এ কেমন ভ্রান্তি আমার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০২.০৮.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এ কেমন ভ্রান্তি আমার! এলে মনে হয় দূরে স'রে আছো, বহুদূরে, দূরত্বের পরিধি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে আকাশ। এলে মনে হয় অন্য রকম জল হাওয়া, প্রকৃতি, অন ভুগোল, বিষুব রেখারা সব অন্য অর্থবহ--- তুমি এলে মনে হয় আকাশে জলের ঘ্রান।
হাত রাখলেই মনে হয় স্পর্শহীন করতল রেখেছে চুলে, স্নেহ-পলাতক দারুন রুক্ষ আঙুল। তাকালেই মনে হয় বিপরীত চোখে চেয়ে আছো, সমর্পন ফিরে যাচ্ছে নগ্ন পায়ে একাকি বিষাদ-ক্লান্ত করুন ছায়ার মতো ছায়া থেকে প্রতিচ্ছায়। এলে মনে হয় তুমি কোনোদিন আসতে পারোনি . . .
কুশল শুধোলে মনে হয় তুমি আসোনি, পাশে বসলেই মনে হয় তুমি আসোনি। করাঘাত শুনে মনে হয় তুমি এসেছো, দুযোর খুল্লেই মনে হয় তুমি আসোনি।
আসবে বোল্লে মনে হয় অগ্রিম বিপদবার্তা, আবহাওয়া সংকেত, আট, নয়, নিম্নচাপ, উত্তর, পশ্চিম--- এলে মনে হয় তুমি কোনোদিন আসতে পারোনি।
চ’লে গেলে মনে হয় তুমি এসেছিলে, চ’লে গেলে মনে হয় তুমি সমস্ত ভুবনে আছো॥ . **************** . সূচীতে . . .
মাংশভুক পাখি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৪.০৭.৭৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ফুলের পোষাকে ঢাকা শরীর, দারুন মাংশভুক পাখি ওই শকুন, ওই হিংস্র গোপন নোখ জুড়ে থাকা শত্রু-স্বভাব, আমাদের দিন থেকে খেয়ে যাবে প্রিয়তম রোদের মাংশ।
ঋতু বদলের ভোরে আমাদের শাখা থেকে তরুন কৃষ্ণচূড়া, আমাদের ভালোবাসা থেকে সুনীল সবুজ বিক্ষোভগুলো ছিঁড়ে নিয়ে গেছে ওইসব নষ্ট শকুন। ওইসব মাংশভুক পাখিরা আমাদের চোখ থেকে খেয়ে গেছে দৃষ্টির স্বাধীন বসবাস।
আমাদের বুক থেকে আমাদের প্রান থেকে ভাষার ভুবন থেকে শোভন শব্দগুলো কেড়ে নিয়ে গেছে ওরা আমাদের প্রিয়তম আকাশটুকু। সূর্যহীণ, জোস্নাহীন, এই কালো অন্ধকারে দুর্ভিক্ষের মতো
কুলের পোষাকে ঢাকা ওই হিংস্র গোপন নোখ, ওই মাংশভুক পাখি, ডানা থেকে ফুলের পালক খুলে ফেলে উড়ে এসে বসবে সব শহরে-গ্রামে-জীবনের সবুজাভ নিসর্গে, পাণ্ডুর দেহ থেকে ছিঁড়ে খাবে রক্তমাংশ, প্রিয়ফুল। আমাদের রাত থেকে নিদ্রাগুলো লাল নক্ষত্রগুলো স্বাধীনতাগুলো কেড়ে নিয়ে গেছে ওরা। কেড়ে নিয়ে যাবে চিরকাল?
প্রেমের নিকটে গিয়ে ফিরে আসি---বুকে ভালোবাসা নেই জোস্নার নিকটে গিয়ে ফিরে আসি---চোখে স্বাধীনতা নেই শ্রমের নিকটে গিয়ে ফিরে আসি---বাহুতে বিশ্বাস নেই মানুষের কাছে গিয়ে ফিরে আসি---দেহে মমতারা নেই নেই, নেই, ফুল নেই, পাখি নেই, রোদ নেই, স্নেহ নেই, খেয়ে গেছে গোপন ঘাতক---
শুধু হাড়, শুধু এক ভয়ানক গ্লানিমাখা আকাংখা নিয়ে প’ড়ে আছে কলুষিত করুন কঙ্কাল মৃত কিছু পুষ্টিহীন হলুদ করোটি। বোধি নেই, স্থিতি নেই, অনাহারে নক্ষত্রের মতো জেগে আছি, করতলে শেষ বিশ্বাসের শিকড়ে এসে থেমে আছে দূষিত ক্ষরন।
তবু তো আকাংখারা মাঝে মাঝে চিৎকার কোরে ওঠে সফেন সাগর, তবুতো কোনোদিন একদিন বৈশাখি রাতে জীবন এসে বলেছিলো : হাড়ের খুলির মাটি কোনো এক বর্ষার পর ঠিকই পাললিক হবে, খরার মাঠের বুকে দেখো ঠিক মেলে দেবে ফসলের সোনলি পালক॥ . **************** . সূচীতে . . .
আমি সেই অভিমান কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১১.০১.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান। আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ, নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান-ভেজা চোখ, আমাকে গ্রহন করো।
উৎসব থেকে ফিরে যাওয়া আমি সেই প্রত্যাখ্যান, আমি সেই অনিচ্ছা নির্বাসন বুকে নেয়া ঘোলাটে চাঁদ। আমাকে আর কি বেদনা দেখাবে?
তপ্ত সীসার মতো পুড়ে পুড়ে একদিন কঠিন হয়েছি শেষে, হয়েছি জমাট শিলা। তবু সেই পাথরের অন্তর থেকে কেঁদে ওঠে একরাশ জলের আকৃতি,
ঝর্নার মতো তারা নেমে যেতে চায় কিছু মাটির শরীরে--- আমি সেই নতমুখ, পাথরের নিচের করুন বেদনার জল, আমি সেই অভিমান আমাকে গ্রহন করো॥ . **************** . সূচীতে . . .
বিশ্বাসে বিষের বকুল কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৫.০৩.৭৬ রামপাল বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ষদি সব নদী ফিরে আসে নীড়ে, জন্মের নিকটে, তবু শরীরে ঘামের গন্ধ আমি তো ফিরিনি আজো! লাঙলের ফলায় মেখে ক্লান্ত-বিশ্রাম, চুলে নোখে অসভ্যতা, আমি তো ফিরিনি গৃহে বনবাস বিরাগী বাউল।
নদীও নদীর ভেতরে মেলে আছে অনন্ত ঋনী, প্রাপ্যের কাছে যতো পাওয়া ছিলো, যতো চাওয়া ছিলো, তারও কি অধিক তুমি দিয়েছিলে ভুলে আমার জন্মের কাছে নিবেদিত বিষের বকুল? স্টেশন জেগেছিলো--- হুইসেলে কেঁপেছিলো রাত, তবুতো একটি মানুষ নির্ধারিত আসনে এসে বসেনি। লোহা সাঁকো বেয়ে নেমে যাওয়া ডাউন-ট্রন, তবুতো একটি মানুষ জানালায় রাখেনি মাথা, রাতজাগা চুল।
যদি সব পাখি ফিরে যায় নীড়ে মমতা-কাতর, যদি সব নদী অধিক প্রাপ্যের লোভে নেমে আসে পুরাতন জন্মের খনে, তবু বিশ্বাসে ঘামের গন্ধ আমিতো ফিরিনি আজো--- হেঁসেলে পোড়াভাত, নিদ্রা-নিহত সেই পোয়াতি কুকুর, দুধের ফেনার ভেতরে মৃত শিশুদের শীর্ন শরীর, বিষের বকুল, গোলাপের লাশ---
সেখানেই আমার কিছু প্রয়োজন ছিলো, সেখানেই আমার শুধু পিছু ডাক ছিলো॥ . **************** . সূচীতে . . .
অমলিন পরিচয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৩১.০৭.৭৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সেই থেকে মনে আছে--- কপালের ডানপাশে কালো জন্ম জরুল, চুলের গন্ধে নেমে আসা দেবদারু রাতে কতোটা বিভোর হতে পারে উদাস আঙুল, সেই প্রথম অভিজ্ঞতা, সেই প্রথম ভুল।
অথবা ভুলের নামে বেড়ে ওঠা সেই প্রেম, সেই পরিচয়, আমি তাকে নিসঙ্গতা বলি। তুমি কি পাখির মতো আজো সেই স্মৃতিদের খড় চঞ্চুতে তুলে আর কোনো পৃথক নীড়ের তৃষ্ণায় করতলে লিখে রাখো দাহ?
তবে কি এই শেষ, সেই থেকে হয়েছে শুরু? তবেকি সেই প্রেম, সেই অভিজ্ঞতাটুক, আমাদের সমস্ত নিসঙ্গতা জুড়ে আছে আজো এক অধিকারে? আজো এক অমলিন বেদনার সাম্পান বিশ্বাসে ভেসে যায় ভেসে যায় . . . ভেসে যায় . . .
দূরত্ব জানে শুধু একদিন খুব বেশি নিকটে ছিলাম, একদিন শরীরের গান শুঁকে তুমি বোলে দিতে : অমিতাভ আজ সমুদ্রে যেও না, আজ খুব ঝড় হবে--- . **************** . সূচীতে . . .
শ্যামল পালক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ০৫.০১.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
একটি পালক তার খসে প’ড়েছিলো দখিনের হাওয়া লেগে ঘাসের উপর, আহা সেই লাজুক শ্যামল পাখি।
ঝরা সে-পালক তার প’ড়ে র’লো ঘাসে, বিকেলের ভেজা রোদ অবাক দুচোখে চমকে থমকে যেন দাঁড়ালো খানিক, আহা, সেই ঘাসে পড়ে থাকা শ্যামল পালক!
মাঠের বাতাস তার ছুঁয়ে গেল চুল, শিহরিত দেহখানি লজ্জায় কেঁপে থরো থরে হলো যেন প্রথম কুমারী--- আহা সেই বিকেলের ভেজারোদে শুয়ে থাকা কুমারী পালক! ব'য়ে আনা উত্তাপ পালকের প্রতি রোমে রোমে, আহা, কোন সেই কোন অচেনা দেশের ধুলো মাখা ওই পালকের নরোম শরীরে!
মনে হলে একবার তুলে এনে তারে রাখি বুকের নিকটে। হয়তো কখনো একদিন কোনো এক নারী, কোনো এক অচেনা নরোম হাত ছুঁয়েছিলো তারে, কোনো এক আচেনা বাতাস তারে বেসেছিলো৷ ভালো হয়তো কখনো--- কোনো একদিন . . . . **************** . সূচীতে . . .
মাতালের মধ্যরত্রি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪.০৮.৭৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আজ সব পোড়োবাড়ি---ধংশের কালো কফিন পাহারা দিয়ে আজো তার কণ্ঠলগ্ন মগ্ন প্রেম ভালোবেসে পোড়ায় তনু। মাঝবাতে পুলিশের বাঁশি শুনে জেগে ওঠে করুন মাতাল, আকাশের মতো তার চোখ থেকে ঝরে ম্লান ব্যথার শিশির---
নগ্ন অন্ধকারে ভাসমান ওই যে-বিষন্ন মানুষ, ব্যথিত মানুষ, অস্থির মাতাল ওই হাতে ওর তুলে দাও রাত্রির সমস্ত পাপ, ওকে আরো মাতাল হতে দাও, ওকে আরো ব্যথিত হতে দাও॥ . **************** . সূচীতে . . .
প্রিয় দংশন বিষ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৭.১০.৭৫ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বাঁকা ব্যবধান কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.০৩.৭৬ রামপাল বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
পাতক বোলে কি ফুলকে ছোঁবো না, জোস্না রবে না বুকে?
যতোটুক খানি বুঝেছি তোমার না-বোঝার ছল কোরে, তার আধখানা যদিবা সাজাই হৃদয়ের নির্জনে। তা-ও কি পাতকী?
ঘাতকী অমন হয়েছিল কেন কিসে? বিষাদে বিভেদে বেড়ে যায় বেলা, মাধবীর তলা শূন্য কি প’ড়ে রবে? তবে, চোখে যার ছড়ায়নি রোদ সূর্যের কিছু রেনু, তনু ঘিরে তার জ্বলবে আঁধার, অন্ধ বন্ধ পাখা?
বাঁকা হাত পেতে ডাকিনি বোলে কি এতোটা দ্বিধা? মেধা খুঁড়ে খুঁড়ে গড়েছি বোলে কি রক্তের মাঝে পুষেছি বোলে কি এতো অবহেলা!
পাতক বোলে কি ফুলকে ছোঁবো না? আমি বোলেই কি তোমাকে পাবো না? ব্যবধান জুড়ে রয়ে যাবে শুধু নীল শূন্যতা বাঁক? . **************** . সূচীতে . . .
অপর বেলায় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২১.০৩.৭৬ রামপাল বাগেরহাট। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বড়ো বেশি সংসার এসে গেছে শরীরে স্বভাবে--- এতোটা কি উচিত ছিলো! এতোটা মেধহীন, ঝড়ের শর্তবিহীন বাতাসে খুলে ফেলেছি শার্টের সবগুলো সোনালি বোতাম--- এতোটা কি উচিত ছিলো!
প্রথম বন্ধন এসে কেঁপেছিলা বেতস লতা, দ্বিতীয়তে মৃত্যু ছিলো দ্বিধাহীন সখাত সলিলে। তবুতো তার কাছে স্বপ্নের শেষ কানাকড়ি, শেষ পরাজয় তুলে দিয়ে বলেছি সিঁদুর-আশ্রয়--- এতোটা কি উচিত ছিলো?
জানি না কি মোহ ছিলো এতো মোহময় জানি না কি-দাহ প্রাণ এতোটা পোডায়! তবুতো মুগ্ধ মন পুড়েছি একাকী এই দিধাহীন বিশ্বাসে---
দারুন নির্জনে নেমে বেঁধেছি একখানা রঙিন নৌকো, আমি তো পারাপার জানি না, জানি না বৈঠার ভাষা। কোনখানে কুল নাই তার কোথায় কিনারা নাই, কতোখানি সাবধানে ভাসাতে হয় ভাঙা তরীখানি জানি না---
তবু, এই অপর বেলায় অনিকেত নবীন মাঝি পরবাসি বন্ধুর খবর নিযে ফিরে যাই দেশে! ফিরে যাই বিনিদ্র চোখের কাছে একখানা চিঠি, বকুলের খামে মোড়া শুভ্র সকাল। . **************** . সূচীতে . . .