কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
কালের উপহার
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ১০ চৈত্র ১৩৭৮, লালবাগ।  “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

উপহার যাহা দেয় কালের রানী
জানিবে সকল তোমার মঙ্গল বানী।
সহসা দুখের ভারে হৃদয় ভরে
বুঝিবে হাসি আছে তাহার করে।
ঝরায় কুসুম যদি প্রভাতবেলা,
বুঝো না এ তাহার নির্মম খেলা,
তোমার সুখের লাগি এ বাসর গ'ড়ে,
দিয়েছে রূপ রস সুধায় ভরে।
মিলনের মাঝে যদি ক্ষনিক ব্যথা আসে,
এ তাহার মিলনেরে বড় ভালবেসে।
ক্ষনিক আঁধার শেষে আলোর ছোঁয়া
প্রিয়াকে আপন করে আরো কাছে পাওয়া,
তোমায় সুখ দিতে ব্যথা আনে তাই,
তোমার কল্যান ছাড়া কাম্য কিছুই নাই।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নির্লিপ্তা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ২রা বৈশাখ ১৩৭৯ লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

হৃদয়ের গহন নীড়ে
নয়ন যমুনা তীরে
কোনদিন পেয়েছ কি মোরে,
মোর ছবিখানা
আঁকিয়াছ কি কভু স্বপন ঘোরে!
গাহিয়াছ কভু মোর গান
সহসা ব্যাকুল প্রানে
জাগিয়াছ নিশিথ বেলা,
আবেগে গাঁথিয়াছ কি মিলন মালা!
কোনদিন কোন চাঁদনী রাতে,
যবে হাসিয়াছে ধরনী আলোক সাথে,
একেলা নিরজনে অনুক্ষন আনমনে
ভাবিয়াছ কি মোর কথা,
উচ্ছল হয়েছে কি পুঞ্জিত ব্যথা!
মরম সরসী নীরে
মানসী নলিনী ঘিরে
হাসিয়াছে শিশির মুকুর
যমুনার হিল্লোলে সলিল কল্লোলে
স্মৃতিবিনা সুমধুর।
কভু কি কোন ক্লান্ত গোধূলি শেষে,
জানিয়েছ সান্ত্বনা হেসে?
কভু কি মুছায়েছ আঁখিজল?
পরায়েছ কণ্ঠে ফুল ; অবশেষ যার ভুল
ঝরা শিশিরে বনতল।
আমি কি তোমার সেই পথিক কবি,
আঁকিয়াছে হৃদে যেগো স্বপন ছবি?
কুয়াশার ছলনায়
সহিছে সবি ওগো নিরব ব্যথায়।

কত ছল আঁখিজল, কত ফুল দল
কতো সরসী নির্মল।
হাসিয়া ঝরিয়া গিয়াছে কাঁদিয়া
ফাগুন ফিরিয়া গেছে বৃথা সুর সাধিয়া।
পরাতে পারিনি মালা
কণ্ঠে তাদের হেসে,
তুমি কাঁদিয়াছ মোরে ভালবেসে।
জ্বালায়ে লয়েছ বুকে অনল পাষান,
শ্যামল শোভা ভরা জীবনের তীর
হয়েছে মরুময় শ্মশান।

প্রদীপশিখায় সঁপিয়া আপনি
অঙ্গার হয়ে শেষে,
তুমি পুড়িয়াছ মোরে ভালবেসে।
তোমার দগ্ধ হৃদয়
সকল হারান ব্যথায়
জ্বলিছে অনুক্ষন ধরি,
ব্যথার কল্লোলমালা
কাঁদিছে তোমায় ঘিরি।

আমি তোমায় পারিনি কিছুই দিতে,
বুকের গহনে বাঁধিয়া নিতে।
ক্ষমা করো সখি মোরে,
প্রাথনা মোর রেখে গেনু তব দ্বারে।
উজ্জল করি সাজায়ে পরিপাটি
নাহি প্রয়োজন এ মোর বাটি
রূপরসে মাধুরী ভরাবার।
দুরন্ত আমার মুক্ত পারাবার।
তটিনীর তীরে বসি কোন দিন,
বিস্মৃতি মাঝে ডুবে যেতে লীন---
মোর গানের প্রসাধ স্ম’রে
কেঁদো না। ভুলে যেও মোরে
চির জনমের তরে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আলোছায়া
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ২রা বৈশাখ ১৩৭৯ লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

পশ্চাতে কাঁদে মোর ভীরু ভালবাসা,
সম্মুখে ডাকিছে ঐ নতুন আশা।
ঝংকার সুর রেশ মিলায়ে যেতে,
চাহিছে হৃদয়ে তারে লইতে গেঁথে।
নতুন কুসুমকলি কর ইশারায়,
তাহার মাঝে আজি বাঁধিবারে চায়।
কাহারে বাঁধিব প্রানে?
যে হাসে সেই আসে ভেসে যায় বানে।
কাহার লাগিয়া রচি বাসা এইখানে,
কিছুই রহে না এই আর্শি মনে।
চলো সম্মুখে চেওনা ফিরিয়া পিছে
অতীত যাহা তা সকলি মিছে।
অতীত বৃন্ত রচে বর্তমান ফুল,
ভবিষ্যৎ দাঁড়ায়ে দুয়ারে গাঁথিছে গো ভুল।
নহে ভুল--- ফুল হয়ে ঘ্রান লয়ে
হৃদয়ে বাঁধিবে বাসা,
নতুন আসিছে লয়ে স্বপন আশা।
ভুল যাহা--- ভুলই যাহা
ফুল তাহা কভু নয়,
বনতলে ঝরা যাহা
বুনো পথে রয়।
ফুল হাসে ভুল লয়ে
ঝরে যায় তাই,
অতীতের মাঝে আমি লুটাইতে চাই।

অতীত বাঁধিয়া পাশে
যে জন মধুরে হাসে
সমুখে ডাকে তারে কালো যমুনা,
ব্যর্থ কূজনে রবে আশা কামনা।
অতীত যাহা থাক
ভাসিয়া যাহা যাক
সমুখে বাড়াও বাহু,

আশার তরনী বেয়ে
কালের সাগর ছেয়ে
ওপারের তীরে,
ভাসাও শালতি নদে ধীরে।

পেছন কাঁদিবে মায়া,
ডাকিবে শ্যাম বনছায়া,
তবু ছাড় নাওখানি,
উজান স্রোতধারা সজোরে টানি।
অতীত বুকে লয়ে
সমুখের গীতি গেয়ে
বীনা বাঁধ সুরে,
এ ধারা রচিয়া গেছে তটিনীর তীরে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মন-মানসী
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ১২ বৈশাখ ১৩৭৯, লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এ ফুল যাবে গো ঝরে,
এ মালা যাবে গো ছিঁড়ে।
সাঁঝের এ প্রদীপ যাবে নিভে
তবু তুমি আমারি রবে।
এ পথিক যাবে চলে,
এ পান্থে কুটির ফেলে।
আশার স্বপন অস্তাচলে যাবে,
তবু তুমি আমারি রবে॥

এ চাঁদ রবে না গগনে,
এ ঘ্রান ছড়াবে নাহি পবনে।
বাসর রজনী বিস্মৃতি মাগিয়া লবে,
তবু তুমি আমারি রবে॥

এ চলা মোদের হবে গো শেষ,
রহিবে না এ মায়া কুসুম বেশ।
নতুন পুষ্প মাতিবে নতুন সৌরভে,
তবু মানসী তুমি আমারি রবে॥

যেখানে রহিবে ওগো যে ফুলের বনে,
যে মায়া বাঁধিবে আসি যে মধুর ক্ষনে।
কণ্ঠে শোভিবে যে হার যে বাসরঘরে,
যে ফুল হাসিবে ওগো কবরী পরে।
আমার সকলি ওগো ভাবিও সেথায়
যে আশা ঝরে গেছে রাতের ছোঁয়ায়
সকলি ভাবিও মোর
যে বেদনা আঁখিলোর
সবি মোর উপহার,
কিছুই ছিল না প্রাপ্য তোমার।
তুমি চেয়েছিলে আনন্দমেলায়
অস্তগোধুলি সাঁঝের বেলায়
গন্ধ হানার ঘ্রান,

তুমি চেয়েছিলে সঙ্গীতমাখা প্রান।
আমার সাগর ভাসিয়া তুমি
হৃদয়ে লয়েছ সব,
তোমার মিলন সুখের বীনায়,
জেগে আছে ব্যথা রব।
আমার ব্যথায় তুমি জেগে রবে
তোমার সুখে বাঁধিয়া লবে
আপন করিয়া মোরে,
তোমার ব্যথার সকল কুসুম
দাও মোর প্রানে ভরে।
সে ফুলের মালা তোমার আমার
বিরহের সুর হয়ে,
চির জনমের বাঁশরীর তালে,
এ জীবনে রবে ছেয়ে।

সকলি নিঃশেষ হোক,
সব ব্যথা প্রানে রোক
সব আশা ঝরে যাক আঁধারে নিরবে,
তবু তুমি আঁখিজলে মোর
চিরদিন জেগে রবে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মালা বদল
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ১২ বৈশাখ ১৩৭৯, লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

সেদিন এসেছিল বাসরবেলা
হয়নি বদল মালা,
ফুটেছিল ফুল সৌরভ ঢালি
রচেনি বরন ডালা।
মোদের বরনে হাসিয়াছিল
রাঙা গোলাপ ফুলে,
হয়ত তোমার ললাটের টিপ
ওঠেনি আলোয় জ্বলে।
লওনি আঁচলে ঢাকিয়া লাজুক আঁখি,
ওঠেনি কুঞ্জে পাপিয়া কোয়েলি ডাকি।
তবুও মোদের বাসর হেসেছে
মাল্য দানে আজি,
মোদের জীবন বন্দনমালা
আজিকে উঠিল সাজি।
এ মালা যাবে ঝরে
নিরবে শুকায়ে হায়,
তবু সে বাঁধন অম্লান রবে
হৃদয়ে বেঁধেছি যায়।
যত দিন বয়ে যাক কালস্রোত ধরি
যত ছবি মিশে যাক বিস্মৃতি স্মরি।
যত ব্যথা স্মৃতি হোক
যত সুখ ঝরে রোক
জীবন ছোঁয়ায়,
তোমার হাসি-অশ্রু
রহিবে আনন্দ ব্যথায়
আমার হৃদয়ে চিরদিন।
বেজে ওঠে সহসা যদি বিদায়ের বীন।

আঁখিভরা জল নিয়ে যদি যাই চলে,
জলের কনিকাগুলো মিশায়ে কাজলে
বেঁধে রেখো মর্মর পত্রপল্লবে।
মোর হাসিটুকু মিলাবে যবে

বনানীর প্রান্ত সীমানার পারে,
কুসুম সৌরভটুকু তার রাখিও ধরে।
স্মৃতির অতল গহনে নয়---
নহে তা চোখের জলে,
রাখিও বাঁধিয়া তায় হৃদয় তলে।
জানিবে না কেহ কোনদিন
বুঝিবে না কেহ তার ভাষা,
নিরবে সকলি থাক
মোদের যত আশা।
তুমি জাগো আমি জাগি
এ বন্ধন রবে জেগে,
ফুল্ল যুথিকা অম্লান হেসে
আঁখিপাতে অনুরাগে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মায়াডোর
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ১৩ বৈশাখ ১৩৭৯, লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এসো এসো বাঁধো বাসা নীড়ভাঙা দুটি প্রানে,
এসো গাহি গান নিরবে নিরজনে।
এ গানের আছে ভাষা নেই সুরধ্বনি,
মহান করিব মোরা হৃদয়ের সুধা আনি।
যে ছবি আঁকা আছে রংহারা হয়ে,
যে নদী হারাপথ বুনো পথ বেয়ে।
এসো মোর প্রানে এসো সব
আবার বাঁধিব ঘর,

রাতের আঁধারে হাসিয়াছে নবীন উষার কর।
বিরহীর প্রানে আঁকিয়াছে চাঁদ আনন্দ মিলন রেখা,
সকল স্মৃতি থাক হৃদয় মানসে আঁকা।
সব ভুলে এসো সখা বাঁধিব খেলার ঘর,
সব থাক অলক্ষে কে আপন-পর।
হারিয়ে যাবার দেশে মায়াডোর যাবে কেঁদে
স্মৃতি বৃথাই রহিবে বীনা স্বরলিপি সেধে।
সব কিছু থাক, এসো তোমাতে আমায়,
বন্ধন রচি এক---এ কালের চলায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হিসাব লিপি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ১৫ বৈশাখ ১৩৭৯, লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১)
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয়
খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

সব ভাষা মোর মূক হয়ে গেছে ঝরা বকুলের মত,
হঠাৎ করিয়া থামিয়া গিয়াছে জীবনের গান যত।
মুক্ত বিহঙ্গ নীলাম্বরে সায়কের বিষ পিয়ে,
সব সাধ তার নিশ্চল হয়ে নিতে গেছে তৃষা লয়ে।
নিয়তি যাহার ছলনায় বাঁধে, বাসর যাহার কাঁদে,
সান্ত্বনা তার কোথায় বলো কিসের স্বপন স্বাদে।
সব ফুল মোর কাঁটা হয়ে আছে কেমনে পরিব হার।
এই আঁখি মোর পথ চেয়ে রয় ফাগুনের তৃষা লয়ে
যেতে যেতে যদি ফিরিয়া আসে আমার এপথ বেয়ে।
কবে কোথা কেবা ক্ষীন আশা লয়ে তুলিয়া দিয়েছে ফুল,
আজিকে হেরিনু সকলি যে তারি ভুল।
জানি না কবে চাহিবারে কি চেয়েছি তোমার কাছে,
কি দিতে মোরে সেদিনের চাওয়া কিবা দিয়ে গেছে!
পেয়েছি কি আর পাইনি কিবা হিসাবের লিপি আজি
ভ্রূকুটিয়া হাসে বেদনার ব্যথারাজি।
হিসাবের খাতা ভরিয়া গিয়াছে অনেক বিরহ ভুলে
অনেক মুকুতা হারায়ে শেষে ঝিনুক লয়েছি তুলে।
কিবা মোর আছে আর---
সবি তো হয়েছে সার,
যত গান যত ছন্দ সুর ; শেষ হয়ে গেছে,
শুধু হিসাবের লিপি মোর
নিরবে লিখিয়া নিছে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেয়সী
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
রচনা ৭ জ্যেষ্ঠ ১৩৭৯, লালবাগ। “খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের
কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত “রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে।
কবির বানান।  

“একি বেশে আজি আসিয়াছ সাজি
মিলন নিশি রাতে।
কেন আঁখিজল করিছে টলমল
কাজল নয়ন পাতে।
সখি, কেন ও চপল নয়ন
ব্যথাতুরা উদাসী,
কেন সুকোমল মুখ পরি রাখিয়াছে ঘিরে
শরতের ঘন মেঘদল আসি?
চাহ মোর পানে আনো সুষমা সুরভি প্রানে
এ রাতি কেন যাবে ফিরে,
দেখ চাঁদ যেতে যেতে অস্ত, অচল পথে
চাঁদনী মাখিছে দীঘির নীরে।
কেমন এ শান্ত সমির।
প্রানের গোপন বৃন্তে ফোটাইছে কলি,
শ্রান্ত কুয়াশা চুম্বন ঢালি
ভিজায়ে দিয়েছে মল্লিকা ফুলগুলি।
রাতের ডাহুকী ক্ষনকাল ধরি
ডাকিয়া মধুর রবে,
তোমার আমার মিলন বারতা
শুধাইছে একান্ত নিরবে।
তোমার আপন ছবি ভাসিয়া উঠেছে
আকাশ আর্শি 'পরে,
একাদশী চাঁদ বিদায় চুমেছে
অভিমানী মান করে।
আঁখিতে আঁখি মিশায়ে গো দেখো
কি সুধা জাগিছে পরানে,
কি উপহার তোমার লাগিয়া
জমা রহিয়াছে গোপনে।"
"সখা তোমাতে আমাতে আর
নাহি হবে দেখা,
মোদের সকল নিরব স্বপন
শুধু মিছে হলো আঁকা।
মোর যত গান রচেছিলে তুমি
তোমার ছন্দ সুরে,
লহ সখা সকলি তোমার,
মোর যাহা দাও ফিরায়ে মোরে।
তোমার হদয়ে মোর যে ছবি
আঁকিয়াছ রঙ্গে রূপে,
সবি তার ওগো দিও বিসর্জন
সন্ধ্যাবরন ধুপে।
আমি তোমারি হয়ে একদিন
আজিকে চলিনু ফিরিয়া,
আপনি সাধিয়া বেঁধেছিনু মালায়
আপনি দিলাম ছিঁড়িয়া
ডেকেছিনু পাশে, বেঁধেছিনু
দিয়েছিনু গলে মালা,
তুমি হেসেছিলে, নিরব ব্যথায়
আমি কেঁদেছিনু একেলা।
সখা, তুমি তো পাওনি ব্যথা
সকল বেদনা রোদন মোর,
আমি পুড়িয়াছি, আমি মরিয়াছি
সে মোর আঁখিলোর।"
"কেমনে কহিছ সখি!
হৃদয় বেদনায় ঢাকি ভুলিয়া থাকি তোমা
এতদিন ধরে তুমি মরিয়াছ পুড়ে
মোর প্রানে ছিল সবি জমা।
কহিও না আর তোমারে ভুলিবার,
মুছিবারে এ স্বপন মোর,
যে মালা গাঁথিয়াছ যতবার আসিয়াছ
আমি তো রুধিনি কভু দ্বার।
রহিয়াছি সারাক্ষন পথ চাহি, আনমন
নিঝুম নিশিথ জাগি,
স্বপন আবেগে মধুর সোহাগে
তোমার সান্নিধ্য মাগি।
কেমনে ভুলিব সখি, যে ছবি লয়েছি আঁকি
হৃদয় গহন পটে,
গাগরি ভরিতে জলে চলিয়াছ দুলে দুলে
শাপলা দীঘির ঘাটে।
ছায়া সরু পথ ধরি এ কি রূপ মরি মরি।
অঞ্চল উড়াইছে দক্ষিনা সমির,
দিনের অস্ত রবি করিয়া নিঝুম সবি
ঘিরিয়াছে পথবাঁক কাজল তিমির।
জোনাকীর ঘুম চোরা লোচন পাগল পারা,
উড়িয়া মাতিয়া সাজাইছে বন,
তোমার মধুময়ী ছবি হেরিয়া মরম কবি
ছন্দে ভরিছে মন।
এসেছিলে পাশে বসেছিলে হেসে
সেদিন সন্ধ্যামাধবী রাগে,
দিয়েছিলে ভরে এ হৃদয়, মোরে
বেঁধেছিলে লাজ-অনুরাগে।
তারপর সখি আসিয়াছে সাজি
বন বাসরের রাতি,
নিশিথ বিজনে হৃদয় কাননে
জাগিয়া প্রানের জ্যোতি।
তুমি কণ্ঠে আমার দিয়েছ পরায়ে
বদল মালার হার,
আমি দিয়েছিনু হৃদয় ভরিয়া
বেদনার আঁখি ধার।
মোদের এই ভালবাসা, এই জানাজানি
এ হৃদয় বিনিময়,
চিরদিন কিগো জাগিয়া রহিবে
নিশিখ জাগার ব্যথায়।”
“কেন এত প্রেম আজিকে তোমার
কেন এত বন্ধন মায়া?
যবে চাহিয়াছিনু তোমার পরশে
প্রানের সোহাগ ছায়া।
তখন কেন গো মিছে ছল করে
রহিয়াছিলে নিরবে দূরে
কেন গো বাঁধনি বীনা তার সুরে,
কেন গো দেখনি হৃদয় চাহিছে কারে?
কেন সথা আসি কহ নাই ডাকি
তুমি মোর---আমি তোমারি,
কেন দূর হতে বাসিয়া ভাল
কেন ঝরায়েছ নয়ন বারি?”
বুঝিনি কখন সখি তোমায়
বাসিয়াছি এত ভালো,
কখন, সখি এ প্রান ডুড়িয়া তুমি
দিয়েছ ভরিয়া আলো!
কথন আমার সব স্নেহ প্রেম
উৎসারিয়াছি তোমার লাগিয়া,
কখন আমার হৃদয় মরু
শ্যামলে উঠেছে ভরিয়া!
কখন আমাতে হাসিতে খেলিতে
তুমি যে গিয়েছ হারিয়ে,
দিয়েছ কখন সব সুধা তব
নিশিথে মাধুরী সাজায়ে।”
“দূর হতে দেখেছিনু সুকোমল সুরভি ভরা
একটি মনোহর ফুল, সন্ধ্যা পুরবে
উদিয়াছিল সন্ধ্যা তারা!
ভাবিয়াছি কত রাতি আনিয়াছি কত গাঁথি
হৃদয়ের রঙে রাঙায়ে,
আমার গোপন বাসনা সঁপিতে তোমার পায়ে।
তবু হয় নাই মোর পূরন সে সাধ
দ্বিধা সংকোচ-লাজ-ভয়ে,
পারিনি বাঁচিতে আপনি
সে মালা তোমারে তুলিয়া দিয়ে।
কতবার গেছি তোমার দ্বারে,
নব কত শত ছল অভিসারে,
সব লাজ সংকোচ রাখিয়া দূরে,
তবু পারি নাই কহিবারে।
তোমার আঁখির পানে চাহিয়াছি যতবার
হয়ে গেছি সখা মূক,
কি এক আবেগ পুলকে মাতিয়া
কাঁপিয়া উঠেছে বুক।
মোর চঞ্চল আঁখিপাতে
এত লাজ ভয় আসি
বাঁধিয়াছে যবে জানিয়াছি সখা
আমি তোমারে যে ভালবাসি।”
“সখি কেন তবে তোমাতে আমাতে এই গান গাওয়া,
মিছে হয়ে যাবে মোর এ পথ চাওয়া!
কেন তবে এতদিন ছিনু মিছে
ছলনার আশা লয়ে,
কেন সখা বেঁধেছিলে যদি যাবে
হৃদয়ে ব্যথা দিয়ে?
কি ছিল প্রয়োজন তবে
এ বাসর বদল মালার,
কেন তবে গেঁথেছিনু নিশিথে
স্বপনের মনিহার!
সুখের বাসরে রহিবে তারা হয়ে জ্বলি
তাই মোর বুনো কবিতার
নাই কোন মূল্য সখি
তোমার নিকটে আর”
“নহে প্রান, সুখ মোর কোথা বল,
চির দিন এ-তো হয়ে রবে আঁখিজল।
কোথা আছে এমন সুখ
যাহা তুমি দিয়েছ মোরে,
এতো সাধ মোর সখা
ছাড়িয়া যাইতে তোমারে!
এত সাধনার, এত বেদনার
এ মোর সাধের নয়নমনি,
কত কাল ছিনু পথ চাহি তোমা
কত দিন গেছি গুনি
প্রানে প্রানে যারে এতদিন ধরে
ফিরেছিনু খুঁজি খুঁজি,
পেয়েছিনু তারে বেঁধেছিনু তারে
বিদায় দিতেছি আজি!
একি মোর সাধ, শান্তি আমার
একি মোর তৃপ্তি বল?
সযতনে প্রানে যাহার লাগিয়া
গেঁথেছিনু ওগো সুখের কমল!
কি ব্যথা লাগে প্রানে বুঝিবে কেমনে
সখা, তুমি তার ভাষা,
তোমার লাগিয়া এতকাল মোর
জমে ছিল সব ভালবাসা
সকলি দিয়েছি তোমা, মোর
সব প্রেম, সব ফুলদল,
রাখিয়াছি শুধু আপনার লাগি
বেদনা নয়ন জল।”
“এ মোদের চাওয়া সখি নাহি হল পাওয়া,
শুধু রয়ে গেল বিধুর বেদনা
দুইটি হৃদয় ভরিয়া।”
“সখা যেথা যাই যতদুরে,
যেথা দুঃখ-সুখ পুরে
চিরদিন রহিব তোমার।
তুমি জানিবে, আমি জানিব
এ প্রেম শুধু তোমার আমার।"

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শান্তিপূর্ন সহ অবস্থান
(অন্তরঙ্গ অগ্রজ ফজল-এ খোদাকে)
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

চারিদিকে ক্ষুধার্ত জল ক্রমবর্ধমান
মাটির গ্রীবায় নেমেছে কঠিন আবহাওয়া
খরা দাও ঈশ্বর খরা দাও
প্লাবিত হৃদয় জলের গভীরতায় জল---
বন্যার প্রতিবেশী হয়ে থাকবো বলো
খরাহীন নিরুত্তাপ বসন্তে একাকী
নিজস্ব পরিকল্পনাধীন প্রকল্পে
এক রকম উদ্বিঘ্নে ছিলাম বহুকাল।
জল শত্রু হলো খরাও অচেনা
নিজেকে ছিঁড়ে খুঁড়ে বিবস্ত্র কোরে
একবার দেখে নিতে চাই---নিজেকেই
রক্তে বিবিধ কনিকার শান্তিপূর্ন সহ অবস্থান।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালো ধোঁয়া
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

অশান্ত কালো ধোঁয়ায় পৃথিবী
হঠাৎ করে ঢেকে গেছে---ছেয়ে গেছে।
স্বপ্নমাখা উজ্জ্বল আলোয় দিনের রবি
হারিয়ে গেছে দৃষ্টিসীমার ধূসর মেখে।
যন্ত্রগুলো আকুলভাবে
চিৎকার ক'রে ভাঙে মিনার স্বপ্লসৌধ,
ক্ষুব্ধ পাষান ভীষন রবে
থরথর কাঁপে কিসের যন্ত্রনায়।

পাখিগুলোর বাঁশী যে আর
ভোর হলে যে ঘুম ভাঙ্গায় না,
নদী বুঝি স্তব্ধ আজ ; নীরব তাহার
জল ছল ছল নূপুরধ্বনি চমৎকার।
কালো ধোঁয়া অশান্ত সব
করে দিলো--- নীড়ের নিদ্রা, পাখির বাঁশী,
হায়না গুলো তীক্ষ্ণ নখে
ছিঁড়ে নিলো শান্ত বুকের মিষ্টি হাসি।
কালো ধোঁয়া--- কেড়ে নিলো
খেয়ার মাঝির বুকের মানিক,
সিঁথির সিঁদুর মুছে দিলো
অঙ্গন বৌএর রাঙা ভালেয়।
কালো ধোঁয়া চুষে খেল
বুকের শীতল লাল রক্ত,
পথের 'পরে লাশের পাহাড়
সৃষ্টি হলো, শবের মিছিল
পথে পথে নদীর জলে।
কালো ধোঁয়া বুকের মাঝে
করলো ক্ষত বেয়োনেটের সুতীক্ষ্ণতায়,
শিকল ভাঙার অবৈধ গান
হৃদপিণ্ডের সতেজতা ; গুঁড়িয়ে দিলো
আগুন মাথা বুলেট ছুঁড়ে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর