কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
নিসর্গ স্মৃতিতে ভাসে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৪.৭.৭৪। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম
সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

কাশফুল করবী
আঁকি পটে তার ছবি
বিহানে মেঠো পথে বাঁশরী নিয়ে
শিশির সিক্ত পায়
রাখালেরা চলে যায়
মাঠ ছেড়ে মাঠে,
ডাহুকীর মালা দোলে
আকাশের পটে।

ছায়াবীথি বনযূথী
সরু পথ তার সিঁথি
করবীতে মঞ্জুলি গরদী পরা,
মলয়া আঁচল ওড়ায় ছন্দহরা।

রুপোলি গাঁয়ের বধূ
হরগাজা কেয়া মধু
নীরবে ভালোবাসে যুঁই বনফুল
কেতকী পরশ বুলায়
আমের মুকুল।

কলমী হেলাঞ্চ দল
মালঞ্চে নির্মল ফুটেছে কতো
বাগানের নাম হারা
কিশোরীরা যতো।

নিষ্প্রান শহরের ইঁট কাঠ ছেড়ে---
আমার হৃদয় ছোটে নিসর্গের
রাখালিয়া সুরে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাতের নটীর চুলে মানুষগুলো
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ৮.৯.৭৪। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম
সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

রাতের দারুন নটী বসে আছে আমার টেবিলে
এ শহরে আজ আর ঘুমোবে না কেউ।

একশো মদ্য মাতাল রাজপথে গ্রীনলেনে
বিষুঃচরন স্ট্রীটে সদরঘাটে সর্বত্র শুধু
ব্রোথেল খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ হবে---
মানুষগুলো আজ আর ঘুমোবে না কেউ।

সে শুধু একটিবারই দরোজা খুলে
বোলেছিলে এসো---আমি দ্রুত ধাবমান
রিকশার ভেতর দেখলাম তাকে, পরিচিত মুখ
কড় কড়ে দুখানা মূল্যবান কাগজ তুলে দিলে
তুমি চলে এলে আমার বশে একান্ত বাধ্যগত
গৃহিনীর মতো। আমি অনায়াসে কাটালাম রাত
সুখের নিদ্রাহীনতায়।

জানি ভোর হোলেই তুমি আমাকে চিনবে না
আর চিনবো না আমিও।

এ শহরে কেউই ঘুমোয়নি কোনোদিন
মগজে তরল দুঃশ্চিন্তা ঢেলে দেখেছো ক্যামোন
ওরা সকলেই জেগে আছে সোনিয়া লায়লা
সাবুব বাবা ফুলজান ওরা ঘুমায় না কেউ

যেতে যেতে যাই যেতে যেতে ভাবি এবং যাই
এ শহর সরাসরি ঘুমের বিরুদ্ধে মত্ত প্রপাগাণ্ডায়
কাকেই বা দেবে তুমি দোষ, দোষের বোমা
ঝুলছে প্রত্যেকের পিঠে কাঁধে ও বাহুতে।

রাতের চুলের ভেতর বসে আছি এখন
মুখোমুখি তুমি আর আমি

তোমার শাড়ি বেয়ে নেমে আসায় সুখ বাতাসের মতো
অনবরত ছুঁয়ে যাচ্ছে স্পর্শকাতর মন।

“ঘুমোবে না তুমি?” বলতেই অনায়াসে
শুয়ে গেল ইচ্ছাকৃত বাসনার মতো।
মানুষগুলো আজ আর ঘুমোবে না কেউ
অথচ এ শহরে তুমিই একমাত্র
শুঁয়ে আছো নিদ্রার বিছানায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমার জন্য লিখি, তোমাকে লিখি না
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২.১০.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  
       
আমি তোমাকে কবিতায় লিখি না
গানেও লিখি না
ক্যানো না আমার গান
আমার সকল কবিতা
তোমার জন্যই লেখা।

আমি তোমাকে কখনো স্বপ্নে দেখি না
কখনো ভাবিও না
ক্যানোনা আমার ভাবনা
আমার সকল স্বপ্ন
তোমার জন্যই
একমাত্র তোমার জন্যই।

চাঁদ আকাশের জন্য ওঠে
অথবা আকাশ চাঁদের জন্য
এ-সব অনেক তর্কের ব্যাপার

আমি তোমার জন্য লিখি কিন্তু
তোমাকে কখনো লিখি না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হৃদয়ের মতো টেলিপ্রিন্টার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১.১০.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

আমি সর্বক্ষন চিঠি লিখি তোমাকে
গোপন টেলিপ্রিন্টার আছে
লেখার মতো কাগজ থাকে

ইনভেলাপও আছে অনেক
টেলিপ্রিন্টার আছে
টেলিপ্রিন্টার আছে।

আমার আজ্ঞাবহ ইথার আছে
আমি তোমাকে চিঠি লিখি
কুশল-সংবাদ জানতে চাই
অথবা নিত্য কাজের কথা
আমারও ইথার আছে
ইথার আছে।

তোমার মতো আমারও আছে
ক্যামেরার মতো চক্ষু আছে
ফিল্মের মতো হৃদয় আছে
ফ্রেমে রাখা ছবির মতো স্মৃতি আছে
আমারও হৃদয় আছে
আমারও ছবি আছে।
ছবি আছে।

তোমাকে প্রতিদিন লেখার মতো
অনেক রকম খবর আছে।

আমারও টেলিপ্রিন্টার আছে
হৃদয়ের মতো টেলিপ্রিন্টার আছে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সম্পূর্ন ভালোবাসার অযোগ্য
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৭.৯.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

আমাকে আজকাল কেউই
কেউই আর ভালোবাসে না।
যে সব প্রেমিক ছিলো
আগেকার
বাসের হ্যাণ্ডেল, রেশনের কিউ
হাফসোল জুতোয়
বড়ো আপন ফুটপাথ্‌

ওদের আজকাল নোতুন প্রেমিক
ওরা আমাকে চেনে না এখন
এমন কি ভালোবাসাও

ইদানীং আমাকে আর
ভালোবাসে না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তুমিও প্রেমের মতোই দুর্বোধ্য
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৯.৯.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

তোমাকে আমার প্রেমের মতোন
মনে হয়
মনে হয় গাঢ় লাল
একথোকা কৃষ্ণাচূড়া
প্রেমেরই মতোন দুর্বোধ্য
তুমি কি প্রেম বুঝতে পারো
প্রেম কি অতি দুর্বোধ্য নয়
রমনীর মতো?

তোমাকে আমার প্রেমেরই মতোন
মনে হয়
মনে হয় ড্রয়িংরুমে ফ্ল্যাস বাল্ভ
উজ্জ্বল জ্বলছে

তুমি ফি যৌবন বুঝতে পারো
রমনীর স্তনের কোমলতা
এসবও কি দুর্বোধ্য নয়
জীবনের মতো?

প্রেম দুর্বোধ্য, নারী দুর্বোধ্য
এবং তুমিও তোমার
প্রেমের মতোই দুর্বোধ্য।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্কেচ এবং ক্যানভাসবিষয়ক
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২১.১.৭৪। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

ক্যানভাস আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিলো
সবুজ রাত্রে আমি একাকী জ্যোৎস্নার মতো
টেনে যেতাম নিখুঁত তুলির ছোঁয়া
সহস্র বিনিদ্র রাত আমার সুবর্ন ক্যানভাসে আঁটা

য্যামোন বুকের ভেতর স্মৃতির পোস্টারগুলো
এঁটে আছে অন্যরকম স্নেহের টানে, স্পর্শে।
ক্যানভাসে স্কেচ এঁকে একদিন কেটে যেতো দিন
কেটে যেতো রম্য রাত---আমার শুধু ক্যানভাস ছিলো।

এখন ক্যানভাস আমি দেখি না আর
ক্যানভাসে স্কেচ দেখে আমি নিহত ইচ্ছার মতো
মরে যাই আত্মার অনুর্বর ক্ষেতে ; যেহেতু
প্রকৃত ক্যানভাস ছিলো আমার নির্জন হৃদয়।

ক্যানভাসে স্কেচ দেখে আমি চিৎকার করি
আমি ফিরে যেতে চাই সেই সব বিনিদ্র রাতে।

আমার প্রকৃত ক্যানভাসে তোমার স্কেচ আঁকা ছিলো
অথচ তুমিই থাকোনি আমার হয়ে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অলক্ষ্যে যে চোখ আমার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ১৭.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

নিশ্চিন্তে দোজখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি বোলে
দিনে অন্তত একবার আমার শ্রাদ্ধ করেন অভিজ্ঞ পিতা,
মাতার সারাক্ষন নিঃসন্দেহ আশংকা ছেলে অলুক্ষুনেই হবে।

অতিকায় ঢোলা প্যান্ট বেলবটম নামক, মাথায় একরাশ
অসম্ভব লম্বা-মস্তান চুল---অথচ মস্তান আমি নই।
একবুক বিপ্লব নিয়ে সদর্পে হেঁটে যাই পথে
একচোখে আমার জ্বলে জ্বলন্ত প্রেম আরেক চোখে
বিক্ষুব্ধ ভাঙনের বিস্ফোরন এসব সকলে জানে

অথচ আমার অন্য একটি চোখে কি সব আছে
কখনো কেউ তা জানে না।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অজ্ঞাতনামা এ কোন স্থানে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

এ আমি কোথায় এলাম, এ কোন স্থানে!
মরা চোখে মরে ছবি নিরাশার মধ্যাহ্নে
ডানা ভাঙা গাংচিল খোঁজে নীড়
সবুজের বুক জুড়ে জেগে আছে কান্নার ঝড়।
শালিকের ভেজা ঠোঁটে কাঁপে সুর বেদনার
ঝরাপাতা ধুয়াশায় মালা গাঁথে একাকী।

কিশোরী ব্যাকুল এক ধূসর চোখে
খুঁজে ফেরে খেলাঘরে পুতুলের বিয়ে
খেলনা টিনের, রঙিন কাগজ, পাতা-বাঁশী,
দুব্ ঘাস জোনাকী। বুঝি তার জীবনের খেলাঘরে
একাকী তেমনি খুঁজে ফেরে সবুজ পাতার হাসি।

এ আমি কোথায় অচেনা পথে
যে পথ চেনা ছিলো গভীর বিশ্বাসের মতো
আপন হৃদয়ের মতো সে পথ সহজেই
বিপথে হারিয়ে গ্যালো মরুভূমির মাঝে
একটি সোনালি সবুজ গ্রাম অসংখ্য কান্নায়
বিভক্ত হয়ে গ্যালো। সহজ হাসিগুলো রাতরাতি
করুন কান্না হয়ে গ্যালো মাত্র কটা দিনে।

এ আমি কোথায় এলাম চিরচেনা-অচেনা স্থানে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ক্ষুধার্ত পাপ নীল আগুনে পোড়ে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
রচনা ২৮.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির
বানান।  

দণ্ডায়মান যে রমনী সম্মুখে আমার
দুটি ঠোঁটে হাসির আলপনা আঁকা,
সলাজে নম্র নিপুন সংগিনী য্যামোন

দৈনিক অতি প্রয়োজনীয় কথাগুলো বোলে যায়
তেমনি জানিয়ে গ্যালো নিজের সমর্পনের কথা।

উজ্জ্বল আলো নিভে গেলে চারিপাশে
অসংখ্য ক্ষুধার্ত ছুঁড়ে দেবে সহস্র হাত
নম্র সলাজ বধূ অভিজ্ঞ হাতে খুলে দেবে
আপন সায়ার ফিতে ব্রেসিয়ারের কোমল হুক।

নিজেই জ্বালিয়ে তুলবে এক গভীর অগ্নিকাণ্ড
এবং নিঃসংকোচে ভিজিয়ে নেবে বিশেষ প্রকোষ্ঠগুলি।
ক্রমশ আগুন নিভে গেলে দ্রুত হাতে তুলে নেবে যাবতীয় পোষ
এবং বিনিময়ে প্রাপ্ত অবৈধ আগুনের মূল্য।

বিষন্ন ক্লান্তি মেখে ফিরে যাবে বিধ্বস্ত আস্তানায়
যেখানে জারজ সন্তান তার অনাহারী সারাদিন।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর