কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
মানুষের মানচিত্র ৩১
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা
৮..৮ মিঠেখালি মোংলা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৩১.
মাঝবাতে স্বপ্নে দ্যাখে সাপ। সাপে কাটে, কামড়ায় মধ্যরাতে
কালো এক বাজপাখি ছোঁ মেরে উপড়ে নিতে আসে তার চোখ।
মাঝরাতে সাপ আসে, স্বপ্নে তার জেগে ওঠে বেহুলার শোক,
কারা যেন কাটে তার দুইখানা কচি পাও কঠিন করাতে।

সে তার জানে না নাম। জানে না কে তার বাপ, কে মা, ভিটেমাটি
জানে না কোথায় তার শৈশবের ভাঁটফুল, আদিগন্ত চিল,
কোথায় চৈত্রের নদী, ভীত ডানকানা মাছ, ম্লান শঙ্খচিল,
কোথায় বিছানো তার মার স্নেহ, ছায়াতলে শীতলিয়া পাটি।

কাটা আগাছার মতো ছিটকে পড়েছে এসে শহরের পথে।
আকালের তাড়া খেয়ে যেভাবে ছিটকে পড়ে গাঁয়ের মানুষ,
যেভাবে ছিটকে আসে হাড্ডিসার মানুষেরা ক্ষুধায় বেহশ---
ভেসে আছে যেইভাবে ভেসে থাকে খড়কুটো বেনোজল শ্রোতে।

কুকুরের গ্রাস কেড়ে খেয়ে তার নাগরিক জীবনের শুরু।
এই টার্মিনালে তার কেটে গেছে শৈশরে ভাঙাচোরা দিন
এই টার্মিনাল তার রক্তের গভীরে দিছে জীবনের ঋন
এই টার্মিনাল তাকে চক্ষু দিয়ে বিনিময়ে কেটে নিছে ভুরু।

সে তার জানে না নাম---মাঝরাতে স্বপ্নে দ্যাখে সাপ, সাপে কাটে
সে তার জানে না নাম---মানুষ না কুকুরের বংশ তার জ্ঞাতি
সে তার জানে না নাম---জানে না সাকিন, পরিচয়, পরিণতি
শুধু, মাঝরাতে স্বপ্নে দ্যাখে সাপ, সাপে কামড়ায়, সাপে কাটে . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষের মানচিত্র
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১০.১১.৮৯ বাসাবো ঢাকা। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত “মানুষের মানচিত্র”
 কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

৩২.
চোপ। ওই হালা জাউরার পুত, খবিশ জবান তোর থামা,
কি ভাবিস, চোখের সামনে মুলা ঘুরায়ে নাচায়ে পাবি পার?
টাকা দিযে রক্ত ধুবি? ধুলোয় ঢাকবি লাশ? স্মৃতি, স্বপ্ন আর
বুকের আগুনে দিবি পানি? ইঁটের বদলে দিবি ফাঁকি, ঝামা?

চোতমারানির জাত, আমার পোলারে তুই ভিনদেশি বুলি
কেন চাস শেখাতে পড়াতে? তুই বাড়া ভাতে ছাই দিস কেন?
নদীর জোয়ার ভাটা আমার জবানে এসে সাজানো গোছানো
কথা হয়ে ফোটে, কথা হয়ে ফোটে ভাত, বীজধান, বুলবুলি।

থামা, খানকির পোলা তোর ইলা-বিলা থামা। মানুষের ঢল
দ্যাখ নোনা দইরার মতো কূল ভেঙে কেমন গর্জায় ওঠে।
কেমন শিমুল দ্যাখ, রক্তজবা কিরকম রাঙা হয়ে ফোটে।
খুনের বদলে খুন, জুলুম চালালে নেবো জুলুমের বদল---

অনেক হয়েছে দেনা, পরনে ত্যানাও এখন জোটে না এখন,
না খাওয়া পোলা থুয়ে মাগ যায় আন বাড়ি আন বিছানায়।
তারেও বা দুষি কেন, পেটে খিদে বিষ হয়ে অনল জ্বালায়।
পেটের ভিতরে বিষ মাথার ভিতরে বিষ, লোহুতে কান্দন---

কেতাব কোরান যদি সত্য হয় তয় কেন এমন আজাব?
দশজনে পোড়ে আর একজন খোয়াবের বেহেস্ত বানায়,
এই যদি বিচার বিধান তয় মানি না---ভুখা দুনিয়ায়
জুলুম চালায় যারা কেড়ে নেবো তাগো সব সুখের খোয়াব॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ক্রান্তিকাল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৮.৭.১৩৯৪ (২.১১.১৯৮৭), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।  কবির
বানান।

বাইরে লুট হচ্ছে রোদ্দুর---
অথচ কেউই বলছে না : তোমরা বেরিয়ে এসো,
দ্যাখো, তোমাদের শীতের কাপড়গুলো
আর ভিজে ক্ষত শুকোবার একমাত্র ওষুধটুকুও
হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

দরোজা আটকে ঘরে থাকবার সময় এখন নয়,
এখন সময় নয় সঙ্গমের।

বাইরে লুট হচ্ছে রোদ্দুর---
আর গৃহবন্দি মানুষেরা
যার যার স্বপ্নের আঠায় একা একা জড়িয়ে গিয়েছে।

কেউ বলছে না : নড়ে চড়ে দাঁড়াও এবার,
দ্যাখো, শিকড়েরা জন্মে গেছে পায়ের আঙুলে,
বেদনার বিবর্ন বাঁকল ঢেকে আছে মানবিক দেহ,
অবদমনের ডালপালা গজিয়েছে নিরীহ মাথায়।

বাইরে লুট হচ্ছে রোদ্দুর---
এখন সময় নয় ভালোবাসা বৃক্ষের স্বভাব,
পাখি কিংবা হরিনের নমনীয় জীবনযাপন ছুঁয়ে থাকা
এখন সময় নয়।
উপদ্রত জনপদে লুট হচ্ছে রোদ ;
ফসলের প্রথম প্রেরনা,
নিয়ন্ত্রিত মানুষের মানবিক মুখরতা স্বপ্নাবলী।
লোকালয়ে লুট হচ্ছে সমতার নিসর্গ-নিয়ম।

কেউ কিছু বলছে না---
কষ্টবন্দী মানুষেরা যার যার অমূলক স্বপ্নের আঠায়
একা একা জড়িয়ে রয়েছে . . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রূপকথা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.১০.১৩৯৫ (১০.২.১৯৮৯), মিঠেখালি  মোংলা।  “মৌলিক মুখোশ”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।  
কবির বানান।  

সামরিক ক্যু হবার পর
সকল কু বাজেয়াপ্ত করা হলো।

কোকিলেরা পাল্টে নিলো পরিচিত ডাক,
পাখিদের পাঠ্যসূচি থেকে কুহু স্বর পরিত্যক্ত হলো।
জলেদের কুল কুল চলাফেরা থেমে হলো ল ল ধ্বনি,

কুস্তিগীর কুহীন স্তি নিয়ে জমালো আসর।
ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিরা কোলালি করলো বটে
কোলাকুলি বন্ধ হলো।

কুলীন সকল লীন হলো, কুকাজ দাঁড়ালো শেষে কাজে,
কুমির হিংস্রতা ভুলে মীর হয়ে মাথায় পরলো টুপি।
কুমারীরা অতিদ্রুত মারীমন্তরে গেল ভেসে,
কুমন্ত্রনা অতপর মন্ত্রনার মর্যাদা জোটালো---

ঘোলাটে কুয়াশা আশা হয়ে নিয়ে এলো
নিরাশার শব্দহীন ঝড়,
আর কুকুরেরা হয়ে উঠলো র অথাৎ খাঁটি ;
নিশর্ত প্রভুভক্তিতে অবশ্যই চিরকাল খাঁটি তারা।
কুলোক সকল লোকে রূপান্তরিত হলেন,
বিভিন্ন প্রথম সারিতে তাদের মুখ জ্বলজ্বল করতে থাকলো।

নটেগাছটি মুড়োলো---
অতপর কুবিহীন সুসময় বেতারে টিভিতে
প্রকাশিত হতে থাকলো প্রত্যেক দিন।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মধ্যরাত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.১০.১৩৯৫ (১১.৫.১৯৮৮), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।  কবির
বানান।

মেয়ে দুটি মাঝরাতে ফেরে।
পা জড়িয়ে আসে ক্লান্তি, অবসাদ রক্তের ভেতরে,
গা থেকে উপচে পড়ে অচেনা অনেক ঘ্রান---
মা, দরোজা খোলো মাগো . . . .

দূরের জাহাজে সিটি বাজে,
আকাশে প্রাচীন চাঁদ পৃথিবীর
এখনো সুন্দর,
এখনো জোয়ার এসে
শস্যক্ষেতে রেখে যায় পাললিক প্রেম।

শুধু, রাত হলে নোনা ঘ্রান, ক্ষমাহীন পাকস্থলি,
প্রতিদিন অচেনা দুয়োর---

মাগো, দরোজা খোলো, মা . . . .
বাইরে ক্ষুধার খরা, স্তব্ধ অন্ধকার।
ডাস্টবিন আলোকিত কোরে আছে
সভ্যতার মহান ভূমিকা।
সহস্র শিশুর পাঁজরের পুষ্টিহীন হাড়
বাজায় উজ্জ্বল সুর পারমানবিক বাঁশি।
মানুষের অকালমৃত্যুর বিনিময়ে নভোযানগুলো
ছুটে যায় সুদূরের গ্রহে---
মা, দরোজা খোলো মাগো . . . .
মেয়ে দুটি মাঝরাতে ফেরে ছেলেটি ফেরে না---
রঙিন রাত্রির স্বাদ উছলে উতলে পড়ে
নগরের সরম্য নিবাসে,
ঝকঝকে মুখগুলো কি সহজে হয়ে ওঠে শ্বাপদসংকুল!

রক্তমাখা ক্ষমতার হাতে পুঁজ, পোকা-ধরা ক্ষত
ছুঁয়ে আছে জীবনের সবকটি ফুল---

মাগো, গরোজা খোলো মা . . . .

লাঙলের ফলার আঘাতে
মাটি থেকে উঠে আসে চকচকে ক্ষুধা,
বস্ত্রকলে ক্ষয়কাশ, জঙধরা শ্রমিকের হাতে
পাকা আপেলের মত অনিশ্চিত দিনমান।

সামান্য খাদ্যের 'পরে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসংখ্য রুগ্ন থাবা,
অথচ রোদের রঙ অবিকল ; সূর্য ওঠে,
বাতাসেরা বয়ে আনে নিসর্গের অমলিন ঘ্রান,
সভ্যতার স্তুতি কোরে প্রতিদিন ছাপা হয় অজস্র কাগজ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অবদমনের ডালপালা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৭.৭.১৩৯৪ (২২.১০.১৯৮৭), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

তবু তুমিও বলতে পারছো না--- না, নেই, কোথাও নেই,
আমার কোথাও আজ তার ছায়া নেই, সে নেই কোথাও---
বৃষ্টির জলের দাগ মুছে গেছে একদিন সকালের রোদে।

তবু তুমি বলছো না--- সে তোমার কেউ নয়, প্রজাপতি,
অথবা পাখি সে, দুদন্ড জড়িয়ে গেছে জীবনের ডালে।
তোমার শাখায় বোসে দেখেছে সে অন্য ফুল, উজ্জ্বল অধিক,
প্রজাপতি উড়ে যাবে বিচিত্র বিভিন্ন ফুলে সে তো স্বাভাবিক---

তবু তুমি বলছো না বিষকরবীর ফল
ঠোঁটে কোরে এনেছিলো সে তোমার নিভৃত উঠোনে,
ঈশানের মেঘের মতোন সাথে কোরে এনেছিলো
বজ্র, বৃষ্টি আর প্রবল বাতাস।
তোমার খড়ের ঘর,
হায় প্রেম! ছিন্নভিন্ন পড়ে আছে বিরান প্রান্তরে।

তবু তুমি বলছো না--- ভুল, ভুল বৃক্ষ, পরিচয়,
ভুল স্বপ্নে বেড়ে ওঠা জীবনের ব্যথিত ফাল্গুন।

তবু তুমি বলছো না---
জীন নয়, সামাজিক জীর্নতার আগুনে রেখেছি হাত,
বিশ্বাসের ঝুলকালি ধেড়ে ফেলে এই তো এসেছি আমি।
এই তো আবার আমি দাঁড়িয়েছি কৃষ্নপক্ষ পৃথিবীর তীরে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যোগ্যতা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩.১.১৩৯৩ (১৬.৪.১৯৮৬),  রাজাবাজার ঢাকা।  “মৌলিক মুখোশ”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

সোজা হয়ে দাঁড়াবার প্রাকৃতিক প্রবনতা যার
শরীরে কোথাও আর একবিন্দু অবশিষ্ট নেই,
যে জানে অমেরুদন্ডী প্রানীদের বুক ঘ'ষে চলা।

পায়ের গন্ধের প্রতি যার আছে দুর্নিবার ঝোঁক,
যে শিখেছে পা চাটার ছলাকলা, বিচিত্র কৌশল,
কুকুরের মতো যার লাথি খেতে আহ্লাদ জাগে।

স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে রেখে পশ্চাতের মাংশময় ভূমি
যে পারে প্রভুর জন্যে এনে দিতে লাথির আরাম,
“জ্বী হুজুর” ছাড়া আর সব শব্দ যে গিয়েছে ভুলে।

যার কোনো স্মৃতি নেই, ব্যক্তিগত দুঃখ-সুখ নেই,
কি স্বপ্নে কি জাগরনে হুজুরের জুতো মোবারক
জেগে থাকে মাথার ভেতরে যার মস্তিষ্কের মতো।

একান্ত তারই জন্যে হুজুরের দরোজাটা খোলা,
এ-সময়ে সেই পাবে সৌভাগ্যের সুগোপন সিঁড়ি।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চোখ খুলে ফ্যালো
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৪.১০.১৩৯৪ (৬.২.১৯৮৮), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

চোখ থেকে খুলে ফ্যালো চোখ,
দ্যাখো এখন কী চমৎকার লাগছে তোমাকে!

কিছুই দেখতে হচ্ছে না তোমার
উপড়ানো চোখ দুটি ছাড়া,
চোখের কোটর এবং তার রক্তমাখা ক্ষত
কি এমন বীভৎস বা ভয়ানক বলো!

এখন তোমাকে আর দেখতে হচ্ছে না
দৃশ্যমান কিছু---
মেঘ কিংবা পাখিদের ঝাঁক
কখনো দ্যাখোনি তুমি,
পুর্নিমার পরদিন আগুন-রঙের ঠান্ডা চাঁদ
অথবা স্রোতের পরে ভাসমান
রাতে নুনের জোনাকি
দেখতে হয়নি কোনদিন তুমি বা তোমাকে।

তুমি তো দেখেছো
রক্ত-ঝলকানো নারীর স্তনের ’পরে
মিষ্টি গোলাপি তিলের টিপ,
স্নায়ু তছনছ করা উরু,
আর কোমরের নগ্ন নদীময় বাঁক।

তুমি তো পেয়েছো কেবলই সুরার সৌরভ,
নেবুগন্ধ নারীর ত্রিভুজ
আর অবিরল শারীরিক উলঙ্গ উৎসব।
কেবল তোমার চোখে সেঁটে ছিলো
কাড়ি কাড়ি টাকার বান্ডিল,

ক্ষমতার মসৃন এক সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে
তুমি তো পৌঁছেছো
নরকের নিসঙ্গতা-মাখা সোনালি চূড়ায়।

তীক্ষ্ন তৃষ্নাময় দীপ্ত সুচতুর তোমার দুচোখ,
এইসব আলোকিত অন্ধকার ছাড়া
কিইবা দেখছে আর!

অতএব চোখ থেকে খুলে ফ্যালো
তোমার দুচোখ,
অন্যথায় অন্য এক চাকু এসে
খুঁচে খুঁচে রক্তাক্ত করবে
এবং তারপর
উপড়ানো চোখ দুটি ছুঁড়ে দেবে
ক্ষুধার্ত কাক বা কুকুরের লকলকে জিভের সামনে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সামঞ্জস্য
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.১৩৯৫ (১৪.১.১৯৮৯), রাজাবাজার  ঢাকা।  “মৌলিক মুখোশ”  কাব্যগ্রন্থের  
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

তুমি বরং কুকুর পোষো,
প্রভু ভক্ত খুনসুটিতে কাটবে তোমার নিবিড় সময়।
তোমার জন্যে বিড়ালই ঠিক,
বরং তুমি বিড়াল পোষো---
খাঁটি জিনিষ চিনতে তোমার ভুল হয়ে যায়,
খুঁজে এবার পেয়েছো ঠিক দিক ঠিকানা।
লক্ষ্মী সোনা, এখন তুমি বিড়াল এবং কুকুর পোষো।

শূকরগুলো তোমার সাথে খাপ খেয়ে যায়,
কাদা ঘাটায় দক্ষতা বেশ সমান সমান।

ঘাটাঘাটির ঘনঘটায় তোমাকে খুব তৃপ্ত দেখি,
তুমি বরং ওই পুকুরেই নাইতে নামো---
পংক পারে জলও পাবে।
চুল ভেজারো তেমন কোনো আশঙ্কা নেই,
ইচ্ছে মতো যেমন খুশী নাইতে পারো।

ঘোলা পানির আঢ়াল পেলে
কে আর পাবে তোমার দ্যাখা।
মাছ শিকারেও নামতে পারো।  
তুমি বরং ঘোলা পানির মাছ শিকারে
দ্যাখাও তোমার গভীর মেধা।

তুমি তোমার স্বভাব গাছে দাঁড়িয়ে পড়ো,
নিলিঝিলির স্বপ্ন নিয়ে আর কতো কাল?
শুধু শুধুই মগজে এক মোহন ব্যাধি---
তুমি বরং কুকুর পোষো। বিড়াল পোষো।

কুকুর খুবই প্রভুভক্ত এবং বিড়াল আদরপ্রিয়,
তোমার জন্য এমন সামঞ্জস্য তুমি কোথায় পাবে?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ক্রাচ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৮.৯.১৩৯৪ (২৭.১২.১৯৮৭), রাজাবাজার ঢাকা।  “মৌলিক  মুখোশ”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

তুমি আমার জীবন্ত ক্রাচ---
তোমাকে চাই।
যেদিকে যাই, যেদিক ফিরি
স্মৃতি কিংবা ভবিষ্যতে,
আমার এখন তোমাকে চাই।
স্নায়ু এখন উড়ির চরের মঞ্চসজ্জা,
খুলির নিচে বিআরটিসির বাস পুড়ছে,
শরীর জুড়ে টলটলোমান ক্ষীপ্ত দারু,
আমার এখন তোমাকে চাই।

খুব সুদূরে হারানো সেই বাড়ির উঠোন,
ভর দুপুরে ছাতিমতলার বিশাল ছায়া,
সব হারিয়ে দুহাত এখন তোমাকে ছোঁয়।
সব হারিয়ে হৃদয় এখন তোমার বুকে
ঠাঁই নিয়েছে---

তুমি আমার জীবস্ত ক্রাচ, তোমাকে চাই,
বন্ধ ঘরের বাইরে যাবো, তোমাকে চাই॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর