কথা ছিলো সুবিনয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৯.২.১৩৯৮ (২৪.৫.১৯৯১), রাজাবাজার, ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। কথা ছিলো, বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বসবে না, চিত্রল তরুন হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।
কথা ছিলো, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম। নদীর চুলের রেখা ধ'রে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ, কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন।
অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল, রাখালের হাত দুটি বড়ো বেশি শীর্ন আর ক্ষীন, বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে ওঠে নাই---
কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো। একদিন বটবিরিক্ষির ছায়ার নিচে হবে সহজিয়া বাউলেরা, তাদের মায়াবী আঙুলের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়--- একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধ'রে বলবে : উদ্ধার পেয়েছি।
কথা ছিলো, বাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরন্য, জমিন, আমাদের পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল--- আজন্ম এ-জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার।
কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে। অথচ এখনো আদিবাসি পিতাদের শৃংখলিত জীবনের ধারাবাহিকতা কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।
মাতৃভূমি---খণ্ডিত দেহের পরে তার থাবা বোসিয়েছে, আর্য বনিকের হাত।
আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা, প্রশস্তি, বহিরাগত তস্কোরের নামে নানারঙ পতাকা ওড়ায়।
কথা ছিলো, “আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন”@, আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ন ফসলের মাঠ।
অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভুমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন॥
. *****************
@ - “আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বন্টন”-- আল মাহমুদ ০৯.০২,৯৮ রাজাবাজার ঢাকা . **************** . সূচীতে . . .
পথ ছাড়ো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৮.৮.১৩৯৭ (১২.১২.১৯৯০), রাজাবাজার, ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হট্ যাও বুড়োবৃন্দ, সরো, পথ ছেড়ে দাও আমাদের যেতে হবে দূরে। ঝামেলা পাকিয়ে দিচ্ছো, অনর্থক পেজগি লাগিয়ে দিয়ে ভাঙছো খোয়ারি, সরো, আমাদের যেতে হবে বহুপথ বহুদূরে হারানো হরিনপূর---
সেখানে অপেক্ষা কোরে আছে বাউল স্নিগ্ধ একতারা হাতে, সেইখানে পাখিদের জন্যে কোনো খাঁচা কেউ ভালোবেসে নির্মান কোরেনি। সেখানে নদীর নাম ভালোবাসা, তরূদের খোলামেলা ডাক নাম প্রেম, বিশ্বাস বন্ধুর মতো কাঁধে হাত রেখে হাঁটে, সেইখানে ফোটে শত ফুল।
এ্যালকোহলিক জিভ নেড়েচেড়ে, নাকে টেনে নস্যির নিরালা নেশা, মাছের চোখের মতো নিরুত্তাপ লেন্সে ঢাকা জোড়া চোখ নিরবে নাচিয়ে কি বোঝাতে চাইছো এখনো? সরো, হট্ যাও, একটুও পাকামো কোরো না। দেখেছি তো তোমাদের নাচানাচি এতোদিন, এবার থামাও, ক্ষ্যামা দাও।
রাত ঝ'রে গেছে, দিন মনেও রাখেনি কারো অনাবিল হৃদয়ের ঘান--- সভ্যতার বিষাক্ত নিশ্বাস লেগে মানুষ গুটিয়ে গেছে শামুকের মতো। এতো ছোটো হয়ে গেছে আজ মানুষের বিশাল হৃদয়। হায় এতো ছোটো, নিজের জন্যেও তার অবশিষ্ট এক ফোঁটা জাগা নেই নিজের হৃদয়ে!
জানি না কতোটা পথ গেলে পর ফিরে পাবো মুক্ত মাঠ, নির্মল হাওয়া--- . **************** . সূচীতে . . .
সাধারনের নিয়ম রীতি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪.৮.১৩৯৭ (১৮.১২.১৯৯০), রাজাবাজার, ঢাকা।“এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
দেখলাম জনতার রাজপথে প্রানবন্ত বিজয়ী জনতা, আনন্দমাখানো মৃত্যু আর শোক চেপে রাখা উল্লাসের হাসি। দেখলাম, কুশপুস্তলিকার দুর্বল অসহায় হাত কি রকম দ্রুত সম্মিলিত মানুষের উত্তোলিত হাতে হাতে ঘুরে ফেরে।
মিলিত মানুষ তার স্বপ্নসহ কি বিপুল অগাধ ক্ষমতা দেখলাম প্লাবনের কাছে কত অসহায় সুপ্রাচীন বট। ফুঁসে ওঠা জোস্নার কোটাল কতখানি অনায়াসে নিয়ে যায় বিশদ স্রোতের টানে খড়কুটো গেরস্থ সংসার--- দেখলাম।
বিচারের কথা কেউ বলছে না কেন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৭.১২.১৯৯০, রাজাবাজার, ঢাকা।“এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
বিচারের কথা কেউ বলছে না কেন আজো সুতীব্র ভাষায়? কোথায় লুকোলো তারা রক্তমাখা হাত নিয়ে কার হেফাজতে? খুনিরা কোথায়? রাজপথ দেখতে চাইছে নির্মোহ বিচার।
উড়ে এসে জুড়ে বসা একটি দশক ধরে হত্যা নিপীড়ন, শ্বাসরদ্ধ, কন্ঠরুদ্ধ, স্বেচ্ছাচারে কলংকিত পুরোটা সময়--- তসরুপ হরিলুটে যারা ছিলো ব্যতিব্যস্ত পেয়ারা গোলাম, ক্ষমতাকে বক্লেস আঁটা কুত্তার মতোন পেলে পুষে যারা এতোদিন কেড়ে খেলো পুরো ননিটুকু দুধের পুরোটা সর।
উন্নয়ন রাজনীতি চর্চা কোরে উন্নত কোরেছে য়ারা ক্যাশ, ব্যক্তিগত চেকনাই, লাবন্যশোবন মেদ স্বাস্থ্য সমাচার, কোথায় তাহারা? জনতা দেখতে চায় এর প্রকাশ্য বিচার।
মায়েদের চোখ ভেজা, এখনো বোনের মুখে কৃষ্নপক্ষ রাত, অনুজের রক্তের ভেতর পুড়ছে এখনো কোনো এক লরী, কোনো এক শুল্কহীন শ্রীমতী পাজেরো জিপ, দীন্তিময় ক্রলিং।
গাছের খেয়েছে সব, কুড়িয়েছে জেনে শুনে তলার পুরোটা, মিনারে প্রবল কন্ঠ, মধ্যরাতে ফিস ফিস প্রাসাদে প্রাসাদে পচা গলা ওইসব ফ্যাকাশে বীভৎস মুখ দেখতে চায় না, রাজপথ এখন দেখতে চায় তরতাজা তুমুল তীক্ষ্নতা, রাজপথ বিচার দেখতে চায় সততায় নিকশিত রায়।
এখনো মায়ের চোখ ভেজা, বোনেরা পাথর আর অনুজের রক্তের ভেতরে এক কুশপুত্তলিকা পুড়ছে এখনো, তার হাত থেকে জনতা নিয়েছে কেড়ে ক্ষমতার আশ্চর্য প্রদীপ। ইতিহাস বিকৃত কোরেছে যারা, তারা কই? কোথায় দস্যুরা?
অপরাধীদের জনতা দেখতে চায় কাঠগড়ায় এখন, বাহাত্তরের সে-ভুল ফের যেন এই দেশে আবার না ঘটে॥ . **************** . সূচীতে . . .
তোমাদের পাঠ্যক্রমে ছিলো না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তোমাদের হয়নি শুনতে দেয়া দশ লক্ষ মানুষের সমবেত কষ্ঠধ্বনি, তোমাদের হয়নি দেখতে দেয়া বাঙালির শ্রেষ্ঠ মানুষটিকেই।
কেবলি কুচক্রে আর মিথ্যাচারে, কেবলি প্রতারনায় ঢেকে আছে সুদীর্ঘ সময়, ভুল নায়কের মিথ্যে উজ্জ্বলতা, উৎকীর্ন ফলক-স্মৃতি, ভুল ইতিহাস লেপন কোরেছে কালি জাতির ললাটে।
তোমাকে জানতে দেয়া হয়নি তোমার পূর্বপুরুষের সুপ্রাচীন সভ্যতার কথা, কৃষিকর্মে সুনিপুন, শিল্পে সমাহিত আর সাগর বানিজ্যে ডিঙা সপ্ত মধুকর, এ-সব তোমার ছিলো কখনো জানতে দেয়া হয়নি তোমাকে---
তবু তুমি নিজেই এসেছো নেমে আজ মিছিলে সবার আগে, কাঁধে তুলে নিয়েছো বন্ধুর লাশ, অচেনা সাথির দেহ। প্লাবনের মতো ফিরে দাঁড়িয়েছো বুলেটের বিরুদ্ধে সবাই---
তোমাদের চোখ জুড়ে স্বাধীনতা শুধু এক স্বপ্ন হয়ে আছে, তোমাদের স্বপ্ন জুড়ে স্বাধীনতা আজো এক শব্দ হয়ে আছে। এমন কি তোমাদের দৈনন্দিন গৃহস্থালিতেও প্রতিদিন স্বাধীনতা নিগৃহীত বুড়ো বোকাদের বাজে তর্জনি হেলনে।
স্বাধীনতা মানুষের আজো এক অনলব্ধ অগাধ আকাংখা---
স্বাধীন মাটিতে জন্ম তোমার তরুন শোনিতে এনেছো ব'য়ে দুই হাজার বছর, তারো আগে নির্বেদ সময়, তোমার উত্থিত হাতে অনার্যের অন্তহীন লড়ায়ের স্মৃতি। তোমাকে জিততে হবে মনে রেখো ফেরার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে--- . **************** . সূচীতে . . .
পাখিদের কথা ভেবে ডানা মেলে দিই কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২১.৫.১৩৯৭ (৫.৯.১৯৯০), ধানমণ্ডি ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
১. সে সময় ছিলো, আজো সে সময় বড়ো বেশি সুসময়--- দু'চুমুক খাওয়া কফির পেয়ালা অপেক্ষা কোরে থাকে, দু'জনের হাতে কড়া সিগারেট পোড়ে জীবনের মতো, একটি টেবিলে দুই মহাদেশ মেলে ধরে পরিচয়।
আলো আর ছায়া ঘরখানা জুড়ে ওড়ে প্রজাপতি যেন, দুইটি নিরব উপস্থিতির যেন কোরে পরিমাপ। স্বপ্ন দ্যাখার পথ খুঁজে খুঁজে দুইজনে আসি ফিরে, দুইটি হৃদয়ে ভিন্ন ভাষায় স্বপ্নেরা বোনে বাসা।
যেন মাকড়শা, যেন বা তা জাল, আটকে ফেলতে চায়। বন্ধন মানে তবে কি শুধুই কারাগার শৃংখল? পাখির জীবন তবে কি সত্যি হবে না মানবপুরে? হবে না কখনো স্বাধীন, যেমন আদিম জীবনে ছিলো?
অর্ধেক খাওয়া কফির পেয়ালা অপেক্ষা কোরে থাকে, দু'আঙুলে জ্বোলে হাত বদলের চিরপবিত্র ধুন।
২. তারাদের সাথে কি কথা তোমার? নক্ষত্রের চোখে যে ছবি দেখবে, ছোঁবে যে প্রবল বাসনার বাঁকা স্রোত, তা কি শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে হবে না জীবনরেখা?
না-ও হতে পারে। কেন না বুঝেছি শুধু এ মাংস হাড়, এই ত্বক, জিভ, মানবীয় জট অন্ত্র, পাকস্থলি--- আছে এক গাঢ় গভীর আগুন, অথবা শীতল শিলা অভ্যন্তরে আছে স্মশানের অগ্নির মতো জেগে, প্রচুর নীরবে প্রকাশিত তার বিপুল চঞ্চলতা।
২ চা, না কফি, হাই? স্মৃতি, না স্বপ্ন, কোথায় মেলেছো পাখা? সুদূরের কোন পাহাড়বাসীর অবাক বাঁশির সুর টেনে নিয়ে যায় গৃহকোন থেকে, চোখে ভেসে ওঠে নীল, চোখে ভেসে ওঠে ঝলোমল নদী পাথর ছড়ানো কূলে।
শুয়ে আছে যেন সবুজ পাহাড়ে রেশমের মতো ঘাসে--- চোখে কি স্বপ্ন না স্মৃতির খুব গহনে তলিয়ে আছো? নাকি তুমি ওই পাহাড়ি বাঁশির সুর হয়ে গেছো নিজে! আমি শুয়ে আছি সবুজ পাহাড়ে রেশমের মতো ঘাসে।
৪. চা, না কফি, নাকি অবিরল এই স্বপ্ন-আরক পান? স্বপ্ন-নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা সন্ধার সীমানায় পাখি হতে চেয়ে আক্ষেপে পোড়ে মানবদেহের খাঁচা। খাঁচা খুলে যদি একবার ওড়া যেতো আকাশের নীলে! যদি ছোঁয়া যেতো নক্ষত্রের সোনালি আলোর দেহ!
৫. ছুঁয়ে দিলে যদি মনে হয় তারে শুধুই মাংস, ত্বক, শুধুই শরীর, শুধু এক বুনোউল্লাস মাখা তনু। যদি মনে হয় দেহের অতীত কিছু নেই কোনোখানে, দেহহীন কিছু কখনো মানুষ পায়নি নিজের কাছে।
বস্তুর সাথে মিশেছে শক্তি, পাথর এবং প্রান অনাদিকালের ধারায় কোরেছে নির্মান বিনিময়।
৬. বলা ভালো এরে উন্মোচনের প্রাথমিক সরলতা, পাখিদের কথা মনে রেখে ভাবা ভালো আকাসের রঙ। কেননা আকাশ চিরকাংখিত, চিরকাংখিত ডানা, কেটে গেছে ঘোর রৌদ্রের দিন ডানাহীন, প্রান্তরে।
তাহলে কি শুধু ছায়া খুঁজে ফেরা সৌর সীমানা জুড়ে! তাহলে কি শুধু বৃক্ষের ডাল বনে বনে খুঁজে ফেরা!
কেন ছায়া চাই? রৌদ্রের খুব মুখোমুখি যদি হই, যদি সূর্যের সোনালি শিখায় ঝলসায় এই ত্বক, সেই তো শোভন। তাই ফুটে থাকি সূর্যের বিপরীতে সূর্যমুখীর পাপড়ির মতো সুতীব্র অভিলাষ।
৭. চা, না কফি, না, না---এখন ওসবে নাগাল পাবে না খুঁজে, মগজের চৌরাস্তা এখন কোলাহলময় নদী। অন্য তৃষ্না কথা বোলে খুব রক্তের নির্জনে, অন্য হৃদয়, অন্য আঙুল, অন্য একটি চোখ তাকায় তুমুল চোখের ভেতর ভেতর-চোখের দিকে॥ . **************** . সূচীতে . . .
আমরা অনার্য কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৭.১২.১৩৯৪ (২০.৩.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমরা অনার্য---আজ এই কথা বলুক সবাই। বাঙালী না বাংলাদেশি, হিন্দু না বৌদ্ধ মুসলমান বন্ধ হোক এই সব অর্থহীন তর্কের প্যাঁচাল। আমরা অনার্য, আজ এই কথা বলুক সবাই---
আর্য নয়, ফিরিঙ্গি, মোঘল নয় পাহাড়ি পাঠান, আমরা অনার্য লোহু. এ-মাটিতে আদিম বসত। এই মাটি, জল, নদী, সমতল ও-চরের ভূমি সাক্ষী দেবে, বোলে দেবে আমাদের পরিচিত নাম। আমাদের শ্রমের ঘামের জলে এ-মাটি ভিজেছে--- সাক্ষী দেবে ঘাসফুল, ফসলের পোঁয়াতি আদল।
কৃষি,ভ্যতার আদি সোনালিমা পতাকা উড়িয়ে আমরাই বাজিয়েছিলাম স্নিগ্ধ জীবনের বাঁশি। সুষম বন্টন আর গ্লানিহীন শ্রমের সময় দিয়েছিলো আমাদের আনন্দের উন্মাতাল দিন।
আমরা দেখিনি আগে বৈষম্যের বৈদিক কুঠার, শোষনের কালো চাকা, ক্ষমাহীন করাল চাবুক, আমরা দেখিনি কোনো মানুষের রক্তমাখা দাঁত। শিল্পের নিমগ্ন তারে ছিলো রাখা শোভন আঙুল, আমাদের কন্ঠে ছিলো প্রাকৃতিক সুরের সৌরভ, আর ছিলো বুকজোড়া আদিগন্ত নগ্ন ভালোবাসা।
সুদূরে আঙুল তুলে তীর্থভূমি কে দ্যাখায় ওই? আমাদের তীর্থ আজো পরিপূর্ন ফসলের ক্ষেত, আমাদের ধর্ম আজো ফসলের সুষম বন্টন--- হোক তবে রুগ্ন এই ফসিল রাত্রির অবসান।
আমরা অনার্য, আজ এই কথা বলুক সবাই, টেবিলের তর্কগুলো গিলে ফ্যালো যার যতটুকু। জীবনের আনাচে কানাচে যারা বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়েছে বিভেদের রঙমাখা সোনালি বাতাস, তাদের বিপক্ষে হাত প্রতিবাদে হোক একত্রিত, আমরা অনার্য---আজ এই কথা বলুক সবাই।
আমাদের পেশী ছিলো, আজো আছে, বন্দি শস্যক্ষেত, ভ্রান্ত সব আইনের জালে বন্দি জিভ ও জবান। সনাতন পাকস্থলি অধিকাংশ অপূর্ন রয়েছে, আর খাদ্য জমে আছে কতিপয় তস্কোরের ঘরে, অকারনে অর্থহীন চর্বি মেদে ছেয়ে গেছে দেহ। কে তুমি শেখাতে চাও মানুষেক ভিন্ন বিভিন্নতা?
সামনে বাড়িয়ে হাত আঙুলের বৈষম্য দ্যাখাও? কে তুমি নাড়িয়ে জিভ অশ্বীকার করো সাম্য-গ্লোক? দাঁড়াও সমুদ্র তীরে, চেয়ে দ্যাখো জলের বিস্তার, তাকাও নীলিমা নীলে, দ্যাখো নীল বিশাল উপমা সম্মিলিত মানুষের, আর দ্যাখো বৈশাখের ঝড়--- তোমার বিকল্প তুমি, আর সব মহান ভনিতা।
যেখানে যাবার কথা ভেবেছিল গুহার মানুষ, যাইনি সেখানে, আজ সভ্যতার সিঁড়ি ভেঙে আমরা এসেছি এক আনবিক ব্রীজের উপর, ধংসের শ্বাপদ জিভ চারিপাশে লকলক জ্বোলে।
পাললিক মাটি, জল, অরন্য ও শস্যের সন্তান, তাকাও সূর্যের দিকে, শিখে নাও বিপুল দহন। আত্মার ভিতরে ফিরে জ্বোলে ওঠো রক্তের ভাষায়--- ভাসায় কে, মাটিতে শিকড় যার রয়েছে প্রোথিত! . **************** . সূচীতে . . .
কেন থাকে কোকিলের সম্মেলনে কিছু কিছু কাক? দেয়াল ভাঙ্গার দলে থাকে কেন দেয়াল নির্মতা? আজো দেখি তত্ত্বপ্রিয় অনর্থক টেবিল-তাত্ত্বিক মাঠের ভূমিকা নিয়ে দূরে বসে গলাবাজি কোরে।
রোদ্দুরে শুকোয় রক্ত, ধুয়ে যায় অকাল বৃষ্টিতে, জীবনের কোনো ক্ষত শুকোয় না কোনো রক্তপাত। জাতির ললাট জুড়ে যে বেদনা রচিত হয়েছে, কোন শুশ্রূষায় বলো আজ তাকে করবে মোচন?
ষড়যন্ত্রে গোপন কালো মেঘ চারপাশে আজ, বিধ্বস্ত হয়েছে দ্যাখো বিশ্বাসের সুগভীর ভিত। মিছিলের অগ্রভাগে যারা হাঁটে নিশ্চুপ গম্ভীর, বুলেটের সামনে তারা কখনো দাঁডায় না জানি--- তাদের রয়েছে ঘর সুসচ্চিত নরোম বিছানা, রয়েছেব বানিজ্য ব্যবসায় আধুনিক দ্রুতযান, এরা কি ভাঙতে চাবে কোনদিন বৈষম্যের খাঁচা?
শুধুমাত্র পাকস্থলি---আর সব শিকেয় উঠেছে এমন জীবনে যারা পুড়ে মরে সারাটি সময়, চারপাশে অন্ধকার নিয়ে যারা পাড়ি দেয় দিন--- কোথায় তাদের হাত? বুকজোড়া আক্রোর্শের ফনা? সম্মিলিত মানুষ কোথায়? কেড়ে নেবে যারা এই গুটিকয় সোনার চামচ, আর বনেদি দেয়াল ভেঙে দিয়ে একাকার কোরে দেবে---কোথায় মানুষ? বেহুলার ভেলা ভাসে সময়ের তুমুল তুফানে॥ . **************** . সূচীতে . . .
ধর্মান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ, ঘৃন্য চতুরতা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২৪.৮.১৩৯৫ (৮.১২.১৯৮৮), রাজাবাজার ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ, তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষতরা। জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে ক্রমশ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগের প্রকোপ।
একদার অন্ধকারে ধর্ম এনে দিয়েছিলো আলো, আজ তার কংকালের হাড় আর পচা মাংশগুলো ফেরি কোরে ফেরে কিছু স্বার্থান্বেষী ফাউল মানুষ--- সৃষ্টির অজানা অংশ পূর্ন কোরে গালগল্প দিয়ে। আফিম তবুও ভালো, ধর্ম সেতো হেমলক বিষ।
ধমান্ধের ধর্ম নেই, আছে লোভ ঘৃন্য চতুরতা, মানুষের পৃথিবীকে শতখণ্ডে বিভক্ত কোরেছে তারা টিকিয়ে রেখেছে শ্রেনীভেদ ঈশ্বরের নামে। ঈস্বরের নামে তারা অনাচার কোরেছে জায়েজ।
হা অন্ধতা! হা মূর্খামি! কতোদূর কোথায় ঈশ্বর! অজানা শক্তির নামে হত্যাযজ্ঞ কতো রক্তপাত, কতো যে নির্মম ঝড় বয়ে গেলো হাজার বছরে! কোন সেই বেহেস্তের হুর আর তহুরা শরাব? অন্তহীন যৌনাচারে নিমজ্জিত অনন্ত সময়? যার লোভে মানুষও হয়ে যায় পশুর অধম!
আর কোন দোজখ বা আছে এরচেয়ে ভয়াবহ? ক্ষুধার আগুন সে-কি হাবিয়ার চেয়ে খুব কম? সে-কি রৌরবের চেয়ে নম্র কোনো নরোম আগুন?
ইহকাল ভুলে যারা পরকালে মত্ত হয়ে আছে, চলে যাক তারা সব পরপারে বেহেস্তে তাদের। আমরা থাকবো এই পৃথিবীর মাটি জলে নীলে, দ্বন্দ্বময় সভ্যতার গতিশীল স্রোতের ধারায় আগামির স্বপ্নে মুগ্ধ বুনে যাবো সমতার বীজ॥ . **************** . সূচীতে . . .