ক্রমবর্ধমান সমস্যার জ্বর এবং কলকাতা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৫.১০.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
হে কলকাতা জীবনের সমস্ত জিজ্ঞাসা যেখানে সহসা এসে হারিয়ে গিয়েছে পথ সেখানে আজো তুমি মৃত পাথরের মতো নির্বাক হয়ে আছো হে কলকাতা হে বিলাসী নগরী তুমি কি সতীত্ব হারিয়েছো তুমি কি অসতী মাতা?
জারজ সন্তান বুকে যে মাতা সতর্ক চোখে হাঁটে দুশ্চিন্তায় তুমি কি তারি মতো ভুগছো হতাশার জ্বরে হে কলকাতা
ক্রমশ নাচে উন্মত্ত ঢেউ পোড়া যৌবনের জীবিকার দুরন্ত জিজ্ঞাসা হে কলকাতা তুমিও কি ওদেরই মতো একরাশ ক্ষুধার রাজ্যে চুর হয়ে আছো সুমার্জিত মুখোশের যন্ত্রনা বাড়ছে ধীরে অন্তঃস্বত্বা রমনীর ক্রমবর্ধমান উদরের মতো এ অবৈধ ভ্রূনের কখনো হবে নাকি প্রসব হে কলকাতা এ প্রসব যাতনা কত দিন কত রাত্রি তোমার উত্তপ্ত যোনির মাঝে মাথা কুটে মরবে
হে কলকাতা তুমি কি অবৈধচারিনী তুমি কি আজীবন সমস্যায় অন্তঃসত্ত্বা . **************** . সূচীতে . . .
উনিশ বছর অপেক্ষমান বুকের আঙিনা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমার জীবনের একদিকে ভালোবাসার সঘন রোদ্দুর আর এক দিকে যন্ত্রনার নীল মেঘ আমি কারো প্রতীক্ষায় আছি।
কোনো সবুজ পাখি অথবা গোলাপী কাক আমি কারো প্রতীক্ষায় আছি আমি জানালা খুলে রাখি।
নিশ্চয়ই একজন কেউ আসবে প্রত্যাশিত তার করাঘাত আমি দরোজায় দারুন উৎকন্ঠায় আছি, কোনো সোনালী ছায়ার ঘ্রানে কেঁপে কেঁপে উঠবে শার্সিতে রোদ্দুর সে রকম আশায় পথ চেয়ে থাকি---
অথচ কোনোদিন কারো অপরিচিত পদশব্দে চমকে ওঠেনি আমার সচেতন আঙিনা অপেক্ষাই যার উনিষটি বছরের সাথি। . **************** . সূচীতে . . .
নির্দিষ্ট গন্তব্যে ধুয়াশা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১৯.১০.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
সূর্যের শেষ ঘন্টা বেজে গ্যালো অফিস ফেরা মানুষেরা দাঁড়িয়ে আছে যার যার ট্রামের প্রতীক্ষায়। কিছুক্ষন পরে তারাও চলে গ্যালো অথচ আমার নির্দিষ্ট বাস এলো না আমার গন্তব্য অনির্দিষ্ট রয়ে গ্যালো।
শহর রাত্রি পরে নিলো সারা গায়ে ওভারকোটের মতো আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম পথচারী রমনী স্তনের কারুকাজ।
জীবনের সমস্ত হলে নাইটি শো ভেঙে গ্যালো একটি সুবর্ন বাস এগিয়ে এলো
দুটো লোক বাস থেকে নামলো পেছনের দিকে কন্ট্রাক্টর চিৎকার কোরে পরবতী স্টেশনের নাম ঘোষনা করলো তিনবার।
তিনটি মেয়ের আলুথালু শাড়ী উড়ে গিয়ে সেঁটে গ্যালো আকাশের স্তনে, কিন্তু আমার প্রার্থিত বাস এলো না। আমার গন্তব্য অনির্দিষ্ট রয়ে গ্যালো। . **************** . সূচীতে . . .
একদিন রক্তাক্ত ঝড়ের শেষে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ২২.১১.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
একদিন আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেলে সমস্ত সংসার স্তব্ধ অরন্য হয়ে যাবে আসন্ন বিক্ষোভের প্রসব বেদনায়।
একদিন মেঘেরা জীবিত হয়ে ঝড় হলে জীবনের সমস্ত ঘরবাড়ী একাকার হয়ে যাবে রক্তাক্ত বিপ্লবের জন্মযন্ত্রনায়।
একদিন সকাল হবে ঝড় শেষ হয়ে গ্যালে পাখিরা গান গাবে নীড়ে আমার চোখের কাক আলোর মখমল বেয়ে উড়ে যাবে নীহারিকা নভে। . **************** . সূচীতে . . .
অবস্যম্ভাবী পরিনতির পূর্বাভাষ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ১.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
জীবন নামক মহাপ্রশ্নের ভুল সংজ্ঞা দিয়ে অবলীলাক্রমে যারা ঘুরিয়ে নিলে আবহমান গতি তোমরাই বেঁচে গ্যাছো, বেঁচে আছো তবে বাঁচবে কিনা জানি না।
শোষনের বিষে ভরে গেলে সর্বত্র মুষ্টিবদ্ধ হাত জেগে ওঠে প্রতিবাদে এ কথা তোমরা জানো। রাজপথ রঞ্জিত হলে নিষ্পাপ রক্তে আগামী সম্ভাবনা দৃঢ়তর হয় এ কথাও তোমরা জানো।
শুধু রক্ত নিলে রক্ত দিতে হয় সেটাই ভুলে গ্যাছো অথচ তোমরাই বেঁচে গ্যাছো, বেঁচে আছো তবে বাঁচবে কিনা জানি না।
মেঘের ভেতর বজ্র আছে এ কথা সত্য যেমন রক্তে আগুন থাকে, বিক্ষোভ থাকে এ কথা আমিও জানি, তোমরাও জানো বুলেট নির্ঘাৎ প্রতিবাদ হয়ে ফিরে আসবে--
অথচ তোমরাই বেঁচে গ্যাছো, বেঁচে আছো তবে বাঁচবে কি না জানি না। . **************** . সূচীতে . . .
ভাগ্য নামক জ্যামিতিক ভগ্নাংশ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৪.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
কান্না জমে থাকে বরফের মতো গোপনে বুকের ভেতর জমে থাকে কান্নার মেঘ। মেঘ হয়ে বর্ষা হয় মেঘে মেঘে ঘর্ষনে জন্মে তড়িং, সংজ্ঞাহীন নিয়ম এক জ্যামিতিক সংজ্ঞা জ্যামিতিক ভগ্নাংশ।
জীবনের সমস্ত প্রেম অভিমান হয়ে গেলে সমস্ত কান্না বিরহ হলে,
নিজস্ব প্রেমপ্রীতিহীন সুটকেসখানা বা হাতে তুলে নিয়ে যদি হেঁটে যাই চির পরিচিত ফুটপাত বেয়ে মুদিখানার ছড়ানো প্যাকেটগুলো গৃহিনীর বাড়তি-আয় পুরোনো পত্রিকা
আর আমাদের হতাশার জঞ্জালসমূহ প্রেম স্নেহহীন সুটকেসে ভরে নিলে নিউ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠা নামক ডাবল ডেকার। বিষন্ন মধ্যাহ্নে আমাকে কখনো তুলে নেবে না, হায় তুলে নেবে না। কেননা ভাগ্য নামক জ্যামিতিক ভগ্নাংশের গোপন নিয়ম আমার জানা ছিলো না।
তাই আমার এবং আমাদের অঙ্কসমূহ আজো উত্তরে গরমিল রয়ে গ্যাছে। . **************** . সূচীতে . . .
মাধবীর অবিশ্বাস্য স্মৃতি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনা ৪.১২.৭৩। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
মাধবী কাল চলে যাবে।
ওর হাতে ফুলগুলো তুলে দিয়ে বোল্লাম ‘তুমিও কি ফুল হয়ে ঝরে যাবে?’ ও নির্বাক উদাসীন। ওর কাকের পাখার মতো কালো চোখ মুহূর্তে জলে ভরে এলো মৃদু কাঁপলো পাপড়ি গুলো।
সদ্যকেনা জ্যামিতি বক্সের চকচকে পিঠের মতো ওর চোখ জ্বলজ্বল কোরে উঠলো। লাল পেড়ে শাড়ীর মতো ওর ঠোঁট ও কথা বলতো গানের মতো য্যানো অনুরোধের আসরের চিরপরিচিত কোনো কন্ঠস্বর।
ওর ঠোঁট কাঁপলো থির থির থির থির ছায়াছবির ভেল্ভেট্ স্ক্রীনের মতো। ও আমাকে জড়িয়ে ধরলো শিশুর মতো কাঁদলো ও।
ওর লাল ঠোঁট বার বার কাঁপলো ও বোল্লো ‘আমি তোকে ভুলবো না কোনোদিন।’
অথচ এই মাধবীই বলতো প্রায়ই বলতো স্মৃতি বোলে কোনো কিছুই আমি বিশ্বাস করি না। . **************** . সূচীতে . . .
অনুভূতিহীন বিকেলে তোমার প্রত্যাশা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আমাকে সম্পূর্ন অনাত্মীয় ভেবে যখন চলে গেলে তোমরা বৈকালিক অনুভূতি মাঠের শিয়র ঘেঁষে রাস্তাটি তখনো শুয়ে ছিলো বিবশ শরীরের মতো উদোম অথচ আমার তো যাওয়া হলো না কোনোদিন।
নির্ভেজাল বেহালাটা নিয়ে আনমনে তুলে যাই অতি চমৎকার রঙিন ফুল সুরের রুমালে এবং তুলে যাই, তুলেই যাই।
দৃষ্টির উড়োজাহাজও প্রপেলারহীন এলোপাথাড়ি উড়ে হারায় পথ। এখন সংগীত চাই---যন্ত্রের চীৎকার কর্কশ ভায়োলীন, গীটারের উন্মাদনা এ সব থাক। মুখ বুজে পেছনে তাকালেই ‘ঝর্না’র মতো তুমিও চলে যেতে চাইলে বুকের পলেস্তারা ভেঙে।
আমার জানালার সম্মুখে তাহলে কি ডাকবে কালো কাক অসময়ে কর্কশ স্বরে।
তোমরাও চলে গেলে বৈকালিক অনুভূতি আমাকে অনাত্মীয় ভেবে এখন তুমিও যেতে চাও! রাস্তাটি তখনো শুয়ে ছিলো উদোম তবু আমার তো যাওয়া হোলো না কোনোদিন। . **************** . সূচীতে . . .
অবকাশে নিহত চিঠির শব কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এইতো খুলে দিয়েছি জানালাটা সবেমাত্র। নীরবেই তাকিয়েছিলাম অনেক্ষন ইথারের স্বচ্ছ আবরন ভেদ কোরে। সম্মুখে খোলা বই বিজ্ঞানের, যার নিরর্থক অর্থ চিরদিনই দুর্বোধ্য রয়ে গেলো আমার কাছে।
এইতো রঙিন বৃষ্টি---ঝরছে ঘুমন্ত শহরে হয়ত সবাই এখন ঘুমিয়ে। অথবা এমনি কেউ কেউ দক্ষিনা মেঘ উদ্দেশ্যহীন বাতাসে। তোমার কান্নার মতো বর্ষা ঝরে, কতোদিন আমি দেখি না তোমাকে! বুকের রক্তের উপর প্রতিফোঁটা বৃষ্টি নরোম হাত রাখে সস্নেহে যেমন তুমি রাখতে, তা কি আজো মনে পড়ে কোনোদিন অবৈধ চাঁদের আলোয়?
বর্ষা ক্রমেই বাড়ে। আরো আরো--- তুমি কাঁদো কাঁদো। আমি এক বুক অশ্রু চাই তুমি কাঁদো আরো গভীর হয়ে।
জানালা কি এখনো খোলাই রয়েছে অসম্ভব অভিজ্ঞ বর্ষার ফোঁটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এসে কখন ভিজিয়ে গেছে আমার অনেক অজান্তে