কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
নদীর ওপারে খাকে রোদ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২.১১.১৩৯৬ (১৪.২.১৯৯০), মিঠেখালি, মোংলা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

নদী পার হয়ে এসো, তা না হলে দ্যাখাই হবে না।
খেয়ায় খোঁয়ারি ভাঙে স্বপ্নগ্রস্ত জলজ যুবক,
সে তোমাকে নায়ে তুলে পৌঁছে দেবে পাললিক তীরে।
তাকে দিও হৃদয়ের মতো লাল একটি গোলাপ---

এখনো ফাল্গুন এসে নাড়া দিয়ে যায়নি বাতাসে
জলের চিতানো বুক অনাবিল, প্রশান্ত এখনো।
ঢেউ ভেঙে সকলেই পাড়ি দিয়ে আসে না দরিয়া,
স্বপ্নমগ্ন স্নিগ্ধ জলে কেউ কেউ পাড়ি দিতে চায়।

বেছে নিতে পারো এই তির তির শান্ত মুগ্ধ জল,
তা না হলে দীর্ঘকাল প্লাবন ও তুফানের জন্যে
প্রতীক্ষায় থেকে যাবে সুতনুকা তোমার বয়স।

এই পারে আমি এক মরমিয়া তরুর স্বভাব
শিকড়ে শাখায় মেলে ধরে আছি ফুল ও ফসল,
নদী পার হয়ে এসো প্রজাপতি---অথবা পেখম
খুলে ফেলে সবুজ পাতার কাছে ফিরে চাও প্রেম।

এক নদী ব’য়ে যায়, অন্য নদী ভিতরে নিরব,
কার জন্যে কোন নদী, কার খেয়া কোন ঘাটে বাঁধা
জানাই হলো না আজো।
শুধু নক্ষত্রের ঝ'রে পড়া দেখে দেখে রাত বাড়ে,
বেলা যায়---অপেক্ষায় ঝ'রে পড়ে স্বপ্নময় চোখ।

হৃদয়ের সুগভীরে নীল এক ক্ষত পুষে রাখি,
হাত তুলে ডাকি---
নদীটির ওই পারে থাকে রোদ থাকে সূর্য,
মাঝখানে আশার কুয়াশা ঢাকা বহমান জল॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কুড়িয়ে পেয়েছি একটি আধুলি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৬.১০.১৩৯৬ (১৫.১.১৯৯০), মিঠেখালি, মোংলা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

কুড়িয়ে পেয়েছি একটি আধুলি, আর অর্ধেক পেলে,
হাতল আঁকড়ে উঠে যেতে পারি, দুঃস্বপ্নের মেলে।

সকলেই শুধু নেমে যেতে চায় যে কোনো ইস্টিশনে---
ভুল ট্রেনে উঠে অনুশোচনায় হয়ে ওঠে মৃত মাছ,
যেন না জেনেই উঠেছে তারা এ অনাকাংখিত ট্রেনে।

কেউ দম্পতি, স্বপ্ন মাখানো অনাবিল মুখখানা
দুমড়ে মুচড়ে হয়েছে এখন ভয়াবহ কদাকার,
যেন মাতালের সামনে পড়েছে মধ্যরাতের থানা।

কারা যে কি ভেবে উঠে পড়েছিলো কারো আজ মনে নেই,
সৌভাগ্যের দূর-যাত্রায় স্বপ্নের মরীচিকা
টেনে এনেছিলো হয়তো এদের---আজ হারিয়েছে খেই।

অথচ আমার এই ট্রেনটিতে উঠতেই হবে, বুঝি,
একটি আধুলি কুড়িয়ে পেয়েছি, বাকি অর্ধেক খুঁজি।

যে আছে আলোয়, আছে তার রাতে ফেরার সম্ভাবনা,
আছে যে আঁধারে, তার সামনেই উজ্জ্বল আলোময়
ফুটে উঠবার অপেক্ষা নিয়ে রয়েছে রোদের কনা।

পেয়েছে যে তার হারাবার ছাড়া কোনো ভয় নেই আর,
যে পায়নি তার কেবলি রয়েছে পাবার দুর্ভাবনা
হারাবার নেই। রোদের উল্টো পিঠেই অন্ধকার।

এড়িয়ে যাবার প্রশ্ন আসে না, ভেবেই ছেড়েছি বাড়ি
দুঃস্বপ্নের শেষে আছে জানি স্বপ্নিল বেলাভূমি,
যতোদুর হোক সোনালি আকাশ, দিয়ে যাব পথ পাড়ি।

কুড়িয়ে পেয়েছি একটি আধুলি বাকি অর্ধেক পাবো?
হাতল আঁকড়ে উঠতেই হবে, এই ট্রেনে আমি যাবো॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত মাছেদের শরীরের খোঁজে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১২.১১.১৩৯৬ (২৪.২.১৯৯০), রাজাবাজার, ঢাকা। “এক গ্লাস অন্ধকার” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

দাঁড়িয়ে তোমাকে থাকতেই হবে এ-গাড় দুঃসময়ে।

এলিয়ে পড়তে চাইবে শরীর আলস্য-সন্ত্রাসে,
চোখের সামনে চমকাবে এসে বিবমিষা-তরবারি,
দোজখের ঝানু দারোগা তোমাকে দ্যাখাতে চাইবে পথ---
দাঁড়িয়ে তোমাকে থাকতেই হবে প্লাবনের দিকে ফিরে।

পাতা ঝ'রে যাবে, ফুল ফুটবে না, শিকড়ে শুকোবে জল,
এলোমেলো পায়ে শিশু হাঁটবে না, আলো জ্বলবে না ঘরে।
ঘোলাটে কুয়াশা জাল মেলে দেবে মগজের কোষে কোষে।

পুষ্টিহীনতা ঝাঁপিয়ে পড়বে সফেন নদীর দেহে,
দুইকূলে জেগে উঠবে বিষদ শূন্যতা-বালুচর।
স্রোত থেমে যাবে, পথ বদলাবে অতিথি পাখির ঝাঁক
মৃত মাছেদের শরীরের খোঁজে আসবে মাছি ও কাক।

আবেগে বাড়ানো বন্ধুর হাতে অবিশ্বাসের চাকু

দেখবে শোভন মুখোশের নিচে এক জোড়া বিষ দাঁত।
আঁধারের পোকা কুরে কুরে খাবে মাংশ, মজ্জা, ঘিলু,
সুদীর্ঘ রাতে কাছে থাকবে না প্রিয় আগুনের আলো---

দাঁড়িয়ে তোমাকে থাকতেই হবে তবু এ-দুঃসময়ে,

পাতা ঝ'রে যাবে, শিশু হাসবে না, নদী ঢেকে যাবে চরে,
মৃত মাছেদের শরীরের খোঁজে মাছিরা আসবে ঘরে॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাঝের দেয়াল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

ধুলোরা জমবে করোটির হাড়ে
নির্মম রাত ভাসাবে আধারে,
নগ্ন জীবনে পচনে পতনে পিপাসা পরাবে পুষ্পহীনতা

বকুল-সকাল খুলে নিয়ে যায়
সূর্যের ঘর, কালো দরোজায়
হাত রেখে বলি, বুকের দুয়ারে করাঘাতে বলি, সূর্য আসুক
ভালো না বাসুক---তবু ক্ষতি নেই, আর্দ্রতা যাক, আন্ধার যাক।

ফুল দিয়ে কারা ঢেকেছে ক্ষুধাকে,
জন্ম লিখেছে কালো মৃত্যুতে---
মাঝের দেয়াল জানে তার সব, কতো ব্যবধান, কতোটুকু দূর
কেন বাঁশি-সুর বাজেনি তাদের গৃহের গুহায় জোস্নার রাতে।

রক্তের দাগ দেখেছে কবিতা
চোখ জুড়ে তাই এতো নীরবতা,
এতো প্রতিবাদ পরতে পরতে জমে ওঠে যেন পাললিক মাটি,
শত্রর ঘাঁটি জনতা চিনেছে, চিনেছে কি ভুল রাজার ভূমিকা?

বিষাদ আসুক বেদনায় বিষে
পরাজয় যাক রক্ততে মিশে,
বাহুতে বক্ষে নেমে এসো ঋজু প্রজ্ঞা-সবল তাজা প্রতিরোধ,
ভেঙে দাও কালো শ্রেনী ব্যবধানে
কলুষিত বোধ নষ্ট হৃদয়,
প্রতারক ক্ষয় নির্মূল হোক সুস্থ রোদের সবল আঘাতে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শস্যের বিশ্বাস
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

হে আমার ভিক্ষুকের হাত বাহু থেকে খ'সে পড়ো,
করুনাসিক্ত জীবন হে আমার পরাজয় তুমি মৃত্যু হও
তুমি খ’সে পড়ো শুকনো লতা।

চারিদিকে এতো বেশি বন্যজীবন যাপন---
গৃহপালিত স্বভাব---এতোবেশি প্রভুভক্ত কুকুরের সুখ!
কোথায় উদ্ধার বলো, কোথায় শোভন সুস্থ মমতার রাখি?

শৃংখলে রদ্ধ মনন---পরাধীন আকাংখার ভাষা
স্বদেশের রুগ্ন দেহে উল্লাসে মত্ত জীব---কুকুর---শকুন---
তাদের কলুষ হাত ধরে রাখে জাতির পতাকা!

হে আমার ব্যাধি---জরা জীর্নতা পাণ্ডুর বোধ,
হে আমার প্রতারনা---কুগ্ন লোভের কালিমা---হে আমার ক্ষয়
বিশ্বাস থেকে খ’সে পড়ো অনাবশ্যক হলুদ পাথর
খ'সে পড়ো, মৃত্যু হও।

হে জীবনের যেটুকু ভগ্নস্তূপ ধ্বংস তুমি অপসৃত হও,
এই ভূমে আরো এক নতুন নির্মান হবে শস্যের বিশ্বাসে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আবরিত আশ্রয়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

প্রতিকুল প্লাবনে কি ভেসে যাবে মানুষের ধান!
এইসব পাললিকা---এইসব শস্যের হাত
কোনো বকুল-দরোজাকে খুলবে না স্পর্শে আঘাতে
পরশের পাললিক তীব্রতায়!
প্লাবনে কি ছিন্নমূল হারাবে সব ব্যাকুল প্রস্তুতি!

কোন নির্জন জানালার পাশে তোমার বেড়ে ওঠে প্রতীক্ষার বয়স!
কোন বর্ষায়-কোন জোস্নায় অলস-আলতো চুলে
উর্মিল উদাসীনতা মেখে নিজেতেই কেঁপে কেঁপে ওঠো,
প্রথম চুম্বন, প্রথম স্পর্শের মতো।
মাংসের মন্দিরে আরতির আয়োজনে দুলে উঠে
চন্দন ফুলে সাজিয়েছি এই আজন্ম আচ্ছন্ন বেদী---
কোথায় প্রতিমা?
কোন সব মুখের ভিড়ে লুকোনো মুখ, কোন অবয়ব ঢেকে আছে তারে
কোন চোখ আড়াল কোরেছে তার আঁখি-নক্ষত্র!

নিরাশ্রয় এই বাসন্তী বিক্ষোভ ভেসে যাবে প্লাবনে বাতাসে
সময়ের গণ্ডার এসে ছিঁড়ে খাবে শস্যসুলভ বৃক্ষ, পাখিদের,
মর্মে তনুতে তবু অঘ্রান বাড়ে, সঞ্চয় বাড়ে বিশ্বাসী বুননে।

শস্যের হাতে স্পর্শ করো জীবনের এইসব বিচ্ছিন্নতা,
এইসব খণ্ডিত প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশায় গেঁথে দাো অমেয় সীবন।
আর এ-সংশয়ে নয়---পাললিকা, এবার আশ্রয় হও
ভীড়ের ভেতর থেকে হাত তুলে বলো মানুষ
এই আমি তোমার উদ্ধার।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পাললিক উদ্ধার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আমাদের বাসনায় ছিলো কিছু ভুলবোধ
প্রাপ্যের পূর্নতা তাই এতো মনে হয়
নিঃস্ব করুন
তাই এত পাওয়াকেও মনে হয় ব্যর্থতা, মনে হয় স্লান।

ক্ষমা হও---ক্ষমা হও দুর্দিনে দুঃসময়ে
সুশোভিত হৃদয়ের যতোটুকু পারো তবু
থামাও যাতনা,
নির্মল রোদ দিয়ে ধুয়ে নাও বেঁচে থাকা মলিন জীবন।

জনপদে জেগে থাকে যে-উদাসী মানুষেরা
যে-বাউল বনভূমি খুলে রাখে অন্তর
নিবিড় মাটিতে,
তার কাছে নতজানু গুল্মের মতো বলো : ক্ষমা দাও প্রানে,
হে উদাস অপরূপ, আমার এ-বুকে দাও শোভন মমতা।

নির্মম নোখ জুড়ে কি ভীষন কালো লোভ
আমাদের বুক জুড়ে কি করুন শূন্যতা,
নিজেতে তাকাও

অবিনয়, চেয়ে দ্যাখো কি রকম পচা ক্ষত শরীরে তোমার,
'কি রকম বিষাক্ত ঘৃনাবোধ ঢেকে আছে অমল হৃদয়।

বৃক্ষের কাছে যাও, পাখিদের কাছে যাও
পাহাড়ের কাছে গিয়ে প্রান খুলে বল তারে :
ওগে প্রশান্তি!

আমাদের দাও কিছু দ্বিধাহীন মমতার কোমল ক্ষমতা,
বুকে কিছু ক্ষমা দাও, গ্লানিহীন দাও কিছু মানবিক প্রেম।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চিল-ডাকা নদীর কিনার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

তা হলে প্রস্তুত হও।
আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই চিল-ডাকা নদীর কিনারে,
সেই শাদা শংখভোর, ভাটিয়ালি, একতারা, সিঁদুর আশ্রয়---
সে-আমার মুগ্ধপ্রান, সে-আমার হারানো হরিনপুর।

এই ভুল অরন্যের পথে-পথে এতোদিন কেটেছে জীবন,
আমরা কি হারাইনি লালনের একতারা মাটির হৃদয়
আমরা কি হারাইনি প্রিয় পথ, প্রিয়তম গ্রামের ঠিকানা?
উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে এইভাবে কতোদূর যেতে চাও বলো!

জন্মপরিচয় নেই, জন্মের মাটি তো আছে---
সেই মাটি সত্য হোক, সেই দেহে সত্যাবদ্ধ আসুক পরান,
আমাদের তীর্থ হোক অঘ্রানের শস্যপূর্ন ফসলের মাঠ।

তা হলে প্রস্তুত হও।
অপর বেলার বাঁশি বেজে ওঠে দূরের তুফানে,
চেতনায় যে-কুয়াশা গেড়ে আছে হলুদ শিকড়
আজ তাকে খুলে ফেলো, খুলে ফেলো রুগ্ন শাখা, বিষন্ন বাকল

আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই চিল-ডাকা নদীর কিনারে . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আশ্রয়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

তোমার করতলের পরে ক্লান্তিটুকু রাখি
রাখি আমার অক্ষমতাগুলো।

আমার যা-সব সুখের কানাকড়ি
বিপুল-শিখা মেধার সোনাদানা,
আমার যা-সব সফল কারুকাজ
অন্যেরা তা পাক---
তুমি আমার ক্লান্তিমাখা ব্যর্থতাটুকু রাখো।

ছিনিয়ে আনা রোদের সমারোহে
মগ্ন হবে রুগ্ন মানুষেরা।
ওরা সবাই শস্যকনা নেবে?
তুমি আমার লাঙল-চেরা মৃত্তিকাকে রেখো।

প্রথিবী চায় সকল সফলাতা,
পৃথিবী চায় সফল বানীটিরে।
যে-অমা তার বক্ষ চিরে জ্বালে
স্বপ্নমাখা সিখের শিখাখানি
তুমি আমার সেই অমাটুক স্নেহের চোখে রাখো।

আমার গৌরবের সাথি নিখিল জুড়ে আছে,
ব্যর্থ রাতে গ্লানির সাথি তুমি---
তোমার প্রিয় ছায়ার তলে ক্লান্তিটুকু রাখি, রাখি আমার
বিষন্নতাগুলো।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জেব্রাক্রোধ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

প্রত্যেকের কিছু সৌভাগ্য থাকে, কিছু পাওয়া থাকে,
প্রত্যকের কিছু স্নিগ্ধ সোনালি রোদমাখা সকাল থাকে,
যার কাছে দ্বিধাহীন ফিরে গিয়ে নিজেকেও খণ্ড খণ্ড কোরে
খুলে রাখা যায়,

যার মাঝে অনায়াসে খেলা করা চলে ভাসমান নিশ্চিন্ত হাঁস,
পালকের ফাঁকে ফাঁকে অন্তরঙ্গ জলের মতো।

প্রত্যেকের বুকের নিভৃতে কিছু দগ্ধ ক্ষত থাকে লুকোনো,
কিছু অসম্পপূর্ন নির্মান, ভাঙাচোরা গেরস্থালি ঘরদোর,
প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু নিদ্রাহীন রাত্রি থাকে
যাকে চিরদিন নষ্ট নোখের মতো রেখে দিতে হয় কোমল অনিচ্ছার বাগানে
যাকে শুধু লুকিয়ে রাখাতেই সুখ, নিজের নিভৃতে রেখে
গোপন পোড়াতেই একান্ত পাওয়া।

অভ্যন্তরে কিছু না পাওয়া থাকে অভিমানে দ্বিধায়
কিছু ডোরাকাটা জেব্রা ক্রোধে নিশ্চুপ আত্মহনন,
অত্যন্তরে কিছু নিঃসংগতা থেকে যায় অনন্ত অবধি---
আকাশের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে মেঘের কবুতর,
করতলে চিবুকের ভালোবাসা রেখে একজন থেকে যায় অচেতন ঘুমে,
এই সূর্যের সমস্ত বয়র্সে তাকে কোনোদিন জাগানো যাবে না,
মাটির মতো নিঃশব্দে জেগে থেকে তার চোখ দেখবে সকল কিছু।

প্রত্যেকেরই কিছু সৌভাগ্য থাকে, কিছু দগ্ধ ক্ষত থাকে বুকের নিভৃতে---
আমার ভেতরে আছে একখণ্ড ক্রোধ---অভিমানে ভেজা প্রেম
অমিতাভ সবুজ ঘাতক॥

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর