ট হিয়া--- সূর্য শুধু স্বপ্ন আনে, মানুষের ভাঙা-স্বপ্ন জোড়াতে পারে না।
নেশায় ঘোলাটে চোখ, টলতে টলতে যায় বুকের বাসনা, অন্ধকারে শাড়ি খোলে কারো বোন, কারো বধূ, কারো বা জননী। দেহের আগুন নয়, ক্ষুধার আগুনে পোড়া এই সব বুক, জীবনের মাংশে এক বিষ ফোড়া, জীবনের গভীর অসুখ॥ . **************** . সূচীতে . . .
মানুষের মানচিত্র ১৯ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৯.৭.৮৮ মিঠেখালি খুলনা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১৯. মলিন আজান শুনে জেগে ওঠে পোলাটার ভাতারখাগি মা, শরীরে সয় না আর, ভরা অভাবের মাস এখন কার্তিক। সবার হাড়িতে টান। সাত গ্রাম ঘুরে তবু মেলেনাকো ভিক--- ক্ষীনকণ্ঠ মুয়াজ্জিন, দু'বেলা জোটে না তারো। অভাবের সীমা
গাঙের ভাঙন হয়ে বেড়ে চলে জমিহারা কৃষকের মতো। গঞ্জের বাতাসে ওড়ে শাদা কালো মনোরম ভিনদেশি নোট, সহ্যের বলদ দুটি খোঁড়ায় সে-ভারে ন্যুব্জ, সয় না সে-চোট। জীবনের হাড়ে মাংশে বাড়ে এক কালো রোগ, কালো এক ক্ষত।
কেন এ-বিহান আসে? খুপড়ির অন্ধকারে কেন আসে ভোর? ঘুম তো মরন, সেই মরনেব মধ্যি থাকি, টাটায় না খিদে, অন্ধকার, সেই ভালো, অন্ধকারে বেঁচে-থাকা সেই তো সুবিধে। সকলি আন্ধার যার একটু সলোকে কিবা কাটে তার ঘোর!
মানুষের মানচিত্র ২০ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১.৯.৮৮ মোংলা বন্দর। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
কার ছায়া নড়ে ওই আধো আলো অন্ধকারে, কুয়াশার ফাঁকে! হাড্ডিসার রোগা ভাঙা গতকালও দুইঘর, ছেড়ে গেছে গ্রাম, তেঁতুলের মগডালে গলা বেঁধে ঝুলে আছে খাদেমের বাপ--- গেরাম উজাড় প্রায়, বানে ও ক্ষুধার ঘায়ে মরে নাই যারা
রঙিলা শহর শেষে গিলেছে তাদের। তাদের লাশের নামে, তাদের হাড়ের নামে, তাদের রক্তের নামে আজ রাজনীতি, জ’মে ওঠে জনসভা, হাততালি, নগরের বিশাল মিছিল . . . আঁখবনে কার ছায়া? মাঝরাতে অন্ধকারে জোড়া ছায়া নড়ে।