কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
মানুষের মানচিত্র ২১
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা
..৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২১.
বড়ো চেনা এই চোখ, ঘন ভুরু, এই রঙ শ্যামল শরীর,
এই ঠোঁট বড়ো চেনা উজান গাঙের মতো কোমরের বাঁক,
এ-পুষ্ট ভরাট মাই পুষে রাখে যেন নোনা দরিয়ার ডাক,
বড়ো চেনা এই হাত, নিশিখের আলিঙ্গনে কামনা-অধীর।

বড়ো চেনা এই ঘ্রান, বৃষ্টি ভেজা মাটি এই দেহের তুলনা।
তামাটে তরুন চাষা লাঙলে চিরেছে এই নওলা জমিন,
কিশোর সবুজ ধান ধ'রে আছে তার সেই শরমের চিন---
এখন সে মৃত, ন্যাংটা, পচা লাশ---তার কথা এখন তুলো না।

এ-ও খুব চেনা কথা, এই কথা শুনেছিলো কুসুমের হাড়।
থই থই ভরা বুক সোমত্ত শরীরে বুনো শ্যাওড়ার প্রান,
বৈশাখে নিখোঁজ মেয়ে আষাঢ়ে উঠলো খেয়ে লাঙলের টান।
‘চুপ চুপ’---এই কথা শুনেছিলো মাটি আর মেঘের পাহাড়।

বড়ো চেনা ওই সব, ওই কণ্ঠ ‘চুপ চুপ’ বনেদি শাসন---
ওইখানে পোড়ে প্রেম, হাড় মাংশ, ওইখানে হাবিয়া দোজখ,
জীবন-গাছের গোড়া ওই হাত কাটে, ওই সর্বনাশা চোখ,
যেদিকে ফেরায় পোড়ে ঘরদোর, ভিটেমাটি, ভাতের বাসন।

এই যুদ্ধ বড়ো চেনা, চোখের আড়ালে বাঘ, গোপন লড়াই,
কখন নিয়েছে পিছু, মরনে জড়ায়ে গেছি পাই নাই টের।
জীবনের রক্ত মাংশ, প্রিয় মুখ হারায়েছি ঢের আমাদের---
মরন জীবনে থাকে, জান বাজি, আমি ওই বাঘটাকে চাই॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৬.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২২.
তারপর সেই গল্প। সেই চেনা গল্প, চেনা কথা জীবনের---
মনে করো সেই মুখ খুঁজতে খুঁজতে আর কোথাও পাচ্ছো না,
সেই যে নদীর পাড়, দুটো লাশ পড়েছিলো পাশাপাশি, পচা,
একজন তোমাব গাঁয়ের ছেলে, অন্যজন সহোদর, ভাই . . .

অনেক খুঁজেও তুমি সেই চিহ্ন, সেই স্মৃতি কোথাও পাচ্ছো না।
সেই যে কিশোর খুব শান্ত, বোবা, নয় মাস সাথে সাথে ছিলো,
যুদ্ধে সে সমর্থ নয় তবু তাকে কোনোভাবে ফেরানো গেল না---
ভাবো, সেই ছেলে যুদ্ধে নয় মারা গেল স্বাধীন স্বদেশে তার।

সেই দুটো ঘন কৃষ্ণচূড়া, আমাদের শপথের স্মৃতি সাক্ষী,
মোড়লের লোহার কুড়োল তার কেটে নিছে জীবন-শিকড়।
মনে করো সেই মুখ, সেই প্রিয়মুখ খুঁজতে খুঁজতে আর . . .
আর কোথাও পাচ্ছো না খুঁজে চেনা মুখ. একটি যুদ্ধের মুখ।

উপরে তাকাও, দ্যাখো ওই মুখ চেনো তুমি, ওই যে মানুষ?
শকুনের মতো চোখ, ঠোঁটে রক্ত, কালো শুকনো জমাট রক্ত,
নোখে লেগে আছে দ্যাখো শিশুর মগজ-মাংশ, কুমারীর লজ্জা।
আর দ্যাখো একজন যুদ্ধের মানুষ কী বিমর্ষ, রুগ্ন, ম্লান---

সেই প্রিয় মুখ তুমি খুঁজতে খুজতে আর কোথাও পাচ্ছো না
সেই চেনা দেশ তুমি খুঁজতে খুঁজতে আর কোথাও পাচ্ছো না
সেই বাংলাদেশ তুমি খুঁজতে খুঁজতে আর কোথাও পাবে না
ত্রিশ লক্ষ লাশের উপরে ওই ছিন্ন ভিন্ন জাতির পতাকা॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২৩
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৭.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৩.
প্রচুর জোনাকি ছিলো, ভাবি রাত, নিশা-লাগা ঘোর অন্ধকারে
জেগে আছে তিনজোড়া চোখ যেন তিনজোড়া শানিত ইস্পাত।
অর্ধেক জলের নিচে, শরারের বাকিটুকু গিলে আছে রাত---
অপেক্ষায় প্রহর ফুরোয়, উঁচু ব্রীজ, ঢালু সড়কের ধারে।

ঝিঁঝিঁ ডাকে। স্মৃতিরা জাপটে ধরে যেন এক আদুরে কিশোর . . .
পদ্মায় দুপুর নামে চক্চকে ইলিশের তরতাজা ঘ্রানে,
ফেনা ভাতে শুটকির ভর্তা মেখে মার হাত থেমে যায়। প্রানে
জাগে খোকার খোয়াব---ওর চোখে এতো কেন দরিয়ার ঘোর।

এটুকু বয়সে কেন গাঙের নেশায় ওরে এতো বেশি টানে!
জন্মেই খেয়েছে বাপ, বাপ খাগি, কব জানি নিজেকে সে খায়,
সংসারে মজে না মন, জেলে-নাওখানা তারে পাথালে ভাসায়।
পরান উতলা হয়, খাজখিজিরের নামে সিন্নি রাখে মেনে।

গ্রেনেডের চাবি দাঁতে, তিনজোড়া চোখ জ্বলে বিষের ভাষায়।
দাউ দাউ বাংলাদেশ! স্মৃতিরা খামচে ধরে পাঁজরের হাড়,
বোনের উদোম দেহ, জমাট রক্তের পাশে লাশের পাহাড়---
বারুদের হাত আজ তীব্রতম আঘাতের প্রতিজ্ঞা সাজায়।

জলপাই রঙা এক ঘাতকের বৈরী ট্রাক, ঘাতক সময়,
হদয়ে বারুদ রেখে অপেক্ষায় বোসে থাকে পদ্মার সৈনিক।
আকাশে নক্ষত্র জ্বলে। জলে প্রতিরোধ। জোনাকি দ্যাখায় দিক,
তিনটি হৃদয় জাগে, জেগে থাকে বিস্ফোরক তিনটি হৃদয়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা
.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৪.
সোনার খাঁচায় বেঁধে রেখেছে পাখিটি, পায়ে সোনার শিকল।
আহারে রঙিলা খাঁচা! দেখতে কি অপরূপ পাখিটির ঘর,
পাখির আকাশ আজ বাঁধা পড়ে আছে ওই খাঁচার ভিতর।
বুনো গান ভুলে গেছে, শিখেছে নোতুন বুলি, নয়া কোলাহল।

রঙিলা খাঁচায় বাঁধা পাখিটির চারপাশে আলোব বহর,
পাখির সকাল নেই, ফাল্গুনের জোস্না নেই, নেই সন্ধা, রাত।
বিশাল আকাশটিরে কেটে নিচ্ছে রুগ্ন এক সুখের করাত---
আহা আজ নিসর্গের উদোম গলায় ঝোলে সোনা মোড়া হার!

পাখি তার ইতিহাস, জন্মের ঠিকানা ভুলে, ভুলে তার বাসা,
বাহারি খাঁচায় বোসে ভিনদেশি গান গায় পরের জবানে,

বিড়ালের শিশু যেন দুধ খায় বড়ো সুখে বাধিনীর বানে---
পেছনে দাঁড়ায় এসে ইতিহাস শব্দহীন, অতীতের ভাষা।

পেছনে দাঁড়ায় এসে খোলা মাঠ, ঝোড়ো হাওয়া, বিশাল আকাশ,
বৃক্ষের বাড়ানো হাত, ডালপালা. রোদ আর বরষার জল।
পেছনে দাঁড়ায় এসে ইংরেজ-মোগল-আর্য, শিকারির ছল।
পেছনে দাঁড়ায় এসে উপদ্রুত জীবনের ভেজা দীর্ঘশ্বাস।

এইসব স্মৃতি নেই, এইসব কষ্ট নেই রঙিলা খাঁচায়,
জীবনের বাজি নেই, ভার নেই, নেই কোনো উত্তরাধিকার।
সোনার খাঁচায় বাঁধা অপরূপ সুখ-পাখি কার, তুই কার?
মাঠের পাখিরা ওই সোনা-মোড়া খাঁচাটিরে ভেঙে দিতে চায়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা
১০.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৫.
পচা ডোবা, তাকে যদি দিঘি বলো, বলো যদি জলাশয় তাকে,
ওই যে উথাল নদী কি নামে ডাকবে তাকে, দেবে কোন নাম?
চাষাটার ঘর ওই। ওখানের ক্ষেত মাঠ চেনে ওর ঘাম,
কি নামে ডাকবে ওকে? ওর নাম লেখে মাটি, আষাঢ়ের পাঁকে।

এক ঘর পুষ্যি তার, বছর বছর মাগি সমানে বিয়ায়।
কমে না নাড়ির জোর, মাজায় পুরোনো দাঁদ, কঠিন সুতিকা।
যাত্রা শুনে বাড়ি ফিরে মাঝরাতে মরদের তবু চাই সিঁকা,
সিঁকায় লুকোলো হাঁড়ি, সে-হাঁড়ির কাঁচারস হাঁড়ি ভেঙে খায়।

চাষাটার ওই দোষ, রোজ রাতে চাই তার গতরের সুখ।
সারাদিন ক্ষেতে খাটে, পেটভরা খিদে নিয়ে ফিরে আসে ঘরে,
তার খেদ ঝাড়ে শেষে হাড্ডিসার পোলাপান, মাগিটার 'পরে।
ফুটো চালে উঁকি দেয় রোদ, বৃষ্টি আর চাঁদের বেহায়া মুখ।

বউটার উদ্লা গা, ন্যাংটো-পাছা ছেলেপিলে, বুড়ির পচন,
ফুলে ঢোল পাওখানা, পুঁজে রক্তে একাকার, ঠেসে আছে মাছি,
এক কোনে প’ড়ে থাকে, ছেঁড়া চটে, পচা গন্ধে, ইচ্ছা তবু বাঁচি---
রোদ্দুরে শুকোয সব, এ-জীবন শুকোয় না, বিষের জীবন।

মোশুমের আয় কিছু মেলার প্যাণ্ডেল আর জুয়োয় খোয়াবে,
তারপর আটাগোলা-ঘাটকচু-আলুসিদ্ধ দিনের খোরাক।
বুড়িটার পচা পাও। ক্ষয় কাশ। ভেতর বাহির পুড়ে খাক . . .
ওইটুকু, তাকে যদি দুঃখ বলো, একে তবে কোন নাম দেবে?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১২.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৬.
চৈত্রের মেলায় ফের দ্যাখা হলো, সার্কাসের খেলোয়াড় মেয়ে,
এখন সে অন্যরূপ অন্য নামে লোকে ডাকে. চেনা বড়ো ভার।
তবু তাকে চিনে নিলো সোনাই শেখের চোখ, ঘোলা চোখ তার,
দুই ঠিলে মজা তাড়ি, নেশা ধ'রে গেছে খুব খোলা হাওয়া খেয়ে।

ডালিমন ছিলো নাম, ঝিলিমিলি মনে পড়ে ঝাপসা সে ছবি . . .
বান-ভাসানির পর সে বছর কলেরায় ধুয়ে নিলো ঘর,
ভয়ে গাঁ ছেড়েছে লোক, ঘরে ঘরে লাশ পচে আপন কি পর,
কবর জোটে না কারো---কে-কার খবর নেয় আধমরা সবি।

যমে বুঝি ফেলে গেল, দুই কুলে রলো বেঁচে একা ডালিমন।
দুয়োরে দুয়োরে মাঙে, চুরি করে এটা সেটা, ঠ্যালা গুঁতো খায়,
মাঝেমধ্যে রাখালেরা ছাড়া মাঠে নিয়ে তাকে যৈবন শেখায়।
স্বচ্ছল চাষির ছেলে ইচ্ছে হলে সে-ও পায় মেয়েটার মন।

একদিন শরীর জানায়ে দিলো পেটে তার আরেক জীবন---
কার শিশু? হয়তো বা ডালিমন জেনেছিলো কার ছেলে পেটে,
কে তার রসের জাউ অসময় বিনা দামে খেয়ে গেল চেটে।
প্রশ্নহীন। কালো চোখ তার যেন মেঘে ঢাকা ঈশানের কোন . . .

ওই তো ত্রিশূল খেলা, ডালিমন হাতে তার মরন ত্রিশূল,
ঘোলা চোখ কেঁপে ওঠে, সোনাই শেখের মনে ন'ড়ে ওঠে ছায়া,
একটি শিশুর মুখ---ঠোঁট নেই, চক্ষু নেই। ত্রিশূলের ছায়া . . .
মাটিতে পড়ার আগে ফলাগুলো ছেঁড়ে তার হৃদয়ের মূল॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১২.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৭.
কথা নেই, বার্তা নেই ভোর বেলা টান্‌ টান্‌ ম'রে পড়ে আছে
মাঘরের কালাগাই, শারান্ত গতরখানা, নোতুন গাবিন।
রোগ নেই, ব্যামো নেই, বিষ-শূল দিছে কেউ এই দ্যাখো চিন,
হরিপদ মুচি, ব্যাটা বেজন্মা চাড়াল, ওর কাজ, ও-ই মেরেছে।

আদেশেরও আগে যায় পোষাপাণ্ডা, মাঘরের পেয়াদার দল।
ভোরবেলা হরিপদ বেতের ধামায় সবে দিয়েছে বুননি,
পুরোনো চামড়াগুলো রোদে মেলে দিছে খুলে মুচির ঘরনি,
এমন সময় এসে সমন হাজির---ওঠ, এই শালা চল।

বিচারের শাস্তি ঘাড়ে হরিপদ চলে গেল থানার গারোদে,
হুশ নেই। নাকে মুখে রক্তমাখা, বোধহয় ভেঙেছে পাঁজর
এ-বিচার ঠিক নয়, প্রতিবাদ করে তার কোথায় সে-জোর।
বুক পাছা ভারি বেশ, বৌটার শরীর চাটে দারোগার খিদে।

তারপর যথারীতি আইনের বড়ো ঘর সদরে চালান,
বউটি থাকবে বেঁচে শোকে তাপে-আপাতত এই গল্প শেষ।
আসলে কি গল্প শেষ? এ-গল্পের শেষ খোঁজে উপদ্রুত দেশ,
মজা নদীটির জল চায় আজ খরস্রোত জোয়ারের টান।

ক’বছর কেটে যাবে---হরিপদ বাড়ি ফিরে দেখবে উঠোনে
জন্মেছে অচেনা ঘাস। ঘরহীন পোড়োবাড়ি, বুউটি নিখোঁজ।
দিন যাবে---সবহারা একদিন পাবে এক ডাকাতির খোঁজ,
স্রোত বদলাবে নদী, ভাঙবে পুরোনো পথ, ছুটবে বেগোনে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১
.৯.৮৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৮.
অল্প বয়সে আমায় দিওয়ানা বানালি বন্ধু, বানালি পাথর।
আগুন উস্কে গিয়ে পরবাসি হলি তুই, থুয়ে গেলি একা,
আকাশের ভরাচাঁদ মাস গেলে ফিরে আসে, মেলে তারও দ্যাখা,
বছর গডায়ে যায়, আমার বন্ধুর সই মেলে না খবর।

গলায় তাবিজ বাঁধি, কে জানে কোথায় কারে মনবান্ধা দিছে,
আরো কেউ আছে বুঝি, পরান জুডোয় তার জুড়োয় শরীব।
রঙিলা সুখের নাও লিলুয়া বাতাস পেয়ে ছেড়ে গেল তীর,
ডানা ভাঙা পাখিটিরে দেখলো না, একবারো তাকালো না পিছে।

এই যদি মনে ছিলো তখন পুঁতির মালা দিয়েছিল কেন?
কেন দিয়েছিলি ফুল, রাঙাপাড় ডুরি শাড়ি, আলতার শিশি?
বাঁশবনে ডেকে নিয়ে শরীরে সোহাগ দিতি কেন ও বিদেশি?
এই যদি মনে ছিলো গোপন দরোজাখানা খুলেছিলি কেন?

কাঞ্চা গাছে কোপ দিয়ে চ'লে গেছে পোড়ামুখি রসিয়া নাগর,
কে আর আসবে বলো! কি কোরে বা এঁটো থালে খেতে দেবো তারে?
নোতুন শাড়ির রঙ অবেলায় জ্ব’লে গেল সাবানের ক্ষারে।
কে দেবে শুকনো ফুলে নিশিরাতে মরমের গহিন আদোর।

কপাল মানি না আমি, হয়তো বা এই ছিলো কপালের ফাঁড়া---
এমনি পাপের বোঝা, আইবুডো পাঁচ মেয়ে, নিজে সে নাচার,
শরীরের স্বাদগন্ধ সাতজনে লুটে খাবে, নেবে না ভাতার।
ধান কেটে নিয়ে গেছে সারা ক্ষেত জুড়ে শুধু প’ড়ে আছে নাড়া॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ২
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা
..৮ মোংলা বন্দর। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

২৯.
তক্কে তক্কে থাকে, কখন সুযোগ বুঝে মটকায় জালি ঘাড়,
কখন যে ফ্যারে ফেলে কেড়ে নেয় জমিজমা, বসতের ভিটে।
কুলোর বাতাস দিলে ধানগুলো থেকে যাবে, উড়ে যাবে চিটে,
এই কথা জানে সে-ও, তাই শুধু সামলায় রাগি বুনো ষাঁড়।

মগডালে বাসা তার, পাতায় পাতায় হাঁটে, নজর সেয়ানা।
গাঙের বাতাস বুঝে নাও ছাড়ে, পাড় চিনে ভিড়ায় সে নাও,
গোনের সময়ে আছে কণ্ঠে গান ভাটিয়ালি, উজানে উধাও---
সুবিধার নৌকো এ যে ছেঁড়া পাল তলা ফুটো ডিঙ্গি বা খেয়া না।

হেমন্তের ধান ক্ষেতে নামে তার রুক্ষ থাবা, লোভে ভেজা হাত।
চাষাদের মজ্জামাংশ, কটু ঘাস চিনে চিনে যে-ধানের চারা
বেড়েছে বাদলে রোদে, চাষার গহন ক্ষোভ জানেনাকো তারা,
ঝলমলে দিনেও কেন চাষাদের ঘরে থাকে পচাগলা রাত।

আল্লাহতালার কাছে কাল বন্ধক দেয়া এ-কথা বুঝায়,
সে বুঝায় পূর্বপুরুষের পাপ, পুরোনো পাপের এই ফল।
চাষার টাটায় পেট, রক্ত নাচায় মাথা, চোখে আসে জল।
তুমুল পেশল হাত অসহায় নুয়ে আসে অসম পুজায়।

সে খুব কঠিন মূল, শক্ত হাতে ধ'রে আছে সমাজের কল---
শক্ত এক গাছের নাহান কামড়ে রয়েছে সে কঠিন মাটি।
তিন ভাগ জলের নিকটে তবু কতোটুকু শক্ত তার ঘাঁটি?
অন্যায় পাহাড় কবে ভাঙতে আসবে ফুঁসে দুর্বিনীত জল?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র ৩০
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৫.১.৮৯ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৩০.
এবার অঘ্রান মাসে কিনে দেবো তাঁতে বোনা লাল পেড়ে শাড়ি,
চাষের মোশুমে যদি খোরাকির ধার দেনা অধিক না হয়
তবে দেবো নাক ফুল, গেরস্থ বউরা সব যেমন গড়ায়।
বলে রাখি, দুটো মাস একটু আদটু খাবো বাজারের তাড়ি।

তিনটে বছব গেল বুকের উপর দিয়ে যেনবা পাহাড়,
একবেলা ভাত দিতে পারি নাই পেটে, উদলা গতরখানা
সবারে দ্যাখায়ে গেছ ঝি'র কাজে আন বাড়ি। অভাবের দেনা
উশুল করেছে জানি, রূপ রস শুষে নিছে বাকি শুধু হাড়।

বুড়ো বুড়ি পেট ফুলে দু'জনে মরলো শেষে, মরই বাঁচালো,
ফুশলায়ে কে যে নিলো, বিধবা বোনটা গেল কোন নিরুদ্দেশে।
আল্লার গজব যেন ভাঙা ঘরে নেমে এলো অভাবের বেশে
সবহারাদের কাছে রাজার পেয়াদা যোন রাদকর চালো।

এবার ফসল ভালো, হালে যেন টের পাই পানির পরশ,
নূহের বাতাস বুঝি জীবনের পালে লাগে অনুকূল হয়ে।
পাষানের মতো ভার এ-জীবন তবু জানি যেতে হবে বয়ে,
অঘ্রানের দেশে যাবো, কতোদূর সেই পথ? কতো, কতো ক্রোশ?

তোমার জমিনে দেবো এইবার ঘাড় শক্ত মানুষের বীজ,
শত আঘাতেও যেন সে মানুষ কিছুতেই না-নোয়ায় ঘাড়।
আমাদের রক্ত মাংশ পুঁজি কোরে দেবো তারে আমাদের হাড়,
তবু যেন কোনোদিন পরতে না হয় তাকে ভাগ্যের তাবিজ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর