কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
আমার গোপন ধর্ষনে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

সে আমার গোপন প্রেমিকা
সে আসে হিমেল রাত্রের চাঁদে
অথবা নিবিড় রাত্রির অন্ধকারে
একেবারে আমার বুকের প্রচণ্ড নিকটে।

বাসরের বন্ধনে তাকে কোনদিন বাঁধিনি
অথচ দেখেছি তাকে নির্ভেজাল
সম্পূর্ন মনের আপন আঙ্গিনায়।

আমি তার লাল ঠোঁটে চুমু খাই
ছিঁড়ে ফেলি অতিদ্রুত ব্রেসিয়ার এবং কালো ফিতে
উদোম স্ফীত নরোম স্তন দুটি
দুহাতে আদর কবি মৃদু পেষনে
বিলোল তলপেটে হাত রাখি অপূর্ব শিহরনে
অথচ বাধা তার পাইনি কোনদিন।

সে আরো গভীর হয়ে মিশে যায়
আমার গোপন হৃদপিণ্ডের মাঝে।
আমার কল্পনার উত্তেজিত যৌনাঙ্গ
দৃঢ় হয়ে প্রবেশ করে নরম যোনিদেশে
অদ্ভুত আনন্দে আমি পুলকিত হই।

তারপর সহসা জস্ম নেয় আশ্চর্য
সুন্দর এক একটি কবিতার সন্তান।
পরিচয় শুধু তারা পায় আমিই
একমাত্র পিতা তার--- কিন্ত অবৈধ মা
কোনদিন আসেনি প্রকাশ্যের সূর্যে।
হয়নি কখনো অত্যধিক রক্তস্রাব
অবথা বহ্বার আনন্দ ধর্ষনে।

তবু সে আমার গোপন প্রেমিকা
যাকে আমি বার বার করেছি ধর্ষন
অনেকগুলো সন্তানের প্রত্যাশায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমিই ব্যতিক্রম একমাত্র
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আমিই সৃষ্টির মাঝে একমাত্র ব্যতিক্রম ;
যা কিছু সৃষ্টি ছাড়া সবি তা আমার সৃষ্টি।
আমি প্রাসাদের আজীবন ব্লাডপ্রেসার,
এবং মর্টারের মারনমুখী যক্ষা,
তাই সাথী খুঁজে পাইনি চলন্ত স্টীমারে।

আমি ঠিকানাহীন পতিতার জারজ সম্তান---
হয়তো মা বলে ভাবি তাই পৃথিবীটাকে,
কেন না তোমাদের মা শুধু আপনারই।
হয়ত শতাব্দীর পিতৃহীন যীশু আমিও
কিন্তু তোমাদের স্থুল অভিধানে অশুদ্ধ তা।

আমিই ব্যতিক্রম একমাত্র--- এখানেই
কেননা আভিজাত্যের মুখোশে দিয়েছি লাগিয়ে
চলন্ততার দ্রাবিঢ় কালো আগুন, এবং যা
পুড়বে বিক্ষিপ্ত লাল লাল চক্র আকারে।

আমিই ড্রেনে কুড়িয়ে পাওয়া ফুটো পয়সা ;
এবং ডিনারের উচ্ছিষ্ট শেষ খাবারটুকু
বোন প্লেটের। আমিও এমনি পিষ্ট নির্দয়
ট্রামের তলার ক্ষুদ্র সবুজ বালকটি।

আমিই ব্যতিক্রম এখানে একমাত্র
কোথাও ভ্রূক্ষেপ নেই বিন্দু, ক্ষ্যাপা চৈত্রের
উন্মাদ ঘোড়ার মতো, সখেদে কখনো
উড়াই সোনালি কেশর প্রচুর বাতাসে।
রাত্রির গাঢ় বুকে পায় পায় হেঁটে যাই
স্পর্শ করি গোলাপের নিভাঁজ গোপন অংগ,
অথবা নিশ্চিন্তে চুমো খাই সৌঁদোলে ঘাসে।

সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে যাই সব চেয়ে উপরে ;
যেখানে আকাশ অসীম, বলাকারা নিশ্চুপ---
ঈশ্বরের ভক্ত দূতরা বিচরে যেখানে
আমিও চলে যাই। দেখি সহস্র পতিতার
বাহুগ্রাসে অন্ধ ঈশ্বর ; অথচ কেমন করে
আজ তোমায় প্রনাম করব আমি।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমার মাতৃত্ব
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আমার ধূসর আকাশে তুমি বাসা বাঁধবে?
কল্পনার রাজহাঁস হয়ে!
কিম্বা পিয়ালের বনে
অসংখ্য বুনো পাতার মাঝে
একটি শ্বেত শুভ্র ফুল হয়ে
বিক্ষিপ্ত পথে পা ফেলতে ফেলতে
আজ তুমি বিষন্ন ক্লান্ত,
নুড়ির আঘাতে তোমার অপ্সরা পা দিয়ে
সিঁদুরের মত রক্ত ঝরে।
আকাশ হতে সেই কতদিন
বৃষ্টির চুমোরা আসে না ;
চাতক চোখের দৃষ্টিকোন বেয়ে
অঝোরে অশ্রু ঝরে---
তুমিও কি কাঁদো?
বুনো কপোতীর মত নিঝুম রাতে।
সায়াহ্নের কালো কাকগুলো
দুটি পাখায় গান বয়ে আনে,
সন্ধ্যা আরতি শুধু তোমাকেই দিতে
বিথর তটিনীতটে দাঁড়াই একা।
কতটুকু দিয়েছি যুগ যুগ হতে
ভাবিনি, পেয়েছি কতটুকু
তাই নিয়ে দুঃখ সুখ।
রাত্রির কনাগুলো বরষার মত
এস্ত মেঘলার পরশ দিয়ে
ঝরে ঝরে পড়ে---
বনানী, শাখা, ফুলে, মাঠে
কিন্বা রাখালের ঝাউ বনে।
আরো নিবিড় ওষ্ঠের তপ্ততা
আমি পাই আমার শিয়রে।
ক্লান্ত কতগুলি সুন্দর পাখি
উড়ে উড়ে নেচে নেচে
তাদের সুবর্ণ পাখার চকমকি
আর অঙ্গের কসরৎ দেখিয়ে
বসে পড়ে আমার আঁখির পাতায়।
তখন তোমাকে ছাড়া আর কাউকেই
মালা দিতে পারি না
প্রথম বাসর রাতের
এখন শুধু তুমি,
চারি পাশে আর কেউ নেই,
রাত্রির অরন্যতা অতি প্রখর
ফেন পাখায় পাখায় লেপ্টে আছে।
রাত জাগা পাখির চোখে ঘুম,
হাসনু আমার @ শাড়ি খসে পড়েছে।
হালকা ধূসর মেঘের আঁচল
নক্ষত্রের আলপনা এঁকেছে।
আজ একাদশী দ্বিপহরেই তাই
চাঁদটা খসে পড়েছে,
বহুদূরে উঁচু শিমুল গাছটার
বুকের মাঝখানে
দৃ'চারটা শিশিরের জোনাকী
উড়ে যাবার সময় তোমার
এলিয়ে পড়া চুল গুলোর
রামধনু এঁকে যায়।
এখন শুঝু তুমি রাত্রির মত
একান্ত আপন।

তোমার শীতল বুকে চুমু দিয়ে
শুষে নেই সবটুকু সুধা,
আদি মাটির গন্ধে আমার আদিম
ক্ষুধার্ত হৃদয়টা জেগে ওঠে।
আমি নিকট আপন।
দেখি জোছনারাতের চেয়ে
তোমার স্নেহের পরশটুকু।
আরো প্রথর উজ্জ্বল।
হাসনু হানার গন্ধের চেয়ে
তোমার বুকে ঘর্মাক্ত
সেঁদেল শব্দ আমার ভাল লাগে না,
নিশ্চুপ দুপুরে স্রোতের পাশে
সুগন্ধ হয়ে শুনি তার গান।

কুমারীর মত মিষ্টি হাসলে
তোমার একটুও ভাল লাগে না,
যৌবনের সোপনে তুমি তো
অনেক আগে পা দিয়েছে,
এখন স্তনে দুগ্ধ এসেছে
জঠরের সন্তান কেঁদে ওঠে
ভূমিষ্ঠেরা চারি পাশে বুভুক্ষু
স্তনবৃন্ত তুলে ধরো সুখে,
নয়ত তোমার মাতৃত্বের অবসান।

তোমার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে
যখন অঘোরে ঘুমাব
তখন তুমি ধীরে ধীরে ব'লো,
তোমার বিগত যৌবনের কথা।

.        **************

@ আমার - গ্রন্থে তাই দেওয়া রয়েছে। আমাদের এটা মুদ্রণপ্রমাদ মনে হচ্ছে। আমরা
ভাবছি যে কথাটা “আমার”  এর বদলে “হানার” হবে না তো! তাহলে পঙ্ক্তিটি দাঁড়ায়
“হাসনু হানার শাড়ি খসে পড়েছে”। মুদ্রিত “হাসনু আমার @ শাড়ি খসে পড়েছে” পঙ্ক্তিটি
কি সঠিক মনে হয়!

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রক্ততৃষ্ণা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

হে আদি অধীশ্বর---
তোমার স্বৈরাচারী ইচ্ছায়
আমাদের কুশপুত্তলিকার মত
যুগ যুগান্ত ধরে নাচিয়েছ।
কি দম্ভ তোমার তুমি স্রষ্টা!
তোমার অন্যায়ের বিচার নেই ;
তোমার পাপ নেই ;
তুমি পুন্যের জহরত-এ গড়া!
এতদিন চোখের সম্মুখে
বিষ দিয়ে বলেছ অমৃত---
মাথায় বজ্রের বান হেনে
বলেছ এ তোমার প্রাপ্য!
আমার হৃদয়পদ্মটা দলে পিষে
শুধেয়েছ এ তোমার আপন কর্ম!

---কিন্তু দাবার গুটি তোমার
অলক্ষ্যেই নিজের কিস্তিতে আঘাত হেনেছে।

তুমি বুঝতেই পারোনি তোমার অজান্তে
তোমারই দেওয়া বিষ পান করে
আজ আমরা প্রত্যেকে নীলকণ্ঠ।
তোমার সৃষ্টির অসাবধানতায়
আজ আমরা প্রত্যেকে স্রষ্টা!
সহস্র বৎসর ধরে অগ্নিদাহনে
আজ আমরাই কাল দাবানল!
আমার রক্ত শুষে তুমি হয়েছ ঈশ্বর---
আমি স্রষ্টার সাথে সর্বক্ষন
দ্বন্দ্বে মত্ত, সংগ্রাম শুরু তাই---
ক্ষমা নেই ঈশ্বর তোমার ;
তোমার বুকের রক্ত পান করবই---

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৃথা রক্ত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আজ শ্মশানে করুন কান্না,
নির্জন কবরের পাশে আর্তনাদ,
ক্ষুব্ধ ব্যথাহত সদ্যযৌবনা কুমারী ;
মা, আত্মহত্যা করেও কাঁদে!
অসংখ্য আত্মা ক্রন্দনরত, ধিক্কারে
ছিঁড়ে ফেলতে চায় স্বাধীন সংসার,
তাদের বুকের রক্তে পা ভিজিয়ে
আনন্দে ভোজে মত্ত বিশ্রী খেঁকি কুকুর!
অবরুদ্ধ ক্রোধে অসহায়---
পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে
অপ্রকাশ্য নির্মম বেদনায়,
নিরবে আর্তনাদ করে সোনালি ধানক্ষেত।
আমরা নির্বোধ।
মাটির জন্য আমরা কাঁদি---
মাকে পারি না প্রকৃত ভালবাসতে!
একবুক রক্ত ঢেলে দিয়েছি
সবুজ সেঁদেল মাটির উপর,
সেখানে জন্ম নিয়েছে
রক্তাক্ত তাজা সূর্যমুখী,

কিন্তু---
নিভৃতে ঝরে গেল।
আমি প্রতারিত---
মিছেমিছি রক্ত দিয়ে ফুটিয়েছিলাম
লাল তাজা সূর্যমুখী।
কবরে, শ্মশানে, পথে---অরন্যে
অব্যক্ত ব্যথায় আমি কাঁদি,
বিক্ষিপ্ত পাষানের প্রতিধ্বনি
মর্মের শাখায় শাখায় গুমরে মরে!
আমার লাল রক্তটুকু বৃথা ঢেলে কি
আমি ভিজিয়েছি সবুজ সেঁদেল মাটি?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিসর্গে নিসর্গ ছবি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আসে ঢেউ কূলে কূলে উচ্ছলে
কাশের কাচুলি ঝলমল,
মাছরাঙা ধ্যানরত নির্জন কূলে,
মনে পড়ে দূর গাঁয়ের নরম মাটি।
বকুলের যুবতীরা নিটোল যৌবন
ফাগুনের কুঞ্জে করে উন্মোচিত,
রক্তে শিরায় শিরায় তাজা সুঘ্রান
ফুটে ওঠে উত্তপ্ত কামনার রাতে।
শিশির ঝরে পড়ে চুমার তপ্ত লালায়,
কসমেটিকের অনুপম সৌরভ
শিরিষ কদমের শাখায় শাখায়,
অযাচিত সুষমায় উন্মন প্রকৃতি।
ডোবান কালো জলে পচা পাট
সোঁদা গন্ধে কৃষককে রাঙ্গায়,
কাঁকনের রিনিঝিন সন্ধ্যার ঘাট
লালপেড়ে গরদের জোনাক বধূ।
মরালের মাখামাখি ধান ক্ষেতে,
কাদামাটি ভিজে ভিজে লোনা স্বাদ
পৌষের ধান ভরা অঙ্গন হতে,
কাকের কোমল শরীর তার এক পাশে
সোনালি লাল রোদে ঝলসায়।
কোথায় কখনো সাপ-পিঠ বাঁকা পথে
কিষানের নয়া মিছিল চলে দুলে দুলে,
ভাটিয়ালী গ্রামফোন বাজে কিষানের মুখে।

শিয়রে প্রভাতের উদয়নী সাইরেন
বাজায় পাপিয়া, দোয়েলী কাক,
নিত্য জীবনের চঞ্চল ট্রেন
শুর করে চলা, সূর্য ওঠার অনেক আগে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিতান্তই একা
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

যখন ঘুম থেকে জাগলাম
ক্রন্দনরত আমি একা,
দেখলাম ধীরে ধীরে আমাকে---
চিনলাম আমার চতুর্পাশ,
জানলাম অনেক ধ্রুব নক্ষত্র,
শিখলাম তাদের নাম।

যৌবনের রথে অনাবিল আনন্দে
বিচরন করলাম ত্রিভুবন,
দেখলাম অনেক --- অজশ্র ফুল,
অসংখ্য নদী প্রান্তর আমায়
জানাল সম্ভাষন। ভাবলাম
সবাই এরা বোধ হয় একান্তই আমার।

আনন্দ প্রাচুর্যের মাঝে লক্ষ্যই
করিনি--- আমিও চলছি।
তারপর আকাশে চাঁদ হাসল,
তারার দল আমায় করল নমস্কার।

প্রচুর হাসির বন্যা এলো পথে,
ভাবলাম এ-ও থাকবে চিরদিন।

কিন্তু যখন পথ শেষ হলো
দেখলাম সবাই হারিয়ে গেছে,
আমি নিতান্তই একা---
ঠিক বিষন্ন মধ্যাহ্নের মত।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বপ্নেরা মরে না
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

চারিদিকে ইতস্তত কার্ফু,
বিক্ষিপ্ত ব্লাক আউট---
অজস্র বুটের জিঘাংসা,
অথচ তারি মাঝে আমার
স্বপ্নের শাখায় অসংখ্য পুষ্প।

হঠাৎ এক ঝাঁক তাজা বুলেট
রক্তাক্ত করে দিয়ে আমার দেহ
হৃদপিণ্ড ভেদ করে চলে যায়।
অসহ্য যন্ত্রনায় লুটিয়ে পড়ি
প্রানপন চেষ্টা মৃত্যুর
কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাবার।

ক্ষুদ্ধ বেয়োনেটের সম্মুখে আমি
ঝড়ে ভাঙ্গা পর্নকূটির বিপর্যস্ত,
মৃত্যুর আগে শেষ প্রত্যাশার
অকুণ্ঠ ভিড় প্রানের দ্বারে বেঁচে থাকার---

কিন্তু কি আশ্চর্য!
স্বপ্নের ফুলগুলো হাসছে---
একটি বুলেটও স্পর্শ করেনি ওদের।
আমার বুক থেকে ঝরছে অজস্র শোনিত,

আর ওরা ক্রমান্বয়ে হচ্ছে আরো উজ্জ্বল।
আমার রক্তের প্রতি কনা
ওদের আরো দীপ্তিময় করছে
প্রদীপ্ত ভাস্করের মত।

ওরা ছড়িয়ে পড়ছে আমার বুক থেকে
সহস্র কোটি হৃদয়ে ঝড়ের হাওয়ায়।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আসন্ন শীত
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

এখন শীত পড়েছে, অতি ধীরে ধীরে ;
ছায়ায় পত্রে ; ঝাউবনে---নির্ঝরে,
হৃদয়ে ; মনের কৃষ্ণচূড়ায়---
বইছে রঙিন হিমেল হাওয়া,
দোলা দেয় বনে বনে--- খোলা জানালায়।
এই শীত উত্তাপ চাই,
সম্বল উষ্ণ বুকটাই।
কনকনে শীত যদিও নয়
নতুন আমেজ লাগে প্রানে,
প্রভাতের তপ্ত রোদটার প্রত্যাশায়---
বলকারা গৃহে, শ্বেত মরাল----
দোয়েলরা ক্ষীন কণ্ঠে গায় এই সকাল
প্রকৃতির উত্তাপ ছড়ায়,
গোলাপের গন্ধটাও বুক চিরে আসে।
সবুজ বনের সিগ্ধ শোভায়
মনটা ফেরে অবশেষে।
শিশিরও ঝরতে শুর করেছে
চামেলী, হেনা ঘর্মাক্ত মৃদু মৃদু
মুকুলের লুকোচুরিও শুরু।

এখন শীত পাতারা মর্মহত
বিদায়াভিষেক নিকটে,
শাখায় শাখায় নীরব আর্তবেদনা
সাথীর আসন্ন বিদায়ে

এখন শীত শুরু, তাই আনন্দ,
ঝরা শাখায় আবার সম্ভাবনা,
শুষ্ক প্রসূন নিশেষে ঝরে যাবে---
নতুন কলির সগৌরব আগমন।
শীত এখন--- উষ্ণতার প্রত্যাশী মন,
কিন্বা উত্তপ্ত ওষ্ঠের পরশ ;
শীত আসে, ফাল্গুন নীরবে আনে
চেতনায় উষ্ণ আবেগ।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাত জাগা ডাহুকী
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আমি এক রাত জাগা ডাহুকী ;
কুয়াশার স্বপ্ন মেখে চোখে
সারা রাত জেগে জেগে দেখি
মেঘের আড়ালে ঢাকা তোমাকে।
কালি পড়া দুটো চোখে
একরাশ বিস্ময়ের শিহরন,
শোনিতে জাগে স্পন্দন
তোমার হৃদয় আলোকে।

পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে
থেমে যায় স্তব্ধ নিঝুম
রাত্রির ঘন কালো বক্ষে,
আমি একা স্বপ্নের দেশে
সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উঠি
তোমার শিথিল শাড়ী বেয়ে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর