আঁধারপুরের বাস কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৮.৮ ১৩৯৫ (১২.১২.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আকাশের নীল কন্ঠে দুলছে পাখির নেকলেস। অফিস ফেরত সূর্যটি দিগন্তের বাসস্ট্যান্ডে একাকি দাঁড়িয়ে আছে, আঁধারপুরের বাস এখনো আসেনি---
বাতাসে উত্তর পাহাড়ের হিম গন্ধ আর অতিথি পাখির ঝরে পড়া পালকের ওম--- যেমন দাঁড়ায় নারী পিপাসার প্রখর প্রহরে।
অথবা সে নারী নয় মুক্তগন্ধা সবুজ ঝিনুক, কর্কশ বালির ক্ষত বুকে নেবে বোলে খুব আগ্রহের চাষাবাদে নিমগ্ন হয়েছে।
আমি মস্তিষ্কের সমস্ত জানালা খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছি, কেউ আসছে না। না রোদ, না পাখির নেকলেস। কেবল উত্তর পাহাড়ের হিম, ঠান্ডা হাত ছুঁয়ে যাচ্ছে ব্যথিত চিবুক। বিস্মৃতির বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছি একা, কেউ আসছে না। না স্বপ্ন, না ঘুম, কেউ নয়। আঁধারপুরের বাস কতোদূর থেকে তুমি আসো??
সবুজ গোলাপ হৃদপিণ্ড কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৪.১১.১৩৯৪ (১৬.২.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমাকে টুকরো কোরে, টুকরো টুকরো কোরে যদি ফেলে রাখো এই রাজকীয় রাজপথে, আইনের লাল গৃহগুলো খোঁজও নেবে না।
দু’একটি নাগরিক কাক এসে ঠোকরাবে প্রথমে আমার চোখ অর্থাৎ দৃষ্টিশক্তি। আর নগরের সভ্য মানুষেরা চলে যাবে দ্রুত পাশ কেটে, খণ্ডিত মৃতদেহকে নিয়ে না জানি কি হাঙ্গামাই হয়। ফ্যাকাশে ত্বকের সুন্দরীটি একটি বার দেখেই বমি কোরে ফেলবে-ইস্ জঘন্য . . . .
পথচারী নিম্ন, মধ্যবিত্ত, ছা পোষারা ভয়ে ভয়ে একটু আধটু উঁকি দিয়েই কেটে পড়বে নিজস্ব গন্তব্যে। তা ছাড়া কীইবা করার আছে তাদের--- ছিন্নমূল টোকায়েরা গুটি গুটি জমা হবে সড়কের পাশে।
মাছিগুলো রক্ত থেকে সংগ্রহ করবে খাদ্য, পিঁপড়েগুলোও বাদ পড়বে না,
সামনে শীতের জন্যে তাদেরও তো খাবার প্রয়োজন। দু'একটি নেড়ি কুত্তা উরু আর পাঁজরের সুনরোম মাংশ সোল্লাসে গিলতে লেগে যাবে।
অতপর শান্তিরক্ষী নামধারী নির্বোধ পুলিশ লাশের সুরতহাল নিতে এসে মুষড়ে পড়বে, কারন, এরকম অদ্ভুত ঘটনায় তারা কখনো অভ্যস্ত নয়।
বিস্মিত চোখে তারা দেখবে লাশের হৃদপিণ্ডটি একটি বিশাল গোলাপের মতো ফুটে আছে, প্রকৃতই সেটি এক অতিকায় সবুজ গোলাপ . **************** . সূচীতে . . .
স্বপনের বাস্তুভিটে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১.১১.১৩৯৪ (১৩.২.১৯৮৮), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
খুব গভীরে শাঁসের মতো হাড়ের ভেতর মাসের মতো সুরক্ষিত স্বপ্ন থাকে। আকাল--- তবু স্বপ্ন থাকে বিরোধ--- তবু স্বপ্ন থাকে ভাঙন--- তবু স্বপ্ন থাকে স্নায়ুর সে কোন জটিল কার্যকলাপ জুড়ে হৃদয় থাকে, সেই গোপনে স্বপ্ন থাকে।
ভস্মিভূত বসতবাড়ির ছাই-এর তলে স্বপ্ন থাকে, স্বপ্ন থাকে গুলিবিদ্ধ বালিহাঁসের নরোম বুকে, স্বপ্ন থাকেই। নৈরাজ্যের চাকায় পেষা অন্ধকারে রন্ধে চাপা তিক্ত তুমুল স্বপ্ন থাকে। স্বপ্ন থাকে, স্বপ্ন থাকেই। দুর্ভিক্ষের কুগ্ন হাড়েও স্বপ্ন থাকে। বিষের ঘায়ে নীলচে দেহ,
যে-জীবনের সূর্য ডোবে নদীর জলে সন্ধেবেলা তারও থাকে দু'হাত ভরা ফুলের মতো তারও চোখে স্বপ্ন থাকে।
স্বৈরাচারে ছিন্নভিন্ন দেশটি তবু স্বপ্ন থাকে, অবহেলায় ধুলোয় পড়া বীজটিতেও স্বপ্ন থাকে। তুমি আমায় ছেড়ে যাচ্ছো, ভুলে যাচ্ছো, তবু আমার স্বপ্ন থাকে। . **************** . সূচীতে . . .
পান করো রাত্রি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৯.১০.১৩৯৫ (১১.২.১৯৮৯), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
শেষ অব্দি মেঘগুলো বৃষ্টি হলো দ্যাখো---
আমি তোমাকে বলতে পারতাম জল, বাষ্প আর আর্দ্র বাতাসের কথা। সুর্যাস্তের আগে মেঘেরা পেখম মেলে ছুঁয়ে দ্যায় প্রজাপতির ডানার তন্ময়তা, তোমাকে বলতে পারতাম দ্রাক্ষারস আর অফুরন্ত উল্লাসের কথা।
আমি স্পর্শের শিশির হয়ে ঝ'রে প’ড়ে আঙুলে, চুলে ও চিবুকের সরল নিসঙ্গতায় হতে পারতাম অন্তরঙ্গ উদাসিনতার ঘ্রান।
একটি ওষ্ঠের ফুল ছুঁয়ে থেকে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিয়েছি--- আমি তোমাকে বলতে পারতাম বৃক্ষ স্বভাবের কথা। পুষ্প, রেনু ও প্রজাপতির কথা।
কিছুই বলিনি আমার হাতের পেয়ালায় না, দ্রাক্ষার রস নয় ভরা ছিল মানুষের রক্ত। এতো মৃত্যু দিয়ে কেনা হচ্ছে সভ্যতার রঙিন শিখর! এতো ঘাম দিয়ে সভ্যতা সাজাচ্ছে তার মখমল চূড়া!
পেয়ালা উপচে পড়ে কষ্ট। তুমি পান করছো না কেন? কেন সব অনর্থক বেলুন উড়িয়ে হয়ে আছো নিমগ্ন পাথর?
তুমি পান করছো না কেন সাথী? উপচে পড়ছে নুয়ে পড়ছে সাহস। শেষ সীমানায় এসে পেছনে দেয়াল। গ্লাস উপচে পড়ছে--- তুমি পান করছো না কেন রাত্রি?? . **************** . সূচীতে . . .