কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
মনে পড়ে সুদূরের মাস্তুল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৩.০১.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।   

পেছন তাকালে কেন মূক হয়ে আসে ভাষা!
মনে পড়ে মেই সব দুপুরের জলাভূমি,
সেই সব বেতফল, বকুল কুড়ানো ভোর,
আহা সেই রাঙাদি-র আঁচল তলের উত্তাপ,
মনে পড়ে . . .

মনে পড়ে, বন্দরের সেই সব কালোরাত,
ঈগলের মতো ডানা সেই বিশাল গভীর রাতে,
একটি কিশোর এসে চুপি চুপি সাগরের কূলে
দাঁড়াতো একাকি
তন্ময় চোখে তার বাশি রাশি বিস্ময় নিয়ে।

কবে তারে ডাক দিয়ে নিয়ে গেলো যৌবন সুচতুর,
কবে তারে ডেকে নিলো মলিন ইটের কালো সভ্যতা!

সবুজ ছায়ার নিচে ঘুমে চোখ চুলে এলে
মা যাকে শোনাতো সেই তুষারদেশের কথা,
তার চোখে আজ এতো রাতজাগা ক্লান্তির শোক!

পেছনে তাকালে কেন নিরবতা আসে চোখে!
মনে পড়ে---জোস্নায় ঝলোমলো বালুচর,

একটি কিশোর তার তন্ময় দুটি চোখে
রাশি রাশি কালোজল---সুদূরের মান্তুল
মনে পড়ে . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রজ্বলন্ত লোকালয়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৩০.০৮.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।   

“আগুন লেগেছে পালা”---
শালা সব শুয়োরের জাত, কুত্তার লেজুড়,
ঘরভরা বীজধান, গর্ভবতী নারী তোর দুধের সন্তান,
সব ফেলে একা-একা পালাবি কোথায়?

“ওই গাঁয়ে মহাজন, ভাত মাছ শস্তায় সকলি মেলে,
খানকি মাগিরা আছে বুক পাছা উরু ঠোঁট রসে থলো-থলো।
ওদের গোলাম হবো, মহাজন খুশি হলে মিলবে এনাম”---।

আগুন লেগেছে দেশে-গ্রামগঞ্জ-নগরে নিভৃতে,
পুড়ে যায় দুধভাত, রাইশস্য, নবানেন নলেন গুড়,
দুগ্ধবতী গাভিদের ভরাট ওলান চোষে অজন্মার দুধরাজ সাপ।

একা একা ওই দ্যাখো পালায় ভীরুরা,
স্বজনের দগ্ধ-দেহ নির্বিকার দুপায়ে মাড়ায়ে যায়,
বৃদ্ধ জননীর লাশ ঠেলে ওই দ্যাখো কাপুরুষ কিভাবে পালায়।
 
শালা সব বেজন্মার জাত,
অভাবি মায়ের মুখে থুতু দিয়ে ওরা যায় গনিকার ঘরে।
ওদের চিহ্নিত করো, খুলে দাও মুখোশের বিচিত্র লেবাস,
নাড়ার বোলেন জ্বেলে ওই সব ভীরু মুখ পোড়াও আগুনে।

কাপুরুষ বিনাশিত হলে,
ওদের কবরে জন্ম নেবে আগামীর গুচ্ছ গুচ্ছ সাহসী সন্তান।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পাঁজরে পুষ্পের ঘ্রান
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২০.১৯.৭৭ মোংলা বন্দর। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।   

তোমাকে বলবো বোলে তারকাটা, পাথুরে জলের হিম,
মৃত্য, রক্ত, লাশ, এই ধ্বংশের শ্মশান ডিঙিয়ে এলাম,
তোমাকে বলবো বোলে।

পাঁজরে পুষ্পের ঘ্রান জ্ব'লে আছে ক্ষুধার মতোন,
ক্ষুধা তো বেঁচে থাকার অন্য নাম।
তোমার আমার এই দূরত্বের মাঝে সেই ক্ষুধার পাথর---
তুমি তাকে প্রেম বলো, স্বপ্ন বলো, লোকে বলে মলিন বিরহ।

তোমাকে বলবো বোলে জলকষ্ট, নিদ্রাহীন রাত
মানুষের শ্বাপদ-স্বভাব মাখা লোভাতুর দাঁতের কৌশল,
আমি তৃষ্ণার অপূর্ণ ওষ্ঠ থুয়ে এসেছি পেছনে।

জীবনের তিনভাগ অনাহার নিয়ে একটি জঠরে
যে-মানুষ পাঁজরে পুষ্পের ঘ্রান পুষে রাখে প্রেমের মতোন
আমি তার স্বপ্নের শিয়র থেকে উঠে এখানে এসেছি
তোমাকে বলবো বোলে।

তোমাকে বলবো বোলে কষ্ট, ধ্বংশ, ক্ষয়, লেলিহান ক্রোধ
তামাটে মাটির গন্ধ বুকে এই ধংশের কবর ডিঙিয়ে এলাম
শুধু তোমাকে বলবো বোলে, ভালোবাসা প্রিয়মুখ
তোমাকে বলবো বোলে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পথের পৃথিবী
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৪.১২.৭৬ সিদ্ধেস্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

গোপনে ছিলাম নিজের মধ্যে একা
তুমি এসে কেন হঠাৎ ডাকলে করাঘাতে!
আত্মমগ্ন কুয়াশার মোহ ছিঁড়ে
দূরে তাকাতেই দেখলাম ঘন বনভূমি,
তুমি ডাকলেই মনে হলো আমি একাকি ছিলাম।

ইতিহাস থেকে জেগে ওঠা এক শব,
যেন এ-প্রথম দেখলো নোতুন পৃথিবীকে,
যেন তার দেশে ছিলো না আকাশ মাটি
ছিলো না এমন রূপালি রোদের কারুকাজ---
আজ তাই তার পায়ের নিচের ধুলোমাখা ঘাসগুলো
মনে হলো তা-ও কতো সুন্দর আহা!

মগ্ন ছিলাম নিজের মধ্যে একা,
তুমি এসে টেনে নামালে পথের পৃথিবীতে,
হাতছানি দিলো জীবনের সাইমুম---
মত্ত জলের করতালি শুনে বিশ্বাসে
বাঁধলাম এই সাহসে শোভিত মাস্তুল আমাদের!

তুমি ডাকলেই মনে হলো আমি একাকি ছিলাম,
তুমি ডাকলেই প্রিয়ময় হলো আমার নির্জনতা।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বজনের শুভ্র হাড়
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৩.০২.৭৮ সিদ্ধেস্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

বুকের তিমির ঠেলে জেগে উঠেছে যে-দ্বীপ
সে-আমার ভালোবাসা,
ব্যথার প্রবাল জমে তিলে তিলে গ’ড়ে ওঠা বাসনার ভূমি।

হননের রক্তপাত শেষে
বিনাশের ধংশযজ্ঞ শেষে
নীলিমার মতো শুভ্র স্নিগ্ধ তনু যে-দ্বীপ উঠেছে জেগে
সে-আমার রক্ত, মাংশ, হাড়, করোটির কষ্ট দিয়ে বোনা
একখানি স্বপ্নধোয়া হৃদয়ের তাঁত।

সে-আমার নোতুন বসতভুমি সাগরের চর,
আমার গৃহের সুখ, জীবনের নিশ্চিত গ্রহর।

এইখানে আবার সাজাবো নীড়, সোনালি সময়,
এইখানে অঘ্রানের চাঁদ সমস্ত বছর দেবে নির্ভার পুর্ণিমা---
বেদনার দীর্ঘ রাত্রি শেষে

বিনাশের রক্তপাত শেষে
আমাদের দ্যাখা হলো,
ব্যথার প্রবাল দ্বীপে পুনরায় দ্যাখা হলো তোমার আমার।
রক্তে ধোয়া মমতার মাটি---
স্বজনের শূভ্র হাড় চারিপাশে ফুটে আছে অপরূপ উজ্জ্বল ফুল,
আমাদের সম্মুখে দিগন্তের মতো প্রসন্ন ভবিষ্যত . . .
ব্যথার প্রবাল দ্বীপে পুনরায় দ্যাখা হলো তোমার আমার।

রক্তের নিবিড় স্রোতে করাঘাত কোরে যায স্মৃতি,
বুকের বাঁ-পাশে কার অস্ফুট কান্নার মতো ব্যথা এসে বাজে!
স্বজনের রক্তে ধোয়া এই প্রিয় মাটির সিঁথানে
আমাদের ব্যথিত প্রনাম এসো জ্বেলে দিই ধুপের মতোন।

কোনোদিন এইসব মানুষেরা ফিরবে না আর . . .
যে-রাখাল উদাস দুপুরে তার বাঁশির সুবাস ছড়াতো বাতাসে
সে আর ফিরবে না।

যে-নারী সিঁথায় লাল সিঁদুরের স্নিগ্ধ প্রেমে একেছিলো মুগ্ধ নীড়
সে আর ফিরবে না।
যে-যুবক রাইফেলে ক্ষুব্ধ হাত বারুদের মতো তেজি বিস্ফোরন
বুকে নিয়ে ছুটেছে মাতাল সে আর ফিরবে না, সে আর ফিরবে না . . .

স্বজনের শুভ্র হাড় চারিপাশে ফুটে আছে ফুলের মতোন।
বিজয়ের ব্যথিত মিছিল তবু কেন চলে ভুলের ভুবনে
কেন তবু ভুল জীবনের পায়ে রেখে আসে পুষ্পের প্রনাম?

বুকের তিমির ভেঙে সুপ্রভাতে আমাদের দ্যাখা হয়েছিলো,
সুরম্য আলোর নিচে জেগে ওঠা আমাদের স্বপ্নধোয়া দ্বীপ---
তবু সেই নিশ্চিত প্রহর আজো আসেনি এখানে,
তব সেই অঘনের পূর্নচাঁদ ছড়ায়নি জোস্নার আরক।

আমার ভাষার কণ্ঠ রোধ কোরে আছে আজো চতুর শ্বাপদ,
আজো শুধু স্বজনের শুভ্র হাড় চারিপাশে ফুটে আছে
উজ্জ্বল বিষন্ন ফুল।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পরাজিত নই পলাতক নই
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৬.১১.৭৬ সিদ্ধেশ্বরী ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আর যাই হোক পলাতক নই---
হয়তো পারিনি জীবনের সব প্রাপ্য মেটাতে
হয়তো অনেক অনিয়ম এনে গড়েছি নিয়ম,
হয়তো স্বজন প্রিয় মানুষের নিষেধ মানিনি
বন্ধন ছিঁড়ে ব্যবধানকেই আপন ভেবেছি বেশি।

অনাহার কতো এসেছে করাল
বন্যায় ঝড়ে ভেসে গেছে কতো নীড়ের জোস্না,
কতোবার আশা ঢেকেছে করুন বেওয়ারিশ লাশে
কতোবার প্রেম বারুদের বিষে হয়েছে কাতর
নির্মমতার নিচে একশত জ্বলন্ত নাগাশাকি---

তবু উন্নত সবল করোটি
তবু দুই হাতে পাথর কাটার প্রার্ঠীন গন্ধ,
তবু বেদনাকে শোনিতে সাজিয়ে বলি প্রিয়তম
বলি সভ্যতা অপরূপ, সারা শরীরে আমার
লেগে আছে আজো আদিম জীবন বিশ শতকের ধুলো।

আর যাই হোক পরাজিত নই---
শত শতাব্দী হেঁটে আসা হয়তো ক্লান্ত
কিছুটা হয়তো বিশ্রাম চায় অনু পরমানু,
কিংবা হয়তো আরো দূর পথ যেতে হবে জেনে
ছুটবার আগে একটু সময় পেছনের দিকে ফেরা
একটু সময় সময়ের দিকে ফেরা।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কার্পাশ মেঘের ছায়া
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, প্রথম খন্ড” থেকে।  

শিমুল শাখারা তবু এতো লাল হয়ে ওঠে আজো,
আজো এতো রত্তময় হৃদয়ের মতো শুষ্ক বাতাসে ছড়ায়
লোহিত সুঘ্রান।
সেই শৈশবে----উড়ন্ত কার্পাশ মেঘের দিকে
ছুটতে ছুটতে একদিন নদীর কিনারে এসে মন্ত্রমুগ্ধ
জলের দিকে নির্বাক চেয়ে থাকা চোখ সেই প্রথম দেখেছিলো
আপন প্রতিকৃতি

জীবনে সেই প্রথম নিজেকে দ্যাখা, নিজের শরীরের দিকে
দৃষ্টি ফেরানো---তখনো জননী মানেই অভিমানে ভেজা চোখ
আঁচলে মুখ লুকিয়ে কেড়ে নেয়া স্নেহ-সিক্ত হাতের পরশ
তখনো জননী মানে শুধুই মা।

জলের আর্শিতে দ্যাখা সেই বিভোর বিস্মিত কিশোরের ছায়া
আজো সে তেম্নি স্থির থমকে দাঁড়ায় এসে নদীর কিনারে,
মৌশুমে সব শিমুল ফুটে ওঠে গাঢ় লাল
বাতাসে কার্পাশ ফাটে---
দুরন্ত কৈশোর আজো ঠিক তেমনি ছুটে যায় তুলোর মেঘের পেছনে

শুধু রক্তাক্ত হৃদয়খানা বুকের ভেতরে লুকিয়ে তন্ময় আমি
গোপনে নিজেকে বলি : তুমি খুব বড়ো হয়ে গেছো খোকা
তুমি খুব বড়ো . . .

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পশ্চাতে হলুদ বাড়ি পঞ্চাশ লালবাগ
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১০.০২.৭৬ কাঁঠালবাগান ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এটা প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ নয়---শুধু এক শব্দহীন সবল অস্বীকার
পরিকল্পিত প্রত্যাখ্যান, এ কোনো অভিমান নয়---ব্যর্থতা নয়।

বিরহে কাতর হবে, কাতরতা বাড়াবে স্বাধীন স্বদেশ, জানতাম
আমার শূন্য চেয়ারে হাত রেখে তাকাবে রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিচিহ্ন
বকুলের দিকে,
প্রতিদিন ঘরে ফেরার পদশব্দ শুনতে চেয়ে অপেক্ষা সাজাবে ভেতরে,
জানতাম, আমার না-থাকা শরীর করতলে প্রদীপের মতো
জ্বলতে-জ্বলতে জ্বালাবে নদী, পাখি, ফুল, সংসারে সাজানো সবুজ---
তবু এ-কোনো প্রস্থান নয়, এ-কোনো বিচ্ছেদ নয়।

এখন যেখানে যতোদূরে থাকি দ্যাখা না হওয়াই ভালো।

তোমার দেয়ালের পলেস্তারে ভেসে উঠুক যৌবন-হন্তা-শ্বাপদ
উঠোনে কৃষ্ণচূড়ায় মৌশুমি ফুলের উল্লাস ঝ'রে যাক হলুদ মাটিতে

অথবা আরো কিছু নোতুন বৃক্ষের ছায়ায় ধ্বনিময় হোক জীবন যাপন,
আরো কিছু হোক, আরো বেশি কিছু---পাওয়া বা পতন
তবু দ্যাখা না হওয়াই ভালো।

চ’লে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়---বিচ্ছেদ নয়,
চ’লে যাওয়া মানেই নয় বন্ধন ছিন্ন করা আর্দ্র রজনী।

চ'লে গেলে আমারো অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না-থাকা জুড়ে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিবেদিত বকুল-বেদনা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২১.১.৭৬ লালবাগ ঢাকা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা
সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।   

একখানা বকুল মালা রেখে গেছি শুধু আমার না-থাকায়
আর কিছু না।

শুধু এক মৌন ফুলের মোম যেন নিশব্দ আলোর গন্ধ
চারিদিকে ছড়িয়ে আছে, যেন আলোকিত হয়ে আছে নিজে।

আমার অস্তিত্বকে প্রমানিত কোরে গর্বিত বুক
ঝুলে আছে মৃত বাসি বকুলের হার পুষ্প পালক,
আমি নেই---

আমি নেই তাই বকুল হয়েছে প্রিয়, দুখের কারন
আমি নেই বোলে বকুল বলছে কথা স্মৃতির ভাষায়।

যেন আমি নই, এই বাসি বকুল ভালোবেসে একদিন
অভিমানী রাতে তুমি বেদনার জোস্না মেখেছিলে বুকে,
যেন এই বকুলের জন্যে এতো পথ হেঁটে আসা
এতোরাত জেগে থাকা অপেক্ষার সাথে একাকি।

সুবোধ সাপের মতো নিবেদিত নিবিড় ভঙ্গিতে
মৃত বাসি শুকনো বকুল ঝুলে আছে হলুদ দেয়ালে,
যেন অহংকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা বিনীত বেদনা
স্নেহময় হাতে যাকে স্পর্শ করলে ভেঙে পড়বে প্রবল বন্যায়।

ইচ্ছাকৃত ভুলে ফেলে রেখে গেছি আমার বকুল
ভুলে ফেলে গেছি ভেবে ফিরিয়ে দিও না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিরাপদ দেশলাই
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ০৪.০৯.৭৭ মিঠেখালি মোংলা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর
রচনা সমগ্র,  প্রথম খণ্ড” থেকে। কবির বানান।   

সঞ্চিত বারুদ বক্ষে তবু প্রয়োজন ছাড়া জ্বলি না কখনো।

জ্বলে ওঠা বারুদের নিজস্ব স্বভাব,
স্বভাবের দোষে তাকে দূরে রাখে সতর্ক মানুষ।
বিস্ফোরন বুকে আছে, আমি তার নিয়ন্ত্রন জানি,
আমাকে নিকটে রাখো, বুকে রাখো শীতার্ত কুমারী---
প্রয়োজন ছাড়া আমি জ্বলি না কখনো।

এই শীতে জীবনের কষ্ট হবে খুব---
গৃহহীন অরন্যের পথে যেতে করাল কুয়াশা
শরীরের রক্ত মাংশ কেটে নেবে শীতের হাঙর,
বসতি বিরল সেই প্রান্তরে গহন বিপদে
আমাকে নিকটে রাখো, বুকে রাখো শীতার্দ্র মানুষ---
প্রয়োজন ছাড়া  আমি জ্বলি না কখনো।

জ্ব’লে ওঠা জীবনের দ্বিতীয় স্বভাব
জন্মদোষে আমি শুধু সেটুকু পেয়েছি,
অস্থিতে মেধায় তাই সেই বোধ খেলা করে সমস্ত প্রহর

বিপ্লবের স্বর শুনে মানুষেরা যে-ভাবে ঘুমোয়,
যে-ভাবে তোমার চোখে মিশে থাকে বেদনার লাভা
বিস্ফোরন বুকে নিয়ে আমিও তেমনি আছি।
আমাকে নিকটে রাখো, বুকে রাখো শীতার্ত স্বদেশ---
প্রয়োজন ছাড়া আমি জ্বলি না কখনো।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর