বার্থডে কেকের ভেতর মৃত্যুর পদধ্বনি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
জন্মদিনে আমি মৃত্যুর কথা ভাবি, দ্বিখণ্ডিত বার্থডে কেকের ভেতর মৃত্যুর ছায়া ঘুরে ঘুরে নাচে আমি দেখি--- বন্ধুদের করতালির ভেতরেও শুনি মৃত্যুর অনাহূত শব্দ!
একটি শিশু জন্ম নিলে আমি তার পিতার ঠিকানা সন্ধান করি এবং জারজ জন্ম ব'লে তাকে ভালোবাসি একান্ত মনে মনে।
মুহূর্তের আনন্দে আমার জন্ম জারজ ছাড়া আমার দ্বিতীয় পরিচয় নেই মূলত আমরা প্রত্যেকেই অজন্মা জাত!
এবং জন্ম মানেই মৃত্যুর প্রতি অমোঘ যাত্রা জন্মদিন মানে একটি সিঁড়ি অতিক্রম
জন্মদিনে আমি মৃত্যুকে ভয় পাই জীবনের প্রচণ্ড করতালির ভেতর শুনি মৃত্যুর নিঃশব্দ চারন।
এক একজন জারজ জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে ক্রমাগত হেঁটে যায় কখনো জানে না সে মৃত্যুর মতো
অতলান্তিকে ধূসর দিগন্ত দেখে ফিরিয়ে নিয়েছো মুখ। সাগরের কতোটা গভীর তুমি দেখেছো কতোটুকু বিশালতায় তার রেখেছো স্পর্শ
আকাশে চুম্বন রেখে ফিরে গ্যাছো ব্যর্থ এবং নীহারিকা নক্ষত্রে তুমি ছুঁয়েছো আশা মূলত হদয়ের সুস্থ ঘোড়টিও ছুটবে দারুন। হৃদয় আকাশকে করেছে বিশদ অতিক্রম হৃদয়ের কতোটুকুই বা চিনেছো তুমি তুমি কতোটা গভীরে তার রেখেছো করতল
রক্তে আমার লুকিয়ে ছিলো সোনালি রোগ কৃষ্ণচূড়া মধ্যরাতে অকাল খেলায় ডাকতো সেদিন রম্য আলোর মগ্ন স্নানে।
এখন বুকে সুরম্য এক ঢেউয়ের সাগর যখন তখন বাজায় বিপুল আরাধ্য সুর
করাঘাতের শব্দে আমি জাগবো না আর আর কখনো দুয়ার আমার খুলরো না।
দিনরাত্রি খুলছে পোষাক তোমার চোখে অপেক্ষার এক অবোধ বৃক্ষ বাড়ছে ধীরে, স্বীকার করি রাত্রি আমার আজন্ম সুখ জন্মাবধি ধূপের কোমল গন্ধমালা ছড়িয়ে আছে স্বজন হাওয়া চতুর্দিকে, মায়ের স্নেহ ক্রমান্বয়ে হচ্ছে সুদূর---
এই শহরে শরীরময় ঘামের মতো অন্তরঙ্গ ভালোবাসার গন্ধ নিয়ে মাটির দিকে থাকবো ফিরে ব্যতিক্রমী---
চৈতন্যের সবুজ মাঠে করাঘাতের উগ্র নিশ্বাস টের পাচ্ছি সকল সময়
সকল কাজে স্মৃতির মতো রোদ উঠছে হাওয়ার স্বরে বেজে উঠেছে নীল করাঘাত। তবু তো এই দুয়ারখানা খুলবে না আর আর কখনো রাতজাগা চোখ অপেক্ষাতে দগ্ধিভূত মেলবে না তার আপন ভূবন। . **************** . সূচীতে . . .
জীবনের ফ্লাটে এক একজন ভাড়াটে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
জীবনের সুদীর্ঘ ফ্লাটে একটি ছোট্ট রুম ভাড়া নিয়ে আছি আমি একজন ব্যতিক্রম ভাড়াটে।
অথবা আমি নই আমরা প্রত্যেকেই এক একজন ব্যতিক্রম ভাড়াটে ছোট ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি ভাড়াহীন ভাড়া দিয়ে থাকি
আবার সময় নিহত হলে আমরা অন্যত্র কোথাও চলে যাই।
কোথায় যাই? কেউ তো বলে না উত্তরহীন সকলেই ঘর ছেড়ে দিয়ে যাবতীয় আসবাব গহনাপত্র ফাইল শার্ট প্যান্ট পুরোনো স্যাণ্ডেল কবিতাবলী কালের ব্যাংকে জমা রেখে নির্ভবনায় চলে যায় অবিকল ঘর ছেড়ে চলে যায়।
আমাকেও তাহলে কি এম্নি চলে যেতে হবে ঘর ফেলে আসবাবপত্র!
আমার অপ্রকাশিত কবিতাগুলো আমি কার জিম্মায় রেখে যাবো তবে। স্বাতি নামে যে মেয়েটি আমারি পাশের রুমে থাকে তাকে দেবো নাকি জনতার কর্ষিত ক্ষেতে ছড়িয়ে দেবো কবিতার ধান!
অথবা একটি ফুলের সতীত্বের মাঝে শুকিয়ে রেখে দেবো সূর্য আমার সমস্ত শব্দাবলী কবিতা ও কবিতার অন্তর্বাস।
একটি ভীষন ডাকাত যে কোনো মুহূর্তে সব কিছুই লুটে নিতে পারে জাহাবাজ একটি ডাকাত কালের সোনালী ডাকাত।
আমি জানি রুমটি ছেড়ে দিলেই জনৈক আর একজন হবে তার মালিক পাশের ঘরের দুঃখিনী মেয়েটি শুধু দীর্ঘস্বাস ফেলবে আর কিছুই হবে না।
আমার ঘরের জানালাগুলো আবার খুলবে রোদ এসে আছড়ে পড়বে তকতকে মেঝেয় গুলিবিদ্ধ বিমানের মতো---
আমি প্যাকেটের নতুন একটি সিগারেটে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
আজকাল ট্রেন বড়ো অনিশ্চিত অসময়, তাই সন্দিগ্ধ বসে আছি প্রাচীন চেয়ারে। নিদ্রার চশমা ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত এক চোখ হতে অন্য চোখ সর্বত্র সব চোখ--- বুড়ো স্টেশনে ধবল গার্ড ধূসরতম পুলিশ।
অংকে শায়িত শিশু নিদ্রায় নিমজ্জিত স্বামী শুধু মেয়েটির দুটি চোখ অপলক স্থির, নিকোটিনের ধোঁয়া আমার চারিপাশে সুরম্য এক কারাগার করেছে রচনা অচ্ছেদ্য ব্যূহ। য্যানো এ কয়েদখানায় কতিপয় আসামী আমরা অনির্দিষ্টকাল ধরে মুক্তির প্রতীক্ষায় সময়ের ক্যালেণ্ডার দেখে দেখে নিষ্প্রভ---
কপালের লাল টিপে তার বাঁধা ছোট্ট সংসার নিরবচ্ছিন্ন সান্ত্বনা য্যানো সুখী গৃহিনী এক।
নির্নিমেষ চেয়ে থাকা লক্ষ্যহীনতায় আমি এক লক্ষ্যকে খুঁজে খুঁজে ব্যর্থ বারংবার, অলস হাতে সে সরায় কপালের এলোমেলো চুল।
অতীতের স্মৃতিগুলো সযত্নে হৃদয়ের কপাল থেকে য্যানো সরিয়ে রাখে।
কখনো ফেরায় চোখ, আমাকে দ্যাখে, অনুভূতিহীন দেখে দেখে আবার দ্যাখে না আকাশী লাজুক শাড়ি আঁচল ভেঙে পড়ে কখনো। সুডোল হাতে দোলে দুখানা চিকন সোনার চুড়ি স্নেহের কোমল দোলায়।
আমি পুনর্বার ফিরে যাওয়ার মতো আরেকবার ফিরে যাই অতীত স্বপ্নে অথচ কোথাও খুঁজে পাই না সিঁদুরের টিপ, প্রেমের শাঁখা।
কয়েদীর মুক্তির দিনের মতো ট্রেন হুইসেল দিতে দিতে জানায় আগমনী নৈশব্দের দেশে। হঠাৎ ফিরে আসা বিদ্যুতের মতো জেগে ওঠে স্টেশন নিদ্রার সুনরোম সানগ্লাস খুলে রাখে সকলে।
স্বামীর সহযাত্রী হয়ে মেয়েটি বেরিয়ে যায় ট্রেনের উদ্দেশ্যে পেছনে জেগে থাকে ওয়েটিংরম।
আমি আমার প্যাকেটের নতুন একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করি। . **************** . সূচীতে . . .
স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক কৃষ্ণচূড়া কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
এই যে এখন বসে আছি যে টেবিলে সামনে রাখা সাজিয়ে নিপুন বইএর সারি একটু ডানে জলরঙে কাঁচ কলমদানী দুইটি কলম একটি গাঢ় রাত্রি কালো অন্যটি বেশ হালকা চমক সোনালি রং।
দুদিন পরেই এই টেবিলটি পুরোনো হবে এসব কিছুই অচেনা হবে চিনতে গিয়ে ভুল কোরবো স্মৃতির চশমা উল্টে যাবে।
এই যে এখন আলুথালু মাতাল মাতাল বইছে বাতাস ফুলগুলো সব তারার মতো জ্বলছে নিখুঁত---দুদিন পরেই এসব আবার অচেনা হবে চিনবো না আর কোনোদিনও।
আজ সকালের সবচে' দামী খবরে কাগজ দুপুরখানা না গড়াতেই সবার থেকে সস্তা হবে ডাল লবনের প্যাকেট হবে।
এই শহরের বাড়িগুলো ফি বছরই হোয়াইটওয়াসে দীপ্ত হবে আমার কাছে প্রতিবারই নতুন কোরে অচেনা হবে।
কিন্তু তোমায় কোনোদিনই পুরোনো কিংবা অচেনা হলে যারে না বলা একমাত্র তুমিই শুধু চিরদিনই থাকবে নতুন ; চেনা পথের দরোজা দিয়েই তোমার কাছে আসবো যাবো ; আসবো যাবো--- শুধুই যাবো। . **************** . সূচীতে . . .
প্রতিদিন কিছু কিছু ইচ্ছা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।
প্রতিদিনই কিছু কিছু ইচ্ছা মরে যায় অনিচ্ছাকৃত মরে যেতে হয় অযত্নে মরে যায়। প্রতিদিনই কিছু কিছু ইচ্ছারা নির্বাসিত হতে বাধ্য হয় নিবাসিত হয়।
ব্যর্থ প্রেমের মতো কিছু কিছু ইচ্ছা স্মৃতির অসুখে ভোগে দীর্ঘদিন, কিছু কিছু ইচ্ছা স্বইচ্ছায়ই হত্যা করি ইচ্ছার হননে বিবর্ণ হই বার বার তবু হত্যা করতেই হয়।
প্রতিদিন কিছু কিছু ইচ্ছাকে মহাত্মা অনুভবসম্পন্ন দ্যাখায় কিছু কিছু কালো ইচ্ছা সাহসে ভর করে উজ্জিবিত হয়
তবু ইচ্ছাকে নির্বাসন দিতে হয় কিছু কিছু ইচ্ছাকে প্রতিকূল হাওয়া বইলেই ইচ্ছার মৃত্যু হয়।
অতঃপর সমস্ত নিহত ইচ্ছারা একদিন পবিত্র ঈশ্বরে পরিনত হবে। . **************** . সূচীতে . . .