ঝরাপাতা তুষের আগুন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
অর্ধেক জীবন গেলো ঝরাপাতা তুষের আগুনে। জীবনের ক্ষত-মাংসে উড়ে আসে লুব্ধ মাছি, কালো কীট কুরে খায়, কুরে কুরে খায়--- আমি তবু পচনের এই পুঁজ বুকে রেখে জেগে থাকি কেন?
আমিও কি রুগ্ন পাতা? তবে আমিও কি নষ্ট দেহ জীবনের মাটি থেকে ছিঁড়ে আনা ছিন্নমূল বৃক্ষ শিশু? অর্ধেক জীবন গেলো---হায় আমিও কি ঝরাপাতা তবে আমিও কি ব্যর্থপ্রান যোজন যোজন জুড়ে প'ড়ে থাকা বালুচর, নদীর কফিন!
প্রসন্ন আলোর দিকে যে-হৃদয় রয়েছে তাকিয়ে, যে-হাত পাথর কাটে আঁধারের, বোনে বীজ নতুন ফসল তারাও কি ব্যর্থ তবে, তারাও কি জীবনের ব্যর্থ রক্তপাত! হে বিশ্বাস-হেম, তরে আমিও কি ব্যর্থগান, বিফল বাসনা?
এ-কেমন মৃত্যুময় শ্মশানজীবন! হৃদয়ের রক্ত, ঘাম, ধুলোবালি মুছে শুধু প্রহর ফুরোয়, বিষন্ন শাখায় শুধু ফুটে থাকে গন্ধবর্নহীন করুন কুসুম!
হায় আমিও কি ব্যর্থগান, তবে আমিও কি ব্যর্থ রক্তপাত? . **************** . সূচীতে . . .
পিতার নীল নকশা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সামনে দাঁড়ায় ঘোর সংসারে বাবার মৃত জায়নামাজ যার উষ্ণ অস্তিত্বে একদিন কিছু পৈত্রিক পুন্য প্রার্থনা শূন্যের দিকে পাখা মেলে উড়তো শাদা পারাবত---
অই সব পুন্য প্রার্থনার নির্বোধ বাসনারা আমার রক্তের ভূমিতে বৃক্ষের বীজ বুনে বিস্তৃত হতে চেয়েছিলো শিকড়ে পাতায় অথচ আমার ভেতরে বাবাকে হত্যা কোরে আমি এক অনন্ত ফেরারী।
সামনে দাঁড়ায় ভিটেমাটি পৈতৃক বসতবাড়িতে পিতামহের শূন্য করতল বাবার প্রৌড় মাংসের বন্দরে একাধিক ভুলের সুরম্য সরলতা--- আমি জানি বাবা কোনোদিন নিজেকে চিনতে পারেনি।
জীবনের গভীর উঠোনে এক নীল করবীগাছের ছায়ায় বিষময় ফলে তাঁর নিঃসঙ্গ হাতখানা বিভ্রমে কেঁপে উঠেছিলো আজো কেঁপে ওঠে দুঃস্বপ্নের হাওয়ায়।
শূভ্র শ্মশ্রুর আড়ালে ভুলের জ্যামিতিক রেখায় বাঁধা অসহায় ক্ষোভ, তোমার প্রার্থনায় একটি ভুল শব্দ ছিলো তুমি তাকে জানতে না এ-জন্মে কোনদিন ভুল কোরেও তুমি জানবে না সেই ভুল ব্যর্থতা তোমার প্রার্থনার শরীরে লুকোনো অসুখ।
মাংশের মুখোশ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
একটি মানুষ খুন কোরে এই তো এলাম আমি প্রার্থনা ঘরে, দ্যাখো শরীরে আমার কি মধুর আতরের ঘ্রান কি মোহন স্বর্গীয় শোভা সারা অবয়ব জুড়ে, আহা ঈশ্বরই সব মঙ্গল কোরেন!
এই দ্যাখো একজন কুমারীর যোনির মাংস আমার বুক পকেটে, আমি কি বিশ্বাসযোগ্য নই, এখনো কি আমি নই ত্রাতা? চোখে মুখে তোমরা কি দ্যাখো না আমার সেই অপূর্ব ছবি? ঈশ্বরের শেষতম রক্ষক আমি এই কলুষিত পৃথিবীতে আমাকে অবজ্ঞা কোরো না।
হে নরকবাসীগন নিশ্চয়ই তোমাদের পথ ভুল। এখনো হত্যার রক্তে করোনি স্নান, পূর্ন হওনি ঘৃনাবোধে? এখনো সত্যের মতো ভ্রান্ত শবদেহ নিয়ে রয়েছো মুখর? নিশ্চয়ই তোমরা নরকবাসী হবে।
এই দ্যাখো শিশুদের মাংস কি সুস্বাদু, আহা কি চমৎকার অসহায় মানুষের বেদনার্ত হৃদয়। যতোটুকু পারো কেড়ে নাও মানুষের প্রাপ্যের ফল যতো পারো যন্ত্রনা বিদ্বেষে ভরে তোলো পৃথিবীর জলবায়ু। হে পুন্যার্থী মানুষেরা মনে রেখো, ঈশ্বরই সব মঙ্গল করেন, তাঁর প্রতি নিবেদিত হও।
এই দ্যাখো একজোড়া কাটা মাথা, একজন কুমারীর যোনির মাংস আমার বুক পকেটে, আমি কি বিশ্বাসযোগ্য নই? . **************** . সূচীতে . . .
মৃন্ময় চিবুক বেয়ে ঝ'রে আসে চোখের শিশির ঝ'রে আসে স্বপ্ন-আর্দ্র জল, বিহ্বল, ব্যাকুল বাসনা।
আমি কি পাই না টের? আমি কি পাই না টের এইসব, নিসর্গ-নগর জুড়ে তোমার ভ্রমন-ধ্বনি বেজে ওঠা সুনিবিড় পাতার মর্মর? তবে এ-কান্না কিসের, এই জল, ব্যথার শিশির? এই মত্ত গাঙের তুফান বুকের ভেতরে কেন বাজে!
মার কাছে ফেরা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
ওখানে ভীষন খরায় ফসলের চরাচরে পাখা মেলে বসেছে এক বন্ধার বাজপাখি, তার ঠোঁটের বিষ আমার রক্তের শহরে ঢুকেছে শত্রুসেনারা যেমন বিজয়গর্বে ঢোকে পরাধীন দেশের ভেতরে। মা, এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই--- রক্তে মাংশে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা।
কতোদিন ঘুমোই না মা! সেই কবে কৈশোরের প্রথম সকালে সংসারের গন্ধেভেজা তোর সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতাম স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলে সেই কবে, কতোদিন আগে কিছুক্ষন বুকে রাখ, বুকের শান্তিতে! কতোদিন ঘুমোইনি, নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে কতোদিন, সেই কতোদিন . . .
সারাবাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড় কান্নার কংকাল দেখে আমি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাইনি সড়কের জীবন্ত কবর এসে বুকের ভূমিতে জেগেছে সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব।