কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
একই সাপের দুই মুখ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.১৩৯১ (১৪.১.১৯৮৫), রাজাবাজার ঢাকা।  “এক গ্লাস অন্ধকার”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

একতার লোহার বাসরে আজ ঢুকে গেছে
মনসার সাপ,
ছোবল দিয়েছে বুকে সৃতানালি বিরোধের ফনা।
আন্দোলন বেহুলার স্বপ্লাহত জীবনের মতো
থুবড়ে পড়েছে মুখ,
তৃতীয় বিশ্বের এই পাতানো খেলার মাঠে।

এইখানে মনসা ও চাঁদ বেনে একই স্বভাব,
একই মুদ্রার তারা এপিঠ ওপিঠ।
যে সব পুতুল নাচে এদেশের মঞ্চে মঞ্চে
মড়ক ও মিছিলের আগে,
তাদের সবার সুতো নাড়ে চাড়ে দূরে-বসা একই আঙুল।

নোখিন্দর-মানুষের বিষে নীল জীবন যখন
যন্ত্রনায় অসহ্য অস্থির ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়
মনসার সাপের উপর,
চাঁদ বেনে সামনে এগিয়ে আসে নিপুন মুখোশে।

না ডান, না বামকুল, কোনো কূলে কখনো ভেড়ে না,
বেহুলা-স্বপ্নেরা শুধু ভেসে যায় উদ্দেশ্যবিহীন---
কষ্টের ভেলায় চড়ে মৃত সর দীপ্ত লখিন্দর
দেখে যায় জীবনের বাঁকে বাঁকে নানান রঙের
সাজানো উজ্জ্বল সব প্রতারনা, ভুল ব্যাকরন।

এইখানে বিরোধী ও মসনদী একই সাপের দুই মুখ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পারলৌকিক মুলো
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৭.১০.১৩৯৬ (৯.২.১৯৯০), মিঠেখালি মোংলা।  “এক গ্লাস অন্ধকার”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

ঝুলিয়ে দিয়েছে সম্মুখে এক পারলৌকিক মুলো,
ভীতি ও লালসা নাকের ডগায় কেবলি উড়ায় ধুলো।

এইবার চোখে প'রে নাও কালো অন্ধত্বের ঠুলি,
যে যতো অন্ধ তার ততো বেশি বিশ্বাসী বোলে নাম।
বিশ্বাস করো, তাহলেই হবে, পেয়ে যাবে রোশনাই।

তর্ক কোরো না ইবলিশ তবে চড়বে তোমার কাঁধে,
মহৎ তারাই ধর্মের নামে যারা কোরে তেজারতি।
অন্যের কাঁধে চড়ে যারা বাঁচে পরগাছা তার নাম,
স্মরনীয় তারা, অনুসরনীয়---তাদের পেছনে ছোটো।

বিশ্বাস করো, তর্ক কোরো না, তাহলেই হবে সব,
ষোড়শী তরুনী, তহুরা শরাব, আরো যতো আশনাই।
সব পাবে শুধু বিশাস কোরে অন্ধ বানাও চোখ,
ইহকাল হোক ঝরঝরে পাবে পরকালে পুরোপুরি।

এখানে কষ্ট, অনাহার আর অন্যায়ে ঠাসা দিন,
এসবই মায়া, দুদিনের ঘর দুদিনের মুসাফিরি।
দুনিযাদারির ভুলে ফাও সব, মুছে দাও লেখাজোখা,
দুনিয়া মিথ্যা, পরকাল হলো সবচেয়ে বেশি খাঁটি।

বিশ্বাস করো, দেখছো যা সবি মিথ্যা এবং ফাঁকা,
যা কিছু দ্যাখোনি সত্যি সেসব বিশ্বাস করো --- চুপ্‌!
এই বিশ্বাসে চোখ দুটো খুলে ছুঁড়ে দাও ইহকালে,
আর মগজের সচেতন কোষে তালাচাবি এঁটে দাও।
এই তো শাবাস! এখনি তুমি প্রকৃত ঈমানদার॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাগেরহাট
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩১.৬.১৩৯৫ (১৬.১০.১৯৮৮), মোংলা বন্দর।  “এক গ্লাস অন্ধকার”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

বাঘের অথবা বাগানের হাট তা নিয়ে তর্ক আছে,
মানুষের হাতে আবাদ হয়েছে এই কথা চিরায়ত।
অরন্য আর পলিমাটি তীরে পাথরের কারুকাজ,
মেঝে, গম্বুজে, খিলানে, খুঁটিতে দূরাগত প্রস্তর,
বিস্মিত কোরে স্বাভাবিক মন, বিস্ময় জাগে বোধে

আর সে সুযোগে অতিলৌকিক কাহিনী গজায় ডানা,
মানুষের কাজ, অবদানগুলো রটে জ্বীনদের নামে॥

এক জ্বীন সে তো বেহেস্তি মিনা, আর কোনো জ্বীন আছে?
পিরামিড তবে কোন জ্বীনদের কাজের নিদর্শন?
অথবা কুতুব, চিনের দেয়াল কিংবা তাজমহল?
কোন জ্বীন এসে তৈরি কোরেছে বুড়িগঙ্গার সেতু?

পৃথিবীর সব নির্মানে মাখা শ্রমিকের তাজা ঘাম,
মানুষের মেধা, পেশীর সাহসে এই সভ্যতা গড়া।

এদেশের জ্বীন কেরুর বোতলে বন্দী হয়েছে সব॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নির্বিরোধ কৃষ্ণচূড়াপুর
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১১.৬.১৩৯৫ (২৬.৯.১৯৮৮), মোংলা বন্দর। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

যদি হাতে রাখি, আর না দিই ফেরত,
ভুলে রাখি সংগোপন সিন্দুকের মহলে---
তাহলে নিসর্গ জুড়ে শুরু হয় তুমুল মাতম,
জলোচ্ছাস ফুঁসে ওঠে, লকলকে জিভে তার
ধংশের সূচনা লেখা।

আর যদি ছেড়ে দেই, যদি বলি : নিয়ে যাও,
তোমাকে বিশ্বাস কোরে ফিরিয়ে দিলাম সব---
তবে ভূমিতে কম্পন উঠে ধসায় ভিতের মাটি,
ফাটলের শূন্যতায় ঝুলে থাকে ত্রিশঙ্কু সময়,
চেতনার মাংশখণ্ড কেটে নেয় কামোটের দাঁত।

ঠিক এ-রকম এক সন্ধার দরোজা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছি---

অথচ আমার লক্ষ্য স্থির।
আমাকে ফিরতে হবে নিসর্গের সর্বোত্তম প্রশান্ত উঠোনে,
আমাকে ফিরতে হবে নির্বিরোধ কৃষ্ণচূড়াপুর॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বপ্নগ্রস্ত / ফিরেছি স্বদেশে শ্রান্ত সিন্দাবাদ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩০.৫.১৩৯৭ (১৪.৯.১৯৯০), রাজাবাজার ঢাকা।  “এক গ্লাস অন্ধকার”  কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

ঘুমের ভেতরে জেগে উঠে দেখি ঘুমিয়েছি বহুখন।

যেন আরব্য রজনীর এক হাজার বছর শেষে
ফিরেছি স্বদেশে স্বজনের কাছে শ্রান্ত সিন্দাবাদ।
অথচ আমার ঘাড় থেকে আজো নামাতে পারিনি দ্যাখো
অন্ধ বধির দৈত্যটি ঘাড়ে চেপে আছে অবিকল

ঘুমের ভেতর এতোদিন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম হায়
এর মধ্যেই বদলে গিয়েছে পৃথিবীর প্রতিবেশ,
শেষ হয়ে গেছে বৃক্ষের দিন, পাখিদের সংসার।
মধ্যপ্রাচ্যে মঞ্চ সাজায় মানবিক অভিনয়---

এইভাবে যদি ঘুমের ভিতরে ঘুমিয়ে পড়েতে থাকি,
আর প্রতিদিন পাল্টাতে থাকে পরমানু অবয়ব,
আর প্রতিদিন বদলাতে থাকে মানুষের দাঁত-নোখ।
বাদলাতে থাকে শাহেরজাদীর গল্পের পটভূমি।

তবে নির্ঘাত তেলসংকটে ধরা খাবে তেলা-মাথা,
অতেলার তেল কখনো ছিলো না আঁতেলের অভিধানে।
আঁতেল মত্ত তেলের তত্ত্বে, তখ্‌তে তেরশ হাতি,
বগলের নিচে ছাতি নিয়ে ছাতি নামিয়ে এশিয়া হাঁটে।

ঘুমের ভেতর ঘুমিয়ে আবার স্বপ্ন দেখতে থাকি,
কী অবাক সেই স্বপ্নদৃশ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়ি।
এইভাবে ঘুমে স্বপ্নে ও ঘুমে ঘুম ও স্বপ্ন চলে,
অন্ধ বধির দৈত্যটি ঘাড়ে চেপে থাকে অবিকল।

বাবুদের দেখে কাবু অবস্থা হাই তোলে হাইফেন,
পূবের কাকটি পশ্চিমাটিকে ঠোঁট নেড়ে বলে---হ্যালো??

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৃষ্টির ভ্রূন দেখে / ছুঁয়ে আছি নশ্বর মাংশের দেহ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.১৩৯৬ (১৪.১.১৯৯০), রাজাবাজার ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? বাঁক পেরোলেই ঝর্না,
আর ঝর্না মানেই তোমার চুল, কালো জল।
থামলে যে? পাড় ধরে হেঁটে যেতে থাকি,
জানি না কি ফুল, তার নাম, তবে আছে
.                                অচেনা অনেক ফুল।
অচেনা ইচ্ছার মতো ফুটে থাকে বুকের বাগানে---
দাঁড়ালেই থেমে যাবে, ভালোবাসা হাঁটি চলো।

হাঁটতে হাঁটতে ভালোবাসা, চলমান স্মৃতি
হাঁটতে হাঁটতে কিশোরের গোলাপি মার্বেল
.                                কুড়িয়ে পাবার মতো সুখ
হাঁটতে হাঁটতে সুদূরের নিবিড় দিগন্ত,
যেন এগুলোই ছোঁয়া যাবে নরোম আঙুলে তার
.                                নিভৃতের দুঃখ কষ্ট,
নিরালোকে ফুটে থাকা সপ্নময় হৃদয়-গোলাপ।

আসলে তো পরস্পর পরস্পরের দিগন্তে দেখি মেঘ,
শস্যহীন হৃদয়ের জন্যে আশাবাদী হয়ে উঠি---
পরস্পরের দিগন্ত ছুঁতে চাই, ছুঁতে চাই
.                                দিগন্তের মেঘ।

হৃদয়-দিগন্ত ছুঁতে চেয়ে একদিন জেগে উঠে দেখি
ছুঁয়ে আছি পরস্পর আমাদের নশ্বর মাংশের দেহ॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এক গ্লাস অন্ধকার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.১৩৯৬ (১৪.১.১৯৯০), রাজাবাজার ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

এক গ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি।
শূন্যতার দিকে চোখ, শূন্যতা চোখের ভেতরও---
একগ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে একা বসে আছি।

বিলুপ্ত বনস্পতির ছায়া, বিলুপ্ত হরিন।
মৌসুমী পাখির ঝাঁক পালকের অন্তরালে
তুষারের গহন সৌরভ ব'য়ে আর আনে না এখন।

দৃশ্যমান প্রযুক্তির জটাজুটে অবরুদ্ধ কাল,
পুর্নিমার চাঁদ থেকে ঝ'রে পড়ে সোনালি অসুখ।
ডাক শুনে পেছনে তাকাই---কেউ নেই।
এক গ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি একা . . .

সমকালীন সুন্দরীগন অতিদ্রুত উঠে যাচ্ছে
.                                অভিজাত বেডরুমে,
মূল্যবান আসবাবপত্রের মতোন নির্বিকার।
সভ্যতা তাকিয়ে আছে তার অন্তর্গত ক্ষয়
.                        আর প্রশংসিত পচনের দিকে।

উজ্জলতার দিকে চোখ, চেয়ে আছি---
ডীপ ফ্রিজে হিমায়িতর কষ্টের পাশেই প্রলোভন,
অতৃপ্ত শরীরগুলো খুঁজে নিচ্ছে চোরাপথ---সেক্সড্রেন।

রুগ্নতার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা বিলাচ্ছে অপচয়---
মায়াবী আলোর নিচে চমৎকার হৈ চৈ, নীল রক্ত, নীল ছবি।

জেগে ওঠে একখণ্ড ধারালো ইস্পাত-চকচকে,
খুলির ভেতরে তার নড়াচড়া টের পাই শুধু!

ইতিমধ্যে ককটেলে ছিন্নভিন্ন পরিচয়, সম্পর্ক, পদবী---
উজ্জ্বলতার ভেতরে ফনা তুলে আর এক ভিন্ন অন্ধকার।
গ্লাসভর্তি অন্ধকার উল্টে দিই এই অন্ধকারে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খেলাধুলার সরল অংক
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.১০.১৩৯৬ (১০.২.১৯৯০), মিঠেখালি, মোংলা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

একবারও না হেরে তুমি সবটা জিততে চাও---
অথচ তোমার হাতে সবচেয়ে ছোট তাস, রঙ
একটাও নেই। নেই বাদশা বা বিবি, অধিনস্থ
নিতান্ত গোলাম কেউ, অন্য হাতে টেক্কার টক্কর।

প্রতিবার জিতে যেতে চাও তুমি প্রতিটি খেলায়,
মন্ত্রি নেই, নিহত ঘোড়ারা, একখানা মাত্র হাতি,
টলোমলো নৌকাখানা, ছত্রভঙ্গ ব'ড়ে সাধারন---
তবু তুমি জিতে যাচ্ছো, আমি শুধু হারছি, হারাচ্ছি।

হেরে যাচ্ছি---হাতে টেক্কা, বড়ো তাস, খেলতে পারিনি,
এক কোনে মন্ত্রী স্থির, সেনাদল নিরস্ত্র, নিশ্চল!
হেরে যাচ্ছি---ইনসুয়িং ভেঙে দিচ্ছে মধ্য স্ট্যাম্প, বেল
ফেলে দিচ্ছে ক্ষীপ্র কিপারের হাত, ব্যাট উঠছেনা।

ক্রমাগত হেরে যাচ্ছি, জিতছো তুমিই শুধু একা,
খৃষ্টপূর্বাব্দের কোনো এ্যারেনায় যেন হলো দ্যাখা---

মুখোমুখি, চোখে চোখ, বিন্দু বিন্দু ঘামের শিশির
আরক্তিম গালে ও কপালে, উড়ন্ত ডানার মতো
ভুরু, হাতে ঝলসাচ্ছে শেষ খেলা, জীবন বা মৃত্যু।

মুহূর্তে স্পর্শের খুব কাছাকাছি দুই জোড়া চোখ,
হৃদয়ের নিকটবর্তী হৃদয়, দুরু দুরু বুক,
নিশ্বাসের ঘ্রান পাচ্ছি, কেঁপে ওঠে তোমার দু'ঠোঁট---
“ভালোবাসি, মানব জনম সাক্ষী ভালোবাসি।” আমি
সমস্ত খেলায় এই একবার বিজয়ী হলাম॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তছনছ বিশ্বামিত্র
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

ধ্যান ভেঙে গিয়েছে আমার---
নিমগ্নতা ভেঙে গেছে খান খান আরশিমহল।

কে তুমি দাঁড়ালে এসে মানব মেনকা?
ছিড়ে গেলো নিমগ্ন সেতার,
তৃষ্ণা বাড়ালো দু'হাত শোনিতের নিভৃত শিকড়ে
জ্বলে উঠলো আগুন
ধারালো বর্ধিষ্ণু এক কোমল আগুন।

কে তুমি দাঁড়ালে এসে মানব-পিপাসা?
এক পশলায় ঝ'রে গেলো
দীর্ঘতম সঞ্চয়ের সবটুকু মেঘ,
তৃষ্নার্ত লালায় ধুয়ে গেলো চন্দনতিলক,
শুকনো ঠোঁটের মাটি ভিজে গেলো
বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে।

অসতর্ক লাঙলের ফলা ছিন্নভিন্ন কোরে দিলো
চাষযোগ্য সবটুকু জমি, জমির গভীর!
নিশব্দ তাণ্ডবে তছনছ হলো ত্বক,
ফুলের পাপড়িগুলো ঝ'রে ঝ'রে পড়লো মাটিতে।
নিভৃত গর্জনে ফুলে উঠলো সমুদ্র যেন,
অবিরাম ঢেউএর ঝাপটায় টলোমলো উপকূল,
লুটিয়ে পড়লো পাড় কোমল বসতি।

আর তুমি ঝড় শেষে ফিরে গেলে অচেনা কোথাও---
ধ্যানভ্রষ্ট বিশ্বামিত্র তছনছ নিজের আগুনে
একাকি পুড়ছি আমি এক দ্বৈত অনুশোচনায়॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রজাপতির স্বভাব
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.১৩৯৬ (১৪.১.১৯৯০), রাজাবাজার, ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

দুএকটি গোপন চুমুর স্মৃতি তুমিও লুকিয়ে রাখো,
কে না রাখে!
অথচ গর্বিত অস্বীকার মেখে যখন নিজেকে মেলে ধরো
তাকেও সুন্দর মনে হয়,
মনে হয় এই সে প্রথম ফুল, প্রথম প্রকাশ।

বিষন্ন কষ্টের ভাঁজ খুলে খুলে যখন লুটায়,
বিকেলের আলোর মতন হৃদয় যখন
খুব বেশি খোলামেলা হয়ে আছে,
তখন পাখির মতো একজোড়া ঠোঁট যদি ছুঁয়ে যায়
যদি পালকের মতো স্নেহময় একখানা হাত
মুছে দেয় চিবুকের বিষন্নতা---
তাতে কোনো দোষ নেই।
জানি, তারো প্রয়োজন আছে এই ভাঙাচোরা নষ্ট কাঠামোয়।

শুশ্রূষার সব দায় কাঁধে তুলে চিরকাল নিয়েছে নিসর্গ,
কেবল মানুষ তাকে সভ্যতার নাম কোরে সুদূরে ঠেলেছে।

মানুষেরই সম্পর্ক আজ শুধু সমূহ জটিল,
স্বরচিত জালে বন্দী মানুষের আত্মাটিতে
জমে ওঠে তাই এতো কোলাহল, অসহ্য চিৎকার।
খাঁচাকে ভাঙতে চেয়ে ভেঙে ফ্যালে নিজের কাঠামো---

বৃক্ষের বিরোধহীন হৃদয়কে বুকে তুলে নিই
পাখির ডানার স্বপ্ন মেখে নিই ইচ্ছার পালকে।
অজস্র সুন্দর ছুঁয়ে যদি শিখে ফেলি প্রজাপতির স্বভাব,
ফুলেরা কখনো জানি ধিক্কার দেবে না তাকে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর