কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা
*
প্রত্যাশিত বিস্ফোরন
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

ইতিহাস যদি বিকৃত হয়ে
আমায় স্থান দেয় আঁস্তাকুড়ে
হিটলার কিন্বা মুসোলিনীর মত
অথবা মাহমুদ শাহ কিম্বা
তুগলককে জুড়ে দেয় যদি
আমার স্বাধীন স্বরূপে
অনুশোচনা আমার তাতে
হবে না কিঞ্চিৎ, দ্রাবিড় বা আর্যের
মত আমি আমার পশুত্বকে
জাগ্রত করব সমাজের এই
অন্ধ পশুকে নিধন করতে।

তাতে আমার জন্য নাইবা আসুক
পুষ্পার্ঘ বরন বন্দনার লালিত্য
সুর ঝংকারিত সংগীত নাই বাজুক
আমার চতুপার্শে ; আমি একা
নিশ্চিত আমি একা এই অরন্যে
অরন্য, হ্যা প্রকৃতই অরন্য এ ধরিত্রী
লোকের নয়, পশুর নয়, আঁধারের।

ইতিহাসের স্বর্নাক্ষরে নাইবা
একান্তে হলো লেখা নামটি আমার,
নাইবা উদল জীবনাকাশে মোর
বিচিত্র কতকগুলি সুন্দর তারা।

আমার নিরব বেদনা যা
আমি বার বার পেয়েছি
সমাজের কাছ খেকে---
তার বিস্ফোরন জানি একদিন
প্রচণ্ডভাবে হবে। ধুমোদ্গীরিত
অগ্নিগিরির মত আমার সত্ত্বা
আমার আত্মচেতনা প্রবল হবে

জলপ্রপাতের মত ভয়ংকর ভাবে।
ইতিহাস আবার লিখতে হবে নতুন---
আবার নতুন করে। এই যে কাল,
এ ইতিহাসে ঘুন ধরেছে। একে
ভাংতে হবে ; গড়তে হবে এ যুগের
সোপানের তালে তালে।

শাসনের গণ্ডিতে আর যদি
ইতিহাসের পরিবর্তন হয় তবে,
যুগ ক্ষমা করলেও তাকে
আমি, আমার উদ্যত আত্মা
কোনোদিন দেবে না তার স্বীকৃতি।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাজপথে
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

চলন্ত কোলাহল প্রখর তপ্ত রৌদ্র,
ছায়াহীন পুটপাতে আমিও চলন্ত একা---
গতিময় নক্ষত্রের মত বিচিত্র রূপের
সন্দিহান দৃষ্টির মাঝপথে, বাঁকা
চাঁদের সুকোমল তীক্ষ আলোক
যেমন সহসা ঠিকরে এসে পড়ে
জানালার ঝিলিমিলি পথে। লোক
লোকারন্যের রাজপথে আমিও তেমনি
শতাব্দীর বুভুক্ষু তৃষ্ণা বয়ে চলি।

চলন্ত যন্ত্রদানবগুলো আশ্চর্যভাবে
উদ্ভাসিত করেছে বিজ্ঞানের চরম সার্থকতা,
কিন্তু আমি যে দেখছি এই প্রাচূর্যময়
অঙ্গসজ্জা আর যান্ত্রিকতার মধ্যে স্পষ্ট নিরবতা
ঠিক অচেনা প্রিয়ার বিদায়বেলার
অস্পষ্ট অস্ফুট বেদনা, আমি জানি---
এই গতি এই রাজপথ --- চলন্ত মানুষ
প্রত্যেকেই আপন কর্মে নিমজ্জিত।

প্রকৃতির অজস্র সৌরভ উপভোগের
উপযুক্ত সময় কোথায়, শুধু নিয়মের
অমোঘ আকর্ষনে আমরা চলি
কথা বলি, হাসি সুন্দরভাবে
তাও অন্তর হতে নয়, কর্তব্যে।

শ্যামল পল্লীর মনোহর শোভা
আমরা পারি না ভাবতে, কারন---
পৃথিবীর সুতীক্ষ্ণ গতি আজ চন্দ্রের দিকে
অনাহারীর দিকে দিকপাত করবে কখন,---
অথচ আপন বুকে তার অস্তিত্ব।

রাস্তার একপাশে মৃতপ্রায় মগ্ন
আনবিক মানবের সহোদর--- অথচ
বাঁচবার অধিকার তারো আছে---
কিন্তু বুকের উপর দিয়েই তার জঘন্য
পৈশাচিকতার বিদেশী তেলের
পোড়া গন্ধ উড়ায় বিদেশীরই গাড়ী
অথচ এই বাংলায়।

পৃথিবীর রং বদলে গেছে,
কালের নির্মমতা বেড়েছে দ্বিগুন---
উপযুক্তেরই একমাত্র স্থান আছে
প্রতিনিয়ত সংগ্রাম বাস্তবের সাথে।
আমি তোমাদের একজন সঙ্গী
যারা অনাহারে মুমূর্যু পঙ্গু,
আমি তোমাদেরও পথের একজন
নির্ভিক অবিচল সাধক তোমরা
যারা বাস্তবের সাথে সংগ্রামরত।
কারন আমি জানি আঘাত মুখ বুজে
সহ্য করলে দাঁড়াবে না পাশে কেউ---
ঘাতককে করতে হবে নির্মূল, আর
অবিচল ধৈর্যের সাথে চালাতে হবে সংগ্রাম।
ভাগ্য আর ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে
নির্মম কালের বুকে নিশ্চিত কখনই
যাবে না রাখা আপন পদচিহ,
আমার সৃষ্টিকর্তা যখন আমি
তখন ভাগ্যকেও গড়তে হবে আমাকে।

চোখের অশ্রু মুছে এবার এসো,
আমার সাথেই কাস্তে শাবল ধরো হাতে
ভিক্ষার থালার পরিবর্তে।
অপরের কথা আর নয় এবার চেনো
নিশ্চিতভাবে চিনতে চেষ্টা করো
হয়তো তোমার মাঝেও খুঁজে পাবে
নিউটন, শেলী, সুকান্ত অথবা নজরুলকে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আদিম
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

আদিম দ্রাবিড়তার যুগ হয়েছে উত্তীর্ন,
আমাদের ক্রমবিবর্তন হয়েছে আকীর্ন।
হাতে পাথরের টুকরার পবিবর্তে
এসেছে আনবিকতার চরম সার্থকতা
পশুর উদ্ভট চিৎকার স্বর
বিলুপ্ত হয়ে এসেছে সুলালিত্য বোধগম্য ভাষা।
হৃদয়ের পাষানহীন চূড়ায়
ধীরে ধীরে জমেছে শুভ্র আশা।
চরনের রূঢ় পদক্ষেপে তবু আজো আমরা
মাড়াই তাজা রক্তাক্ত কংকাল,
আজো ভরে রেখেছি যত্ন করে
সুমার্জিত গৃহে মোদের জঞ্জাল।
আজো অন্ধকারের বুকে আমরা
নিবিড় সচ্ছন্দে নিদ্রাপ্লুত হই,

আজো দ্রাবিড় যুগের দুর্গ্ধন্ধময়
শবদেহগুলি নির্বিঘ্নে বই।
পুরানো ভিতের বাড়িটি আর
প্রয়োজন হয়নি ভাঙ্গার,
তাই ভাঙ্গা ঘরটির উপর
আয়োজন করছি দ্বিতল কোঠা তৈরীর।
পুঁজ ঝরা দেহের ক্ষত স্থানে
সুসজ্জিত অলংকার রেখেছি
সুগন্ধময় সৌরভিত করে।
আশ্চর্য সেই আদিম দ্রাবিড় :
শতাব্দী ; তারপর বিংশ যুগ
তারা কাঁচা মাংস খেতো
আমরা খাই তাজা রক্ত
তাদের চেয়ে আমাদের
বিভৎস দক্তগুলোই অভিজ্ঞ
কি করে অসহায়ের বুকে
দাঁতের বিষ ঢুকিয়ে
লালিত্য সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে
রক্ত শোষায় নব প্রবর্তনের।
সত্যি অশ্চির্ধ! সেই দ্রাবিড় :
এই চাঁদের মানুষ অথচ
পার্থক্য নেই এতটুকুও।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
একই সিঁড়ি
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ        
“খুটিনাটি খুনশুটি ও অন্যান্য কবিতা” (১৯৯১) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। অসীম সাহা সম্পাদিত
“রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহর রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড” থেকে। কবির বানান।  

যদি হঠাৎ ক্যাম্বোডিয়ায়
বিস্ফোরিত হয় প্রচণ্ড কোন মাইন,
কিম্বা বিমানবিধ্বংসী কামানগুলো
দ্বারুনভাবে করে ধুমোদর্গীরন
ক্ষুধার্ত ঈগলের মতো ফ্যাণ্টমের ঝাঁক
তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে যদি টুকরো টুকরো ক'রে
ছিঁড়ে নেয় কোন নর্তকীর পেলব
দেহের সুবাসিত অংগ---এই ক্যাম্বোডিয়ারই
জানি, নর্তকীর সুঠাম দেহপল্লব
সেথা বারুদের পোড়া বিশ্রী গন্ধে
আর অবিশ্রাম সংগ্রামে বিক্ষত।
যদি মার স্তন্য হতে ছিনিয়ে নেয়
পিপাসিত শিশুর দুগ্ধ, যদি তীক্ষ্ণ
বেয়েনেটের নির্মম খোঁচায়
থেঁতিয়ে দেয় কুমারী বোনের অংগ।
যদি ফিলিস্তিনী গেরিলা কমাণ্ড
সামান্য অসাবধানতায় ভস্মিভূত হয়
নিজেদেরই পুঁতে রাখা ডিনামাইটে---
আমার তাতে দুঃখ নেই একবিন্দু।
শোকের বিহ্বলতায় পড়ব না মুষড়ে।
আমার ক্ষুদ্র কিশোর হৃদয়
যদিও দারুন ব্যথায় বাষ্পরুদ্ধ হবার কথা
তবু আমি পেয়েছি নবীন আলোর
পরশমনি স্পর্শ। আঘাত পেয়ে
সেই ব্যথা নিয়ে যদি বিলাপ করি
আঘাতকারীকে কখন করব প্রতিঘাত।
নিহত মায়ের বক্ষে লুটিয়ে যদি
করুন কান্নায় বুক ভাসাই তবে
কতক্ষনে করব ঘাতকের নিধন যজ্ঞ।
বেদনা বিলাপ আর শোক
শুধু মিছেমিছিই করা তাতে
নিজের ক্ষতি,---- আর অত্যাচারীর সুযোগ।
বিলাপের দিন আজ নয়
আজ নবীন উল্লাসে শক্র নিধন
---এই নবীনেরও সমুখে আসছে আঁধার
কারন তোমাকেও একদিন
প্রবীন বোলে আখ্যায়িত করবে
অনাদিযুগের নতুন।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর