যে যার সন্ধার কাছে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৬.৮.১৩৯৬ (৩০.১১.১৯৮৯), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
শেষমেশ যে যার সন্ধার কাছে ফিরে যায়, যে যার অন্ধকারের কাছে।
জীবনযাপন ঘিরে আছে এক বর্নময় খাঁচা, সোনালি স্বাধীনতার ডানা বেঁধে রাখে রঙিন শিকল--- শেষমেশ যে যার ক্ষত ও পচনের কাছে ফিরে যায়, যে যার ধংসস্তূপের কাছে।
বহু শ্রমে টেনে তোলা সমুদ্রের সুবিশাল মাছ প্রাপ্তির হাঙর যাকে দিয়ে গেছে হাড়ের চেহারা, শেষমেশ সেই সব কংকাল টেনে তোলে যে যার সমুদ্র থেকে, টেনে তোলে কর্পুর ও লোবানের ঘ্রান।
দরোজা খুলেই রাস্তায় পা রাখে কেউ কেউ দুয়োরে দাঁড়িয়ে দেখে নেয় চারপাশ। কারো কারো স্বপ্নের সিন্দুকে থাকে আজীবন-তালা আর কেউ ফলবান বৃক্ষের মতোন হয়ে উঠে বিপুল সমৃদ্ধ---
তবু শেষমেষ একটি নীলাভ প্রজাপতির জন্যেও যে যার স্মৃতির ফ্রেমে কষ্টকে বাঁধিয়ে রাখে।
হাত বাড়ালেই ফুটে থাকা রক্তিম গোলাপ--- তবু যে যার কাঁটার কাছে ফিরে যায় একদিন, একদিন যে যার নিসঙ্গতার কাছে। . **************** . সূচীতে . . .
অবচেতনের পথঘাট কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৯.১.১৩৯৫ (২.৫.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সোনালি জোস্না মাথার ভেতরে গড়ে তোলে বিস্তার। সবুজ ঘোড়ারা ঘুরেফিরে আসে নীল ঘোড়াদের কাছে, সাথে কতিপয় কাচুমাচু মুখ গোবেচারা খরগোশ, একে অপরের গায়ের সুবাসে শ্রেফ বুঁদ একাকার।
রাতের দেয়ালে লাল লেখাগুলো মুছে ফেলে যায় কারা! বুটের ডগায় হাসে স্বদেশের প্রাকৃতিক শ্যামলিমা। আর দুএকটি দলছুট শাদা দিগন্ত-কবুতর উড়ে যেতে চেয়ে দ্যাখে পায়ে বাঁধা প্রতারক শৃংখল।
তকমা সাঁটানো জলপাই রঙ গম্ভীর কুম্ভীর, সূর্যের দিকে পা দুখানি তুলে রয়েছে নির্বিকার। আর চুনোপুটি ত্রুটি ও ভ্রূকুটি এক হাঁড়িতেই রাঁধে। যারা খায় তারা ধন্য ধন্য, বাকিরা খাকি না, নাকি।
সহসা ঘূর্নি সবুজ ফেনায় গ্রাস কোরে চারিদিক--- উভয়ে খেচর আর উভচর মৈত্রীর পথ খোঁজে। সূর্য ভাগাড়ে জ্বাল দেয়া যতো তরল রঙের পিপে দিলো উল্টিয়ে নিখিলের এই নিকটবর্তী তীরে।
ধীরে ধীরে গাড় ঘুম নেমে এলো অবচেতনের তলে, তারপর রঙ, অবিরল রঙে দিগন্ত ভেসে যায়। একবার ভাবি শিশু হয়ে ধরি রঙের প্রান্তরেখা, স্মৃতিরা হা হা হা কড়া নেড়ে ওঠে ঠিক সবুজের নিচে।
পিচে ঘর্ষনে চাকায় হাঁকায় সর্বগ্রাসিনী থাবা, দেখি সড়কের চৌরাস্তায় ষোড়শীরা আছে ঝুলে উদ্বন্ধনে, লাল রঙগুলো কোথায় হারালো আজ? গম্বুজে কালো অচেনা কোকিল গেয়ে ওঠে কোন সুর?
লাটাই গুটাই, ফুটাই পাথরে প্রথাসিদ্ধির ফুল, আমার এখন ডানা মেলবার মুহূর্ত শেষতম। খুব সকালের আকাশের মতো অম্লান আমলকি।
আমি তো এখন গলিত রাতের সমস্ত কালি মেখে চিত হয়ে শুয়ে দেখবো দুপাশে রক্তের বেচা কেনা। কোটি কোটি শাদা পঙ্গপালের শেষহীন অভিযান, পার হয়ে যায় পৃথিবীর পথ, নদী, দেশ, লোকালয়।
ঝড়ো হাওয়া বয়---কে যে খুলেছিলো কবাট কখন জানি! ফেরা হয় নাই, দ্রাক্ষার রসে ঢাকা পড়েছিলো চোখ। দিগন্তে দেখি মিশেছে সকল আলোকিত রাজপথ, হেঁটে চলে যাবো। কে কি বোলেছিলো আজ আর মনে নেই।
লাল ফুলগুলো কোথাও দেখি না, রাত জেগে থাকে ঘুম, ঝড়ো বাতাসে কে রুমাল উড়াবে? ভালোবাসি তাকে, বাসি, স্মৃতিস্বপ্নের লাল ফুলগুলো তুলে দেবো তার হাতে--- ক্ষমা কোরে দিও, কে যে বোলেছিলো! কে যে বোলেছিলো! কবে? . **************** . সূচীতে . . .
আগুন ও বারুদের ভাষা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৬.১০.১৩৯৪ (৮.২.১৯৮৮), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রত্যেকবারই তুমি বন্দুক তুলছো আমার তৃষ্নার্ত হৃদপিণ্ড লক্ষ্য কোরে। গনতন্ত্রের মহান ভনিতায় ডুবে থেকে আমি কি এখনো পেতে দেবো আমার হৃদয়?
আমি জানি, সম্মিলিত মানুষের চেয়ে কখনোই বেশি নয় অস্ত্রের ক্ষমতা। আমি জানি, মিলিত মানুষ হচ্ছে পৃথিবীর প্রকৃত প্রকাশ--- তবু আর কতোবার ‘গনতন্ত্র মুক্তি পাক’ বুকে লিখে বুলেটের সামনে দাঁড়াবো? হৃদ্পিণ্ড ছিঁড়ে যাবে বারুদের ক্ষমাহীন বিষ।
আমি জানি, মিছিলে যাবার দিন আজ শেষ, (তবু এখনো মিছিল চলে ঝলোমলো রাজপথ জুড়ে) আমি জানি, গনজমায়েত আজ আর স্বৈরাচারের অনিবার্য আতংক নয়। (তবু আজো জমায়েত জ'মে ওঠে মিনারের পাদদেশে)
বদলে গিয়েছে দিন, বদলে গিয়েছে আজ প্রতিবাদের প্রসিদ্ধ ভাষা---
দক্ষিন সমুদ্রের মতো আজ আমাকে প্লাবন হতে দাও, হতে দাও অপ্রতিরোধ্য বিপুল টাইফুন। এখন আমাকে মুখোমুখি হতে দাও চিহ্নিত শক্রর, হাতে তুলে নিতে দাও সম্মিলিত মানুষের বিক্ষুদ্ধ হৃদয়, আর তার সঠিক প্রতীক---আগ্নেয়াস্ত্র।
বুলেটের বিরুদ্ধে আমাকে আজ হাতে তুলে নিতে দাও আগুন ও বারুদের ভাষা॥ . **************** . সূচীতে . . .
চিলেকোঠা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.১১.১৩৯৪ (২৭.২.১৯৮৮), মিঠেখালি মোংলা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নিচের সিঁড়িতে ভিড় সে ভিড়ের ভিতরে ছিলো। তার বুকে ছিলো উপরে ওঠ স্বপ্ন যে স্বপ্ন সবার। যেস্বপ্ন একজন শ্রমিকের যেস্বপ্ন একজন কেরানির যে স্বপ্ন একজন মিল মালিকের তারও সেই স্বপ্ন ছিলো স্বপ্ন সবারই থাকে।
সে একধাপ উপরে উঠলো--- আরো এক ধাপ। অনেকেই যেমন ওঠে, যেমন উঠতে পারে। যেমন উপরে ওঠে পাখি কিংবা মেঘ এ ঠিক তেমন নয়--- কিছুটা বৃক্ষের মতো কিছুটা বা মেয়েদের সাহসের মতো সে একটু বেড়ে উঠলো, এক ধাপ উপরে বাড়লো।
ডাইনে তাকালো সে যারা ছিলো অনেকেই নেই। বাঁয়ে তাকালো সে যারা কথা বলছিলো অনেকেই নেই। সে তখন নিচের সিঁড়িতে তাকালো কিছুটা আনন্দে, কিছুটা আশংকায়।
একটু আগেই যে তার শব্জি-প্রিয়তা নিয়ে ঠাট্টা কোরেছিলো, এখন সে জানতে চাইছে মানুষ আদৌ মৌলিক কিনা--- সে আবার উপরে তাকালো।
এরপর সে একটার পর একটা সিঁড়ি পার হতে থাকলো প্রতিবার সে ডাইনে তাকলো বাঁয়ে তাকালো আর তাকালো নিচেয়।
এখন উঠবার মতো আর সিঁড়ি নেই--- সে ডাইনে তাকালো---কেউ লেই সেখানে সে বাঁয়ে তাকালো---সেখানেও কেউ নেই সে তখন নিজের দিকে তাকালো দেখলো, আবার দেখলো।
চিত্রনাট্য ১ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১০.১.১৩৯০ (২৩.৪.১৯৮৩), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সে মাঝরাতে স্টিমার থেকে নামবে। সদরঘাটে। তার পরনে থাকবে মলিন আকাশি রঙের প্যান্ট, ধূসর জামা আর পায়ে থাকবে বাটা কোম্পানির চটি।
এক থোকা আমলকির মতো তার বুকে থাকবে এক থোকা মেঘ। শ্যামল স্বপ্ন। তার গা থেকে ধানের গন্ধ আসবে। উড়নচণ্ডি চুল থেকে আসবে লজ্জাবতী লতা আর ঘাসের গন্ধ। তার দৃষ্টি থাকবে এলোমেলো। কিছুটা উদাসিন। কোথাও যেন স্থির নয়--- কোন কিছুতেই। তার চিবুকে থাকবে প্রজাপতির ডানার গৌরব আর ঔদ্ধত্য।
এই মাঝরাতে সে উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে শুরু করবে। রাস্তার উপর দিয়ে সে হাঁটতে থাকবে। তার পায়ে বহুজাতিক কোম্পানির সিল মারা মলিন পাদুকা। এই মহানগরীতে সে বহিরাগত--- আগন্তুক। আমরা তাকে অনুসরন করতে থাকবো। কারন, আমরা জানতে চাইবো, বুঝতে চাইবো এই আগন্তুকের উদ্দেশ্যহীনে ভ্রমনের অর্থ।
যেহেতু তার চোখ ইতস্তত এবং বিক্ষিপ্ত যেহেতু তার পদক্ষেপ খুব বেশি দৃঢ় নয় যেহেতু তার মুখে এক ধরনের সরলতার ছায়া
যেহেতু তার কোন ভঙ্গিতেই চতুরতা প্রকাশ পায় না একারনেই আমরা তার ভ্রমনের আগে উদ্দেশ্যহীন শব্দটি ব্যবহার করবো। সে হাটতে থাকবে . . . .
আমাদের তাত্বিকবৃন্দের কেউ কেউ তাকে নিম্মমধ্যবিত্ত বোলে শনাক্ত করতে চাইবে, বাকিরা অন্য অভিধায়। তাত্বিকদের এই বিতর্ক ভীষন দীর্ঘ হতে থাকবে।
আমাদের নেতৃবৃন্দের ভেতর ইতিমধ্যে মতের পার্থক্য দ্যাখা দেবে। কেউ কেউ এই ভ্রমনকে বলতে চাইবে সাম্রাজ্যবাদের চত্রান্ত। কেউ বলবে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলতে চাইবে কেউ কেউ। কেউ বলতে চাইবে এটি বিপ্লবের অগ্রবাহিনীর প্রতীক। সে হাঁটতে থাকবে . . . .
অতপর আমাদের বিতর্ক সংঘর্ষে পরিনত হবে। এবং সংবাদপত্রের জন্য আমরা বিবৃতি খসড়া লিখতে শুরু করবো। আমাদের অস্ত্রধারী কর্মীগন পরস্পরেব দিকে পিস্তল তাক কোরে থাকবে। বাক্যহান--- সকলের চোখেমুখে ফুটে উঠবে অত্যাধুনিক ঘৃনা। সে হাঁটতে থাকবে। সে হাঁটতেই থাকবে . . . . . **************** . সূচীতে . . .
চিত্রনাট্য ২ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৯.৫.১৩৯৩ (১৩.৯.১৯৮৬), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়। কোনো এক সোমবার। সকাল দশটা বিশ। প্রচণ্ড বোমার শব্দে সবই চমকে তাকিয়ে দেখলো দুই দল তরুন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মারমুখি এলোমেলো ভঙ্গি। বিক্ষিপ্ত এবং সশস্ত্র একটি ছেলের শরীর ধোঁয়ার ভেতর ছিটকে উঠে টুকরো টুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন-আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মাটি মাংশ ধোঁয়া কোনোটাকে আর আলাদাভাবে চিনবার উপায় নেই।
তরুনটি মারা গেলো। রক্তাক্ত একটি চোখ তার কোটরের বাইরে ঝুলছে।
নিচের পাটির দাঁতগুলো উল্টে এসে পড়েছে ওই চোখটির কাছে। অন্য চোখটি। গোল একটি চোখ। রক্তাক্ত পলকহীন।
হলুদ থকথকে ঘিলু ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশে। জিন্সের প্যান্টের একটি ছেঁড়া টুকরোর সাথে একাকার হয়ে আছে এক টুকরো নরোম মল। অর্ধজীর্ন ভাত মাছ পাকস্থলি ফুটো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন একটি পড়ে থাকা পায়ের উরুসন্ধির মাংশ চমকে উঠার মতো থর থর কোরে কাঁপছে।
এগিয়ে আসা দর্শক তরুনদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি তার নিজন্ব বিস্ময় যথেষ্ট উচ্চস্বরে উচ্চারন করলো--- প্রথম : ছেলেটি মারা গেলো। দ্বিতীয় : মারা গেলো নয়---মারা হলো। তৃতীয় : এই ছেলেটি কেন মরলো?
দর্শকের বিস্ময় প্রকাশ আর প্রশ্নোত্তরের সময়টুকুর মধ্যে বোমার শব্দে উড়ে যাওয়া কাকগুলো কিরে আসতে শুরু করলো বিভিন্ন ডালে, দেয়ালে, ছাদে---
প্রথম : ছেলেটি কে? ছাত্র না বহিরাগত? দ্বিতীয় : মৃত্যুই কি তার যথেষ্ট পরিচয় নয়? তৃতীয় : আর কিছু না? শুধু মৃত্যু? মৃত্যুই মানুষের একমাত্র পরিচয়? দ্বিতীয় : হ্যাঁ মৃত্যুই মানুষের সর্বশেষ পরিচয়। মানুষ মরছে-বিষে, বোমায়, চাকুতে, বুলেটে ও বেয়োনেটে। এই সভ্যতায় মৃত্যু ছাড়া মানুষের অন্য কোনো পরিচয় নেই।
ইতিমধ্যে এ্যাম্বুলেন্স এসে পড়েছে ঘটনাস্থলে (সম্ভবত এটাই তাদের সবচেয়ে ত্বরিৎ আগমন) ভিড়ের জটলা ভেদ কোরে দুইজন স্বাস্থকর্মী ছিন্নভিন্ন লাশটিকে তুলে নিলো গাড়ির ভেতরে।
লাশকাটা ঘরে এখন তার জন্যে অপেক্ষা করছে একরাশ অবহেলা। ডোমের বীভৎস চাকু। কাটাছেঁড়া এবং সবশেষে মৃত্যুর কারন নির্দেশ করা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট---
রক্ত শীতল করা সাইরেন বাজিয়ে অবশেষে এ্যান্থুলেন্সটি চলতে শুরু করলো। পেছনে পড়ে থাকা রক্তের উপর
তখন একটি দুটি কোরে মাছি পড়তে শুরু কোরেছে। . **************** . সূচীতে . . .
স্বপ্নগুলো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২০.৯.১৩৯৪ (৩.১.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমাদের স্বপ্নগুলো এইভাবে ঠুকোরে ঠুকোরে খাবে কাক ও শকুন। আমাদের আকাংখারা মুখ থুবড়ে পড়বে জমকালে পিচের রাস্তায়। একাকি বান্ধবহীন আমাদের হৃদপিণ্ড জুড়ে ধ্বংসস্তূপ জমে উঠতে থাকবে ব্যাংকে সঞ্চিত টাকার মতো।
আমাদের চরমপন্থি ফুসফুসের জন্যে প্রয়োজন আজ একটু নির্মল বাতাসের ছোঁয়া, প্রয়োজন এক টুকরো সজীব ভালোবাসা। আমাদের সন্ত্রস্ত, সশস্ত্র মস্তিষ্কের জন্যে প্রয়োজন সামান্য আশ্রয়, অমলিন, একটু স্নেহের টোকা।
না আমাদের স্বপ্নকে, না সংবিধানকে আমরা কিছুই, কাউকেই বাঁচিয়ে রাখতে পারছি না। আমরা ধ'রে রাখতে পারছি না আমাদের সময়ের বেগবান স্রোতগুলো, স্বপ্নবান প্রানবন্ত আআগুলো--- কবরের সুবিশাল নির্জনতা আজ নেমে এসেছে এখানে, এই গ্রহে।
আমাদের স্বপ্নগুলো অপ্রচলিত পথে ছুটতে চায় তাই রক্তাক্ত তার পা, আঘাতে বিক্ষত দেহ, তবু সে ছুটছে--- প্রতারনাহীন আমাদের বিশ্বাসের বিক্ষুব্ধ আগুন, অন্ধকার পোড়াতে পারেনি বোলে আজ নিজেই সে নিজেকে পোড়ায়।
প্রলোভনহীন ভালোবাসা আমাদের প্রতিবার রক্তাক্ত হচ্ছে বিত্তের বিনাশী চাকায়। আমাদের রক্তস্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে পল্যুটেড পৃথিবীর ক্ষমাহীন বিষ,
এ্যালকোহল ঝাঁপিয়ে পড়ছে যকৃতে, নিরন্ন পাকস্থলিতে। নিকোটিনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে রক্ত প্রবাহিনী নালীগুলো। আমাদের স্বপ্নময় আন্দোলনগুলো বার বার বুটে ও বুলেটে, আপোষে ও ষড়যন্ত্রে ঝিমিয়ে পড়ছে।
শাদা একটি গোলাপ আমাদের অন্তর্গত স্বপ্ন, সমতার এক নীল আকাশের স্বপ্ন আমাদের, আমাদের স্বপ্ন শ্রমময় একটি দিনের, সম্মিলিত নৃত্য আর গানে উন্মাতাল একটি সন্ধার স্বপ্ন আমাদের, আমাদের স্বপ্ন এক প্রশান্ত নিদ্রার রাত---
অথচ কোথাও তার কনামাত্র ছায়া নেই, চিহ্ন নেই, স্বপ্নের সূচনা নেই এখনো কোথাও। আমাদের স্বপ্নগুলো ঠুকোরে ঠুকোরে খাচ্ছে কাক ও শকুন॥ . **************** . সূচীতে . . .
গ'লে যাচ্ছে মুহূর্ত, সময় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১১.৯.১৩৯৩ (২৫.১২.১৯৮৬), মোংলা বন্দর। “মৌলিক মুখোশ” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
খুলে নাও এইসব পোষাক আমার---কৃত্রিমতা, মাংসের উপরে এই ত্বক, এই সৌন্দর্য মোড়ক খুলে নাও দিনের শরীর থেকে রোদের ভূমিকা।
গলা পিচের মতোন গ'লে যাচ্ছে মুহূর্ত, সময়, গ'লে যাচ্ছে নারী আর শিশুদের অনাবিল বোধ, মানুষের মৌলিক বিশ্বাস গ'লে যাচ্ছে ভালোবাসা---
আমি ফেরাতে পারি না সভ্যতার অবিরল ক্ষতি, আত্মরমনের ক্লেদ, জলে ভাসা পুষ্পের সংসার, শিশুর মড়ক, আমি ফেরাতে পারি না মহামারি, ভ্রূন হত্যা, অন্ধকারে জ্বলজ্বোলে হননের হাত . . .
ক্ষমাহীন অক্ষমতা জ’মে জ’মে পাহাড় হয়েছে, পাহাড়ের পাদদেশে সোনারঙ আলস্যের ধান, আর কিছু দলছুট পরাজিত বিবর্ন মারিচ।
টুকরো টুকরো কোরে ছিঁড়ে ফ্যালো আমার চেতন, বিশ্বাসের স্থবির শরীর চাবুকে রক্তাক্ত কর, ক্ষুধার্ত সিংহের মুখে ছুঁড়ে দাও আমার আত্মাকে।
মানুষের মৌলিক মুখোশ আমি খুলতে পারি না, শুধু পুড়ে যেতে পারি, পুড়ে যাই, পোড়াই সৌরভ, রাতের আগুন এনে নিবেদিত সকাল পোড়াই॥ . **************** . সূচীতে . . .