নদীর ওপারে খাকে রোদ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২.১১.১৩৯৬ (১৪.২.১৯৯০), মিঠেখালি, মোংলা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
নদী পার হয়ে এসো, তা না হলে দ্যাখাই হবে না। খেয়ায় খোঁয়ারি ভাঙে স্বপ্নগ্রস্ত জলজ যুবক, সে তোমাকে নায়ে তুলে পৌঁছে দেবে পাললিক তীরে। তাকে দিও হৃদয়ের মতো লাল একটি গোলাপ---
এখনো ফাল্গুন এসে নাড়া দিয়ে যায়নি বাতাসে জলের চিতানো বুক অনাবিল, প্রশান্ত এখনো। ঢেউ ভেঙে সকলেই পাড়ি দিয়ে আসে না দরিয়া, স্বপ্নমগ্ন স্নিগ্ধ জলে কেউ কেউ পাড়ি দিতে চায়।
বেছে নিতে পারো এই তির তির শান্ত মুগ্ধ জল, তা না হলে দীর্ঘকাল প্লাবন ও তুফানের জন্যে প্রতীক্ষায় থেকে যাবে সুতনুকা তোমার বয়স।
এই পারে আমি এক মরমিয়া তরুর স্বভাব শিকড়ে শাখায় মেলে ধরে আছি ফুল ও ফসল, নদী পার হয়ে এসো প্রজাপতি---অথবা পেখম খুলে ফেলে সবুজ পাতার কাছে ফিরে চাও প্রেম।
এক নদী ব’য়ে যায়, অন্য নদী ভিতরে নিরব, কার জন্যে কোন নদী, কার খেয়া কোন ঘাটে বাঁধা জানাই হলো না আজো। শুধু নক্ষত্রের ঝ'রে পড়া দেখে দেখে রাত বাড়ে, বেলা যায়---অপেক্ষায় ঝ'রে পড়ে স্বপ্নময় চোখ।
হৃদয়ের সুগভীরে নীল এক ক্ষত পুষে রাখি, হাত তুলে ডাকি--- নদীটির ওই পারে থাকে রোদ থাকে সূর্য, মাঝখানে আশার কুয়াশা ঢাকা বহমান জল॥
শস্যের বিশ্বাস কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হে আমার ভিক্ষুকের হাত বাহু থেকে খ'সে পড়ো, করুনাসিক্ত জীবন হে আমার পরাজয় তুমি মৃত্যু হও তুমি খ’সে পড়ো শুকনো লতা।
শৃংখলে রদ্ধ মনন---পরাধীন আকাংখার ভাষা স্বদেশের রুগ্ন দেহে উল্লাসে মত্ত জীব---কুকুর---শকুন--- তাদের কলুষ হাত ধরে রাখে জাতির পতাকা!
হে আমার ব্যাধি---জরা জীর্নতা পাণ্ডুর বোধ, হে আমার প্রতারনা---কুগ্ন লোভের কালিমা---হে আমার ক্ষয় বিশ্বাস থেকে খ’সে পড়ো অনাবশ্যক হলুদ পাথর খ'সে পড়ো, মৃত্যু হও।
হে জীবনের যেটুকু ভগ্নস্তূপ ধ্বংস তুমি অপসৃত হও, এই ভূমে আরো এক নতুন নির্মান হবে শস্যের বিশ্বাসে। . **************** . সূচীতে . . .
আবরিত আশ্রয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রতিকুল প্লাবনে কি ভেসে যাবে মানুষের ধান! এইসব পাললিকা---এইসব শস্যের হাত কোনো বকুল-দরোজাকে খুলবে না স্পর্শে আঘাতে পরশের পাললিক তীব্রতায়! প্লাবনে কি ছিন্নমূল হারাবে সব ব্যাকুল প্রস্তুতি!
কোন নির্জন জানালার পাশে তোমার বেড়ে ওঠে প্রতীক্ষার বয়স! কোন বর্ষায়-কোন জোস্নায় অলস-আলতো চুলে উর্মিল উদাসীনতা মেখে নিজেতেই কেঁপে কেঁপে ওঠো, প্রথম চুম্বন, প্রথম স্পর্শের মতো। মাংসের মন্দিরে আরতির আয়োজনে দুলে উঠে চন্দন ফুলে সাজিয়েছি এই আজন্ম আচ্ছন্ন বেদী--- কোথায় প্রতিমা? কোন সব মুখের ভিড়ে লুকোনো মুখ, কোন অবয়ব ঢেকে আছে তারে কোন চোখ আড়াল কোরেছে তার আঁখি-নক্ষত্র!
শস্যের হাতে স্পর্শ করো জীবনের এইসব বিচ্ছিন্নতা, এইসব খণ্ডিত প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশায় গেঁথে দাো অমেয় সীবন। আর এ-সংশয়ে নয়---পাললিকা, এবার আশ্রয় হও ভীড়ের ভেতর থেকে হাত তুলে বলো মানুষ এই আমি তোমার উদ্ধার। . **************** . সূচীতে . . .
চিল-ডাকা নদীর কিনার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
তা হলে প্রস্তুত হও। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই চিল-ডাকা নদীর কিনারে, সেই শাদা শংখভোর, ভাটিয়ালি, একতারা, সিঁদুর আশ্রয়--- সে-আমার মুগ্ধপ্রান, সে-আমার হারানো হরিনপুর।
এই ভুল অরন্যের পথে-পথে এতোদিন কেটেছে জীবন, আমরা কি হারাইনি লালনের একতারা মাটির হৃদয় আমরা কি হারাইনি প্রিয় পথ, প্রিয়তম গ্রামের ঠিকানা? উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে এইভাবে কতোদূর যেতে চাও বলো!
জন্মপরিচয় নেই, জন্মের মাটি তো আছে--- সেই মাটি সত্য হোক, সেই দেহে সত্যাবদ্ধ আসুক পরান, আমাদের তীর্থ হোক অঘ্রানের শস্যপূর্ন ফসলের মাঠ।
তা হলে প্রস্তুত হও। অপর বেলার বাঁশি বেজে ওঠে দূরের তুফানে, চেতনায় যে-কুয়াশা গেড়ে আছে হলুদ শিকড় আজ তাকে খুলে ফেলো, খুলে ফেলো রুগ্ন শাখা, বিষন্ন বাকল
আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই চিল-ডাকা নদীর কিনারে . . . . **************** . সূচীতে . . .
জেব্রাক্রোধ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রত্যেকের কিছু সৌভাগ্য থাকে, কিছু পাওয়া থাকে, প্রত্যকের কিছু স্নিগ্ধ সোনালি রোদমাখা সকাল থাকে, যার কাছে দ্বিধাহীন ফিরে গিয়ে নিজেকেও খণ্ড খণ্ড কোরে খুলে রাখা যায়,
যার মাঝে অনায়াসে খেলা করা চলে ভাসমান নিশ্চিন্ত হাঁস, পালকের ফাঁকে ফাঁকে অন্তরঙ্গ জলের মতো।
প্রত্যেকের বুকের নিভৃতে কিছু দগ্ধ ক্ষত থাকে লুকোনো, কিছু অসম্পপূর্ন নির্মান, ভাঙাচোরা গেরস্থালি ঘরদোর, প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু নিদ্রাহীন রাত্রি থাকে যাকে চিরদিন নষ্ট নোখের মতো রেখে দিতে হয় কোমল অনিচ্ছার বাগানে যাকে শুধু লুকিয়ে রাখাতেই সুখ, নিজের নিভৃতে রেখে গোপন পোড়াতেই একান্ত পাওয়া।
অভ্যন্তরে কিছু না পাওয়া থাকে অভিমানে দ্বিধায় কিছু ডোরাকাটা জেব্রা ক্রোধে নিশ্চুপ আত্মহনন, অত্যন্তরে কিছু নিঃসংগতা থেকে যায় অনন্ত অবধি--- আকাশের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে মেঘের কবুতর, করতলে চিবুকের ভালোবাসা রেখে একজন থেকে যায় অচেতন ঘুমে, এই সূর্যের সমস্ত বয়র্সে তাকে কোনোদিন জাগানো যাবে না, মাটির মতো নিঃশব্দে জেগে থেকে তার চোখ দেখবে সকল কিছু।
প্রত্যেকেরই কিছু সৌভাগ্য থাকে, কিছু দগ্ধ ক্ষত থাকে বুকের নিভৃতে--- আমার ভেতরে আছে একখণ্ড ক্রোধ---অভিমানে ভেজা প্রেম অমিতাভ সবুজ ঘাতক॥ . **************** . সূচীতে . . .